ঢাকা, বৃহস্পতিবার 26 April 2018, ১৩ বৈশাখ ১৪২৫, ৯ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন শুদ্ধ রাজনীতি

গত ১৭ এপ্রিল সন্ধ্যায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি লন্ডনের ওয়েস্ট মিনিস্টারে বৃটিশ পার্লামেন্টের সেন্ট্রাল হলে ‘ভারত কী বাত সব কী সাথ’ নামে প্রবাসী ভারতীয়দের সাথে এক মতবিনিময় সভায় মিলিত হয়েছিলেন। সেখানে বিশ্ব কূটনীতিতে ভারতের অবস্থান কি রকম সমীহজনক জায়গায় পৌঁছেছে, সেটা বোঝাতে গিয়ে তিনি রোহিঙ্গা সঙ্কটের প্রসঙ্গ টেনে আনেন নিজ থেকেই। তবে প্রসঙ্গ টেনে এনে যে মন্তব্য করেন, তাতে সৃষ্টি হয়েছে এক নতুন কূটনৈতিক বিতর্ক। বিষয়টি রাষ্ট্র হিসেবে ভারতকেও যে এক বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে, তার প্রমাণ প্রধানমন্ত্রীর ওই মন্তব্য নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও মুখ খুলতে রাজি হচ্ছে না। উল্লেখ্য যে, ওই মতবিনিময় সভায় নরেন্দ্র ােমাদি মন্তব্য করেছিলেন, মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে ফেরত গেছে।
মোদির মন্তব্যে ‘ফেরত’ শব্দটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে ফেরত গেছে বললে বোঝা যায়, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার গিয়েছিল। এমন তত্ত্বের কারণেই তো সৃষ্টি হয়েছে রোহিঙ্গা সংকট। মিয়ানমার সরকার তো এই মর্মে প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে যে, রোহিঙ্গারা আদতে বার্মার মূল বাসিন্দা নয়, তারা হলো বাঙালি মুসলমান, যারা বাংলাদেশ থেকে এসেছে। ‘রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে ফেরত গেছে’ মন্তব্য করে তো নরেন্দ্র মোদি প্রকারান্তরে মিয়ানমারের মিথ্যা তত্ত্বকে স্বীকৃতি দিয়ে দিলেন। বন্ধু রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী এমন মন্তব্য কী করে করলেন? অথচ ইতিহাস বলে, রোহিঙ্গারা শত শত বছর ধরে বার্মায় বসবাস করে আসছে। তাদের নাগরিকত্ব ছিল। তারা পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। মন্ত্রিপরিষদে তাদের প্রতিনিধি ছিল। রোহিঙ্গাদের রেডিও স্টেশনও ছিল বার্মায়। ইতিহাসের এসব তথ্য-উপাত্তকে কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না।
নরেন্দ্র মোদির মন্তব্যে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মহল বিস্মিত ও বিচলিত। এটা কি ভারতের পরিবর্তিত অবস্থান, নাকি বেখেয়ালে মুখ ফসকে শব্দটি বেরিয়ে গেছে? যদি তেমনটি হয়, তাহলে বিষয়টি পরিষ্কার করার দায়িত্ব ভারতের। ভারত তা করে কিনা তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশের জনগণ।
শুধু  বোলচাল নয়, মোদির গেরুয়া রাজনীতিও বাড়িয়ে চলেছে সঙ্কটের মাত্রা। ভারত অধিকৃত কাশ্মীরের হিন্দু অধ্যুষিত রাসানা গ্রামের সব মুসলিম এখন গ্রামছাড়া। এএফপি পরিবেশিত খবরে আরো বলা হয়, স্থানীয় হিন্দুদের দ্বারা আট বছরের এক মুসলিম শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার পর আতঙ্কে গ্রাম ছেড়েছেন তারা। পুলিশ বলছে, মুসলিম যাযাবর বাকারওয়াল সম্প্রদায়কে ভয় দেখিয়ে গ্রাম থেকে বিতাড়িত করতেই কয়েকজন হিন্দু স্থানীয় একটি মন্দিরের ভেতর শিশুটিকে পাঁচ দিন আটকে রেখে ধর্ষণ ও হত্যা করে। যশপাল শর্মা (৩৯) নামে এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ওই ঘটনার পরই গ্রাম খালি হয়ে গেছে। ওই হত্যাকা- ও এর পরের পরিস্থিতি নিয়ে গ্রামটি এক দুঃস্বপ্নের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জানা গেছে, আসিফার ধর্ষণ ও হত্যাকা-ের মূল অভিযুক্ত ব্যক্তি রাসনা মন্দিরের নেতা সানজি রায়। স্থানীয় এক পুলিশও এ ঘটনায় জড়িত ছিল। এ ছাড়া ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার জন্য ঘুষ নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে আরো তিন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
এমন ঘটনায় উপলব্ধি করা যায় বিজেপির গেরুয়া চেতনায় উগ্রতার মাত্রা কতটা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে আশার কথা হলো, হিন্দুত্ববাদী উগ্রতার বিরুদ্ধে ভারতের বিবেকবান নাগরিকরা প্রতিবাদ করতে শুরু করেছেন। ওই ধর্ষণ ও হত্যাকা-ের বিরুদ্ধে প্রায় প্রতিদিনই বিক্ষোভ হচ্ছে জম্মুসহ ভারতের বিভিন্ন শহরে। এদিকে আট বছরের শিশু আসিফা হত্যাকা-ের ঘটনায় লন্ডনে তোপের মুখে পড়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। স্থানীয় সময় বুধবার (১৮ এপ্রিল) লন্ডনে পৌঁছলে বিক্ষোভ করেন শতাধিক ভারতীয়। ডাউনিং স্ট্রিট ও পার্লামেন্টের বাইরে এ বিক্ষোভ করেন তারা। ওই সময় বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মের সাথে সাক্ষাৎ করতে ডাউনিং স্ট্রিটে গিয়েছিলেন মোদি। তবে মোদি আসার আগে থেকেই ডাউনিং স্ট্রিট ও পার্লামেন্টের বাইরে অবস্থান শুরু করেন বিক্ষোভকারীরা। কর্মসূচিতে তারা কাশ্মীরে শিশু আসিফা হত্যার তীব্র নিন্দার পাশাপাশি জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান। বিক্ষোভে ‘মোদি গো হোম’, ‘মোদি স্টপ কিলিং মাইনোরোটিজ’, ‘উই স্ট্যান্ড অ্যাগেইনস্ট মোদিস অ্যাজেন্ডা অব হেট অ্যান্ড গ্রিড’সহ বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড তুলে ধরা হয়। এদিকে বৃটেনে বসবাসকারী ভারতীয় আইনজীবী নরেন্দ্র সিং বলেন, ভারত সরকার আসিফা হত্যাকা-ের ঘটনায় কিছুই করেনি।
২২ এপ্রিল জি নিউজ পরিবেশিত খবরে বলা হয়, ভারতে শিশু ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদ- করা হয়েছে। ২১ এপ্রিল এ শাস্তির বিষয়ে মন্ত্রী পরিষদ বিল পাস করার পর প্রেসিডেন্ট রামনাথ কোভিন্দ এই অর্ডিন্যান্সে স্বাক্ষর করেছেন। শাস্তিতো কঠোর করা হলো। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, সঠিক তদন্ত না হলে সঙ্গত শাস্তি কি দেয়া যাবে? আর শাস্তির চাইতেও ভারতে সংখ্যালঘুদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরাপত্তা। নিরাপত্তার জন্য যে রাজনীতি প্রয়োজন তা এখন ভারতে বর্তমান আছে কী?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ