ঢাকা, শনিবার 28 April 2018, ১৫ বৈশাখ ১৪২৫, ১১ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

পুষ্টিহীনতা

বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটির মতো। তার মধ্যে আড়াই কোটিরও বেশি অপুষ্টির শিকার বলে জাতিসংঘের তথ্য উদ্ধৃত করে ইত্তেফাক রিপোর্ট করেছে গত ২৪ এপ্রিল। এতে নারীদের পুষ্টিহীনতা ভয়াবহ বলে উল্লেখ করা হয়। পুষ্টিহীনদের মধ্যে আবার ৬০ শতাংশই নারী। শিশুমৃত্যুর প্রধান কারণও এই পুষ্টিহীনতা বলে উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞ মহল। তারা বলেন, দেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়লেও পুষ্টিপরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। জাতিসংঘের 'খাদ্য ও কৃষি সংস্থা' ফাও এর খাদ্য ও পুষ্টিপরিস্থিতি বিষয়ক ‘ফুড সিকিউরিটি নিউট্রিশনাল সার্ভিল্যান্স প্রোগ্রাম’ এর গবেষণা রিপোর্টে এমন তথ্যই প্রকাশ পেয়েছে। গতবছর প্রকাশিত ‘এন এসেসমেন্ট অন কাভারেজ অব বেসিক সোশ্যাল সার্ভিস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের দারিদ্র্যদূরীকরণ এবং খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে বেশ অগ্রগতি হলেও সার্বিক পুষ্টিচিত্র সন্তোষজনক নয়। দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু, কিশোরী ও নারী এখনও অপুষ্টির শিকার। এর ফলে আগামী ২০২৫ সালের মধ্যে খর্বতা ২৭ শতাংশ হ্রাস করে আনবার যে টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছিল তা পূরণে সংশয় দেখা দিয়েছে।
পুষ্টি কর্মপরিকল্পনায় বলা হয়, ৫ বছরের কমবয়সী শিশুরা এখনও উচ্চমাত্রার পুষ্টিহীনতার শিকার। এদের মধ্যে ৩৬.১ শতাংশ খর্ব, ১৪.৩ শতাংশ কৃশ এবং ৩২.৪ শতাংশ কম ওজনের। প্রাক-বিদ্যালয়ের শিশুরা ভিটামিন এ এবং জিঙ্কের অভাব এবং নারীরা আয়োডিন স্বল্পতায় ভুগছে। শহরের বস্তিতে পুষ্টিপরিস্থিতি খুব নাজুক। গ্রামেরও খুব ভালো নয়। বস্তির অধিকাংশ শিশু খর্বকায়। দেশের পুষ্টিপরিস্থিতির উন্নয়নে এবং সচেতনতা বাড়াতে এখন চলছে জাতীয় পুষ্টিসপ্তাহ- ২০১৮। শেষ হবে আগামীকাল ২৯ এপ্রিল রোববার। এবছর এর প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয় 'খাদ্যের কথা ভাবলে পুষ্টির কথাও ভাবুন'। উল্লেখ্য, পুষ্টিহীনতার জন্য প্রতিবছর দেশের আর্থিক ক্ষতি প্রচুর। অপুষ্টি উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও বড় বাধা। পুষ্টিহীনতার কারণে শিশুরা অসুখে বেশি ভোগে। এতে শিশুদের জন্য পরিবার ও সরকারের ব্যয়ও বাড়ে। অপুষ্টি প্রতিরোধ করতে মায়ের অন্তঃসত্ত্বার সময় থেকে ২ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ খাদ্য দিতে হবে। এজন্য বস্তি ও গ্রামাঞ্চলে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। গত ১০ বছরে পুষ্টিহীনতায় ভোগা মানুষ বেড়েছে ৭ লাখ। সামাজিকভাবে নারীর প্রতি বৈষম্যের কারণে নারী ও কন্যাশিশুরা চাহিদা ও প্রয়োজন মাফিক খাদ্য এবং পুষ্টি পায় না। ফলে এদের নানাবিধ অসুখবিসুখসহ ৪৪ শতাংশ নারী রক্তস্বল্পতায় ভোগেন। তার মানে দেশের শিশু ও নারীসমাজ এখনও অবহেলা ও উপেক্ষার শিকার। এ বিষয়ে দেশ পরিচালকদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনসহ কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে বৈকি।
দেশশাসকদের তরফ থেকে উন্নয়নের মহাসড়কে সদাপট অগ্রসরমানতার ঘোষণা দেয়া হলেও পুষ্টিহীনতার যে নাজুক পরিস্থিতি আলোচ্য রিপোর্টে উঠে এসেছে তা প্রায় অন্তঃসার শূন্যতায় পরিণত হতে চলেছে। দেশের আড়াই কোটির অধিক সংখ্যক মানুষ যদি পুষ্টিহীনতায় ভোগে এবং একই কারণে আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধর খর্ব, কৃশকায় এবং প্রায় প্রতিবন্ধী প্রজন্ম হিসেবে গড়ে ওঠে, তাহলে স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের নাগরিকরূপে গৌরবান্বিত হবার কিছু থাকে কি? না, আমরা এমন পঙ্গু জাতি হিসেবে গড়ে উঠতে চাই না। সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী জাতি হিসেবে টিকে থাকতে হলে আমাদের যেসব শিশু, কিশোর ও মা এখনও পুষ্টিহীনতার শিকার তাদের প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। তারা যেন সুস্থ ও সফল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে সেদিকে নজর দিতে হবে আমাদের সবাইকে। দেশের আড়াই কোটির অধিক সংখ্যক নাগরিক বিশেষত শিশু ও মায়েরা অপুষ্টিসহ নানা সমস্যায় আকীর্ণ থাকবে আর দেশপরিচালকরা উন্নয়নের ফাঁকা বুলি কপচাবেন তা দেশ ও জাতির কাছে প্রত্যাশিত হতে পারে না। এর উত্তরণ জরুরি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ