ঢাকা, শনিবার 28 April 2018, ১৫ বৈশাখ ১৪২৫, ১১ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

গড়াই নদী দুই দফা খননে সফলতা না মিললেও ফের হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেয়া হচ্ছে

কুমারখালী (কুষ্টিয়া) : খননের পরও গড়াই নদীর বর্তমান চিত্র -সংগ্রাম

মাহমুদ শরীফ, কুমারখালী (কুষ্টিয়া) : দক্ষিণ ও পশ্চিমের কয়েকটি জেলা মরুকরণের হাত থেকে রক্ষা এবং সুন্দরবনকে নোনা পানির আগ্রাসন হতে রুখতে ও সারা বছর মিঠা পানির প্রবাহ সচল রাখতে দুই দফা খনন কাজে তেমন কোনো সুফল না মিললেও তৃতীয় বারের মত নতুন করে গড়াই খননে প্রায় হাজার কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেয়া হচ্ছে। এ বছরই প্রকল্পটি পাশ হতে পারে। তবে দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা, সঠিক গবেষণা, অপরিকল্পিত ড্রেজিং, কাজ বাস্তবায়নে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে গড়াই খননে সুফল পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ। আগের তুলনায় শুস্ক মৌসুমে মিঠা পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গত কয়েক বছরে খুলনা, যশোরসহ কয়েকটি জেলায় নদী অববাহিকায় স্যালাইনিটি (নোনা পানি) বেড়েছে। তাই তৃতীয় বারের মত ফের গড়াই খননে মেগা প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। যার ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা। প্রকল্পটির ফাইল বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনে আছে। চলতি বছরেই প্রকল্পটি একনেকে পাশ হবে বলে পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানিয়েছে।
পরিবেশবিদদের মতে, খুলনা বিভাগের মধ্যে পরিবেশগত দিক থেকে পদ্মার প্রধান শাখা নদী গড়াইকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। পানি উন্নয়ন  বোর্ডের মতেও গড়াই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সুন্দরবনের জন্য গড়াইয়ের মিঠা পানি অপরিহার্য্য। কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হরিপুর ও মিরপুর উপজেলার তালবাড়িয়া এলাকার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া পদ্মা থেকে গড়াই উৎস মুখ শুরু হয়েছে। নদীটি কুষ্টিয়া ছাড়াও মাগুরা, রাজবাড়ি, ঝিনাইদহ, ফরিদপুর হয়ে যশোর ও খুলনা হয়ে সুন্দরবনে গিয়ে মিশেছে। সুন্দরবন ছাড়াও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে নোনা পানির আগ্রাসন রুখতে বড় ভূূূূমিকা রাখে গড়াইয়ের মিঠা পানি। সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, বর্ষা মৌসুমে গড়াই নদীর দুই কূল পানিতে উপচে পড়লেও শুষ্ক মৌসুমে নদীর চেহারা একেবারেই ভিন্ন। খনন কাজ চলার পরও শুষ্ক মৌসুম আসলে দেখা যায় পানি শুকিয়ে প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে নদীর অবস্থা একেবারেই নাজুক। নদীর কুষ্টিয়া-রাজবাড়ী মহাসড়কের লাহিনী এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে নদীতে শুকিয়ে গেছে। কোন স্রোত ও প্রবাহ নেই। সেখানে রেল সেতু ও সড়ক সেতুর পাশে গর্তে কিছু পানি জমে আছে। বন্ধ পানিতে একজন জেলে পায়ে হেঁটে একটি ছোট্ট টিনের তৈরি নৌকা টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আর উৎস মুখ তালবাড়িয়া থেকে শুরু করে লাহিনী এলাকা ছাড়াও সর্বত্র নদীতে বিপুল পরিমান পলি ও বালু জমেছে। এসব বালু অবৈধভাবে কেটে নিচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। গত দেড় যুগ আগেই পলি ও বিপুল বালু জমে গড়াই নদীতে পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। নদীকে আগের রুপে ফিরিয়ে আনতে ১৯৯৭ সালে সর্বপ্রথম তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গড়াই নদীর মুখে মাটি কেটে পরীক্ষামূলক নদী খননের কাজ উদ্বোধন করেছিলেন। কিছু দিনের মধ্যেই বৃষ্টির পানিতে মাটি ও বালুতে নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় ঐ কাজে আর কোন সুফল মেলেনি। পরের বছর ১৯৯৮ সালে এ নদী পুনরুদ্ধারের লক্ষে ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প অনুমোদন হয়। নেদারল্যান্ডের কো¤পানী জিআরসির মাধ্যমে জোরেশোরে এ কাজটি শুরু হয়। জিআরসির কাজ শেষ হওয়ার কয়েক বছর না যেতেই ফের মরুকরণের প্রভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে। শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার পানির স্তর নেমে যাওয়ায় গড়াই নদীর মুখে বিশাল বালুরাশি জমে যাওয়ায় গড়াই নদী একেবারে মরাখালে পরিণত হতে থাকে। এর বড় প্রভাব পড়তে শুরু করে দক্ষিনাঞ্চলের নদী এবং সুন্দরবনের জীব বৈচিত্রের উপর। বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর গড়াই নদীর পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখা, এলাকার খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষা করা, জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা, সুন্দরবন এলাকার লবনাক্ত দূরীকরণ, দক্ষিণাঞ্চলের মিষ্টি পানির প্রবাহ বৃদ্ধি, সেচ সহযোগিতা প্রদান, মৎস্য চাষ সুবিধা, সুন্দরবনের বৃক্ষরাজির উৎপাদন বৃদ্ধি, কুষ্টিয়া, যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, ফরিদপুর যশোর ও খুলনা এলাকাকে মরুকরণের হাত থেকে রক্ষাসহ আরো বেশ কয়েকটি মহৎ লক্ষ্য নিয়ে ২০১০-১১ অর্থ বছর থেকে ৪ বছর মেয়াদী বৃহত্তর আকারের ডেজিং করতে “গড়াই নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্প-২” প্রকল্প গ্রহণ করে। এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯৪২ কোটি টাকা। এ প্রকল্পের আওতায় কুষ্টিয়ার গড়াই নদীর মুখ থেকে শুরু হয়ে ৩০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এবং ৪০মিটার প্রস্থ গড়াই নদীর ৯৩ লাখ ঘন মিটার মাটি খনন করা করা হয়। এ প্রকল্পে পানি উন্নয়ন বোর্ড দেশীয় তৈরি গড়াই ও পদ্মা নামে ২টি ড্রেজার মেশিন ক্রয় করে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে জমা দেয়ার আগেই এই ২টি ড্রেজার মেশিন নিয়ে কেলেংকারীর ঘটনা ঘটে। ফলে তৎকালীন পিডি ও নির্বাহী প্রকৌশলীকে এ প্রকল্প থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছিল। ২য় পর্যায়ের মেয়াদে তালবাড়িয়া থেকে খোকসা উপজেলা শহর পর্যন্ত মোট ৩০ কিলোমিটার নদী খননে ৫০৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়ে গেলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। গত মৌসুমের খনন কাজ শেষ হলেও এ বছর কোন বাজেই নেই। তারপরও পানি উন্নয়ন বোর্ড ১৭ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে  আপদকালিন খনন কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য। যা এখন চলমান রয়েছে। চলতি বছর ২৭ লাখ কিউবিক ঘন মিটার বালু উত্তোলন করা হবে। এদিকে নতুন করে ফের তৃতীয় ধাপের খনন কাজ করতে একটি প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে। প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। একনেকে পাশ হলে তৃতীয় ধাপে ফের বড় পরিসরে খনন কাজ করার কথা ভাবছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। পাশাপাশি নদীকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে তৈরি করা হবে একাধিক গাইড বাঁধ। যাতে ভাঙ্গন থেকে রক্ষার পাশাপাশি নদীর তলদেশে বালি ও পলি না জমে। এতে খনন খরচ কমে আসবে। এছাড়া নদীর বালি দিয়ে ব্লক তৈরির কথাও ভাবছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। তবে খননে তেমন সুফল না মেলায় ঢাকায় একটি মিটিংয়ে গড়াই খননের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। খননের পরও পানি প্রবাহ না থাকায় আগের তুলনায় দক্ষিণের কয়েকটি জেলায় নোনা পানির আগ্রাসন দিন দিন বাড়ছে। এতে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে উচ্চ মহল থেকে। বিষয়টি নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারও বিব্রত পরিস্থিতিতে পড়েছেন। তারাও বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলতে চাচ্ছেন না। কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রফিকুজ্জামান বলেন, ‘দুই দফা খননের পরও নদীতে পানি প্রবাহ আগের মত নেই। নতুন করে একটি প্রকল্প পাঠানো হয়েছে। তাতে খনন, গাইড বাঁধ নির্মাণসহ সব মিলিয়ে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা। আশা করা হচ্ছে এ বছরেই প্রকল্পটি পাশ হবে।’ নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন,  ‘গড়াই বাঁচাতে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। এছাড়া গবেষণারও ঘাটতি আছে। বৃহৎ পরিকল্পনা হাতে নিলে এ প্রকল্প থেকে সুফল মিলবে। বর্তমানে নদীকে সচল করতে খনন কাজ চলছে। প্রবাহ স্বাভাবিক হয়ে যাবে আশা করছি। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানাগেছে, ‘ভৌগলিক কারণে গড়াই নদীতে প্রচুর পরিমানে পলি ও বালু জমে। এছাড়া ভাঙ্গনের কারণেও নদীর প্রশস্ততা বাড়ছে দিন দিন। এ জন্য বর্ষা মৌসুমে অধিক পরিমানে বালু জমে উচু হয়ে উঠছে নদীর বুক। এতে পানি শুকিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে নদীকে সচল করতে ২৫ ফুট চওড়া করে কোন রকমে ক্যানালের আকারে খনন করা হচ্ছে। যাতে অন্তত পানি প্রবাহ সচল হয়। পরিবেশ ও নদী গবেষক কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. রেজওয়ানুল ইসলাম বলেন, ‘সঠিক কোন পরিকল্পনা ছাড়াই বার বার গড়াই খনন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। এতে কাজের কাজ কিছু হয় না। গড়াই এ এলাকার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নদী। তাকে বাঁচাতে প্রয়োজন দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা। গড়াই না বাঁচলে এ অঞ্চল থেকে অনেক মাছ ও জলজ প্রাণী হারিয়ে যাবে। ইতোমধ্যে অনেক পাখি ও মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ