ঢাকা, বৃহস্পতিবার 26 April 2018, ১৩ বৈশাখ ১৪২৫, ৯ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কোটার ফাঁদে বঞ্চিত মেধাবীরা

স্টাফ রিপোর্টার : আজ ২৬ এপ্রিল বৃহস্পতিবার। বিশ্ব মেধা সম্পদ দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হয় দিবসটি। কিন্তু নানা কোটার কারণে বাংলাদেশের মেধাবীরা কাজে আসছে না দেশের প্রয়োজনে। অনেকেই কোটার ফাঁদে পড়ে দুর্বিসহ জীবন যাপন করছেন। আবার অনেকেই দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যাচ্ছেন। এর মধ্যে প্রধানত সরকারি চাকরিতে কোটার ফাঁদে বাদ পড়তে হচ্ছে মেধাবী অনেককে।
বর্তমানে দেশে পাঁচ শতাংশ কোটা রাখা হয়েছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য। প্রতিবন্ধী এক শতাংশ, মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য ৩০ শতাংশ, নারী ও জেলা কোটা ১০ শতাংশ করে। সব মিলিয়ে কোটার জন্য বরাদ্দ ৫৬ শতাংশ। ফলে এর কোনো শ্রেণিতে যারা পড়েন না, তাদের প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে বাকি ৪৪ শতাংশের জন্য। পঞ্চম আদমশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের জনসংখ্যা ১৫ কোটি ২৫ লাখ ১৮ হাজার ১৫ জন। এর মধ্যে ১৫ লাখ ৮৬ হাজার ১৪১ জন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী এবং ২০ লাখ ১৬ হাজার ৬১২ জন প্রতিবন্ধী। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, দেশে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা প্রায় দুই লাখ। এই হিসেবে মোট জনসংখ্যার ১ দশমিক ১০ শতাংশ নৃ-গোষ্ঠীর জন্য কোটা সংরক্ষিত থাকছে পাঁচ শতাংশ, ১ দশমিক ৪০ শতাংশ প্রতিবন্ধীর জন্য এক শতাংশ এবং শূন্য দশমিক ১৩ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য ৩০ শতাংশ।
এ মাসের শুরুতে দেশে কোটা সংস্কারের আন্দোলন তীব্র হয়। প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার আশ্বাসে আন্দোলন স্থগিত হয়। সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আকবর আলি খানও বিদ্যমান কোটা পদ্ধতি সংস্কারের পক্ষে মত দিয়ে বলেন, অধিকাংশ কোটাই অসাংবিধানিক ও ন্যায়নীতির পরিপন্থী। মেধা কোটা ৫০ শতাংশের কম হওয়া উচিত নয় বলেও মনে করেন তিনি। আকবর আলি বলেন, কোনো কোটাই চিরদিন থাকতে পারে না। প্রত্যেক কোটার সময়সীমা নির্ধারণ করে দেয়া উচিত। দেশে যখন ১৭ জেলা ছিল তখন চালু হয় ‘জেলা কোটা’। পরে ১৭ জেলা ভেঙে ৬৪টি করা হলেও সেই কোটাই রয়ে গেছে। অন্যদিকে জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে উপজাতি ও প্রতিবন্ধী কোটা সংরক্ষণ করা হচ্ছে না। সরকারি চাকরিতে ২৫৭ রকমের কোটা প্রচলিত আছে তথ্য দেন এই সাবেক আমলা।
সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির ১৯ অনুচ্ছেদের (১)-এ বলা হয়েছে, সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবেন। (২) মানুষে মানুষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য বিলোপ করিবার জন্য নাগরিকদের মধ্যে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করিবার জন্য এবং প্রজাতন্ত্রের সর্বত্র অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমান স্তর অর্জনের উদ্দেশ্যে সুষম সুযোগ সুবিধাদান নিশ্চিত করিবার জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন। (৩) জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতা রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশ গড়ার কাজে দেশের সর্বোচ্চ মেধাবীদের কাজে লাগানোর জন্যই সর্বোচ্চ চাকরিগুলোতে সর্বোচ্চ মেধাবীদের নিয়োগ দেওয়া অনিবার্য। দেশের মঙ্গলের জন্যই এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। কারণ আজ যে ছেলেটাকে বা মেয়েটাকে দশম হওয়া সত্ত্বেও সর্বোচ্চ পদে নিয়োগ দেওয়া হবে, সে কিন্তু আরও অন্তত ৩০/৩৫ বছর দয়ার দানে পাওয়া চাকরি করে অবসরে যাবে। আর আজকের মেধাবী ছেলেটা বা মেয়েটার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হবে বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত অমুক দেশের নাগরিক। শুধু কল্পনা করুন, এভাবে চলতে থাকলে আমাদের দেশের ভবিষ্যত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?
কিন্তু আমরা আমাদের কোনো কোনো সন্তানের প্রতি পক্ষপতদুষ্ট হয়ে অন্য সন্তানকে বঞ্চিত করছি। তাই বাধ্য হয়ে যথার্থ যোগ্য সন্তানটি রাগে-ক্ষোভে-দুঃখে-অভিমানে দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের ভবিষ্যত নিঃসন্দেহে অন্ধকার থেকে গভীরতরো অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে।
কোটা-প্রথাকে বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে যে, একজন কোটাধারী যথার্থ মেধাবী ছেলে বা মেয়ে কোটাধারী হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতে লজ্জা পাচ্ছে। কেন আত্মপরিচয় সংকটে ফেলে দেয়া হচ্ছে তাদের? আত্ম-পরিচয় নিয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচতে দেওয়া হোক দেশের প্রতিটি মেধাবী সন্তানকে।
তাছাড়া, কেবল চাকরি দিয়েই সুবিধা দিতে হবে কেন? দেশের মঙ্গলের জন্যই বিকল্প পন্থা আবিষ্কার করতে হবে। যে কাঁধ যে দায়িত্বের উপযুক্ত তাকে সে দায়িত্বই অর্পণ করা উচিত। যদি জাতির উন্নতি চাই, যথার্থ মুক্তি চাই, এই উদ্যোগের কোনো বিকল্প নাই। যে কাঁধ যে দায়িত্ব নেওয়ার উপযুক্ত নয়, সে কাঁধে সে দায়িত্ব অর্পণ করলে তো সে কাঁধ ভেঙে পড়বেই। ভেঙে পড়বে জাতির মেরুদ-, জাতির ভবিষ্যৎ।
তাই দেশের সর্বোচ্চ দায়িত্বগুলো সর্বোচ্চ মেধাবীদের হাতেই অর্পণ করা উচিত। তবেই দেশ হবে সমৃদ্ধ, জাতি হবে উন্নত। মেধাবীদের বিদেশে চলে যাওয়ার মোহ থেকে, দেশের প্রতি তৈরি হওয়া অনীহা থেকে এখনি মুক্তি দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। নতুবা দূর-ভবিষ্যতে নয়, নিকট-ভবিষ্যতেই মেধাশূন্যতায় জাতীয় নেতৃত্ব নিমজ্জিত হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ