ঢাকা, বৃহস্পতিবার 26 April 2018, ১৩ বৈশাখ ১৪২৫, ৯ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

পুষ্টি পূরণে দেশ এখনও অনেক পিছিয়ে

ইবরাহীম খলিল : বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তার মান এখনও নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। সেইসাথে এর অবস্থাও অস্থিতিশীল রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এরপরও খাদ্য খাতে দেশের অনেকটা অগ্রগতি হলেও পুষ্টি পূরণের ক্ষেত্রে দেশ অনেকটা পিছিয়ে আছে। এছাড়া দেশে এখনও শিশুদের পুষ্টি, খর্বাকায় পরিস্থিতি এবং পাঁচ বছরের নিচে শিশুদের কম ওজন সমস্যা উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে।
এশিয়ার খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টির ধারাবাহিক উন্নতি হয়নি। কখনও কখনও এই পরিস্থিতি পেছনের দিকেও হেঁটেছে। বাংলাদেশের খাদ্যের দাম খুব বেশি উঠানামা করে।
খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করার জন্য প্রতিবেদনে সময়ভিত্তিক খাদ্য উৎপাদনের তথ্য, বিশ্ব খাদ্য সংস্থা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে। কিন্তু এখনও পুষ্টির বিষয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাছাড়া দুর্নীতি, সুশাসনের অভাব, রাজনৈতিক সহিংসতার সময়কালেও খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে। বিগত সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা কিভাবে খাদ্য নিরাপত্তাকে বাধাগ্রস্থ করেছে সেটিও তুলে ধরা হয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ভূমি ক্ষয়, অতিমাত্রায় রাসায়নিক সার প্রয়োগ, ভূগর্ভস্থ পানি দূষণ প্রভৃতি খাদ্য নিরাপত্তায় বাধা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এডিবি বিভিন্ন দেশের দুর্নীতি এবং অর্থনৈতিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে উল্লেখ করেছে, যে দেশ যত দুর্নীতিগ্রস্ত সেদেশের খাদ্য নিরাপত্তা তত ঝুঁকিতে থাকে।
২০১৪ পর্যন্ত সময় ভিত্তিক খাদ্য উৎপাদনের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ ধান উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংস্পূর্ণ (৯৯%)। কিন্তু অন্যান্য খাদ্য উৎপাদনে পিছিয়ে রয়েছে। দেশের চাহিদার তুলনায় গম ২৭ ভাগ, ভুট্টা ৬৮ ভাগ এবং সয়াবিন উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৪৬ ভাগ। বাকিটা আমদানি নির্ভর। মাছ, মাংস, দুধ, ডিম এবং ডাল হলো আমিষের মূল উৎস।
২০১৫ সালের বিশ্ব খাদ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী বছরে মাথাপিছু মাত্র দশমিক ২৫ মেট্রিক টন ডাল উৎপাদন হয় যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। দেশে গড়ে মাথাপিছু বছরে দশমিক ৮ টন ডাল আমদানি করতে হচ্ছে। দেশে প্রাণীজ আমিষ গ্রহণের হারও অনেক কম। পুষ্টি পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে উল্লেখ করা হয়েছে, গর্ভবতী নারীদের রক্ত স্বল্পতার হার ২০১০ সালে ৪৮ শতাংশ ছিল যা ১০১৫ সালেও কোন পরিবর্তন হয়নি। ৫ বছরের নিচে শিশুদের এ সমস্যা প্রায় ৫৬ ভাগ। প্রতিবেদনে বাংলাদেশ, ভারত, চীন, ইন্দোনেশিয়া, ইসরাইল, জাপান, কোরিয়া, পাকিস্তান, সিঙ্গাপুরের খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতির তুলনামূলক তথ্য সন্নিবেশন করা হয়েছে।
এদিকে অপুষ্টির কারণে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে  বলে মনে করেন স্বাস্থ্য খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, খাদ্য খাতে অগ্রগতি হলেও পুষ্টি পূরণের ক্ষেত্রে এখনও দেশ অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে।
পুষ্টির অভাবে শূন্য থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে শতকরা ৩৮ দশমিক ৭ ভাগ ছোট আকৃতির, ৩৫ দশমিক ১ ভাগ কম ওজনের এবং ১৬ দশমিক ৩ ভাগ শিশুর আকৃতি ছোট হচ্ছে। পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, পুষ্টির অভাবে শিশুরা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস ও অপুষ্টিতে ভোগার আশঙ্কা বেশি থাকে। রক্তস্বল্পতাসহ নানা রোগেও আক্রান্ত হয়ে থাকে।
পুষ্টি ও প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলেন, অপুষ্টির শিকার মা ও শিশুর সংখ্যা আগের তুলনায় কমলেও তা খুব বেশি ইতিবাচক নয়। পুষ্টির চাহিদা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে ভাতের ওপর চাপ কমবে এবং শিশুদের মেধার বিকাশ ঘটবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপুষ্টির প্রধান কারণ জনসংখ্যা, দারিদ্র্য, পুষ্টি সম্পর্কে অজ্ঞতা ও জনসচেতনতার অভাব। দরিদ্র পরিবারে খাদ্যের সহজলভ্যতা না থাকার সঙ্গে সঙ্গে স্বচ্ছল ও অবস্থাপন্ন পরিবারেও শিশুদের অপুষ্টির শিকার হতে দেখা যাচ্ছে। পুষ্টিকর খাবার না দিয়ে শিশুদের আবদার মেটাতে পানীয়, জুস ও চিপস দিচ্ছে। জাঙ্ক ফুডের কারণেও শিশুদের শরীরে ক্ষতি হচ্ছে। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বা কম খেতে দেয়াও অপুষ্টির কারণ। বয়স অনুপাতে কতোটুকু খাবার, কী খাবার, কতক্ষণ পর খাবে, তা অনেক মা-বাবা বুঝতে পারেন না। অপুষ্টি দূর করতে শিশুর সুষম খাদ্য গ্রহণের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এটা শুধু শিশুই নয়, কিশোর-কিশোরীসহ সব বয়সের মানুষের জন্যও প্রযোজ্য।
তারা আরো বলেন, রক্তস্বল্পতা, ঠোঁটের কোণায় ঘা, পেটের অসুখ, চোখের নানা সমস্যা, চর্মরোগ, আমাশয়, চুলপড়া, পেটে কৃমি, শারীরিক গঠন সঠিক না হওয়া ও স্নাযুতন্ত্রে বিকাশ ব্যাহত ইত্যাদি অপুষ্টির কারণে হয়ে থাকে। অনেকে মনে করেন, বেশি দুধ ও মাংস খেলে স্বাস্থ্য ভাল হয়। কিন্তু তা নয়, শিশুসহ প্রতিটি মানুষের বয়স অনুপাতে মিশ্র খাবার অর্থাৎ সুষম খাবার গ্রহণ করতে হবে। সে জন্য মাংস ও দুধের সঙ্গে মাছ, ডিম, ডাল, ভাত, সবজি, ফলমূল খেতে হবে।
সাউথ এশিয়া ফুড এন্ড নিউট্রিশন সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ (এসএএফএএনসিআই)-এর তথ্যপত্রে দেখা গেছে, বাংলাদেশে অপুষ্টির হার ১৯৯০ সালের পর থেকে ব্যাপকভাবে কমে এসেছে। ২০১৫ সালের মধ্যে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ওজন স্বল্পতার হার অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। যেহেতু নারী ও ছোট শিশুরা বেশি অপুষ্টির শিকার হয়, সেহেতু মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি ও জলাভূমির টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে, ছোট জাতের মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে মাছের সার্বিক উৎপাদন বৃদ্ধি, এবং পুষ্টিমান বাড়াতে এ গবেষণায় গুরুত্ব আরোপ করা হয়।
পুষ্টি সম্পর্কে সচেতনতা, পুষ্টিশিক্ষা এবং শিশুদের সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে সহায়তা করতে মা-বাবা’র সচেতনতার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এ জন্য হাসপাতাল ও গণমাধ্যমের ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য। দৈনন্দিন খাবারে যথেষ্ট অণুপুষ্টি না পেলে শিশুরা অপুষ্টির শিকার হয়। ফলে তাদের পক্ষে স্কুলে শেখা এবং পরবর্তীতে কর্মজীবনেও ভাল করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ ধরনের ক্ষতি অপূরণীয়। অপুষ্টির শিকার যারা তাদেরসহ অন্যান্যদের এ বিষয়ে আরো অধিক মনোযোগি হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।
ইউনিসেফের এক জরিপ থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশে শতকরা ৬০ ভাগ শিশু কম ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। খাদ্য ঘাটতির কারণে কম বয়সী শিশুদের শতকরা ৪৭ ভাগ শিশুই মারাত্মক স্বা¯’্যহীনতায় ভোগে। এর মধ্যে রক্তস্বল্পতা একটি উল্লেখযোগ্য কারণ।
চিকিৎসকদের মতে, অপুষ্টি একটি মারাত্মক জনসমস্যা। এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে কোন খাবারে কি পরিমাণ পুষ্টি রয়েছে সে সম্পর্কে অভিভাবকদের সঠিক ধারণা থাকা প্রয়োজন। সমাজে কিছু সমস্যা রয়েছে, যা শিশু অপুষ্টির কারণ, তা হলো মাতৃদুগ্ধের বিকল্প খাদ্যের ব্যবহার। নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর মাধ্যমেও বিকল্প এ মাতৃদুগ্ধ মা’র হাতে পৌঁছে থাকে।
বিডিএইচএসের সর্বশেষ এক জরিপে দেখা যায়, ২০১১ সালে বাংলাদেশে কম ওজনের শিশু ছিল শতকরা ৩৬ ভাগ। অর্থাৎ এই শিশুরা আড়াই কেজির কম ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছে।
২০১১-১২ সালে জাতীয় পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে জাতীয় অনুপুষ্টি সমীক্ষা হয়েছিল। সেখানে দেখা যায়, ৯ থেকে ১৪ বছরের কিশোরী মেয়েরা আয়রন (লৌহ জাতীয়) খাবার প্রয়োজনের তুলনায় ২০ শতাংশ কম খায়। শতকরা ১০ ভাগ মাছ ও মাংস খেতে পায়। এ সমস্যা কিশোর-কিশোরী উভয়ের।
 দেশে পুষ্টি বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি ও পুষ্টি উন্নয়নের গতিকে ত্বরান্বিত করার মাধ্যমে অভীষ্ঠ অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে গত সোমবার থেকে শুরু হয়েছে জাতীয় পুষ্টি সপ্তাহ-২০১৮। জনগণের খাদ্যাভাস ও খাদ্য পরিকল্পনায় পুষ্টির বিষয়টিকে গূরুত্ব দেয়ার লক্ষ্যে এবছর পুষ্টি সপ্তাহের প্রতিপাদ্য নির্ধারন করা হয়েছে ‘খাদ্যের কথা ভাবলে পুষ্টির কথাও ভাবুন’। দীর্ঘ ১৯ বছর পর এবছর পালিত হচ্ছে পুষ্টি সপ্তাহ। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রনালয়ের উদ্যোগে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে এই সপ্তাহ।
২০২৫ সালের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের অপুষ্টি হ্রাস করতে ‘জাতীয় পুষ্টিনীতি ২০১৫’ ও অন্যান্য নীতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অনুসরণ করে দ্বিতীয় জাতীয় পুষ্টি কর্মপরিকল্পনায় (২০১৬-২০২৫) কয়েকটি সূচক ও লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
এগুলোর মধ্যে রয়েছে- শিশুর জন্মের প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর হার ৮০%-এ উন্নীত করা, ৬ মাসের কম বয়সী শিশুদের শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর হার বাড়িয়ে ৭০%-এ উন্নীত করা, ২০ থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুদের বুকের দুধ খাওয়ানো অব্যাহত রাখার হার ৯৫% করা, ৬-২৩ মাস বয়সী শিশুদের ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য খাবার গ্রহণের হার বাড়িয়ে ৪০%-এর বেশি করা, কম জন্ম ওজনের হার কমিয়ে ১৬% করা, ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের খর্বাকৃতির হার কমিয়ে ২৫% করা, ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে কৃশকায়তার হার কমিয়ে ৮% করা, ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে কম ওজনের হার কমিয়ে ১৫% করা, ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে মারাত্মক তীব্র অপুষ্টির হার কমিয়ে ১%-এর নিচে আনা।
পুষ্টি সপ্তাহের প্রথম দিনে মেলা ও র‌্যালি, দ্বিতীয় দিনে গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েদের পুষ্টি নিশ্চিতকরণ, তৃতীয় দিনে ৫ বছরের নিচে সব শিশুর পুষ্টি নিশ্চিতকরণ, চতুর্থ দিনে কিশোরী ও স্কুল পুষ্টি নিশ্চিতকরণ, পঞ্চম দিনে বৃদ্ধদের পুষ্টি, ওয়াটার, স্যানিটেশন ও হাইজিন নিশ্চিতকরণ, ষষ্ঠদিনে বহুপাক্ষিক অবহিতকরণ ও সমন্বয় এবং সমাপনী দিনে পুষ্টি বিষয়ে রচনা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণ করা হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ