ঢাকা, শুক্রবার 27 April 2018, ১৪ বৈশাখ ১৪২৫, ১০ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বেপরোয়া ছিনতাই কেড়ে নিচ্ছে প্রাণ

মো. তোফাজ্জল বিন আমীন : আমরা বড্ড কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে এক একটি দিন অতিবাহিত করছি। প্রতিনিয়ত শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য মহান আরশের মালিকের কাছে প্রার্থনা করছি। তবু শান্তির সুবাতাস কোথাও মিলছে না। মজলুম মানুষের কান্নার আওয়াজ ইথারে ইথারে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে। একটি বেদনাদায়ক ঘটনার সমাপ্তি হতে না হতে আরেকটি বেদনাদায়ক ঘটনার সূচনা হচ্ছে। পাঠকের নিশ্চয় মনে থাকার কথা নিকট অতীতে দেশে শিশু হত্যার সিরিজ চলছিল। আর এখন চলছে ছিনতাইয়ের নৃশংসতার সিরিজ। সামনে কোনো সিরিজ চলবে তা আল্লাহ মালুম। একটি দেশের সরকার যখন শুধুমাত্র নিজের ক্ষমতা ও আমিত্বকে প্রাধান্য দেয় তখন সেখানে আর শান্তির পায়রা উড়ে না, এটা বোধ হয় নতুন করে কাউকে বুঝানোর প্রয়োজন নেই। পৃথিবীর যে কোনো দেশের সরকারের দায়িত্ব জনগণের নিরাপত্তা ও অপরাধীদের শাস্তির বিধান নিশ্চিত করা। কিন্তু একটি দেশের সরকার যখন গণতন্ত্রের মোড়কে স্বৈরতন্ত্রের পথে হাঁটে তখন আর সেখানে কারও অধিকার রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। তবে সরকার যখন সন্তানতুল্য নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকারগুলো প্রতিষ্ঠিত করে তখন মানুষ সুখে-শান্তিতে জীবনযাপন করে। যেমনটি জেফারসন বলেছেন, রাষ্ট্রের জন্য মানুষ নয়, মানুষের জন্য রাষ্ট্র তৈরি হয়েছে। আমেরিকার গণতান্ত্রিক এই নেতার ভাষ্যমতে, একটি ভালো সরকারের প্রথম ও একমাত্র লক্ষ্য হলো মানুষের জীবনের নিরাপত্তা দেয়া ও তাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দেখা, তাদের ক্ষতি না করা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য বাংলাদেশের জনগণ অনেক ক্ষেত্রেই সেই অধিকারটুকু পাচ্ছে না।

একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা যখন সংশয়গ্রস্থ হয়ে যায় তখন আর দুঃখের সীমা থাকে না। সম্প্রতি দেশে ঘটে যাওয়া ছিনতাইয়ের ঘটনা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেও প্রতিকারের উদ্যোগ তেমন দেখা যাচ্ছে না। প্রায় প্রতিদিনই রাজধানীর কোথাও না কোথাও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। এমনকি ছিনতাইকারী চক্র নিরীহ মানুষকে খুন করতেও কুন্ঠাবোধ করছে না। এর মধ্যে কয়েকটি মর্মান্তিক নিষ্ঠুর ঘটনা ঘটলেও ঘটনার সাথে জড়িত ছিনতাইকারীদেরকে পুলিশ বাহিনী গ্রেফতার করতে পারেনি। ছিনতাইয়ের ঘটনা যত বাড়ছে অপরাধ দমনে পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও জনমনে অসন্তোষ ততই বাড়ছে। একটি সমাজ বা রাষ্ট্রে যখন আইনের শাসনের ব্যতয় ঘটে তখনই কেবল হত্যা, গুম, খুন, অপহরণ, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, ছিনতাইয়ের মতো অমানবিক ঘটনা বাড়তে থাকে। ছিনতাইকারী চক্র মানুষের হাতে থাকা ব্যাগ,গায়ের গহনা, টাকা পয়সা, মোবাইল ফোনসহ অন্যান্য জিনিস শুধু ছিনিয়ে নিচ্ছে তা কিন্তু নয়! অবলীলায় মানুষ খুন করতেও কুণ্ঠাবোধ করছে না। তাদের হাতে মানুষ খুন হওয়ার ঘটনা সত্যিই বেদনাদায়ক। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে গত সাত মাসে রাজধানীতে ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে প্রাণ গেছে ৭ জনের। সর্বশেষ ২৬ জানুয়ারির একই দিনে রাজধানীর সায়েদাবাদ ও ধানমন্ডি এলাকায় ছিনতাইকারীদের হাতে দু’জন প্রাণ হারিয়েছে। ধানমন্ডির মিরপুর রোডে কাক ডাকা ভোরে টানা পার্টির শিকার হন বেসরকারি হাসপাতালের আয়া হেলেনা বেগম। সায়েদাবাদ এলাকায় ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে রক্তাক্ত হয়ে দৌড়ে হাসপাতাল পর্যন্ত গিয়েছিলেন ব্যবসায়ী ইব্রাহিম। কিন্তু ছিনতাইকারীদের নিষ্ঠুরতার শিকার হতে এ ব্যবসায়ী প্রাণে বাঁচতে পারেনি। তাদের করুণ নৃশংস মৃত্যুর দায় সরকার এড়াতে পারে না।

দেশের সন্তানতুল্য নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা দেয়া সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠী ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করার চেয়ে বিরোধী মতালম্বীদের দমনে বেশি ব্যস্ত। আর সে সুযোগে ছিনতাইকারী চক্র আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। গত জুন থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত ঢাকায় শুধু ভোরে ছিনতাইকারীদের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন পাঁচজন। এর মধ্যে পুলিশ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে নারী, পুরুষ, শিশু ও ছাত্র রয়েছেন। ছিনতাইয়ের কবলে পড়ে যখন কোনো মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে তখনই কেবল ছিনতাইয়ের বিষয়টি বড় হয়ে উঠে। অথচ প্রতিনিয়ত মানুষকে ছিনতাইয়ের কবলে পড়তে হচ্ছে। সেসব ঘটনা অনেকটাই আড়ালে থেকে যায়। অনেকে পুলিশি ঝামেলা এড়াতে থানায় যায় না। ফলে ছিনতাইকারীরা প্রশ্রয় পেয়ে দানবের ভূমিকা পালন করছে। সাধারণ মানুষ কেন পুলিশের সাহায্য নিতে ইচ্ছুক হয় না এই বিষয়টির সুরাহা করা প্রয়োজন। পুলিশের নিকট গিয়ে বিপদে পড়বে না এমন গ্যারান্টি যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করা যায় তাহলে অনেক সমস্যা এমনিতেই সমাধান হয়ে যাবে। পত্রিকান্তে জানা যায় যে, রাজধানীর প্রায় শতাধিক স্পটে প্রতিনিয়ত ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। চিহিৃত এসব স্পটে ছিনতাইয়ের সাথে কারা জড়িত পুলিশ বাহিনীর তা অজানা থাকার কথা নয়। এদের গ্রেফতার করে আইনের মাধ্যমে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করলে রাজধানী থেকে ছিনতাই বহুলাংশে কমে যাবে,তা নিশ্চিত করে বলা যায়। তবে পুলিশকে রাজনৈতিক দমন পীড়নে যেভাবে ব্যস্ত রাখা হয় তার ছিটে ফোটাও যদি ছিনতাই প্রতিরোধে ব্যবহার করা হতো তাহলে বর্বর ছিনতাইয়ের কবলে পড়ে সাধারণ মানুষের জীবন এভাবে মৃত্যুর শিকার হতো না।

সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া ছিনতাইয়ের কিছু ঘটনার পরিসংখ্যান পাঠকদের জ্ঞাতার্থে তুলে ধরা হলো। ১৩ জানুয়ারি রাতে শেরেবাংলা নগর এলাকায় ইসকেন্দার হাওলাদার নামে এক অটোরিকশাচালককে ছিনতাইকারী চক্র হত্যা করে তার গাড়িটি নিয়ে যায়।  ২০১৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর রাজধানীর দয়াগঞ্জের রেলব্রিজ এলাকায় ছিনতাইয়ের সময় মায়ের কোল থেকে পড়ে সাত মাসের শিশু আরাফাত নিহত হয়। ৮ অক্টোবর টিকাটুলিতে এক শিক্ষিকাকে ছিনতাইকারীর কবল থেকে বাঁচাতে গিয়ে খুন হন ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী খন্দকার আবু তালহা। ৫ ডিসেম্বর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিউটের জুনিয়র কনসালট্যান্ট ফরহাদ আলম ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে মারা যান। ৩০ জুন ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে জালাল নামে এক তরুণ খুন হন রাজধানীর ওয়ারী এলাকায়। ৮ নভেম্বরে রাজধানীর রায়ের বাজারে সাব্বির হোসেন নামে এক তরুণকে ছিনতাইকারীরা হত্যা করে। ১৯ নভেম্বর ঢাকার মৌচাক এলাকায় গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এক পরিদর্শককেও ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করেছে দুই ছিনতাইকারী। ১০ ডিসেম্বর রাতে ওয়ারীতে শাহীদা নামের এক নারীর পায়ে গুলী করে টাকাসহ হাতব্যাগ ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারীরা। ২১ জুন ভোরে মিরপুর বেড়িবাঁধ এলাকায় পুলিশের এএসপি মিজানুর রহমান তালুকদার ছিনতাইকারীদের হাতে নির্মমভাবে খুন হন। ২০১৬ সালের ২১ মে রাজধানীর কাঁটাবনে ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে নিহত হন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী প্রিয়াংকা দত্ত। ২০১৫ সালের ২৪ আগস্ট কমলাপুরে চিকিৎসক দম্পত্তি সানজানা জেরিন খান ও মোনতাহিন আহসান ভূঁইয়া রনি ছিনতাইয়ের কবলে পড়েন। ২০১৪ সালের ২৮ অক্টোবরে ভোরে ধানমন্ডির সোবহানবাগে রিকশাযোগে যাওয়ার সময় শিশুসন্তান রাইসার সামনে মা আয়েশা আক্তার রিপা ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে প্রাণ হারান। ২০১২ সালের এপ্রিলে মিরপুরের রাইনখোলায় ছিনতাই ঠেকাতে গিয়ে  গুলিতে নিহত হন হযরত আলী নামের এক ব্যক্তি। ২৩ জানুয়ারি রাজধানীর চকবাজারে দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে জুয়েল মিয়া নামে এক ব্যবসায়ী খুন হন। ধারাবাহিকভাবে বর্বরোচিত ও নৃশংস এ ধরনের ঘটনা ঘটলেও ছিনতাইকারীদেরকে আইন প্রয়োগকারী বাহিনী গ্রেফতার করতে পারেনি। ফলে ছিনতাইকারীরা আরো বেপরোয়া হয়ে একের পর এক নৃশংস ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে। ছিনতাইকারীদের গতি প্রতিরোধে পুলিশের তৎপরতা আরো বাড়িয়ে জনগণের জানমালের নিরাপত্তার বিধান নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকা এই অপরাধের লাগাম এখনই টেনে ধরতে না পারলে সামনে আরো ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে। বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকা এই অপরাধের লাগাম এখনই টেনে ধরা প্রয়োজন। কারণ মানুষ যদি অতিষ্ঠ হয়ে আইন হাতে তুলে নেয় তাহলে হিতের বিপরীত হয়ে যায়। ২০১৬ সালের ২৮ অক্টোবর রাজধানীর মতিঝিলে প্রকাশ্যে দিবালোকে তিন ছিনতাইকারীকে গণধোলাই ও পরে শরীরে আগুন লাগিয়ে নিমর্মভাবে পুড়িয়ে মারা হয়। ঠিক তার কয়েকদিন পর একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে রাজধানীর ধানমন্ডিতে। সেখানেও এক ছিনতাইকারীকে প্রকাশ্যে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। আমরা কোন অপরাধীকে পুড়িয়ে কিংবা গণপিটুনীতে হত্যা করা হোক তা প্রত্যাশা করি না। দেশের প্রচলিত আইনে ঐসব অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি প্রদান করা হোক। যাতে করে জনগণের ভয় ভীতি দূরীভূত হয়ে যায়। এ ব্যাপারে সরকার ও পুলিশ প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টরা যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন এমনটিই দেশের ১৬ কোটি মানুষের প্রত্যাশা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ