ঢাকা, শুক্রবার 27 April 2018, ১৪ বৈশাখ ১৪২৫, ১০ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ফেরে না সব পাখি

 

আতাউল হক মাসুম: সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছুই বদলে যায়। দশ বছর আগে কে বলতে পারতো যে, এই অজপাড়া গাঁয়ে একদিন শহরের উৎকট ধোঁয়া এসে লাগবে। আজ পাকা সড়ক হয়েছে, পুরো গ্রামে বিদ্যুৎ না পৌছালেও যে কয় পাড়ায় বিদ্যুৎ আছে তাতেই যেন আলোকিত সারা গ্রাম। রোজ সন্ধ্যাায় তিন মাথা মোড়ে রমিজের চায়ের দোকানে জড়ো হয় খেটে খাওয়া মানুষগুলো। ডিশ লাইনের কল্যাণে প্রাপ্ত দেশ বিদেশের নানান খবর নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলতে থাকে মাঝরাত অবধি। 

চা পানের ফাঁকে সেদিন মেলা নিয়ে কথা হচ্ছিল। এবার মেলায় লাঠি খেলা থাকবে না শুনে বেজায় ক্ষেপে যায় কাসু মেম্বার। নাম কাসু মেম্বার হলেও আদতে তিনি ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার না। ছিলেনও না কোন কালে। তবে লোকমুখে শোনা যায় বয়সকালে তিনি নাকি তিন তিনবার নির্বাচন করেছিলেন। ভাগ্য খারাপ! টাকা পয়সা সাধ্যমত খরচ করেও জিততে পারননি কোনবার। জোত-জমি বিক্রি করে ঋণ শোধ করতে গিয়ে নি:স্ব প্রায় অবস্থা। তার পরই লকব জুটে য়ায় মেম্বার। অবশেষে স্থির হলো লাঠিখেলা চলবে; শহর থেকে যে বায়োস্কোপ পার্টি আসার কলা ছিল তাই বরং বাতিল করা হবে। কাসু মেম্বারের কথায় জলিল মাস্টার সায় দেওয়াতে কাজ হয়েছে দ্রুত। 

এবারই প্রথম রতন ভাইয়ের সাথে মেলায় এসেছে মিনা। ওদের সাথে মিনার ছোটবোন মিতুও আসার জন্য বায়না ধরেছিল। কিন্তু কেন যেন মিনার মা মিতুকে তাদের সাথে আসতে দিলেন না। রতন মিনার মামাতো ভাই। মিনাদের গ্রামের দুই গ্রাম পরেই রতনদের বাড়ি। রতন সাভারের একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে চাকুরি করে। নববর্ষের ছুটিতে বাড়ি এসেছে। রতনের সাথে আসতে অবশ্য মিনারই অনেক সংকোচ বোধ হয়েছে। মিনার সাথে রতনের বিয়ে ঠিক হয়েছে। রোজার ঈদের পরে রতনের ছোট কাকা অর্থাৎ মিনার ছোটমামা দুবাই থেকে দেশে ফিরবেন। তখনই বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করা হবে। 

        বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে মিনাদের গ্রামে অনেক বড় মেলা বসে। বাঙালি ঐতিহ্য উদযাপনে দূর দূরান্তে থেকে লোকজন আসে। গানের আসর লাঠিখেলা প্রভৃতি মেলার মূল আকর্ষণ। লাঠিখেলা দেখে মিনা আর রতন নাগরদোলায় উঠলো। দুলতে গিয়ে হঠাৎ ভয় পেয়ে রতনকে জড়িয়ে ধরে মিনা। রতন লাজুক হেসে মিনাকে আগলে রাখে পরম মমতায়। তারপর ওরা দুজন একটা অস্থায়ী রেস্টুরেন্টের নিরিবিলি টেবিলে গিয়ে বসে। মিনার পছন্দমত খাবারের অর্ডার দেয় রতন। খাওয়ার মাছে মিনা কিশোরী সুলভ নানান প্রশ্ন করে রতনকে। জিজ্ঞেস করে, ঢাকায় আপনি কি এখন রান্না করে খান? রতন হেসে জনাব দেয়, না আমাদের একজন বুয়া রাখা আছে। তিনি রান্না করে দেন। তবে তোমাকে নিয়ে গেলে আমরা ছোট একটা বাসা নেব। রতন আরও কিছু বলতে চায়। মিনা তাকে থামিয়ে দিয়ে এদিক ওদিক তাকায়। তারপর খাওয়ার মনোযোগ দেয়। বেশ লজ্জা পেয়েছে সে রতনের শেষ কথায়। রতন খেয়াল করে দুমাস আগের মিনা এখনকার মিনা যেন সম্পূর্ণ আলাদা। বিয়ের কথাবার্তার পর থেকেই যেন সে আগের খুনসুটি সব   ভুলে গেছে। কথাও বলে মেপে মেপে। লজ্জা নারীর নিজস্ব অলংকার। আপনাতেই আপ্লুত হয় রতন। মেলা থেকে ফেরার পথে হরেক রকম খাবার আর মিনার জন্য একটা মোবাইল ফোন কেনে রতন। তারপর শেষ বিকেলে বাড়ি ফেরার জন্য একটা ব্যাটারি চালিত ভ্যানে ওঠে তারা। 

পরদিন সকালে রতনের ঘুম ভাঙ্গে মিনার নতুন ফোনের প্রথম কলে। কাল সন্ধ্যায়ই মিনাকে রেখে বাড়ি চলে এসছে রতন। রতন ফোন ধরে হাই হ্যালো বলতেই বুঝতে পারে মিনার মন ভার। কি হয়েছে জানতে চাইলে মিনা বলে একটা বাজে স্বপ্ন দেখে তার ঘুম ভেঙ্গেছে। দেখেছে দুইটা পাখি আকাশে উড়ছে। হঠাৎ শিকারীর একটা গুলি এসে একটা পাখির পালকে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে পাখিটি নিচে পড়ে গেল। আরেকটা পাখি ভয় পেয়ে কিচির মিচির শব্দ করে ছুটে পালালো। শুনে রতন হেসেই অস্থির। হাসি থামিয়ে বলল, শোনো মিনা, তুমিতো অনেক নরম মনের মানুষ। ঢাকা শহরে কিন্তু নরম মানুষের পদে পদে বিপদ। তাই তোমাকে এখন থেকেই মনকে শক্ত করতে হবে। স্বপ্নতো স্বপই। মিনা জানতে চায়, আপনি কি আজই চলে যাবেন। কাল গেলে হয় না! আজ আরেকবার আমাদের বাড়িতে আসতেন।

রতন আদর মাখা গলায় বলে, না মিনা। আজ বিকেলোর লঞ্চ ধরেই ঢাকা যেতে হবে। কাল সকালে অফিসে না গেলে মায়না কেটে দিবে। তাছাড়া প্রতিদিন তোমাদের বাড়ি গেলে লোকে কি বলবে? আগে না হয় অন্য কথা ছিল। অপেক্ষা কর সোনা আর কটা দিনই তো .....। 

বৈশাখীর ছুটির পর থেকে রতনের দিনগুলো খুব ভাল কাটছিল। প্রথম প্রথম মোবাইল পেয়ে মিনা যখন তখন ফোন করে। দিনে ব্যস্ত থাকলেও রাতে অনেকক্ষণ ধরে কথা বলে তারা। 

আজ ২৪ এপ্রিল বুধবার। একমনে কাজ করে যাচ্ছে রতন। একটু আনমনা হয়ে গিয়েছিল রতন। সহকর্মী  মিঠুনের ডাকে সম্বিত ফিরে পায়। কি মিয়া, কি ভাবছেন এত? শোনেন আজ লাঞ্চের পরে শওকত ভাই আমাদের মিষ্টি খাওয়াইবো। হে নাকি নতুন বউরে ঘরে তুলছে। আঞ্চলিক ভাষায় কথাগুলো বলে হাসতে থাকে মিঠুন। রতনের হঠাৎ  মিনার কথা মনে হয়। আরতো কয়টা দিন। মিনাও তার ঘরে বউ হয়ে আসবে। সেও সবাইকে মিষ্টি খাওয়াবে। সুখবরটা চেপে রাখতে না পেরে মিঠুনকে বলে ফেলে। মিঠুন নামের ছেলেটা একটা হইচই বাধিয়ে দেয়। 

লাঞ্চের ব্রেকের আধা ঘন্টা আগে হঠাৎ করেই একটা বিকট শব্দ কানে আসে। ভয়ংকর ঝাঁকুনি দিয়ে কেঁপে উঠলো যেন পুরো বিল্ডিংটা। রতনসহ সবই বসে পড়লো। মনে হল প্রচন্ড ভূমিকম্পের কারণে সবকিছু যেন নিচের দিকে ধাবিত হচ্ছে লিফটের মতো। মাথার ভেতর ঝিম দিয়ে উঠলো রতনের। চারদিকে তীব্র আর্তনাদের রোল পড়ে গেল মুহূর্তেই। সবাই পড়িমড়ি করে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করে বের হতে চাইছে। একসময় ছাদের কঠিন কংক্রিট আছড়ে পড়ে মেঝেতে। পিষ্ট হতে লাগলো সবাই। নিমিষেই এক মর্মান্তিক অধ্যায়ের অবতারণা ঘটলো। জলজ্যান্ত মানুষগুলো মুহূর্তের মধ্যে একে একে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে লাগলো। কারও মাথা থেতলে গেছে, কারও বা শরীর আটকে গেছে কংক্রিটের ভারী দেওয়ালের নিচে। নিজের পরিণতি ভেবে শিউরে উঠলো রতন। হঠাৎ পকেটের মোবাইলটা বেজে উঠলো। অনেক কষ্টে পকেট হাতড়ে মোবাইলটা বের করে দেখলো মিনার ফোন। রিসিভ করে কানে ধরেই হাঁউমাঁউ করে কেঁদে ফেললো রতন। কান্নাজড়িত কন্ঠে বলতে লাগলো, মিনা তোমাকে হয়তো আর দেখতে পাবো না আমি। আমার সব কিছু শেষ হয়ে গেল মিনা। আমাকে তুমি মাফ করে দিও। .......আরও কি যেন বলছিল রতন, কিন্তু সেসব কথা কানে ঢুকলো না মিনার। কোন কালবৈশাখী ঝড়ে লন্ডভন্ড হয়ে গেল তার জীবন। বাকরুদ্ধ মিনার হাত থেকে বিছানায় পড়ে গেল রতনের দেওয়া ফোনটা। চোখে সবকিছুই ঝাপসা দেখছে মিনা। কি মনে হতেই আবার ফোনটা কানে তুলে নিল সে। হ্যালো, হ্যালো.... রতন কথা বলো কিন্তু ওপাশ থেকে কোন সাড়া পাওয়া গেল না। চিৎকার দিয়ে  বিছানায় লুটিয়ে পড়লো মিনা। 

 [২০১৩ সালে সাভারের  রানা প্লাজা ট্রাজেডিতে নিহত সকল কর্মকর্তা কর্মচারী স্মরণে রচিত]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ