ঢাকা, শুক্রবার 27 April 2018, ১৪ বৈশাখ ১৪২৫, ১০ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মমিনুর রহমান মমিন এর ছড়া : একটি ছান্দসিক প্রকাশ

এ কে আজাদ: ছড়া -কখনো হাল্কা, কখনো কড়া। অর্থাৎ ছড়ার ভাব কখনো হাল্কা, আবার কখনো বা সিরিয়াস। তবে ছন্দের চটুলতা আর শব্দের কাঁরিকুঁরিতে হাল্কা কথামালার ছান্দসিক উপস্থাপনাই যেন ছড়ার মূল প্রতিপাদ্য। বোধ করি, সে কারণেই ছড়াকে ইংরেজীতে ননসেন্স রাইম বলা হয়ে থাকে। সেই দিক থেকে “হাট্টিমা টিম টিম”ও  একটি ননসেন্স রাইম। তবে ছড়াকার মমিনুর রহমান মমিনএর ছড়া অতটা অর্থহীন বা ননসেন্স নয়। তবে তার ছড়ার গতি আছে, ছন্দের ছান্দসিকতা আছে, আছে অর্থবহ উপস্থাপনা। 

১। এক শনিবার হারুন মিয়ার/চক্ষু দুটি ধাঁধা 

কা- একি হরমনিটার/চলছে গলা সাধা।

২। বিশ্বাস আলী আপন মনের/বিশ্বাসে 

গন্ডা বিশেক/লুচিপুরি/কয়েক হালি/আমের ঝুড়ি 

  শেষ করেছে লম্বা কখান/নিঃশ্বাসে। 

উপরের উদাহরণগুলো মমিনুর রহমান মমিনের ননসেন্স রাইমের সংজ্ঞাতে পড়ে কি না তা ব্যাখ্যা বিশেষণের দাবী রাখলেও, ছোটদের জন্য এগুলো নিঃসন্দেহে মজাদার ছড়া। এগুলোরও ভাব আছে।  চিন্তার বিস্তৃতি আছে। আর ছন্দের ব্যবহার যে চমৎকার সে কথা বলাই বাহুল্য। 

 

তবে মমিনুর রহমান মমিনের অনেক ছড়াই যেন ছড়ার ছন্দে অনেক গভীর কথা বলে। মজার ছলে চিন্তার জগতে নাড়া দেয়। সমাজের অসংগতিতে খোঁচা দেয়। যেমন- 

মিষ্টি মেয়ে পান্না/ পুতুল খেলার ঘর ছেড়ে যে/করতে এলো রান্না । 

ভুল করেছে তালে/লঙ্কা হলুদ সব মেখেছে/লাজুক লাজুক গালে।

শ্বশুর দিলেন তালি/ পান্না মেয়ের দু’চোখ ফাঁকা/ নাকের ডগায় কালি।

ভীষণ পাকা চালে/ তরকারীতে পান্না মেয়ে/ মুখ পুড়ালো ঝালে । 

[রাধুনীঃ ছুটির ছুটি]

অসম্ভব রকমের সমাজ সচেতনতা। অপরিসীম দক্ষতার সাথে জটিল বিষয়ের সরল উপস্থাপনা। বাংলাদেশের সামাজিক একটি বড় সমস্যা হলো বাল্যবিবাহ। যে মেয়েটির পুুতুল খেলার কথা, হৈ হুল্লুুর করে পাড়াময় ঘুরে বেড়ানোর কথা, সেই মেয়েটিকে যখন বউ হয়ে পরের ঘরে যেতে হয়, শিশুর কোমল কাঁধে নিতে হয় সংসারের জটিল ঘানি, তখন রান্না করতে গিয়ে এমন নাকানি চুবানি খাওয়া ছাড়া আর কিবা করার থাকে। অথচ এমন পরিস্থিতে সংসারের জটিল পাঠশালা থেকে পান্না মেয়েকে ছুটি না দিয়ে শ্বশুরবাড়ির লোকেরা হাস্যরসে মেতে ওঠে। এমন করুণ দৃশ্যকেই হাসির ছলে  চিত্রিত করেছেন মমিনুর রহমান মমিন। 

সেরের উপরে সোয়া সের আছে। দুর্বলের  উপরে সবলের অত্যাচার নিপীড়ন যেন আদিকালের ইতিহাসেরই পরম্পরা। কিন্তু যারা সবল তাদের উপর হানা দিতে অন্য সবলেরা তিনবার ভাবে। অথবা শক্তিশালী হলে আক্রমণ করার চাইতে পলায়ন করাই উত্তম বলে মনে করে আক্রমণকারী কিংবা জবর  দখলকারীরা। রাজা এবং রাজ্য শাসনের এমন সিরিয়াস বিষয়ের উপস্থাপনা মমিনুর রহমান মমিনের ছড়ায়:-

মোল্লা বাড়ির পুকুরে/ শ্যাওলা বনে যাচ্ছিলো এক বোয়াল/ কোকিল ডাকা দুপুরে

সামনে হাজির পুঁটি/ হেসেই কুটি কুটি

আলতো করে চোয়াল খুলে/ ধরতে যাবে টুটি। 

হঠাৎ হাজির রুই/ ভিলেন হাসি হেসে বলে/ এই পাড়াতে তুই?

ছোকড়া বোয়াল চমকে/ চোয়াল দুুটো বন্ধ করে/ যায় দাঁড়িয়ে থমকে। 

নিপীড়িত ও অত্যাচারীত মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে, আক্রান্তদের মনে প্রতিরোধ করার জন্য সাহস ও শক্তি সঞ্চয় করতেই এমন ছড়ার অবতারণা। 

সিরিয়াস বিষয় নিয়ে ছড়াছড়ির ফাঁকে মজার ছড়া লিখতে পটু ছড়াকার মমিনুর রহমান মমিন। অনেক মজার ছড়া দিয়ে মমিনের “ছুটির ছুটি’’ আর “উড়াউড়ি দিন’’ ছড়াগ্রন্থ দুটি গড়া। মজার বিষয়কে পড়ার বিষয়ে রূপান্তর করতে মমিনুর রহমান মমিন হলেন অত্যন্ত সিদ্ধহস্ত। বই দুটি থেকে কয়েকটি ছড়া এখানে উদ্ধৃতি করা প্রয়োজনঃ 

১। সাবার পুতুল ইরানী/নাস্তা করে বিরানী 

একটা পুতুল মুটকী/রাত্রে খাবে সাগর কলা/ কাতলা মাছের শুটকি। 

[সবার পুতুল : উড়াউড়ি দিন]

২। কামরুল নাজমুল বড় আশরাপ

দিন কানা তিন জন দিনে চুপচাপ। 

কার গাছে কলা আছে আছে পাকা বেল 

কার গাছে আম-লিচু ঝুনা নারকেল। 

শেয়ালের ডাকে ডাকে রাত বাড়ে যত 

তিন কানা দেয় হানা বাদুড়ের মত। 

[দিনকানা : উড়াউড়ি দিন]

৩। সেই থালাতে তিনটে টোকা/ একটা ঘুষি দিলে

 আরব দেশের টাটকা রুটি/খুরমা খেজুর মিলে। 

[কাঁসার থালাঃ ছুটির ছুটি]

৪। লজ্জাবতী মেয়ে/দিনের বেলা ঘুমিয়ে থাকে/পান সুপারী খেয়ে 

৫।একটি ছিল বেলপাতা আর/আর একটি ছিলো ঢিল

গলায় গলায় ওদের ভিতর/কি যে দারুণ মিল। 

[ বেল পাতা আর ঢিল: ছুটির ছুটি]

৬। কচুর পাতা/ দারুণ ছাতা/বৃষ্টি হলে ব্যাঙ, 

ছাতার তলে/ বসে বসে/ডাকে ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ। [ব্যাঙের ছাতা: ছুটির ছুটি]

ব্যঙ্গ ছড়া লেখাতেও অত্যন্ত দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন ছড়াকার মমিনুর রহমান মমিন। সমাজের নানান অসঙ্গতি আর অসামঞ্জস্যকে কটাক্ষ করে লিখেছেন ব্যঙ্গ ছড়া। সমাজের রাঘব বোয়াল যারা তাদের বেলায় কোন দোষ হয় না। অপরাধ অকর্ম করে তারা থেকে যায় ধরা ছোঁয়ার বাইরে। অথচ যারা ছোট খাটো অপরাধ করে তাদের বেলায় মশা মারতে কামান দাগাতে হয়। সমাজের এই রাঘব বোয়ালদেরকে কটাক্ষ করে মমিনুর রহমান মমিন লিখেছেন-

ক্ষুদিরাম ঘোষ/ দুধে পানি দিয়ে বলে/ কি আমার দোষ?/[যত দোষ করে ঘোষঃ ছুটির ছুটি]

সমাজে স্বার্থপর কিছু লোক থাকে, যারা কেবল নিজেদের স্বার্থ নিয়েই ব্যস্ত। অন্যের অধিকার খর্ব করে তারা সব কিছু দখল করে নিতে চায়। তাদের কাছে ন্যায় অন্যায় বলে কিছু নেই। নিজেদের স্বার্থে তারা অন্ধ। তারা বিচার মানে না। কিন্তু তালগাছ তাদেরকেই দিতে হবে। সমাজের এই সব স্বার্থপর লোকদের কে কটাক্ষ করে মমিনুর রহমান মমিন লিখেছেন:-

ডান দিকে যাও/বাম দিকে যাও/ তালগাছ আমাদের দশ গাঁ সালিশে/ লাঠি ও নালিশে/  হুমকিটা মামাদের। 

[তালগাছ: উড়াউড়ি দিন]

আবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেও  ছাড়েননি ছড়াকার তার ছন্দের পয়ারে। ফরাক্কা বাঁধ নিয়ে ভারতের সাথে বাংলাদেশের দ্বন্দ্ব বহুদিনের। অনেক আলাপ আলোচনার পরেও ফারাক্কা বাঁধে নিশ্চিত হয়নি বাংলাদেশের ন্যায্য পানির হিস্যা। বাংলাদেশের ন্যায্য দাবীর পক্ষে ভারতের বিরুদ্ধে মমিনুর রহমান মমিনের শক্ত প্রতিবাদ: 

দিল্লীর বুকে জল  থই থই/ ঢাকার বুকে খরা

ভালই ভালই বলছি দাদা/ ফারাক্কা বাঁধ সরা

.............................................

ফসল পানির ভীষণ অভাব/ আমার বুকে তেষ্টা

জল না পেলে/ মায়ের ছেলে

ফারাক্কাতে ধাক্কা দিতে/ কবর মরণ চেষ্টা।

[ফারাক্কা বাঁধ সরা: ছুটির দিনে]

আমাদের ঘুণে ধরা সমাজে কচি কচি শিশুদের অধিকার রক্ষা করার মতো কেউ নেই। যেই সময়ে একটি ছোট বাচ্চার খেলার কথা ছিল, মা বাবার আদর পাবার কথা ছিল। সেই শিশুটি মানুষের বাসায় কাজ করে।  তাদের সাধ আর স্বপ্নকে লুট করে সমাজের উচুঁ তলার যে সব  মানুষেরা সুখের সংসার সাজায়, তাদেরকে বিদ্রুপ করে মমিনুর রহমান মমিন লিখেছেন-

যেই বয়সে একটা খুকুর/ থাকবে পুতুল/ খেলার সাথী থাকবে ঘোড়া/ থাকবে হাতি...

....................................

সেই খুকুটি আজ/বই খাতা আর কলম ফেলে/ বাসায় করে কাজ । কোথায় পুতুল/ মিষ্টি দুপুর/ঘুঙুর বাঁশি/ কোথায় নূপুর

কোথায় মনে আশা?

সবাই তাদের স্বপ্ন লুটে/ আর যে লুুটে/ মায়ের  ভালোবাস।

[খেলার সময় নাই: ছুটির ছুটি] 

 বাংলাদেশ একটি কৃষি প্রধান দেশ। যারা ক্ষেতে খামারে কাজ করে ধান, শাক সব্জি উৎপাদন করে, তারা পেট পুড়ে খেতে পায় না দু’বেলা। এই সব শাক সব্জি পুষ্টির আধার হলেও, যারা পুষ্টিকর শাক সব্জি উৎপাদন করে তাদের ছেলে মেয়েরাই অপুষ্টিতে ভুগে। আর সমাজের উুঁচু তলার স্বার্থপর মানুষেরা ফুলে ফুলে মোটা হয়। এমন নির্দয় সমাজ ব্যবস্থাকে কটাক্ষ করে মমিনুর রহমান মমিন লিখেছেন-

কলার ক্ষেতে/ মূলার ক্ষেতে/ ব্যস্ত ভীষণ মা যে ...

চয়ন শুকায় দিনে দিনে/ পায়না ওষুধ সেবা

সিমের দামে কলার দামে/ পুষ্টি দেবে কে বা?

[জীবন ঘুরে চরকায়ঃ ছুটি ছুটি]

ছাড়াকার মমিনুর রহমান মমিনের ছড়ায় একটা বড় অংশ জুড়ে আছে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিয্দ্ধু আর দেশপ্রেম। আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে তিনি লিখেছেন-

আমাদের হামিদুর আমাদের ছেলে/ স্বাধীনতা প্রিয় তার খুন দিল ঢেলে

লাল আর সবুজের পতাকায় আজ/ মা পরেন অবিনাশী মুক্তির তাজ।

[আমাদের ছেলে: উড়াউড়ি দিন]

গাঁও গেরামে যুদ্ধ চলে/যুদ্ধ পুরো দেশটায়

আশার ঝিলিক মায়ের চোখে/আসলো বিজয়/ তার ছেলেদের চেষ্টায়। 

[স্বাধীনতা: উড়াউড়ি দিন]

মমিনুর রহমান মমিন এমন একজন ছড়াকার যার ছড়ায় একই সাথে ননসেন্স রাইম এর সাথে যেমন মজার ছড়া আছে, তেমনি আছে সিরিয়াস বিষয়ের উপস্থাপনা। যত সব বিষয়ের আয়োজন করেছেন ছড়াকার মমিনুর রহমান তার সবগুলোই করেছেন ছন্দের নিত্য নতুন ভঙ্গিমায়। বাহারী ঢঙের ছান্দসিক উপস্থাপনা মমিনুর রহমানের ছড়াকে করেছে ঋজু পাঠ্য, সুখপাঠ্য। সেই সাথে তাঁকে একজন বোদ্ধা ছড়াকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ