ঢাকা, শুক্রবার 21 September 2018, ৬ আশ্বিন ১৪২৫, ১০ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

মাদ্রাসার পাঠ্যবইয়ে পরিবর্তন আসছে

সংগ্রাম অনলাইন ডেস্ক: বাংলাদেশে মাদ্রাসার কোরান ও হাদিস শিক্ষাসহ ধর্মীয় ৩২টি পাঠ্যবইয়ে পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগ বলছে, পাঠ্য বইগুলোতে কোরানের যেসব আয়াত- প্রেক্ষাপট ছাড়াই ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলোতে পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

একই সাথে কোন হাদিস বা কোরানের কোন আয়াত থেকে যাতে ভুল বার্তা না যায় সেবিষয়েও লক্ষ্য রাখা হয়েছে।

কিন্তু কওমী মাদ্রাসা বোর্ড বলছে, যারা এই পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা ইসলামের মূল আদর্শকে বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন।

বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই বিভাগটি বলছে, বর্তমানে মাদ্রাসার পাঠ্যবইয়ে যেসব বিষয় আছে তার কিছু কিছু জিনিস পরিবর্তন করা দরকার।

এই বিভাগের সচিব মো. আলমগীর হোসেন বলছিলেন, তাদের পর্যবেক্ষণে তিন ধরনের পরিবর্তন দরকার বলে তারা মনে করছেন।

এসবের মধ্যে রয়েছে কোরানের ও হাদিসের অনুবাদের মধ্যে কিছু পরিবর্তন করা।

মি. হোসেন বলেন, কোন ধরনের প্রেক্ষাপট বা পটভূমি ছাড়াই এসব আয়াত খাপছাড়াভাবে বইতে সন্নিবেশ করা হয়েছে যাতে করে ইসলাম সম্পর্কে ভুল বার্তা শিক্ষার্থীদের মধ্যে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি বলেন, "এখানে বলা আছে যুদ্ধ ক্ষেত্রে শত্রুকে আক্রমণ করা। সেটা শত্রু যখন আক্রমণ করবে তখন আমিও তাকে আক্রমণ করবো। কিন্তু সেই প্রেক্ষাপট না বলে যদি আমি বলি যে বিজাতীয়দের হত্যা করো, তাহলে অবশ্যই বুঝতে হবে সেটা অসৎ উদ্দেশ্য থেকে বলা হচ্ছে। কোরানে কোথাও বিজাতীয়দের হত্যার কথা বলা হয়নি, বরং বলা আছে যেকোন মানুষকে অন্যায় ভাবে হত্যা করা মহাপাপ।"

শিক্ষার্থীদের কাছে যাতে ভুল বার্তা না যায় সেজন্যে এই সিদ্ধান্ত- বলছে কর্তৃপক্ষ।

এছাড়াও কোরানের যেসব আয়াতে দাম্পত্য জীবন সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে সেসব এত ছোট ক্লাসের বইতে না থাকাটাও সমীচীন বলে মনে করছেন তারা। একই সাথে অন্য ধর্মের মানুষের সাথে সুসম্পর্ক রাখা, এবং কোরান পাঠে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অনুবাদ এবং সেটা চলিত ভাষায় রাখার কথা বলা হয়েছে।

মি. হোসেন বলেন, "স্বামী স্ত্রীর সাথে কি ধরণের সম্পর্কে হবে বা হবে না সেটা কুরআনের আয়াতে যা আছে, সেটাতো ক্লাস সিক্স বা সেভেনের বাচ্চার পড়ার দরকার নেই। যখন তারা বড় হবে তখন এমনিতেই তারা পড়বে।"

বাংলাদেশে মুসলমানদের জন্য পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ কোরানের বাংলা অনুবাদ করছেন বিভিন্ন লেখক এবং প্রকাশক। বাংলাদেশের ইসলামিক ফাউন্ডেশন ইতিমধ্যে বিভিন্ন লেখক ও প্রকাশকের লিখিত কোরান শরিফের ৮০টি বাংলা অনুবাদের বইয়ের কপি সংগ্রহ করে সেগুলো আলেম-ওলামাদের পর্যালোচনা করার দায়িত্ব দিয়েছে।

এদিকে, মাদ্রাসার এই পাঠ্যবই পরিবর্তনের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেই কমিটির নেতৃত্ব দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউসুফ।

তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম এই পরিবর্তনটা আসলে কতটা জরুরি ছিল?

অধ্যাপক ইউসুফ বলেন, "আমরা মনে করছি একটা বই যারা লেখে সেখানে টুকটাক ভুল থাকতেই পারে। যাচাই-বাছাই করে যদি দেখা যায় কোথাও ভুল-ভ্রান্তি আছে এবং আমরা মনে করি এই ক্লাসের বাচ্চাদের জন্য এটা থাকা উচিত না- সেটা আমরা সংশোধন করে দিয়েছি এবং সেটা হওয়ার দাবি রাখে।"

কর্তৃপক্ষ বলছে, অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের এখনই অনেক কিছু পড়ার দরকার নেই।

মাদ্রাসার পাঠ্যবই পরিবর্তন নতুন নয়। এর আগে ২০১৩ এবং ২০১৪ সালেও পরিবর্তন করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ এবং প্রতিকার কমিটির সভায় এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়াতে ২০১৬ সালে বিভিন্ন দফায় পরিবর্তন করা হয় পাঠ্য বই এর বিষয়বস্তু।

এবারের পরিবর্তনের বিষয়ে গত বৃহস্পতিবার ২৬শে এপ্রিল মাদ্রাসার পাঠ্যবই সংক্রান্ত জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) এক বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত হয়েছে।

পাঠ্যবইয়ের এই পরিবর্তনের ব্যাপারে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন ইসলামি ঐক্য জোটের মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ। তিনি একই সাথে কওমী মাদ্রাসা বোর্ডেরও সহ সভাপতি।

তিনি বলেন, "কুরআনুল কারিম এবং হাদিসের মধ্যে কোথাও মানুষকে সন্ত্রাসবাদ,জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করে এমন কোন আয়াত বা হাদিস নেই। আমি মনে করে উনারা এই জায়গাটা খুব ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। এবং এটার সঠিক উপলব্ধি তারা করতে পারেননি। ইসলামের মর্মবাণী তারা বুঝতেই পারেননি। যার ফলে তাদের কাছে মনে হয়েছে মানুষকে কুরআনের এই আয়াতটি সন্ত্রাসবাদের দিকে উদ্বুদ্ধ করে।"

কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগ বলছে, পরিবর্তিত পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেয়া হবে আগামী বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালের শুরুতে।

তবে ২০২০ সালে যুগের চাহিদার সাথে মিল রেখে আরেক-দফা পরিবর্তন করা হবে বলেও কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

-বিবিসি বাংলা

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ