ঢাকা, বৃহস্পতিবার 26 April 2018, ১৩ বৈশাখ ১৪২৫, ৯ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

হতাশা-বঞ্চনা থেকে কোটাবিরোধী আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে

জিবলু রহমান : [ছয়]
শাহবাগ থানা পুলিশ বলেছে, এই ঘটনায় কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। ভিসির বাসার ক্ষতবিক্ষত সিসি ক্যামেরার ডিভাইস তারা উদ্ধার করেছে; কিন্তু শনাক্ত করে এখনো কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। এ দিকে দুষ্কৃতকারীরা শনাক্ত না হওয়ায় ক্রমেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ডালপালা মেলছে।  (সূত্র : দৈনিক নয়াদিগন্ত ১৩ এপ্রিল ২০১৮)
১২ এপ্রিল ২০১৮ ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে ‘কোটা পদ্ধতি সংস্কার আন্দোলন: সরকারের ভূমিকা’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেছেন, ‘কোটা পদ্ধতি সংস্কারের ঘোষণা না দিয়ে বাতিল করে প্রধানমন্ত্রী কোটা নিজেদের ঘরের মধ্যে অবরুদ্ধ করেছেন। ছাত্রদের যৌক্তিক দাবি নিয়েও দেশে বিভাজনের রাজনীতি সৃষ্টি করেছেন।’ বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেছেন, ‘কোটা সংস্কার নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য সংবিধানের পরিপন্থী। তিনি রাগ-অনুরাগের বশবর্তী হয়ে এক ধরনের ধমক দিয়েছেন। ’
যদি দেশের সকল শ্রেণীর মানুষ এ আন্দোলন নিয়ে মতামত ব্যক্ত করতে পারে তাহলে তারেক রহমান কী দোষ করেছেন। ১৩ এপ্রিল ২০১৮ সকালে ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক এবং দলের অন্যতম মুখপাত্র ড. হাছান মাহমুদ এমপি বলেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বাসভবনে হামলা, ভাংচুর, লুটপাট এবং তারেক রহমানের টেলিফোনে নির্দেশনা একই সূত্রে গাথা। এই দুটি ঘটনার আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।
হাছান মাহমুদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারী চাকরির কোটা পদ্ধতি বাতিলের ঘোষণায় আন্দোলনকারীরা খুশি হয়ে তাকে মাদার অব এডুকেশন উপাধি দিয়েছে। বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি নিয়ে ছাত্ররা জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান দিয়েছে। কিন্তু সবাই খুশি হলেও বিএনপি খুশি হতে পারেনি। তারা এই আন্দোলনকে নিয়ে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র করতে চেয়েছিল। তাদের ষড়যন্ত্রের রাজনীতির পরাজয় হয়েছে বিধায় তাদের এত গাত্রদাহ। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় প্রকৃতপক্ষে বিএনপি-জামায়াত গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র ভেস্তে গেছে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে হাছান মাহমুদ বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুফিয়া কামাল হলের ছাত্রলীগের সভানেত্রী ইফফাত জাহানকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বহিষ্কারাদেশ দেশের মৌলিক অধিকার ও সংবিধানের পরিপন্থী। তাকে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার করাও ঠিক হয়নি। হাছান মাহমুদ বলেন, ‘সুফিয়া কামাল হলের ছাত্রলীগের সভানেত্রীকে যে প্রক্রিয়ায় ছাত্রলীগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে, সেটি সঠিক ছিল না। ছাত্রলীগ তার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে আমি মনে করি সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।’ তদন্ত ছাড়া ইফফাতকে বহিষ্কার করায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সমালোচনা করেন হাছান মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘একটি ছাত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আসার পর কোন ধরনের তদন্ত ছাড়া মৌখিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করে দেয়ার মতো ঘোষণা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠান দিতে পারে এটি আমার কল্পনারও বাইরে। এটি দেশের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী, সংবিধানপরিপন্থী, যেটি সমীচীন হয়নি। যে কেউ অপরাধ করলে সেটির তদন্ত হতে হবে। তদন্তের পর শাস্তি হবে। এখানে কোন তদন্তই করা হয়নি।’ (সূত্র : দৈনিক জনকন্ঠ ১৪ এপ্রিল ২০১৮)
সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা থাকবে না বলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রফেসর ইমিরেটাস ড. আনিসুজ্জামান এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর তারা এ অভিনন্দন জানান।
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি সরকারি চাকরির নিয়োগে কোটা ব্যবস্থা না রাখার পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখার কথাও বলেছেন। এটা খুবই ভালো। প্রধানমন্ত্রী সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। এ জন্য তাকে অভিনন্দন।
ড. আকবর আলি খান বলেছেন, এর আগে যত প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন হয়েছিল, তার প্রত্যেকটির প্রতিবেদনেই কোটা ব্যবস্থা সংকুচিত করার সুপারিশ ছিল। কিন্তু সাহস করে কোনো সরকারই তা বাস্তায়নের উদ্যেগ নেয়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই প্রথম সরকারি চাকরিতে কোটা না রাখার ঘোষণা দিলেন।
তিনি বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় জেলা কোটা রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে; তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহারও বিস্তৃত হয়েছে। ফলে পুরো বাংলাদেশই এখন একত্রিত। যে উদ্দেশ্যে বহু বছর আগে জেলা কোটা রাখা হয়েছিল, তার প্রয়োজন এখন আর নেই। একই সঙ্গে নারী কোটা রাখারও যুক্তি আছে কি-না, তা নিয়েও সন্দেহ আছে। কারণ এখন নারীরাই বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় ভালো ফল করছে এবং মেধার ভিত্তিতেই সরকারি চাকরিতে নিয়োগ পাওয়ার যোগ্যতা রাখে।
বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের সংস্কারকে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে ড. খান বলেন, শুধু কোটা ব্যবস্থা সংস্কার করলেই সরকারি চাকরিতে মেধাবীদের চাকরি পাওয়া নিশ্চিত হবে না। প্রকৃত মেধাবীদের চাকরি পাওয়া নিশ্চিত করতে হলে অবশ্যই বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনকে স্বাধীন করতে হবে, যেন তারা সব ধরনের প্রভাবমুক্ত থেকে নিয়োগ পরীক্ষা পরিচালনার সুযোগ পায়। একই সঙ্গে বর্তমান পরীক্ষা পদ্ধতিরও সংস্কার করতে হবে। এসব সংস্কার যদি হয়, তাহলে কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের সুফল পাওয়া যাবে; না হলে নয়। (সূত্র : দৈনিক সমকাল ১২ এপ্রিল ২০১৮)
সরকারি চাকরিতে ক্ষুদ্র-নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় চাকরিতে বিশেষ বিধান কীভাবে করা হবে সে বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি সুপারিশ প্রদান করবে। তবে ওই কমিটি এখনো গঠিত হয়নি জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেছেন, কমিটিতে আলোচনা  করে সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে  ক্ষু-নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধীদের চাকরিতে কোটা সংরক্ষণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।        
কোটা পদ্ধতি বাতিলের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা কি প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়ন হবে-এই প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে সার্কুলার দিয়ে কোটা সম্পর্কিত পূর্বের বিধান বাতিল ঘোষণা করতে হবে। তবে এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতির সম্মতির প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মোজাম্মেল হক খান বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে তার কার্যালয় থেকে লিখিত নির্দেশনা আসলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাব যাবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে। প্রধানমন্ত্রী প্রস্তাব অনুমোদন করার পর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কোটা বাতিলের বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করবে। তবে এটি শুধুমাত্র বিসিএস পরীক্ষার ক্ষেত্রে কার্যকর হবে না কি সকল নিয়োগের ক্ষেত্রে কার্যকর করা হবে সেটি পরিষ্কার নয়। সচিব কমিটির সুপারিশ প্রকাশের পর তা জানা যাবে।
রাষ্ট্র চাইলে সংবিধানের আলোকে অনগ্রসর শ্রেণির মানুষের জন্য সরকারি চাকরিতে কোটা সংরক্ষণে বিশেষ বিধান করতে পারবে । সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট মত রয়েছে। তবে মুক্তিযোদ্ধা, নারী, জেলা ইত্যাদি কোটা বিষয়ে সংবিধানে সুস্পষ্ট উল্লেখ নেই। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী সরকারি চাকরিতে ক্ষুদ্র-নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধীদের বিদ্যমান কোটা পদ্ধতি বহাল রেখে বাকিগুলো বাতিল করা হতে পারে। যদিও এখনো প্রতিবন্ধীদের কোনো কোটার কোনো শতাংশ উল্লেখ নেই। এবার হয়তো সেটি নির্ধারণ করে দেওয়া হতে পারে। ক্ষুদ্র-নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর জন্য ৫ শতাংশ কোটা এখন নির্ধারিত আছে। বিদ্যমান ব্যবস্থায় মেধা থেকেই এক শতাংশ প্রতিবন্ধী কোটা পূরণ করা হয়। (সূত্র : দৈনিক ইত্তেফাক ১২ এপ্রিল ২০১৮)
কোটা প্রথা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও চাকরি প্রার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী এরই মধ্যে হল ছেড়েছেন। এই যখন অবস্থা তখন কবি সুফিয়া কামাল হলে ছাত্রী নির্যাতনে অভিযুক্ত হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ইফফাত জাহান ইশাকে স্বপদে ফিরিয়েছে ছাত্রলীগ। ১৩ এপ্রিল ২০১৮ সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মো. সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এরপর দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান ছাত্রলীগ নেত্রী ইশাকে ছাত্রত্ব ফিরে দেয়ার বিষয়টি জানিয়েছেন একটি বেসরকারি টেলিভিশনকে। ইশার ছাত্রত্ব ফিরিয়ে দেয়ার বিষয়ে ওই টেলিভিশন চ্যানেলকে ভিসি বলেন, ‘শুধু ছাত্রত্ব ফিরে পাবে না, বরং সম্মানিত হবে এবং সেটি উচিত হবে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও সেটি হবে। কারণ আমরা তো কোনো শিক্ষার্থীর প্রতি অবিচার করতে পারি না। ওই মেয়েটির কাছ থেকে আমরা যেটি শুনেছি যে ওই মেয়ে একটি দরজায় পা দিয়ে আঘাত হানার কারণে তার পা কেটে গেছে।’ (সূত্র : দৈনিক মানব জমিন ১৪ এপ্রিল ২০১৮) কবি সুফিয়া কামাল হলে শিক্ষার্থী নির্যাতনের ঘটনায় ছাত্রলীগের গঠিত তদন্ত কমিটিতে ছিলেন বিভিন্ন সময়ে বিতর্কিত এক নেত্রী। ১২ এপ্রিল ২০১৮ ছাত্রলীগ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে কমিটি গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। এর আগে বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকা-ের জড়িত থাকার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে।
কেন্দ্রীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখার দুইজন করে মোট ৪ সদস্য বিশিষ্ট এ কমিটি গঠন করা হয়। এরা হলেন :  কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি নুসরাত জাহান নুপুর ও নিশীতা ইকবাল নদী, ঢাবি শাখার সভাপতি আবিদ আল হাসান ও সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন প্রিন্স।
ছাত্রলীগের এ তদন্ত কমিটিতে ছিলেন মাদক ব্যবসায় অভিযুক্ত ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি নিশীতা ইকবাল নদী। ৬ ফেব্রুয়ারি মাদক ব্যবসা নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে উঠে আসে এই নেত্রীর নাম। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাদক ব্যবসায়ীদের ৩৮ জনের একটি তালিকার উল্লেখ দিয়ে বলা হয় এর মধ্যে রয়েছে ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের ২০ জন নেতাকর্মীর নাম। এর মধ্যে রয়েছে ছাত্রলীগ নেত্রী নদী। এর আগে ২০১৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলের সভাপতি থাকাকালে নিশীতা ইকবাল নদীর বিরুদ্ধে ইয়াবা ব্যবসা এবং অধঃস্তন নেত্রীকে অনৈতিক কাজে বাধ্য করার অভিযোগ আসে। ৩১ জানুয়ারি ২০১৫ সালে অপর একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন আনুযায়ী ওই হলের ছাত্রলীগের তৎকালীন দপ্তর সম্পাদক ইসরাত জাহান সোনালী নদীর বিরুদ্ধে ভিসি ও প্রক্টর বরাবর অভিযোগ করেন। অভিযোগে দীর্ঘদিন থেকেই ইয়াবা ব্যবসা এবং ওই শিক্ষার্থীকে দিয়ে অনৈতিক কাজ করাতে চাপ প্রয়োগের কথা উল্লেখ করেন। (সূত্র : দৈনিক নয়া দিগন্ত ১৩ এপ্রিল ২০১৮) ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে এশার বহিষ্কারাদেশ তুলে নেয়ার পরে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। তারা আশঙ্কা করছেন, ছাত্রলীগের নির্দেশ উপেক্ষা করে হল থেকে যারা আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন তাদের মাশুল দিতে হতে পারে। আন্দোলন স্থগিত করার পর অংশগ্রহণকারী ঢাবি শিক্ষার্থীদের অনেকেই এখন হলে থাকছেন না।
এশার বিরুদ্ধে সংগঠনের বহিষ্কারাদেশ তুলে নেয়ার পরই আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। কবি সুফিয়া কামাল হলের একাধিক শিক্ষার্থী সংবাদপত্রকে বলেছেন, এশার বিরুদ্ধে আরো অনেক অভিযোগ রয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই তার হাতে শিক্ষার্থীরা লাঞ্ছিত ও মারধরের শিকার হয়ে আসছেন। কিন্তু ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাননি। ১০ এপ্রিল রাতে সবকিছুর বিস্ফোরণ ঘটেছে এক সাথে। যে কারণে শিক্ষার্থীরা বেশি উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন।
এশা ঠিকই এখন হলে তাদের ওপর প্রতিশোধ নেবে। হয়তো এশার নির্যাতনে এখন ওই শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনই বিপন্ন হতে পারে; এমনো কেউ কেউ আশাঙ্কা করছেন। জিয়া হলের এক শিক্ষার্থী সংবাদপত্রকে বলেছেন, হলের ছাত্রলীগ নেতাদের নির্দেশ উপেক্ষা করে তারা আন্দোলনে গিয়েছিলেন। এশার বহিষ্কারাদেশ তুলে নেয়ার পর তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। মনে হচ্ছে ছাত্রলীগ তাদের ওপর প্রতিশোধ নেবে।
বেসরকারি ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির এক ছাত্র সংবাদপত্রকে বলেছেন, যেভাবে ওই পুলিশ কর্মকর্তা হুমকি দিয়েছেন, তাতে তারা আতঙ্কিত। যেকোনো সময় তারা বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন। (সূত্র: দৈনিক নয়াদিগন্ত ১৪ এপ্রিল ২০১৮) হলটির একাধিক ছাত্রী সংবাদপত্রকে জানান, ইশা হলটির নেতৃত্বে আসার পর থেকে সাধারণ ছাত্রীদের ওপর নানা ধরনের নির্যাতন করে থাকেন। বিভিন্ন সময় মারধরও করা হয়েছে অনেককে। কোটা সংস্কার আন্দোলনে যারা সক্রিয় তাদের নানা ধরনের হুমকি দিয়েছেন তিনি। কিন্তু এত দিন কেউ ভয়ে মুখ খুলেননি।
এদিকে কোটা সংস্কার আন্দোলনে সক্রিয় থাকা অন্যান্য হলের ছাত্রছাত্রীদেরও নানা ধরনের হুমকি দিচ্ছে ছাত্রলীগ-এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিরোধী দলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে দাবি করা হচ্ছে কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খানসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে। ফেসবুকে ছড়ানো হচ্ছে বিভিন্ন ‘অপপ্রচার’। ইতিমধ্যে হল ছেড়েছে অনেকে। ১৩ এপ্রিল দুপুরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে অপপ্রচার চালানোর প্রতিবাদ ও হয়রানি অভিযোগ করে আন্দোলনকারীদের যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খান কোটা সংস্কার আন্দোলনের ফেসবুক গ্রুপ থেকে লাইভে বক্তব্য রাখেন। এসময় রাশেদ তার বক্তব্যে নিজের ও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ভাইয়েরা আমাকে এখন বিরোধী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ও ভিসি স্যারের বাসায় হামলা করেছি বলে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। আমি বলতে চাই, আমি এসবের কিছুর সঙ্গে সম্পৃক্ত নই। যদি সম্পৃক্ত থাকতাম তাহলে গত দুই মাস যাবৎ গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা আমার পরিবার ও বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব খোঁজাখুঁজি করেও কিছু পায়নি কেন? আপনারা কী গোয়েন্দা সংস্থা থেকেও বেশি এক্সপার্ট ও আইটি বিশেষজ্ঞ হয়ে গেছেন? এসময় রাশেদ বলেন, যারা এখন অপপ্রচার চালাচ্ছেন, তারা চাচ্ছেন জননেত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তকে বানচাল করতে। আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে সত্যের পক্ষে ছিলাম। এখনো আছি। আর আমাদের কেন্দ্রীয় কমিটি ও আন্দোলনকারীদের ওপর যদি কোনো ধরনের হয়রানি না হয় সে বিষয়ে সবাই সজাগ থাকবেন। রাশেদের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের প্রতিক্রিয়ায় আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক ফারুক হাসান ওই গ্রুপে লেখেন, ‘আমরা কেন্দ্রীয় কমিটি এক আছি। আমাদের ওপর ভরসা রাখুন। যে কোনো অন্যায়ের দাঁত ভাঙা জবাব দেয়া হবে।’ আর যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হক নুর বলেন, ‘নতুন নাটক তৈরি করে মেধাবী শিক্ষার্থীদের বোকা বানাতে চেষ্টা করবেন না। শিক্ষার্থীরা আবার রাজপথে নামলে কিন্তু পালাবার পথ পাবেন না।’
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আন্দোলন স্থগিত হওয়া সরকারের জন্য স্বস্তিদায়ক। তবে সরকার বিষয়টি যে ভাষায় মীমাংসা করেছে তা আন্দোলনকারী তরুণদের মধ্যে কোনো স্বস্তি দিতে পারেনি। দুপক্ষেই এ অস্বস্তি হয়তো দীর্ঘদিন থেকে যাবে। অনেককেই এ তরুণরা ভুল প্রমাণ করেছে। বিশেষ করে আমরা যারা মনে করতাম, ‘এখনকার তরুণরা শুধু ফেসবুক আর স্মার্টফোনেই ব্যস্ত থাকে। তাদের প্রতিবাদের কোনো শক্তি নেই। রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা না থাকলে তারা কোনো আন্দোলন করতে পারে না’ ইত্যাদি। বহু পুরনো কথা- ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো লোকে ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে না। কোনো রাষ্ট্রের তরুণ প্রজন্ম যদি লক্ষ্যে অবিচল থেকে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম করে তা কখনো ব্যর্থ হয় না। আপাত দৃষ্টিতে দ্বিতীয় শাহবাগ অভ্যুত্থানের এটাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা। [সমাপ্ত]
jiblu78.rahman@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ