ঢাকা, বৃহস্পতিবার 26 April 2018, ১৩ বৈশাখ ১৪২৫, ৯ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বেওয়ারিশ লাশ

খুনি ও ঘাতকরা রাজধানী ঢাকাকে বেওয়ারিশ লাশের ‘ডাম্পিং গ্রাউন্ডে’ পরিণত করেছে বলে একটি জাতীয় দৈনিকের রিপোর্টে জানানো হয়েছে। নাম-পরিচয়হীন তথা বেওয়ারিশ লাশের দাফন ও শেষকৃত্যের কাজে নিয়োজিত সংস্থা আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রকাশিত ওই রিপোর্টে জানা গেছে, রাজধানী ও এর আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় প্রতিদিনই একাধিক বেওয়ারিশ লাশ উদ্ধার করা হয়। দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না, তাদের প্রত্যেককে খুন করা হয়েছে। গুলি করে বা ধারালো কোনো অস্ত্রের আঘাতে হত্যা করার পর খুনি-ঘাতকরা লাশগুলোকে সাধারণত নদ-নদীতে ভাসিয়ে দেয়। এ উদ্দেশ্যে রাজধানীর চারপাশে প্রবাহিত বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী, তুরাগ, বালু এবং শীতলক্ষ্যাকে বেছে নেয়া হয়।
কোনো কোনো লাশ পাওয়া যায় বস্তাবন্দি অবস্থায়। অনেক লাশকে আবার কিছু বিশেষ এলাকায় রাস্তার ধারে বা ডোবা-নালায় ফেলে দেয়া হয়। রূপগঞ্জের পূর্বাচল উপশহর, ডেমরা, মিরপুরের বেড়িবাঁধ, বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত রেললাইনের উভয় পাশ, যাত্রাবাড়ি, শ্যামপুরের ওয়াসা পুকুর পাড়, কামরাঙ্গীর চরের বেড়িবাঁধ এবং কুড়িল-কাঞ্চন তিনশ ফুট সড়কের আশপাশসহ রাজধানীর প্রায় সব এলাকাতেই আজকাল বেওয়ারিশ লাশ পাওয়া যাচ্ছে। কয়েকদিন পর্যন্ত পড়ে থাকে বলে বেশিরভাগ লাশই পচে ও গলে যায় এবং তার ফলে সেগুলোকে শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। থানায় হারিয়ে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ বা জিডি না থাকায় এবং বেওয়ারিশ তথা অজ্ঞাত বলে পুলিশ সাধারণত লাশগুলো সম্পর্কিত তদন্তের ব্যাপারে আগ্রহ দেখায় না। তারা বরং আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামকে খবর দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব পালনের অবসান ঘটায়। তেমন অবস্থায় আঞ্জুমানের পক্ষ থেকে আজিমপুর ও জুরাইনসহ কয়েকটি কবরস্থানে লাশগুলোকে দাফন করা হয়। লাশ কোনো হিন্দুর বা অমুসলিমের হলে শেষকৃত্যের কাজও করে আঞ্জুমান। এভাবেই বেওয়ারিশ বা অজ্ঞাত পরিচয় হিসেবে হারিয়ে যায় অসংখ্য নিহত মানুষ।
ভীতি ও উদ্বেগের অন্য কিছু কারণেরও উল্লেখ রয়েছে দৈনিকটির রিপোর্টে। বেওয়ারিশ লাশের সংখ্যা এরকম একটি প্রধান কারণ। আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের উদ্ধৃতি দিয়ে রিপোর্টে জানানো হয়েছে, প্রতিমাসে ১০৩টি হিসেবে বছরে গড়ে এক হাজার ২৩৪টি লাশের দাফন করে সংস্থাটি। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে তিনজনের বেশি ব্যক্তির লাশ দাফন করা হচ্ছে। অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এমন অবস্থা চলছে বেশ কয়েক বছর ধরেই। আঞ্জুমানের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এক হাজার ৩৩৩টি, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এক হাজার ৩৫৭টি এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এক হাজার ৩০০টি বেওয়ারিশ লাশ দাফন করেছে আঞ্জুমান। চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে বেওয়ারিশ লাশের সংখ্যা ছিল ৭৮০।
অন্য একটি তথ্যও যথেষ্ট ভীতিকর। যে সব লাশ দাফন করা হচ্ছে তাদের অধিকাংশের বয়সই ১৬ থেকে ৪৭ বছরের মধ্যে। অনেক যুবতী নারীর লাশও দাফন করেছে আঞ্জুমান। যার অর্থ, খুনি-ঘাতকরা নারীদেরও হত্যা করছে। হত্যার আগে তাদের ওপর যৌন নির্যাতন চালানো হয়ে থাকতে পারে বলেও মনে করেন তথ্যাভিজ্ঞরা।
বলার অপেক্ষা রাখে না, বেওয়ারিশ লাশ সংক্রান্ত রিপোর্ট এবং এতে উল্লেখিত তথ্য-পরিসংখ্যানগুলো যে কোনো বিচারে অত্যন্ত ভীতিকর ও আশংকাজনক। বলা দরকার, এই রিপোর্টে শুধু রাজধানী ও এর আশপাশের তথ্য-পরিসংখ্যান দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে একই ধরনের নৃশংস হত্যাকান্ড চলছে সারাদেশেইÑ এমনকি গ্রামাঞ্চলে পর্যন্ত। এর সঙ্গে আবার গুমও যুক্ত হয়েছে। জড়িয়ে পড়েছে র‌্যাব ও পুলিশসহ সরকারের আইন-শৃংখলা বাহিনীর নামও। কে জানে, বেওয়ারিশ হিসেবে যেসব লাশ উদ্ধার করা হয়েছে ও হচ্ছে, তাদের মধ্যে ‘বন্দুক যুদ্ধ’ এবং ‘ক্রসফায়ারের’ মতো ঘটনার অসহায় শিকার ব্যক্তিরাও রয়েছে কি না। এভাবে কতো মানুষের জীবন যে ধ্বংস করা হয়েছে ও হচ্ছে তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান কখনোই জানা সম্ভব হবে না। আমাদের আপত্তি ও প্রতিবাদের কারণ হলো, খুব কম ঘটনার ক্ষেত্রেই খুনি-ঘাতকদের চিহ্নিত ও গ্রেফতার করা হচ্ছে। শাস্তিও কেউ পাচ্ছে না বললেই চলে। একই কারণে সংযত হওয়ার পরিবর্তে খুনি-ঘাতকরা উল্টো ‘লাই’ পেয়ে যাচ্ছে। গুম ও হত্যাও তারা যথেচ্ছভাবেই করে চলেছে।
এভাবেই বর্তমান সরকারের আমলে নিষ্ঠুরতা সকল সীমা ছাড়িয়ে গেছে। আমরা মনে করি, এ ব্যাপারে পুলিশকে বিশেষভাবে তৎপর করা দরকার। কোথাও কোনো লাশ পাওয়া গেলে পুলিশের উচিত সকল থানায় মিসিং রিপোর্ট সম্পর্কে খোঁজ-খবর করা এবং জানা গেলে সংশ্লিষ্ট থানার সঙ্গে সমন্বয় করে তদন্তের মাধ্যমে খুনি-ঘাতকদের গ্রেফতারের চেষ্টা চালানো। গ্রেফতার করা গেলে এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া দরকার, যার ফলে  আর কেউই কাউকে গুম বা হত্যা করার এবং যেখানে-সেখানে লাশ ফেলে দেয়ার চিন্তা পর্যন্ত করার সাহস না পায়। সরকারের উচিত ঘটনাক্রমে কঠোর শাস্তি দেয়ার বহুবার উচ্চারিত ধমকের পুনরাবৃত্তি করার পরিবর্তে বাস্তবে কিছু করে দেখানো। আমরা চাই, গুম ও হত্যার মতো ভয়ংকর অপরাধ দমন ও নির্মূল করার উদ্দেশ্যে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হোক। বাংলাদেশের কোনো মানুষকেই যেন আর কোনোদিন বেওয়ারিশ লাশ না হতে হয়। রাজধানী ঢাকাও যেন লাশের ‘ডাম্পিং গ্রাউন্ড’ হিসেবে কুখ্যাত না হয়ে ওঠে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ