ঢাকা, বৃহস্পতিবার 26 April 2018, ১৩ বৈশাখ ১৪২৫, ৯ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

হতাশার রাজ্যে কিশোর ফুটবলাররা

মোহাম্মদ সুমন বাকী : ফুটবল ভুবনে কি অবসর সময় চলেছে? প্রশ্নের উত্তরে পরিস্থিতি সেটাই বলে। আপাতত কোনো টুর্নামেন্ট নেই মাঠে। তা রাজধানী ঢাকায়। এর বাইরে অন্য জেলার অবস্থা সহজে অনুমেয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বি লীগ (পেশাদার) সবচেয়ে বৃহৎ আসর। যা ফিফা কর্তৃক স্বীকৃত। সেটা মাঠে গড়ায় ২০০৭ সালে। তা জানা আছে খেলা পাগল ভক্তদের। এই লীগ স্থায়িত্ব হবে কি ? নাকি হঠাৎ মুক্ত হাওয়ায় উড়ে যাবে? এসব প্রশ্নের মাঝে নব ধারায় পেশাদারিত্বের ছোঁয়া পায় লাল-সবুজ পতাকা দেশের ফুটবল ভুবনে। তখন সাজ সাজ রব পড়ে যায় চারদিকে। আলোর পথে বাফুফে হাঁটে। একের পর এক বিজ্ঞাপন নিয়ে বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গোল বলকে আকর্ষণের স্থায়ী আসনে বসিয়ে দেয়। যা বজায় রয়েছে বর্তমান সময় পর্যন্ত। এর সুফল পুরোপুরি পায়নি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)। তবে মাঝে মধ্যে ফাঁক ফোকর গলিয়ে ঘরে উঠে সেটা। তা অবশ্যই সত্য কথা। বাফুফের কর্মকর্তারা কি বলেন? ২০০৭ সালে বাংলাদেশ (বি) প্রিমিয়ার ফুটবল লীগের সূচনাটা ছিলো এক কথায় দারুন। সবার হৃদয়কে যা স্পর্শ করে নব উদ্যমে স্বপ্ন দেখায়। সেই তালিকায় স্থান পেয়েছে এক ঝাক নতুন প্লেয়ার। যারা বয়সে টগবগে যুবক। কিশোর লেবেল থেকে যাদের ঢাকা বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে আত্মপ্রকাশ ঘটে। গোল বলের প্রতিভা এটাকেই বলে। তা গোলাপ ফুলের ন্যায় সৌরভ ছড়ায় সারাদেশে।
ফুটবল ভুবনে নয়া তারকা খেলোয়াড়ের হাট বসে। সেটা জাকির হোসেন শাহীন, গাউস মোহাম্মদ, শহীদ হোসেন স্বপন, আলফাজ আহমেদ, আরমান মিয়া, রকিব, টিটু, নকিব, মামুন জোয়ারদার, সেন্টু, ইকবাল, মিলন, বিপ্লব, দুলাল চন্দ্র সাহা, নজরুল,  বিপ্লব ভট্টাচার্য্য, আলী মনসুরদের পরের ধাপ হতে। যা নতুন করে না বললেও হয়। যারা ছিলে ফুটবলের আইডল। তাদের সবুজ ঘাসের ময়দানে আগমন ঘটে দেশের বিভিন্ন জেলার ক্রীড়া অঙ্গন থেকে। এই সকল খেলোয়াড় গোলাকার বলের ভুবনে পা রাখেন পরিবারের মায়া ত্যাগ করে। মা, বাবা, ভাই, বোন আত্মীয়স্বজন ছেড়ে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা লীগের বছর, দশক, যুগের ইতিহাস সে কথার স্বাক্ষী বহন করে। তারা ছিলেন সুপার ফুটবল হিরো। উদ্ভাসিত পারফরম্যান্স ঘিরে। নয়া তারকার তকমা লাগিয়ে যাদের পরের ধাপে উঠে আসেন ওয়ালী ফয়সাল, আব্দুল্লাহ পারভেজ, মামুনুল ইসলাম মামুন, বিদ্যুৎ, খোকন দাস, মারুফ, মামুন, জাহিদ পারভেজ চৌধুরী, বিপ্লব বড়ুয়া, ফোরকানের মতো অনেক ফুটবলার।
তারা বুট-বলের সমন্বয়ে গড়া এই ক্রীড়ায় নৈপূণ্য দেখিয়েছেন খুবই চমৎকার। তা উল্লেখ করতে হয় বার বার। সেটা পরিশ্রমী পারফর্মের পারফেক্ট ফল হিসেবে। যা আলোকিত হয়ে স্বর্নাক্ষরে স্থান পেয়েছে বি লীগের বর্নাঢ্য ইতিহাসে। তা দেশের ফুটবল ভুবনকে ঘিরে।
এদের পরের ধাপটাই যেন অন্ধকার। সেটা অবাক করে সবাইকে। জাতীয় দলের জার্সী পরলেই তারকা। বর্তমানে দেশের ফুটবলে চলেছে এমন ফর্মূলা। অপ্রিয় সত্য কথা যা। নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো। এ প্রবাদ বাক্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের ফুটবল এগিয়ে চলেছে। তা কষ্টের সাগরে বার বার ভাসিয়েছে। ফেডারেশন ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল এসোসিয়েশনের (ফিফা) র‌্যাংকিংয়ে ধাপে ধাপে অধঃপতনের কারণে। এই পরিস্থিতিতে লজ্জা পরিবেষ্টিত পরাজয় ঘটেছে দুর্বল হংকংয়ের বিপক্ষে! সেটা লাল-সবুজ পতাকা দেশের গোলাকার বলের করুন দৃশ্য ফুটিয়ে তুলে!! জাতীয় দল তালিকায় স্থান অর্জন করে আরো নীচে। এক বাক্যে যা দুঃখজনক। ফুটবলারদের অভিমত কি এই বিষয়ে? চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সৈয়দপুর, নড়াইল, জামালপুর, রাজবাড়ী, নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষীপুর, হবিগঞ্জ, জয়পুর হাট জেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় পরিকল্পনাহীন ফুটবল টুর্নামেন্ট হচ্ছে। তা এ খেলার উন্নয়নের সুন্দর পথে বড় বাধা। সেটা নতুন করে কলমের কালিতে তুলে না ধরলেও হয়। সারাদেশে পরিকল্পনাহীনভাবে অনুষ্ঠিত এমন প্রতিযোগিতায় কোনো প্রকার দিক নির্দেশনা নেই।
অথচ হাজার হাজার কোটা স্পর্শ করে সবুজ ঘাসের মাঠে গড়াচ্ছে তা। যা ভাবা যায় না। বাফুফে সে খবর কি জানে? উপজেলার সংখ্যায় কোটি কোটি টাকা ব্যয় হয় সেখানে। প্রাথমিক পর্যায়ের টেকনিক বলে পুশ, রিসিভ করতে না জানা প্লেয়াররা খেপ খেলার ধারায় এক ম্যাচ অংশ নিয়ে ১,০০০ হতে ৫,০০০ টাকা পারিশ্রামিক পায়!
তোমার টার্গেট কি? এই প্রশ্নের উত্তরে তার সহজ সরল ভাষ্য, খেলার বিনিময়ে টাকা পাই। আবার টার্গেট কি? সেই খেলোয়াড়ের উত্তর হাস্যকর! তা বলাবাহুল্য। অনেকটা দায়ছাড়া গোছের। দেশের কোটি কোটি ক্রীড়া পাগল প্রেমি কি বলেন? এখানেই প্রমাণ পাওয়া যায় মাঠে অনুষ্ঠিত এসব টুর্নামেন্টের বিন্দু পরিমান মূল্য নেই। কখনো কাজে আসবে না। যা আইডল হিসেবে। তা ভবিষ্যৎ ফুটবল প্রজন্মের কাছে। শুধুমাত্র টুর্নামেন্ট আয়োজনের নামে চাঁদা তোলা ছাড়া আর কিছু নয়। ফুটবল মৌসুমের ক্যালেন্ডার কার্যক্রম (২০১৭-১৮) শেষ হবার পথে। সেটা ঘরোয়া আসরের প্রতিযোগিতাকে ঘিরে। যা বরাবরের মতো। সর্বশেষ ময়দানে গড়ায় স্বাধীনতা কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট। ঢাকা আবাহনী, শেখ জামাল, চট্টগ্রাম আবাহনী, শেখ রাসেল, ঢাকা মোহামেডান, মুক্তিযোদ্ধা, ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবকে টেক্কা দিয়ে তাক লাগানো শিরোপা জিতে নেয় আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ। সেটা পরিশ্রমী নৈপূণ্যের ফসল। তা সকলের বোধগম্য। ফুটবল রাজ্যে নব শক্তিশালী টিমের আগমন। যা ভালো দিক। কারণ এমন সাফল্য অন্য ক্লাবকে দল গঠন করতে উৎসাহ যোগায়। সেটা সুপার প্রতিদ্বন্দ্বিতার আমেজকে পুঁজি করে। অবশেষে তা বিফলে যায়। টনিক হিসেবে কোনো ভাবে কাজে আসেনি। এর বিপরীতে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এমন পরিস্থিতিতে কিশোর ফুটবলাররা খুবই হতাশ। নৈপূণ্য উন্নতি করার ক্ষেত্রে গাইড লাইন নাই তাদের। খেপ ম্যাচ খেলার টুর্নামেন্ট একমাত্র ভরসা। সামান্য অর্থ উপার্জন হয় বলে। এছাড়া আর কিছু নয়। দেশের তৃণমূল পর্যায়ে বঙ্গবীর সংসদ উল্লেখ করার মতো ফুটবল টিম। যেখান থেকে জন্ম নিচ্ছে অনেক প্লেয়ার।
আব্দুল্লাহ আল পারভেজ, ওয়ালী ফয়সাল, দুলাল সাহা, সিফাত, প্রমিলা বিভাগে সুখি, অনন্যা, ইতিদের নাম সেই তালিকায় শোভা পায়। এই বঙ্গবীর সংসদ ক্লাবের কিশোর প্লেয়ার সাব্বির হোসেন আকাশ। সে খুবই হতাশ। ফুটবলের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তার ভাষ্য, খেলা বেশি করে চাই। যা এখন নাই।
বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছি ঠিকই। তবে সেটা ভরসা পাবার জন্য যথেষ্ট নয়। সিনিয়র খেলোয়াড়রা বর্ষপঞ্জী ফলো করে মাঠে নেমে চলেছেন। তা আমাদের লেবেলের টুর্নামেন্টে নেই। সে কারণে কোনো ভাবে টার্গেট ঠিক রাখতে পারছি না। তাই আমরা হতাশার মাঝে ঘুর-পাক খাচ্ছি। যা নিদ্রা কেড়ে নিয়েছে। কিশোর লেবেলে বর্ষপঞ্জী থাকা উচিত বলে মনে করি আমি। তাহলে এই বয়সের ছেলেরা ফুটবলের প্রতি আগ্রহ দেখাবে।
এ ব্যাপারে বিশ্বাস আছে শতভাগ। শুধু আকাশ একা নয়, মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম ফুটবল দলের কোচ খোকন, প্লেয়ার তুরাগ, কাউসার, চমক, রাব্বি, ইফতিদের (সবাই কলেজ ছাত্র) হতাশার রাজ্যে অবস্থান নিতে দেখা গেছে। এমন পরিস্থিতিতে বাফুফে পরিকল্পনা গ্রহণ করবে কি? তা সময়ই বলে দিবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ