ঢাকা, শনিবার 28 April 2018, ১৫ বৈশাখ ১৪২৫, ১১ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

পহেলা বৈশাখ নিয়ে বাড়াবাড়ি উচিত নয়

খান মুহাম্মদ ইয়াকুব আলী : একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত থাকার দরুণ ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক কিছু দিবস বা অনুষ্ঠান পালন করতে হয়। যতটা করা দরকার তার চেয়ে বেশি করার ইচ্ছাও পোষণ করি না। আবার অতি উৎসাহীও হই না। এতদিন বর্ষবরণ অনুষ্ঠান করিনি। মনে করেছিলাম একটা ভাল কাজই করছি। ভাগ্যের পরিহাস, আমাদের সমাজের কিছু অতি সতর্ক অভিভাবক রয়েছেন যারা সন্তানের হাতে টাকা দেন না আর গৌরবের সাথে বলেন, ‘ছেলের হাতে টাকা দিলে সে নষ্ট হয়ে যাবে’। ফলাফল হয়, ছেলেটি বাবার নিকট থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ না পাওয়াতে পরে কি করে? কি করে? একটি ঘটনা বলি। ঢাকার কদমতলী থানার রায়েরবাগ এলাকায় ভাড়া থাকতাম। আমার পাশের বাসার দুটি পরিবার দুজনই নামাজী এবং ধর্ম-কর্ম পালন করেন। একজনের বাসায় টেলিভিশন রয়েছে আর অন্যজন ঘরে টেলিভিশন রাখা হারাম মনে করেন। যিনি ঘরে টিভি রাখেন না, সে ভদ্রলোক অফিসে যাওয়ার পর তার দুটি ছেলে সারাদিন পাশের ফ্ল্যাটে টিভি দেখে আর সাংঘাতিকভাবে দুষ্টুমী করে। ছেলে দুটির মা বলে ‘আপা কি করি বলেন? ওর বাবা টিভি রাখা হারাম মনে করে, আর ওদেরকে আমি ঘরে রাখতে পারি না। দয়া করে আপনার ভাইয়ের নিকট বলবেন না। বিষয়টি কেমন হল, নিজের ঘরে টিভি রাখলেন না অথচ আপনার ছেলেরা টিভিও দেখছে আবার অন্যকেও বিরক্ত করছে। ছেলের প্রয়োজনীয় টাকা দিবেন না, দেখবেন সে ঠিকই তার প্রয়োজন পূরণ করবে, তাতে আপনার সেই বড় গলা রক্ষা করে নয় বরং আপনার সর্বনাশ করে। আমি যখন স্কুলে পহেলা বৈশাখ পালন বা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন না করতাম তখন দেখা যেত ৮ম থেকে ১০ম শ্রেণির ছাত্রীরা আপত্তিকর পাতলা বৈশাখী শাড়ি পরে অন্য স্কুলের অনুষ্ঠানে গিয়ে যোগদান করতো। এরপর চিন্তা করলাম, এতো আরো পীড়াদায়ক। তার চেয়ে শালীনতার মধ্য দিয়ে আমিই অনুষ্ঠান করি। কিছু বিষয় আছে সমাধান করা কঠিন। আমার এক বন্ধু ছাত্রথাকাকালে আমাকে বলেছিলেন ‘আমি পর্দা পালন করি অথচ আমার ছোট বোন পর্দার ধার ধারে না। আমার মা বললেন, ছোট বোনকে নিয়ে মার্কেটে যেতে। বোন বেপর্দা, তাই আমি রাজি হলাম না। অমনি মা বললেন, তাহলে পলাশের সাথে যাক। পলাশ হলো আমার খালাতো ভাই। ভাবলাম, আমি যদি বোনকে না নিয়ে যাই তবে সে খালাতো ভাইয়ের সাথে যাবে এটাতো আরো মারাত্মক। তাই ইচ্ছের বিরুদ্ধে হলেও নিজের বেপর্দা বোনকে নিয়ে মার্কেটে যেতে হলো। পাঠক সমাজের অবগতির জন্য বলি, শালীনতা, ভদ্রতা, নৈতিকতা ও পর্দা পালনের মধ্য দিয়ে গত বছর পহেলা বৈশাখ পালন করার পরেও বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়ি। অথচ সে অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করেন এবং মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করেন ঢাকা মহানগর শিল্পীগোষ্ঠী। যারা গানের মধ্যে আল্লাহ ও রাসূল (সা.) এর কথা স্মরণ করিয়ে দেন। অথচ পাশের মসজিদের খতিব সাহেব জুমার খুৎবায় বলেন, এবার কিছু স্কুল জাঁকজমকভাবে পহেলা বৈশাখ পালন করেছে। আমি বুঝতে পেরেছি, এটা আমাকে ইঙ্গিত করেছেন। কারণ আমি স্কুল পরিচালনা করলেও উত্তরাধিকার সূত্রে মুসলিম। ধর্ম-কর্ম পালন করার চেষ্টা করি। অতএব আমার দ্বারা পহেলা বৈশাখ পালন করা একেবারেই বেমানান। বৈশাখ নিয়ে কিছু একটা লিখার জন্য আমার বন্ধু একটি সমাজসেবা অফিসের কর্মকর্তা জনাব নাজমুল হক প্রায়ই বলতেন, ভেবে পাইনি কি লিখবো। আজ অর্থাৎ ৯ এপ্রিল ২০১৮ সকাল বেলা স্কুলের সামনে বসেছিলাম তখন শিশু শ্রেণির দুজন ছাত্রের মা আমার সাথে কথা বলছিলেন একজন বললেন, আমার এক আত্মীয় বলেছেন, পহেলা বৈশাখ পালন করা হাদিসে নিষেধ আছে। আমি বললাম, বাংলা নববর্ষের প্রবর্তন করলেন স¤্রাট আকবর, এটা হাদিসে আসলো কি করে? উনারা আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। ভাবলাম এই বর্ষবরণ নিয়ে এক পক্ষ যেমন সীমা লঙ্ঘন করছে আবার অন্য পক্ষ এটাকে একেবারে জাহান্নামের বাহন বানিয়ে ফেলেছে। দু’পক্ষই বেশি বাড়াবাড়ি করছে। তাই কিছু লিখার ইচ্ছা পোষণ করলাম আসলে লিখা নয়, মনের মাঝে জমে থাকা কথাগুলো তুলে ধরলাম। প্রকৃতপক্ষে পহেলা বৈশাখ কি? এটা পালন করা না করার মধ্যে কি লুকিয়ে আছে? স¤্রাট আকবর দেখলেন, আমরা হিজরী আর খ্রিস্টাব্দ মাস বা বছর পালন করি, তাই তিনি মনে করলেন আমাদের বাংলা ভাষাভাষীদের সুবিধার জন্য বাংলায় হিসাব-নিকাশ করব, খাজনাপাতি উঠাবো বাংলা মাসে। ব্যবসায়ীরা তাদের বার্ষিক হিসাব-নিকাশ, দেনা-পাওনা এ বাংলা মাসে বা বছরে করবে আর এ বছরের প্রথম মাস হলো বৈশাখ। সে মতে, আমরা বর্তমানে জমির খাজনা বাংলা বছরে অর্থাৎ বৈশাখ মাসের হিসেবে পরিশোধ করি। ব্যবসায়ীরা পহেলা বৈশাখে হালখাতা করে বিগত দিনের দেনা-পাওনা হিসেব করে। আমরা সাধারণ জনগণ আমাদের বাঙালি জাতির ভাষা, বাংলা ভাষা, মাস বাংলা বছরের প্রথম দিনে যদি শালীনতা বজায় রেখে কোন অনুষ্ঠানে পালন করি, তাতে এমনকি মহাপাপ হবে? যদি আমি এই প্রত্যয় নিয়ে অনুষ্ঠান করে যে আমার বিগত বছরটা যেমনভাবে অতিবাহিত হলো সামনের বছর যেন আরো ভালোভাবে কাটে। যেমনটি ম্যাসেজের মধ্য দিয়ে বলেছে উদয় নামে একজন ব্যক্তি। অতীতের সকল দুঃখ কষ্ট পাওয়া না পাওয়াকে ভুলিয়ে দিয়ে নতুন করে জীবন নামক ক্ষুদ্র ঝুলিতে অনাবিল আনন্দের বার্তা বয়ে আনুক, নব আনন্দে উজ্জ্বল নির্মল জীবন, এই কামনা করছি। আপনাকে ১৪২৫ শুভ বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা। উদয় হোক।
এমন প্রাঞ্জল ভাষায় যদি আমরা ভাব বিনিময় করে নতুন বছরকে স্বাগত জানাই তাহলেও কি অপরাধ হবে? অন্যদিকে আজকের বড় বড় মানুষগুলোর জন্ম হয়েছে গ্রামের সেই কৃষক বাবার ঘরে, যে ঘর থেকে আমাদের জীবন শুরু হয়েছে পান্তাভাত আর পেঁয়াজ ও কাঁচা মরি দিয়ে। সে কথা যেন ভুলেই গিয়েছি, এটা স্মরণ করিয়ে দেয়াতে কিসের অপরাধ? তাও বুঝে আসে না। হ্যাঁ, যদি কেউ এটাকে ইবাদত মনে করে তা হবে অপরাধ। আবার রমনা বটমুলে সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতির ঝড় তুলে সেটা অপরাধ হতে পারে। কিন্তু শালীনতার ভেতর দিয়ে যদি কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় তাও কেন অপরাধ হবে তা আমার বুঝে আসে না। আমাদের মনে রাখা দরকার যে, ফেসবুক, ইন্টারনেট বা টেলিভিশনের কোন অপরাধ নয় অপরাধ আর নিরপরাধ প্রশ্ন আসে আমরা কিভাবে তা ব্যবহার করছি সেটা। শিশুদের বিনোদন আর মনের উৎফুল্লতা সবকিছু বন্ধ করে দিয়ে কেবলই ঘরের মধ্যে বন্দি করে রেখে তাদের মেধা মননের বিকাশ সাধন সম্ভব নয়। আর ঢালাওভাবে যেমন সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতির প্রচলন করে সীমা লংঘন করা ঠিক নয়। অন্যদিকে সবকিছুকে অন্যায় আর অপরাধ বলাও এক ধরনের বাড়াবাড়ি ছাড়া কিছু নয়। অতএব উভয় পক্ষকেই বাড়া বাড়ি পরিহার করা উচিত। পহেলা বৈশাখ পান্তাভাত আর ইলিশ ভাজা খেতে হবে এটাও যেমন ঠিক নয়, আবার এটা খেলে কবিরাগুনাহ হবে তাও বা কেন হবে? টিভির টকশোতে আমাদের দেশের অনেক সাংস্কৃতি ব্যক্তিত্বই বলেছেন, পান্তাভাত আর ইলিশ মাছ খাওয়ার সাথে বাঙালি সংস্কৃতির কোন সম্পর্ক নেই। আমরাও মনে করি, এটা একটা বানানো সংস্কৃতি। আবার যদি ধরি, আমাদের পরিচয় ভাতে মাছে বাঙালি, আমাদের পদ্মার ইলিশ বিশ্বব্যাপি সমাদৃত। সেই ইলিশ আর পান্তার কথা স্মরণ করার জন্য এমনটি করছি। আমাদের বেনারশী শাড়ি হাড়িয়ে যাওয়ার পথে তার ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য এর উৎসব করা হয়। এটা কি অপরাধ? পান্তা ইলিশও আমাদের অতীতকে মনে করিয়ে দেয়। এটা খেতে হবে, এমনও নয়, আবার খেলে অপরাধ হবে এটা মনে হয় ঠিক নয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ