ঢাকা, রোববার 29 April 2018, ১৬ বৈশাখ ১৪২৫, ১২ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

তারেক রহমানের নাগরিকত্ব বিতর্ক : নতুন করে মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা?

আবার শুরু হয়েছে মাইনাস টু ফরমূলার বাস্তবায়নের কাজ । তবে সেবার অর্থাৎ ১/১১ এর জরুরী সরকারের সময় দুইজন নেত্রীকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করতে চেয়েছিলেন মিলিটারি কন্ট্রোলড সরকার। মঈনুদ্দিন, ফখরুদ্দিনের সরকার মুখে মাইনাস টুর কথা বললেও সেটি ছিলো আসলে মাইনাস ওয়ান ফর্মূলা বাস্তবায়নের চক্রান্ত। সেই মাইনাস ওয়ান বলতে সেদিন ওদের মনে ছিল বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার চক্রান্ত। একজনকে মাইনাস করলে জনগণ সেটি গ্রহণ করবে না । তাই মাইনাস টুর আড়ালে মাইনাস ওয়ান অর্থাৎ বেগম জিয়াকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করাই ছিল আসল উদ্দেশ্য। জনগণকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য শেখ হাসিনাকে মাইনাসের কথা বলা হলেও ইন্দো-মার্কিন যৌথ প্রকল্পের অধীনে শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সেই মাইনাস টু ফর্মূলার আপাত অবসান হয়।
৯ বছর ৪ মাস পর সেই মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়নের ফর্মুলা জোরদার হয়েছে। এবারও টার্গেট দুইজন । শেখ হাসিনার স্থলে এবার টার্গেট হলেন বিএনপির অস্থায়ী চেয়ার পার্সন তারেক রহমান। আওয়ামী লীগের মাইনাস টু’র মধ্যে রয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া এবং তার জ্যৈষ্ঠ পুত্র বিএনপির অস্থায়ী চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এই ফর্মুলা মোতাবেক বেগম জিয়াকে ইতোমধ্যেই জেলে ঢুকানো হয়েছে। ৫ বছরের সাজা বহাল রেখে তাকে নির্বাচনের অযোগ্য বলে ঘোষণা করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখন উচ্চ আদালত কর্তৃক ৫ বছরের সাজা বহাল রাখতে পারলেই কেল্লা ফতে। অর্থাৎ বেগম জিয়া আগামী নির্বাচন এবং রাজনীতি থেকে আউট হয়ে যান। আওয়ামী লীগের নিজস্ব হিসাব এই যে বেগম জিয়াকে মোটামুটি মাইনাস করা গেছে। তাকে স্থায়ীভাবে মাইনাস করা সময়ের ব্যাপার। তাই এখন মাইনাস টু’র ২ নম্বর টার্গেটকে ধরা হয়েছে। আর এই ২ নম্বর টার্গেট হলেন তারেক রহমান। তাকে একেবারে নাগরিকত্ব অর্থাৎ বাংলাদেশের নাগরিক থেকেই খারিজ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বাজারে অতীতে গুজব ছিল যে, মামলা মোকদ্দমার কারণে তারেক রহমান যদি ইলেকশন করতে না পারেন তাহলে তার স্ত্রী ড. জোবায়দা রহমান ইলেকশন করবেন। এখন দেখা যাচ্ছে জোবায়দা রহমান এবং কন্যা জায়মা রহমানসহ তারেক রহমানের পুরো গোষ্ঠীকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার ফর্মুলা রচনা করা হচ্ছে।
এবার ফর্মুলার হাতিয়ার হলো তারেক রহমানের পাসপোর্ট বিতর্ক এবং নাগরিকত্ব ইস্যু। বিশাল সফরসঙ্গী নিয়ে প্রধান মন্ত্রী লন্ডন সফরে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি ব্রিটিশ প্রধান মন্ত্রীর সাথে দেখা করেছেন এবং তারেক রহমানকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য ব্রিটিশ প্রধান মন্ত্রীকে অনুরোধ করেছেন। সকলেই জানেন যে , ঐ অনুরোধে কোনো কাজ হবে না। তাই এখন তার পাসপোর্ট নিয়ে লেগে পড়েছে এই সরকার। বাংলাদেশ হাই কমিশন তো সরকারের অধীনে। সেই হাই কমিশন থেকে তারেক রহমানের পাসপোর্টের কয়েকটি পাতা ফটোকপি করে মিডিয়াতে ছেড়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। পাসপোর্টের ঐ কয়েকটি পৃষ্ঠা গণমাধ্যমে ছেড়ে দিয়ে তিনি প্রমাণ করতে চেষ্টা করেছেন যে, তারেক রহমান তার বাংলাদেশী নাগরিত্ব বিসর্জন দিয়েছেন।
॥দুই॥
সেজন্য কয়েকদিন আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম রীতিমতো এলান করে দিয়েছেন যে, তারেক রহমান তার পাসপোর্ট ব্রিটিশ সরকারের হোম ডিপার্টমেন্টে সারেন্ডার করেছেন এবং তার নাগরিকত্ব বর্জন করেছন। অতএব এখন থেকে তিনি আর বাংলাদেশের নাগরিক নন। যে ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক নন সেই ব্যক্তি বাংলাদেশের রাজনীতিতে জড়িত থাকতে পারেন না। বিএনপি বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দল। যে ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিকই নন, সেই ব্যক্তি বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল বিএনপির অস্থায়ী সভাপতি হন কিভাবে? আওয়ামী লীগের অন্য নেতারা বলেছেন যে, তারেক রহমানকে ইতোঃপূর্বে মানি লন্ডারিং কেসে সাজা দেওয়া হয়েছে। তারপর জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের অর্থ আত্মসাৎ করার দায়ে তার ১০ বছরের কারাদন্ড হয়েছে। কিন্তু তিনি বাংলাদেশের আইন আদালতের কাছে ফিউজিটিভ বা পলাতক। তেমন একজন ব্যক্তি বাংলাদেশের রাজনীতিই করতে পারেন না, নির্বাচন করা তো দূরের কথা। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের এই আকস্মিক পাসপোর্ট ও নাগরিকত্ব ইস্যু উত্থাপনে শিক্ষিত সচেতন মানুষতো বটেই সাধারণ মানুষও প্রথমে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। তারা ঠিক বুঝতে পারেননি যে, হঠাৎ করে এই ইস্যুটি আনা হলো কেন? এই কাজটি করার জন্য তিনি খেটেছেনও অনেক। তারেক রহমানের পাসপোর্টের কয়েকটি পৃষ্ঠার ফটোকপি করে সেগুলো সাংবাদিকদের মাঝে বিলিয়েছেন এবং ব্রিটিশ হাই কমিশনের ভুলে ভরা একটি চিঠিও সার্কুলেট করেছেন। তারপর ঢাকায় এই ইস্যুতে একটি প্রেস কনফারেন্সও করেছেন। তারেক রহমানের পাসপোর্ট ইস্যু নিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এত কিছু করতে গেলেন কেন? প্রথম প্রথম অনেকেই ব্যাপারটি বুঝতে পারেন নি। কিন্তু এখন সকলের কাছেই ক্লিয়ার হয়ে গেছে যে, তারেক রহমান বাংলাদেশের নাগরিক নন, এই বিষয়টি জনগণের কাছে তুলে ধরা এবং সেটি মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা। কিন্তু দিন শেষে দেখা গেল যে এবার সরকার তথা তার প্রতিমন্ত্রী দক্ষতার সাথে তারেক রহমানের কার্ডটি খেলতে পারেন নি। এখন অনেকের মনে হচ্ছে যে ঐ কার্ডটি মন্ত্রী তথা সরকারের নিকট বাউন্স ব্যাক করেছে। প্রতিমন্ত্রী প্রথমে পরিষ্কার ভাষায় ঘোষণা করেছিলেন যে, তারেক রহমান তার পাসপোর্ট সারেন্ডার করেছেন এবং ব্রিটিশ নাগরিকত্ব পাওয়ার আশায় বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বর্জন করেছেন।
॥তিন॥
পাসপোর্ট জমা দেওয়ার সাথে নাগরিকত্ব বিসর্জনের সম্পর্ক কি? ইমিগ্রেশন সম্পর্কে যাদের মিনিমাম নলেজ রয়েছে তারা আওয়ামী প্রোপাগান্ডাতে হতবিহবল হয়েছেন। অন্যদের কথা বাদ দিন। খোদ আওয়ামী সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যরিস্টার শফিক রহমান বলেছেন যে, ইংল্যান্ডের নাগরিক হওয়ার জন্য তিনি সাময়িকভাবে বাংলাদেশী পাসপোর্ট বাংলাদেশ হাই কমিশনে জমা রাখতে পারেন। অনুরূপ মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহ্ধীন মালিক। তার মতে, পাসপোর্ট থাকা না থাকার ওপর নাগরিকত্ব নির্ভর করে না। আর পাসপোর্ট তো হলো একটি ট্রাভেল ডকুমেন্ট। তারেক রহমান সপরিবারে তাদের ট্র্যাভেল ডকুমেন্ট জমা দিয়েছেন ব্রিটিশ নাগরিকত্ব লাভের জন্য। এখানে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বর্জনের প্রসঙ্গ আসে কিভাবে? অভিযোগটি যখন আওয়ামী লীগের একজন প্রতিমন্ত্রী তুলেছেন তখন সে অভিযোগ প্রমাণ করার দায়িত্বও ঐ প্রতিমন্ত্রীর। এটি আইনের বিধান।
একথা ঠিক যে, জনাব তারেক রহমান তার পাসপোর্ট ব্রিটিশ হোম মিনিস্ট্রিতে জমা দিয়েছেন। ২০১২ সালে যখন তিনি দেখেন যে, ব্রিটিশ সরকার আওয়ামী লীগের অনুরোধে সাড়া দিচ্ছেন না এবং তাকে ফেরত আনার জন্য ইংল্যান্ডের কোনায় কোনায় তদবির করা হচ্ছে তখন তারেক রহমান নিজের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত হন। তিনি পরিষ্কার বুঝতে পারেন যে, তাকে দেশে ফেরত আনার জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে প্রধানত দুটি কারণে। প্রথমটি হলো, তিনি বাংলাদেশে এলেই তাকে জেলে ঢুকানো হবে। এরপর বিচার করে তাকে গুরুদন্ড দেওয়া হবে। এসব কারণে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে তিনি চিন্তিত হন এবং ব্রিটিশ সরকারের নিকট পলিটিক্যাল এ্যাসাইলাম বা রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আবেদন করেন। এই আবেদন করার পূর্বশর্ত হলো ব্রিটিশ সরকারের কাছে তার পাসপোর্ট জমা রাখা। এই পাসপোর্ট জমা রাখার অর্থ পাসপোর্ট সারেন্ডার করা নয় বা নাগরিকত্ব বিসর্জন দেওয়া নয়। অথচ, পররাষ্ট্র প্রতি মন্ত্রী সেই প্রোপাগান্ডটিই করেছেন। যাই হোক, আবেদনের এক বছর পর তাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া হয়।
॥চার॥
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সম্ভবত জানেন না যে, পাসপোর্ট জমা দিলেই নাগরিকত্ব বর্জন করা হয় না অথবা নাগরিকত্ব খারিজ হয় না। তিনি হয়তো আরো জানেন না যে, ২০১৬ সালে মন্ত্রী সভা যে নাগরিকত্ব আইন অনুমোদন দিয়েছে সেটি এখনো সংসদে পাস হয়নি। তাই বাংলাদেশের নাগরিকত্ব এখনো ১৯৫১ সালের আইন মোতাবেকই চলছে। এই আইন মোতাবেক নাগরিকত্ব বর্জনের একটি ফরম রয়েছে। যিনি বর্জন করতে চান তাকে ঐ ফরমটি পূরণ করতে হয়। আলোচ্য ক্ষেত্রে তারেক রহমান এরকম কোনো ফরম পূরণ করেননি। ব্রিটেন কিন্তু জার্মানি বা সিঙ্গাপুর নয় যেখানে নাগরিকত্ব পেতে গেলে দেশের পাসপোর্ট সারেন্ডার করতে হয়। কিন্তু ইংল্যান্ড বা আমেরিকার নিয়ম আলাদা। এসব দেশে যে ব্যক্তির পিতা মাতা বাংলাদেশী, অর্থাৎ জন্ম সূত্রে যে ব্যক্তি বাংলাদেশী সেই ব্যক্তি নাগরিকত্ব পাওয়ার পর তার স্বদেশি অর্থাৎ বাংলদেশী পাসপোর্ট ফেরত পান। এমনকি বাংলাদেশে যারা দ্বৈত নাগরিক, অর্থাৎ যারা বৃটেন এবং বাংলাদেশ উভয় দেশেরই নাগরিক তাদেরকে ব্রিটিশ বা বাংলাদেশী কোনো পাসপোর্টই সারেন্ডার করতে হয় না।
 বেগম জিয়া কারাগারে। তার অনুপস্থিতিতে তার পুত্র তারেক রহমান অস্থায়ীভাবে বিএনপি চেয়ারপার্সনের দায়িত্ব পালন করছেন। একজন পাগল ও উন্মাদও বোঝে যে বাংলাদেশের নাগরিক না থাকলে বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব করা তো দূরের কথা, একজন সাধারণ সদস্যও থাকা যায় না। আর তারেক রহমান এবং বিএনপির উচ্চ শিক্ষিত নেতৃবৃন্দ এই সহজ সরল সত্যটি বুঝবেন না যে, বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বিসর্জন দিলে তিনি বিএনপির সাধারণ সদস্যও থাকতে পারেন না। এই কান্ডজ্ঞানটুকু বিএনপির র‌্যাংক এ্যান্ড ফাইলের মধ্যে আছে।
তারেক রহমান বাংলাদেশের নাগরিক ছিলেন , তিনি বাংলাদেশের নাগরিক আছেন এবং ভবিষ্যতেও মৃত্যু পর্যন্ত বাংলাদেশের নাগরিক থাকবেন। তবে যদি তারা ইচ্ছা করেন তাহলে দ্বৈত নাগরিকত্ব বা ডুয়াল সিটিজেন শিপও রাখতে পারেন। যেমন রেখেছেন আওয়ামী লীগের জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এবং আরো অনেকে।
শিক্ষিত মানুষদের বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে, অভিবাসন ও নাগরিকত্ব সম্পর্কে মিনিমাম নলেজও আমাদের কিছু কিছু মন্ত্রী ও এমপি রাখেন না। স্বেচ্ছায় বিসর্জন না দিলে নাগরিকত্ব খারিজ হওয়ার একটি প্রক্রিয়া আছে। কোনো রাষ্ট্র যদি কারো নাগরিকত্ব খারিজ করে তাহলে সেটি হয় একটি শাস্তি। আর এই ধরনের শাস্তি দিতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দায়ের করতে হয় এবং একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সেই প্রক্রিয়ার সমাপ্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাগরিকত্ব বহালও থাকতে পারে অথবা খারিজও হতে পারে। তারেক রহমানের বেলায় এই ধরনের কোনো ঘটনাই ঘটেনি। তাহলে তার নাগরিকত্বের অবসানের কথা ওঠে কেন?
আওয়ামী লীগ যত চেষ্টাই করুক বেগম জিয়া এবং তারেক রহমানকে মাইনাস টু ফর্মুলা করে বাংলাদেশের রাজনীতির অঙ্গন থেকে বহিষ্কার করা সম্ভব হবে না। কারণ, আইন সেই সুযোগ কাউকে দেবে না।
Email: asifarsalan15@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ