ঢাকা, শনিবার 28 April 2018, ১৫ বৈশাখ ১৪২৫, ১১ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

একটি স্বপ্নের মৃত্যু

রুহুল আমিন রাকিব : ভাইয়া এই ভাইয়া। ঘুম থেকে উঠবে না? অনেক বেলা হয়েছে তো। উঠে দেখ সকালের লাল সূর্য্যি মামাটা দীঘির জলে উঁকি মেরে খেলা করছে দিঘির জলের সাথে। আর লাল নীল সাদা হাঁসের দলও সাঁতার কাটছে আপন মনে।
কি হলো ভাইয়া? তুমি দরজা খুলছ না ক্যান? তোমার কি ঘুম শেষ হয়না?
ছোট বোনের ডাকে কোন সাড়া শব্দ আসে না রফিকের রুম থেকে।
রফিক বাবা মায়ের এক মাত্র আদরের দুলাল। বাবা পুলিশ অফিসার, আর মা প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষিকা।
রফিকের এক মাত্র বোন রিয়া। রিয়া এবার ক্লাস সেভেনে আর রফিক ইন্টার প্রথম বর্ষে পড়ে। বাবা মা চাকুরির কারণে নিয়মিত খোঁজ খবর রাখতে পারে না,ওদের দুই'ভাই বোনের। খুব ভোরে উঠে সূর্যের আলো ফোটার আগে রফিকের বাবা মা কে তৈরি হতে হয় নিজ নিজ কর্মস্থলে চলে যাবার জন্য। মেয়েকে স্কুলের সামনে নামিয়ে দিয়ে রিয়ার বাবা রোজ অফিসে চলে যান। আর রফিক তখন থাকে গভীর ঘুমে। সপ্তাহে এমনো দিন আছে যে মুখ দেখা হয় না ওদের পরিবারের সবার একসাথে।
আজ কয়েক দিন ধরে যেন, অনের রাত করে বাসায় ফেরাটা এক রকম নিয়ম হয়ে গেছে রফিকের। অনেক রাত করে বাসায় ফিরে ঠিক মতো রাতের খাবারো খায় না রফিক। রাত করে ঘুমানো আর রোজ সূর্য মাথার উপর উঠলে তবেই যেন ঘুম থেকে উঠার সময় হয় রফিকের। আর কলেজ সেই যে কবে গিয়েছে এ কথা যেন এক রকম প্রায় ভুলতে বসেছে রফিক। ছোট বোন রিয়া এই বিষয়ে কিছু বললে'ই হলো চোখ লাল করে ঠাস-ঠাস করে দু'চার'টা পিঠে বসিয়ে দিতে একটুও দিধা করে না রফিক। দিনে দিনে কেমন যেন বদলে যেতে লাগলো রফিক। কারণে অকারণে রাগ করা, বাবা মায়ের কাছে নানা বাহনা দেখিয়ে মিথ্য কথা বলে প্রয়োজনের চাইতে অধিক টাকা চাওয়া। আরো কত রকম যে তালবাহনা করে বসে রফিক। দিনে দিনে সুখের সাগরে ঢেউ খেলা পরিবারে নেমে এলো অশান্তির কালো ছায়া। রফিকের বাবা পুলিশ অফিসার মতিন সাহেব গভীর চিন্তায় পড়ে গেল ছেলেকে নিয়ে। ছেলেকে নিয়ে কত স্বপ্ন ছিলো মতিন সাহেবের। ছেলেকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে একদিন এই দেশের একজন ভালো নাম করা ডাক্তার বানাবে। ছেলের সুনাম ছড়িয়ে পড়বে দেশে,এমন কি দেশের বাহিরেও। আর তখন গর্বে বুক ভরে যাবে মতিন সাহেবের। ছেলেকে নিয়ে রঙতুলিতে সাজানো স্বপ্নগুলো আজ যেন চোখের সামনে বিলিন হয়ে যাচ্ছে ছেলের নষ্ট হওয়ার কষ্টে। আজ যখন বাবা মা বুঝতে পারছে ছেলে খারাপ কোন নেশা করে । এই কথা যেন কিছু তেই বিশ্বাস হয় না রফিকের বাবা মায়ের। কত সুখ আর শান্তি ছিলো মতিন সাহেবের! আজ যেন অন্ধকার গ্রাস করছে মতিন সাহেবের পরিবার জুড়ে।
পুলিশ অফিসার বাবার ছেলে নেশা করে এই কথা সমাজের লোক জানলে,সমাজে মুখ দেখাতে পারবে না,রফিকের বাবা মতিন সাহেব। অনেক চেষ্টা করা হলো রফিককে ভালোর পথে ফিরিয়ে আনার জন্য। তবে মরণ নেশা যেন কিছুতেই ছাড়তে চায়না রফিকের পিছু। আজ সাতাশে এপ্রিল ঢাকা পি'জি হাসপাতালের দু'তালার তিন নাম্বার রুমের পাঁচ নাম্বার বেডে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে রফিক। ডাক্তার বলছে অতিরিক্ত নেশা জাতীয় ক্ষতিকর ঔষুধ সেবন করার কারণে রফিকের দুই'টা কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে প্রায়। রফিকের বাঁচার সম্ভাবনা প্রায় শেষের পথে। ধুমপান করার কারণে কণ্ঠনালিতেও বাসা বেঁধেছে মরণ বেধি ক্যান্সার। ডাক্তারের রিপোর্ট শুনে মাথা ঘুরে পরে যায় মতিন সাহেব। আজ সাত দিন ধরে তেমন একটা হাঁটা চলা করতে পারে না রফিক। তরল খাবার ছাড়া কিছু খেতেও পারে না।
সারাদিন হাসপাতালের বেডে শুয়ে বসে দিন কাটে রফিকের। আর রফিকের পাশে অশ্রুশিক্ত ছল ছল নয়নে চেয়ে থাকে,রফিকের মা ও আদরের ছোট বোন। আজ সারা দিন কোন খাবার মুখে দেয়নি রফিক,তেমন কোন কথাও বলেনি কারো সাথে। মাঝে মাঝে চোখ মেলে তাকিয়ে কি যেন খুঁজে ফিরে ফ্যাল ফ্যাল করে শূন্য দৃষ্টি নিয়ে। কিছু না খাওয়ার কারণে পেট শুকিয়ে যেন কাঠ হয়ে গেছে। গলাটা আজ যেন আগের চাইতে বেশ ফুলে গেছে। একটু পর পর নার্স ও ডাক্তার এসে দেখে যাচ্ছে রফিককে। অন্য দিনের চাইতে আজ আত্মীয় স্বজনের আনাগনা একটু যেন বেশি রফিক'কে একনজর দেখার জন্য। ঘড়িতে রাত তিন'টা বেজে দুই'মিনিট। আকাশের কোথাও তারা নেই। ঝুলে থাকা চাঁদটাও লুকোচুরি খেলা খেলছে মেঘের সাথে।
রফিক একটু পর-পর পানি পানি বলে চিৎকার করছে, আর চোখ মেলে তাকিয়ে দেখছে মাথার কাছে হাত বুলিয়ে অশ্রু শিক্ত নয়নে বসে আছে জনম দুখীনি মা। হঠাৎ চোখ দুটি বড় বড় করে মায়ের কোলে নিজেকে লুকানোর প্রাণপণ চেষ্টা করে রফিক। নাহ্ শক্ত করে নিজের বুকে জড়িয়ে নিয়েও রফিক'কে আর বাঁচাতে পারল না ।রফিক চিরদিনের জন্য চলে গেলো না ফেরার দেশে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ