ঢাকা, রোববার 23 September 2018, ৮ আশ্বিন ১৪২৫, ১২ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ভারতে ধর্ষণের দায়ে ধর্মগুরুর সাজা

সংগ্রাম অনলাইন ডেস্ক:

ভারতে বহুল আলোচিত, বিতর্কিত ও পরিচিত এক অ্যাধ্যাত্মিক গুরুকে ধর্ষণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন যে সারা পৃথিবীতে তার লাখ লাখ ভক্ত রয়েছে।

উত্তরাঞ্চলীয় যোধপুর শহরের একটি আদালত তার রায়ে বলেছে, আসারাম বাপু ২০১৩ সালে ওই শহরের একটি আশ্রমে ১৬ বছর বয়সী একটি মেয়েকে ধর্ষণ করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই রায়ের বিরুদ্ধে তিনি উচ্চতর আদালতে আপিল করতে পারেন।

ব্যাপক পুলিশী নিরাপত্তার মধ্যে যোধপুরের জেলের ভেতরেই একটি বিশেষ আদালত কক্ষ তৈরি করে আসারাম বাপুকে নাবালিকা ধর্ষণের মামলায় দোষী সাব্যস্ত করা হয় বুধবার সকালে। ওই জেলেই ২০১৩ সাল থেকে আটক রয়েছেন আসারাম বাপু।

এক নারী সহকর্মীসহ আসারাম বাপুর আরও চার সহকারী এই ধর্ষণ মামলায় অভিযুক্ত।

সারা বিশ্বে ৭৭ বছর বয়সী এই গুরুর চারশোর মতো আশ্রম রয়েছে যেখানে তিনি মেডিটেশন ও যোগ ব্যায়াম সম্পর্কে তার অনুসারীদের শিক্ষা দিয়ে থাকেন।

ভারতের গুজরাট রাজ্যেও আরো একটি ধর্ষণের মামলায় তার বিচার চলছে।

রায় ঘোষণা উপলক্ষে যোধপুর শহরে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। রায়ের ফলে গুরুর সমর্থকরা সহিংসতা করতে পারেন এই আশঙ্কা থেকেই এই ব্যবস্থা।

আসারাম বাপু তার ভক্তদের মেডিটেশন ও যোগ শেখান

এর আগে আরেক ধর্মগুরু - গুরমিত রাম রহিম সিং ইনসানও একাধিক নারীকে ধর্ষণের দায়ে এখন জেল খাটছেন।

রাম রহিমকে যেদিন পাচকুইয়ার বিশেষ আদালত দোষী সাব্যস্ত করেছিল, সেদিন তার হাজার হাজার ভক্ত গোটা শহরে দাঙ্গা লাগিয়ে দিয়েছিল।

সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আজ যোধপুর শহরকে নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে ফেলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সেখানে উপস্থিত বিবিসি সংবাদদাতারা।

অপশক্তি তাড়ানোর নামে ধর্ষণ

১৬ বছর বয়সী এক কিশোরী অভিযোগ করে যে নিজের আশ্রমেই তাকে ধর্ষণ করে আসারাম বাপু।

উত্তরপ্রদেশের সাহারাণপুরের বাসিন্দা ওই কিশোরীর পরিবার ঘটনার আগে পর্যন্ত আসারাম বাপুর কট্টর ভক্ত ছিল।

সেখানে আসারাম বাপুর একটা আশ্রমও বানিয়ে দিয়েছিলেন নির্যাতিতা কিশোরীর বাবা। দুই মেয়েকে ভাল শিক্ষা দেওয়ার জন্য 'বাপু'র আশ্রমে পাঠিয়েছিলেন তাদের পিতা।

পুলিশের চার্জশীট অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ৭ অগাস্ট ওই আশ্রম থেকে ফোন পান নির্যাতিতার বাবা। বলা হয় তার মেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে।

পরের দিন ওই আশ্রমে গেলে তার বাবাকে জানানো হয় যে ওই কিশোরীর ওপরে অপশক্তি ভর করেছে। একমাত্র আসারাম বাপুই তাকে সুস্থ করে তুলতে পারবেন।

সেই আশায় ছিন্দওয়াড়া থেকে নির্যাতিতার পুরো পরিবারই রাজস্থানের যোধপুরে আসারাম বাপুর আশ্রমে যান।

ওই কিশোরীকে সুস্থ করে তোলার নাম করে ১৫ই অগাস্ট সন্ধ্যায় নিজের ঘরে তাকে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করে আসারাম বাপু।

ঘটনার পরে একাধিকবার ওই পরিবারকে ঘুষ দিতে চাওয়া হয়েছে, এমন কি প্রাণে মেরে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয়েছে।

তবুও ওই কিশোরী গত ৫ বছর ধরে তার নিজের বয়ানেই অটল থেকেছে।

কে এই আসারাম বাপু

বর্তমান পাকিস্তানের সিন্ধ প্রদেশে ১৯৪১ সালে জন্ম নেওয়া আসারামের আসল নাম অসুমল হরপলানি।

দেশভাগের পরে তার পরিবার ভারতে চলে আসে।

৬০-এর দশকে দীক্ষা নিয়ে অসুমল থেকে আসারাম হন তিনি। ১৯৭২ সালে গুজরাটের আহমেদাবাদের সবরমতি নদীর তীরে নিজের প্রথম আশ্রমটি গড়ে তোলেন তিনি।

ধীরে ধীরে গুজরাটের নানা জায়গায়, আর পরে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে আশ্রম গড়ে তোলেন আসারাম।

ভক্তদের মধ্যে অটল বিহারী বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আদভানী, কংগ্রেসের দিগ্বিজয় সিং, কমলনাথ, মোতিলাল ভোরা যেমন ছিলেন, তেমনই সবথেকে নামকরা দর্শনার্থীদের মধ্যে ছিলেন নরেন্দ্র মোদীও।

তবে ২০০৮ সালে আসারামের এক আশ্রমে দুই নাবালকের হত্যার ঘটনা সামনে আসার পর থেকে সব রাজনৈতিক দলের নেতা-মন্ত্রীরাই ধীরে ধীরে দূরে সরে যান।

 

এই গুরুর বিরুদ্ধে বহু মানুষের ক্ষোভ রয়েছে।

তার প্রভাব গত কয়েক দশকে ভারতের সীমানার বাইরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। তার ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুসারে সারা দুনিয়ায় তার ভক্তের সংখ্যা চার কোটির মতো।

সারা ভারতে তার কোটি কোটি ডলার মূল্যের সম্পদ রয়েছে। বলা হয় তার মোট সম্পত্তির পরিমান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা।

তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও জালিয়াতির অভিযোগেও তদন্ত চলছে।

জামিনের চেষ্টা

গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকেই জামিন পাওয়ার জন্য দেশের সেরা আর সব থেকে দামী উকিলদের কাজে লাগিয়েছিলেন আসারাম বাপু।

তার পক্ষ নিয়ে নানা সময়ে আদালতে আইনি লড়াই চালিয়েছেন রাম জেঠমালানি, রাজু রামচন্দ্রন, সুব্রহ্ম্যনিয়াম স্বামী, সিদ্ধার্থ লুথরা, সলমান খুর্শিদ, কে টি এস তুলসী বা ইউ ইউ ললিতের মতো বাঘা বাঘা আইনজীবীরা।

তবুও ১১ বার তার জামিনের আবেদন খারিজ করে বিভিন্ন আদালত।

তার বিচারকে ঘিরে বিতর্ক

ভারতে গুজরাট রাজ্যের সুরাট শহরে ২০০২ সাল থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে আরো একজন নারীকে ধর্ষণের অভিযোগে তার বিচার চলছে।

এই দুটো মামলায় অন্তত পাঁচজন সাক্ষী গত পাঁচ বছরের বিভিন্ন সময়ে হামলার শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে তিনজন মারাও গেছেন। তার বিরুদ্ধে লেখালেখির কারণে সাংবাদিকের উপরেও হামলা করা হয়েছে।

এসব হামলার ঘটনাও পুলিশ তদন্ত করে দেখছে।

যারা হামলার শিকার হয়েছেন তাদের পরিবার বলছে, গুরু এবং তার অনুসারীরা এসব হামলা চালিয়েছে। আসারাম বাপুর পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ সবসময় অস্বীকার করা হয়েছে।

সূত্র: বিবিসি

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ