ঢাকা, শুক্রবার 27 April 2018, ১৪ বৈশাখ ১৪২৫, ১০ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

পরিবেশবাদী কবি রাজু ইসলাম ও তার অচিন বনের বিহঙ্গ

শাহিদ উল ইসলাম: কোন সু-প্রসিদ্ধ বা অহংকারের জ্ঞান গর্বে গর্বিত কংক্রিটের নগর থেকে নয়, একেবারে নিখাঁদ বেলে দোয়াশ মিশ্রণে গড়া মাটির পল্লী থেকে ভাঁটির স্বরে একটি জোড়ালো অথচ আবেগময়ী উচ্চারণ এই ‘অচীন বনের বিহঙ্গ’। বেলে দোআঁশের মাটি থেকে করি’র এই দীর্ঘশ্বাস আমার কর্ণমূলে বারবার বেজে উঠে সঙ্গত কারণেই। এ যেন পেলব সতেজ সবুজের আঙিনা থেকে সু উচ্চারিত এক গাঁয়ের কবি’র বাঁশের বাঁশির রাখালিয়া সুর যা মন কেড়ে নেয়, প্রাণ কেড়ে নেয়।

হ্যাঁ অচিন বনের বিহঙ্গ কবি রাজু ইসলাম এর লেখা সে রকম একটি কাব্যগ্রন্থ। গ্রন্থটি চার বছর পূর্বে আমার হাতে এসেছে। গ্রন্থটিতে সর্বমোট আটান্নটি কবিতা স্থান পেয়েছে। এর মাঝে কয়েকটি কবিতা আমাকে ভীষণভাবে আলোড়িত করেছে। তার গ্রন্থের প্রতিটি কবিতায় শব্দে মিশে আছে দেশপ্রেম, পরিবেশপ্রেম তথা সর্বোপরি দেশের জনসাধারণের প্রতি তীব্র ভালবাসা। তার লেখনীতে সত্য ও সুন্দরকে শিল্পিতভাবে প্রকাশ করার এক সাহসী পদচারণা যেমনিভাবে লক্ষ্য করা যায় ঠিক তেমনিভাবে অসত্য বা মিথ্যা ভাবাবেগকে পরিহার করার প্রবল প্রবণতাও আকর্ষণীয়। 

মূলত তিনি যেমন একজন সংগ্রামী তরুণ কবি ঠিক তেমনি একজন পরিবেশবাদী কবিও বটে। তার জন্ম ঢাকার সীমানা জুড়ে দোহার থানার জয়পাড়া গ্রামে। বাবার চাকরির সুবাদে শৈশব কাটিয়েছেন আরো একটি ছায়াঘেরা গ্রাম নবাবগঞ্জের যন্ত্রাইল গ্রামে। জন্মাবধি তিনি গাঁয়ের বাসিন্দা, গাঁয়ের মানুষ। গ্রাম বা পল্লী তার সকল কিছু যাকে অস্বীকার করার সাহস তার নেই। পল্লী তাকে নানাভাবে জড়িয়ে রেখেছে বাল্যকাল থেকেই। আর তাই পল্লীর নানা ছবি তাকে অহর্নিশ আকর্ষিত করেছে বলেই পল্লীর কথা তিনি এরূপ শিল্পিতভাবে কবিতায় আবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছেন। 

যেমন তার একটি লেখায়; নদী এখন অ্যাকুরিয়াম কবিতায় উঠে এসেছে একজন জেলের কাহিনী- 

‘সকালে যাবার কালে এক জেলেকে দেখেছি ভেসাল ফেলে যাচ্ছে নিরবধি

জানতে চাইলে শুধালো ‘ নারে ভাই মাছ কই’।’

এই কবিতায় ফুটে উঠেছে পল্লীর নদ, নদী, জেলে ও মাছ এর বর্তমান দুরবস্থার দৃশ্য- যেখানে আছে শুধু হাহাকার, নাই জেলের ভেসালে তাজা মাছ, যা কিনা মাছে ভাতে বাঙালীর প্রিয় খাবার। এই যে মাছের এই আকাল একে কবি কাছ থেকেই দেখেছেন আর তা শিল্পিতভাবে গেঁথেছেন কবিতায়।  অপর একটি কবিতা নদীরা হারায়’ এটিও তার একটি পরিবেশবান্ধব কবিতা। এ কবিতাটিতে ফুটে উঠেছে বর্তমান আবহমান বাংলার নদ নদীর দুরবস্থার কথা;

আসলে সাগর আসুক; সে নদীর ভালবাসা

কিন্তু অনাত্মীয়ের এ শাসনে নদীটি

রেখা থেকেও হয়ে যায় অদেখা এ কবিতায় কবি’র বাল্যকাল থেকে দেখা একটি নদীর ইতিহাস ও চিত্র ফুটে উঠেছে ; যা কিনা বাল্যকাল থেকেই কবি হৃদয়ে আঁকা ছিল। অথচ আজ তাকে লিখতে হচ্ছে নদীটির মৃত্যু গাঁথা! সরল একটি নদী ভূমি দস্যুদের জবরদখলে কেমন করে বাঁকা রেখার ন্যায় হতে হতে এক সময়ে কিভাবে হারিয়ে যায় তার বর্ণনাই করা হয়েছে এ কবিতাটিতে।

কবি রাজু ইসলাম এর আরও একটি কবিতার শিরোনাম পরিবেশবাদী। এখানে কবি নিজেকে পরিবেশবাদীর পক্ষে দাঁড় করিয়েছেন দৃঢ়তার সাথে, এবং তিনি যে পরিবেশবাদী কবি তা পাঠক মাত্র এই কবিতাটি পাঠেই শনাক্ত করতে সক্ষম হবেন।

‘এইখানে যদি কোনদিন দ্যাখ ধ্বংসস্তুপ

যদি দ্যাখ এইখানে এই জনপদ

গুমরে কাঁদে; ফিরে যেতে চায় অতীত অহমিকা যদি কোনদিন দ্যাখ তোমার স্বপ্নের শহর দূষণের আর্তনাদে প্রলুব্ধ এক বুড়িগঙ্গা...’

কবি এখানেও সেই নদীর কথাই গেঁথেছেন। ঢাকা তীরবর্তী বুড়িগঙ্গা নদীর কথাই এখানে সুস্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ঢাকা শহরের মল-মুত্র এই নদী দিয়েই পাচার হয়ে থাকে। কবি আশঙ্কা করেছেন ভূমি দস্যুদের দখলে এই নদীটি যখন মারা যাবে বা বিলীন হয়ে যাবে তখন নগর ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। মল-মুত্রের শহরে পরিণত হবে ঢাকা শহর। তাই কবি তার এ কবিতার মাধ্যমে সকলকে সজাগ করার চেষ্টা করেছেন নিরলসভাবে। তার এ কবিতায় ভবিষ্যতের একটি ম্যাসেজ বা একটি সংবাদ আমরা পাই। এটিই তো একজন কবির কাজ যে পাঠকের কাছে সংবাদ পৌঁছে দেয়া। এই কবিতায় যে ম্যাসেজটি ভবিষ্যতের পাঠকের জন্য লেখা তা কিন্তু মিথ্যা ভাবাবেগের ফসল নয়। সত্য সুন্দর ও সরল ভাবাবেগই এখানে বিদ্যমান। 

বুড়িগঙ্গা দূষণ ও দখল এর ফলে এই জনপদ একদিন ধ্বংসপ্রাপ্ত হতে চলেছে এজন্য কাউকে দোষারোপ করা যাবে না। কেননা কবি জাতিকে জানিয়ে দিয়েছেন স্পষ্টভাবে; ‘তখন আর আফসোসে চুল ছিঁড়ো না নিজের

নিজের দোষটা চাপিও না অন্যের ঘাড়ে

বুক চাপড়ে নিঃশ্বাসের সঙ্কীর্ণতায় কেঁদো না;

কেননা এ অবস্থার জন্য তুমি নিজেই দায়ী।

সেদিন যদি আমার এ কবিতাটি তোমার চোখ না এড়ায় তবে ভেবে নিও আমিও ছিলাম পরিবেশবাদী।’

অচিন বনের বিহঙ্গ প্রেমরসে সঞ্জীবিত এক কবিচিত্তের আনন্দ বেদনার জলসাঘর। কবি রাজু ইসলাম পল্লীতে বসে নিরবে নিভৃতে সাহিত্য সাধনা করে যাচ্ছেন যেন এক স্বপ্নচারী হয়ে। সবার মতো কবির স্বপ্নও পূরণ হয় না, স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। তাই কবি তার স্বপ্নচারী কবিতায় লিখেছেন;

‘দিগবিদিগ ছুটোছুটি করে যে স্বপ্নগুলো

তা কতক পূর্ণ হয়; কতক অপূর্ণতায় জর্জরিত’

কবির স্বপ্ন একটি সুন্দর বাংলাদেশের। একটি সু প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের। ‘অচিন বনের বিহঙ্গ’ কবি’র রঙিন রঙিন উপমা-বহু বর্ণে বর্ণিল চিত্রকল্প আর ভাষার কারুকার্যের এ এক অপার বারান্দা। এখনে কালের পাঠক একটু জিড়িয়ে নিতে চাইবেই। সে কারণেই কবি রাজু ইসলামকে বলবো কবিতা গ্রন্থটির দ্বিতীয় মুদ্রণের কথা। এর সাথে আরও নতুন নতুন লেখা কবি আমাদের উপহার দিবেন এমন প্রত্যাশা তো করতেই পারি। সে ক্ষেত্রে কবি রাজু ইসলাম কে আরও বেশী সজাগ থাকতে হবে এবং পল্লীর আনাচে কানাচের চিত্রগুলো উঠে আসবে বর্ষণচিত্র হয়ে। এই বর্ষণচিত্রও তার লেখা একটি কবিতার শিরোনাম। গ্রন্থটির প্রচ্ছদ দৃষ্টিহারি। আমি এ গ্রন্থটির বহুল প্রচার ও প্রসার কামনা করি। গ্রন্থটি পাবেন প্রিয়মুখ প্রকাশনীতে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ