ঢাকা, শুক্রবার 27 April 2018, ১৪ বৈশাখ ১৪২৫, ১০ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মার্কিন ডলার ও পণ্যের মূল্য

দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে হঠাৎ করে আবারও মার্কিন ডলারের মূল্য বাড়তে শুরু করেছে। গণমাধ্যমের খবরে জানানো হয়েছে, ডলারের মূল্য শুধু বাড়ছেই না, বাড়ছেও লাফিয়ে লাফিয়ে। মাস তিন-চারেক আগেও প্রতি ডলারের মূল্য যেখানে ৭৮ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে ছিল তার মূল্যই ৮৬-৮৮ টাকায় উঠেছে। এটা ঘটেছে চলতি সপ্তাহে তথা ২২ থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত কয়েকদিনে। এ সময়ে ব্যাংকগুলোতে সরকারি পর্যায়ে নগদ ডলারের সর্বোচ্চ দর বা মূল্য দেখানো হয়েছে ৮৫ টাকা ৭৫ পয়সা। বিপরীতভাবে সর্বনি¤œ দর ছিল ৮৪ টাকা। কিন্তু সবই ছিল কাগজেপত্রে। বাস্তবে ২৯টি ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বিদেশিসহ প্রায় সব ব্যাংকই বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশনÑ বাফেডা’র নির্দেশনা উপেক্ষা করেছে এবং যার যেমন খুশি তেমন মূল্যে ডলার কেনা-বেচা করেছে। এর ফলে বুধবার ডলারের আন্তঃব্যাংক দর যেখানে ছিল ৮২ টাকা ৬০ পয়সা, সেখানে কোনো কোনো ব্যাংক এমনকি ৮৮ টাকা দরেও ডলার বিক্রি করেছে। ব্যাংকের পাশাপাশি মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলোও ইচ্ছামতো ডলারের মূল্য আদায় করেছে। 

মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে হঠাৎ করে মার্কিন ডলারের মূল্য বেড়ে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদসহ তথ্যাভিজ্ঞরা জানিয়েছেন, বিশেষ করে পবিত্র রমযান মাসকে সামনে রেখে পণ্য আমদানির জন্য বিপুল পরিমাণ আমদানি ঋণের দায় পরিশোধ করতে হচ্ছে। বিভিন্ন সেবাখাতের আমদানির ব্যয়ও এ সময়ই মেটাতে হচ্ছে। পাশাপাশি রয়েছে টানা কয়েকদিনের ছুটি, যখন বিত্তবানেরা সাধারণত দেশের বাইরে ভ্রমণ করতে যান। এ ধরনের কিছু বিশেষ কারণেই মার্কিন ডলারের ওপর প্রচন্ড চাপের সৃষ্টি হয়েছে। এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, বিগত কিছুদিনের মধ্যে ডলারসহ বৈদেশিক মুদ্রার খাতটিতে এক হাজার ১৭৩ কোটি ২০ লাখ ডলারের টান পড়েছে। টাকার অংকে এর পরিমাণ ৯৭ হাজার কোটির বেশি। পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা ও করণীয় নির্ধারণ করার জন্য অগামী ৬ মে বাফেডা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ সকল ব্যাংকের মধ্যে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সে বৈঠকেই ডলারের মূল্য নির্ধারণ করা হতে পারে। 

এদিকে ডলারের মূল্য বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে আমদানি ব্যয় মেটানোর যুক্তি দেখানো হলেও রাজনৈতিকভাবে সচেতন অর্থনীতিবিদ ও তথ্যাভিজ্ঞরা কিন্তু অন্য কথা বলেছেন। তাদের অভিমত, এমন অবস্থার প্রধান কারণ আসলে অবৈধ পথে টাকার পাচার। চলতি ২০১৮ সাল যেহেতু নির্বাচনের বছর সেহেতু স্বাভাবিক নিয়মেই বিদেশে টাকার পাচার অনেক বেড়ে গেছে। ক্ষমতার সম্ভাব্য রদবদল, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং রাজনীতির ক্ষেত্রে সহিংসতার আশংকায় বড় দলের নেতা, ঠিকাদার ও অসৎ ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাসহ আরো অনেকেই দেশে টাকা রাখার চাইতে বিদেশে পাচার করে দেয়াকে নিরাপদ মনে করছেন। বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে নানা ধরনের জটিলতা ও প্রতিবন্ধকতা থাকায় এ ধরনের ব্যক্তিরা হুন্ডিসহ বিভিন্ন অবৈধ পন্থার আশ্রয় নিয়ে থাকেন। বর্তমান পর্যায়েও তেমন অবস্থারই সৃষ্টি হয়েছে। আর টাকা যেহেতু পাচার করা যায় না এবং করা গেলেও সেটা যেহেতু লাভজনক ও নিরাপদ নয় সেহেতু সংশ্লিষ্টজনেরা মার্কিন ডলারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। একই কারণে রাতারাতি ডলারের দামও বাড়তে শুরু করেছে। তথ্যাভিজ্ঞরা আশংকা প্রকাশ করে বলেছেন, পাচারের এই ধারা প্রতিহত না করা গেলে ডলারের দাম তো বাড়তে থাকবেই, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, মাত্র মাস কয়েক আগেও যে মার্কিন ডলারের মূল্য ছিল ৮০ টাকার নিচে, সে একই ডলারের মূল্য ৮৭-৮৮ টাকা পর্যন্ত উঠে যাওয়ার  বিষয়টি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত আশংকাজনক। কথা শুধু এটুকুই নয়। অর্থনীতিবদসহ বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন এবং এমন অনুমান সত্যও যে, নির্বাচনের বছর বলে ডলারের মূল্য আরো বাড়তেই থাকবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে আমদানি ও রফতানিসহ পণ্যের মূল্যের ওপর। আমদানি ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে বলে পণ্যের মূল্যও বাড়তে থাকবে। অন্যদিকে রফতানি করতে গিয়ে একই ডলারের কারণে ক্ষতির শিকার হবেন ব্যবসায়ীরা। আমরা উদ্বিগ্ন বিশেষ করে পবিত্র রমযান মাসের কারণে। মাত্র দিন কয়েক আগেই বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ জনগণকে আশ্বস্ত করার উদ্দেশ্যে জানিয়েছিলেন, ছোলা, চিনি, পেঁয়াজ ও ভোজ্যতেলসহ রমযানে বেশি প্রয়োজনীয় সকল পণ্যেরই চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি মজুদ রয়েছে। সুতরাং আসন্ন রমযানে কোনো পণ্যের সংকট যেমন হবে না তেমনি মূল্যও বাড়বে না। 

অন্যদিকে মার্কিন ডলার সম্পর্কিত সর্বশেষ রিপোর্ট কিন্তু সকল বিচারেই অত্যন্ত আশংকাজনক। অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতো আমরাও মনে করি, অমদানি ব্যয় মেটানোর আড়ালে টাকার পাচার বন্ধ করার পাশাপাশি পরিস্থিতিতে অবশ্যই দ্রুত ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটানো দরকার। এজন্য সরকারের উচিত অবিলম্বে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন বন্ধ করে দেশে সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা। সব মিলিয়ে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করা দরকার, কাউকেই যাতে অবৈধ পথে টাকা পাচার করার কথা চিন্তা না করতে হয়। আমরা প্রসঙ্গক্রমে টাকা পাচারকারীদের চিহ্নিত করার এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনসঙ্গত ব্যবস্থা নেয়ার জন্যও দাবি জানাই। এ ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হলেই টাকার পাচার যেমন কমবে তেমনি কমে আসবে মার্কিন ডলারের মূল্যও। সরকারকে বুঝতে হবে, ডলারের মূল্যের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ দেশের অর্থনীতি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত রয়েছে। সুতরাং মার্কিন ডলারের মূল্যবৃদ্ধির রাশ টেনে ধরতে হবে অনতিবিলম্বে।     

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ