ঢাকা, রোববার 29 April 2018, ১৬ বৈশাখ ১৪২৫, ১২ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মেধাবীরা পাড়ি জমাচ্ছেন বিদেশে

ইবরাহীম খলিল : বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগে ’৮৬-এর ব্যাচে মোট শিক্ষার্থী ছিলেন ৩১ জন। তাঁদের ২৫ জনই এখন বিদেশে। একই বিভাগের ’৯৪-এর ব্যাচের ৪৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে অন্তত ৩৫ জন পাড়ি জমিয়েছেন বিভিন্ন দেশে। ৯৮-এর ব্যাচের ৬৫ জনের মধ্যে অন্তত ৩০ জন কাজ করছেন দেশের বাইরে। ইয়াহু, গুগল, মাইক্রোসফট, আইবিএমের মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানে ভালো অবস্থানে আছেন তাঁদের অনেকে। জানা যায়, শুধু ওই বিভাগ নয়, বুয়েটের সব বিভাগের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ শিক্ষা শেষে পাড়ি জমান বিদেশে। উচ্চতর শিক্ষা বা চাকরি সূত্রে তাঁরা দেশ ছাড়েন। পরে সাধারণত কেউই আর ফেরেন না।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশে উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাব ও মেধার স্বীকৃতি না দেওয়ায় মেধাবী শিক্ষার্থীরা দেশে থাকছেন না। বুয়েট থেকে শুধু স্নাতক ডিগ্রি নিতে প্রতি শিক্ষার্থীর জন্য রাষ্ট্রের ব্যয় হয় প্রায় আট লাখ টাকা। রাষ্ট্র তাঁদের তৈরি করলেও ব্যবহার করতে পারছে না। তাঁদের মেধা ব্যবহার করছে বিভিন্ন ধনী দেশ। এর বিনিময়ে দেশ কিছু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই মেধাবীদের দেশের প্রযুক্তি ও প্রকৌশল ক্ষেত্রে ব্যবহার করা গেলে উন্নয়ন ত্বরান্বিত হতো।
ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি পলিসি-২০১০ (সংশোধিত)-এ বলা হয়েছে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকার বেশ কয়েকটি কারণের একটি হচ্ছে ‘মেধা পাচার’। মেধা পাচার ও দক্ষ জনশক্তির ইমিগ্রেশন সমস্যার বিষয়টি গুরুত্বারোপ করে তা বন্ধ করার কথাও নীতিমালায় বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, দেশে বিজ্ঞান থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের কর্মক্ষেত্র সীমিত। ফলে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান বিষয়ে পড়ালেখার আগ্রহ কমছে।
বুয়েটের অধ্যাপক ম. তামিম মোজাম্বিকে বুয়েটের মেধা পাচার নিয়ে একটি গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। সেখানে বলা হয়, বুয়েট থেকে পাস করার পর শিক্ষার্থীদের ৮০ ভাগ বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁদের ৬০ ভাগ এ ক্ষেত্রে সফল হন।
সুযোগ-সুবিধার অভাব, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, মেধার স্বীকৃতি দেওয়ার অভাবকে তিনি ছাত্রদের চলে যাওয়ার জন্য দায়ী করেছেন। ওই উপস্থাপনায় বলা হয়, দেশে পেট্রোলিয়াম ক্ষেত্রে দক্ষ জনসম্পদের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। এ জন্য বুয়েটে কানাডার সহায়তায় ১৯৮৬ সালে পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মিনারেল রিসোর্সেস ইঞ্জিনিয়ারিং (পিএমআরই) বিভাগ চালু হয়। ১৯৯৫ সালে শুরু হয় শিক্ষাকার্যক্রম। যৌথ কার্যক্রমের আওতায় প্রথমবার বুয়েটের পাঁচজনকে কানাডার আলবার্টা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয় উচ্চশিক্ষার জন্য। পিএইচডি শেষে পাঁচজনের একজন দেশে ফিরে এসে তিন মাস ছিলেন, তার পর আবার পাড়ি জমান কানাডায়। দুজন দেশে ফিরে তিন বছর থেকে চলে যান কানাডায়। আর একজন দেশে ছিলেন সাত বছর। অন্য একজন নরওয়ের নরওয়েজিয়ান ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে ডিগ্রি নিয়ে সেখানেই ফিরে যান।
একই প্রকল্পের আওতায় পানিসম্পদের ওপর দুজন এবং ছয়জনকে রসায়ন প্রকৌশলে প্রশিক্ষণের জন্য আলবার্টাতে পাঠানো হয়। এঁদের মধ্যে রসায়নের দুজন মাত্র দেশে ফিরে আসেন। বাকি প্রশিক্ষণার্থীরা সেখানেই থেকে যান। আর পানিসম্পদের জন্য যে দুজনকে পাঠানো হয়েছিল, তাঁদের একজন দেশেই ফেরেননি। অন্যজন দেশে ফিরে আড়াই বছর পর আবার পাড়ি জমান বিদেশে।
যাঁরা এসব ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন করছেন, তাঁদের একটি বড় অংশ হয় দেশের বাইরে চলে যাচ্ছেন অথবা দেশেই মোটা বেতনে বিদেশি কোম্পানিগুলোতে কাজ করছেন। ফলে এসব ক্ষেত্রে স্থানীয় দক্ষ জনসম্পদের অভাব রয়ে গেছে।
 সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বুয়েটের মেধাবী ছাত্ররা দেশে উপযুক্ত কাজ পাচ্ছেন না। তাঁদের কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। বুয়েটের অনেক ছাত্রই এখন বিভিন্ন দেশের বিশ্বস্বীকৃত বিশেষজ্ঞ। দেশেও তাঁদের কাজে লাগানো যেত। এ জন্য দরকার নীতিমালা। সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কথা বলছে। তা করতে হলে দেশের এসব মেধাকে আগে কাজে লাগাতে হবে।
২০০৬ সালে ডেনমার্ক বাংলাদেশে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) খাতের সম্ভাবনা যাচাই করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে। তাতে বলা হয়, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় দুই হাজার আইটি গ্র্যাজুয়েট হচ্ছে। তাঁরা আন্তর্জাতিক প্রোগ্রামিংয়ে নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখছেন। এঁদের সস্তায় ব্যবহার করা যায়। কিন্তু এ দেশে প্রতিবছর এক হাজার ৮০০ থেকে দুই হাজার উপযুক্ত লোক পাওয়া যায় না। তার বড় কারণ ‘ব্রেন ড্রেন’। গত ১০ মার্চ জাপান বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য মেধা পাচার রোধ করার ওপর গুরুত্বারোপ করে।
বুয়েট শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখন বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা কিছুটা হলেও কমছে। তার কারণ বেসরকারি পর্যায়ে কিছু কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে বেসরকারি মুঠোফোন অপারেটরগুলোতে বুয়েটের অনেক শিক্ষার্থীর কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
 আরেকটি পরিসংখ্যানে দেখানো হয়েছে, গত দশ বছরে উচ্চশিক্ষা নেবার লক্ষ্যে শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশের বাইরে চলে যাওয়ার হার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে। প্রতিবছর দেশ থেকে বিদেশে পড়তে যাওয়া ছাত্রের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ২০০৬ সাল থেকে ২০১৫ এর মধ্যে কমপক্ষে ৩৩,১৩৯ জন শিক্ষার্থী গিয়েছেন বিদেশে। ইউনেস্কোর এক রিপোর্ট থেকে জানা যায়, প্রতিদিন প্রায় ৯০ জন বাংলাদেশী নাগরিক শিক্ষার জন্য চলে যান অন্য কোন দেশে। তাদের মধ্যে অনেকেই উন্নত জীবনযাপনের আশায় সেসব দেশেই থেকে যান।
২৭ বছর বয়সী মো. রফিকুল ইসলাম মানিক গত বছর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতœতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক পাশ করেন। তিনি তার মাস্টার্স এর পড়াশোনা করার জন্য বাংলাদেশ ছেড়ে পাড়ি দিয়েছেন প্যারিসের সোরবোন ইউনিভার্সিটিতে। কারণ তিনি যে ধরণের বৈজ্ঞানিক গবেষণা করতে চান, তার কোন সুযোগ এদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। ইশতিয়াকের সাথে কথা বলা হলে তিনি বলেন,আমাদের গবেষণাগারগুলোতে পর্যাপ্ত সরঞ্জামের যথেষ্ট অভাব রয়েছে এবং শিক্ষার মানও বেশ নিম্নমানের। বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা হলেও আমাদের দেশে প্রত্নতত্ত্বকে তেমন গুরুত্বের বিষয় ভাবেননা অধিকাংশ মানুষ। এটিই মূলত দেশে এবং বিদেশে পড়াশোনার মধ্যে মূল পার্থক্য।
ইউজিসি-র সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর নজরুল ইসলাম মনে করেন, বাংলাদেশী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবেই দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন অধিকাংশ বিদেশগামী শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, আমাদের দেশের উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আসন সংখ্যা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সীমাবদ্ধ। এখানে সুযোগের অভাবে অনেক শিক্ষার্থী দেশ ছেড়ে চলে যায়। উদাহরণস্বরূপ, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য বুয়েট একটি চমৎকার প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এখানে গবেষণাগারগুলোতে পর্যাপ্ত সরঞ্জাম নেই এবং অন্যান্য অনেক ল্যাব সুবিধা থেকে ছাত্ররা বঞ্চিত। তাই বুয়েট এর মতো প্রতিষ্ঠান উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীরা বাইরের কোন দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকেই নজর দিচ্ছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এত বেশি মাত্রায় দেশ ছেড়ে মেধাবীরা চলে গেলে ভবিষ্যতে দেশে মেধা পাচার ধরনের পরিস্থিতি শুরু হতে পারে।
ইউনেস্কোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের পছন্দের দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানী ও কানাডা। ৩৩,১৩৯ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ২০% আছে মালয়েশিয়াতে, ১৬% যুক্তরাষ্ট্রে, ১৪% যুক্তরাজ্যে, ১৩% অস্ট্রেলিয়াতে, ৬% জার্মানী ও ৫% শিক্ষার্থী রয়েছে কানাডার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ