ঢাকা, সোমবার 30 April 2018, ১৭ বৈশাখ ১৪২৫, ১৩ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দক্ষিণ এশিয়ায় মেরুকরণে নেপথ্যে

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা : ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মাধ্যমে স্নায়ুযুদ্ধের  অবসান এবং  পরাশক্তির এক নক্ষত্রের কক্ষচ্যুতিতে  বিশ্বশক্তি এক কেন্দ্রে কেন্দ্রীভূত হয়। দৃশ্যপটে মহাপরাক্রমশালী রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। খুব সঙ্গত কারণেই তারা মনে করেছিল যে, তাদের চ্যালেঞ্জ করার মত আর কোন বৃহতশক্তি বিশ্বে আর অবশিষ্ট নেই। সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের আত্মবিশ্বাসে ফাটল সৃষ্টি হয়েছিল। কারণ, তারা ধরেই নিয়েছিল যে সোভিয়েত ইউনিয়নের লেজে-গোবরে অবস্থার পর তাদের পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো হয়তো কোন ভাবেই সম্ভব নয়। আর এর একটা বড় প্রভাব পড়েছিল বিশ্ব বৈশ্বিক রাজনীতির পরিক্রমার ওপর। কিন্তু সে অবস্থা খুব বেশি দিন স্থায়ি হয়নি। খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ধবংসস্তুপে দাঁড়িয়েও আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ে প্রত্যয়ী হয়ে উঠেছে রাশিয়া। ফলে বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিন আধিপত্য আবারও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। এককথায় পশ্চিমী শক্তি এখন অনেকটাই ক্ষয়িষ্ণু।
মূলত সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনীতিতে একটা মেরুকরণও পরিলক্ষিত হয়। স্নায়ুযুদ্ধকালীন সময়ে ক্ষমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সোভিয়েত ইউনিয়নকে মোকাবেলা করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানকেই তাদের মিত্র হিসেবে বিবেচনা করতো। কারণ, পাকিস্তানের জন্মশত্রু ও চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী  প্রতিবেশী ভারতের অবস্থান ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের অনুকুলে। তাই দক্ষিণ এশীয় রাজনীতিতে শক্তির একটা ভারসাম্য রক্ষার জন্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টি ছিল পাকিস্তানের দিকে। খুব সঙ্গত কারণেই সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ভারতের গাঁটছাড়াটা বেশে উপভোগ্যই হয়েছিল। কিন্তু স্নায়ুযুদ্ধোত্তর সময়ে সে অবস্থা আর অবশিষ্ট থাকেনি বরং বৈশ্বিক রাজনীতিতে টিকে থাকতে এবং আঞ্চলিক প্রভাব-প্রতিপত্তি বিস্তার এবং আত্মরক্ষার স্বার্থেই নতুন মেরুকরণ শুরু হয়। কিন্তু এই মেরুকরণ এক বৃত্তেই আবর্তিত হয়নি বরং তা সময় সময়ই পক্ষ পরিবর্তন করেছে। আর এর নেপথ্যের খেলাটাও বেশ চমকপ্রদ।
বিশেষ করে একবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভিক সময় থেকেই বিশ্বপরিস্থিতি সহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা ক্রমেই কমে এসেছে। পাকিস্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র্রের যুদ্ধাস্ত্রের সর্ববৃহৎ বাজার বলে মনে করা হলেও এক সময় সেই মধুচন্দ্রিমায় ভাটির টান লক্ষ্য করা যায়। ফলে অস্ত্রের মূল্য পরিশোধের পরও তা সরবরাহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনিহা উভয় দেশের মধ্যে সম্পর্কের পুনঃবিন্যাস জরুরি হয়ে পড়ে। কারণ, বৈশ্বিক রাজনীতির নতুন মেরুকরণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর পাকিস্তানকে সাথে রাখা আর জরুরি মনে করেনি বরং  রাশিয়া সহ দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান শক্তি গণচীনের উত্থান ঠেকানোর জন্যই ভারতকেই তারা বন্ধু হিসেবে বেছে নিয়েছে। 
সাম্প্রতি  রাশিয়ার কাছ থেকে পাকিস্তানের অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রবিরোধী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও জঙ্গিবিমান কেনার সিদ্ধান্ত থেকেই স্পষ্টভাবে বোঝা যায় দক্ষিণ এশিয়ায় আন্তর্জাতিক রাজনীতির মেরুকরণ কতটা পাল্টে গেছে। ভারত ও পাকিস্তানের বিগত দিনের পরীক্ষিত বন্ধুদের সঙ্গে থাকা উষ্ণ সম্পর্ক এখন শীতল হয়ে গেছে। অন্যদিকে নিজেদের মধ্যে থাকা সম্পর্ক বাদে প্রতিবেশী অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক লক্ষণীয়ভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, যার পেছনে রয়েছে এ অঞ্চলে পূর্ব বনাম পশ্চিম দ্বন্দ্বের কারণে দেখা দেওয়া নতুন শঙ্কা। যা আগামী দিনের বিশ্ব পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও সমস্যাসঙ্কুল করে তুলবে বলেই মনে হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয় তা এখন নিশ্চিত করে বলা বেশ কষ্টসাধ্যই। কারণ, অতীত পর্যালোচনায় উপমহাদেশীয় রাজনীতিতে মেরুকরণে ইঁদুর-বিড়াল খেলাটা বেশ স্পষ্ট।
একথা ঠিক যে, বিগত সময়ের তুলনায় বর্তমানে পাকিস্তান ও রাশিয়ার সম্পর্ক সবচেয়ে মধুর। তার কারণ ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক একই রকম নাটকীয় পরিবর্তন। যুক্তরাষ্ট্র এখন দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতকেই তার ‘কৌশলগত অংশীদার’ মনে করে, যা ১৯৭০-৭১ সালে কল্পনা করা অসম্ভব ছিল। ওই সময় বাংলাদেশ স্বাধীনতার জন্য পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল এবং যুক্তরাষ্ট্র সেই প্রেক্ষিতে বঙ্গোপসাগরে তার সপ্তম নৌবহর পাঠিয়েছিল পাকিস্তানের অখন্ডতা রক্ষার জন্য। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সে সহযোগিতা পাকিস্তানের কোন কাজে আসেনি বরং এক অনিবার্য পরিণতিতেই বিশ^ মানচিত্রে বাংলাদেশ নামের এক শিশু রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটেছিল।
খুব সঙ্গত কারণেই পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ভারতের পূর্বেকার নিরপেক্ষ থাকার পররাষ্ট্রনীতি পাকিস্তানের তুলনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আগামীতেও হবে বলেই মনে করা হচ্ছে। বর্তমানে দুই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই তাদের নিজ নিজ দেশের নতুন পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে সমালোচনায় সরব রয়েছে। দুই দেশের কোনও দেশেই এই পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িত নীতিনির্ধারকরা এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে জনগণের মতামত জানার চেষ্টা করেননি। অথচ তারা দাবি করেন, দেশগুলোতে গণতন্ত্র কার্যকর রয়েছে। কিন্তু বৈশি^ক রাজনীতি সহ আঞ্চলিক রাজনীতি উভয় ক্ষেত্রেই জনমতের বিষয়টি চরমভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। ফলে দুরত্ব বেড়েছে শাসকশ্রেণির সাথে সাধারণ মানুষের।
একথা অস্বীকার করা যাবে না যে, মার্কিন-ভারত জোটের প্রভাব মোকাবেলা করে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় পাকিস্তান গণচীনের সাথে একটা গাঁটছাড়া বেধেছে। অবশ্য রূঢ় বাস্তবতার প্রেক্ষাপটেই ভারতের অনৈতিক প্রভাব থাকার জন্য ক্ষুদ্র ও শক্তিহীন প্রতিবেশীগুলো চীনের দিকেই নিজেদের মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে। বিশেষ করে নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপের ঘটনা প্রবাহ সেদিকেই অঙ্গলী নির্দেশ করে। সম্প্রতি নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে পাকিস্তান রাশিয়ান প্রযুক্তিতে  নির্মিত অত্যাধুনিক ট্যাংক কেনার কথা ভাবছে। এর আগে দেশটি রাশিয়ার কাছ থেকে চারটি যুদ্ধ হেলিকপ্টার ও পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে থাকা জেএফ-৭ যুদ্ধবিমানের জন্য নতুন ইঞ্জিন কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ওই দুই দেশ যৌথ সামরিক মহড়াও করেছে, যা ভারতের জন্য মাথা ব্যথার কারণও হয়েছে। তাছাড়া পাকিস্তানের ভেতর দিয়ে দীর্ঘ পাইপলাইন যাওয়ার প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত থাকা একটি ১ হাজার কোটি ডলারের জ্বালানি চুক্তিও চূড়ান্ত হওয়ার পথে। যা উভয় দেশের মধ্যে নিবির ঘনিষ্ঠতার কথায় প্রমাণ করে।
অবশ্য পাক-রাশিয়া সম্পর্ক নিকট অতীতে এমন ছিল না বরং এর বিপরীত অবস্থায় লক্ষ্য করা গেছে। একথা স্মরণ করা দরকার যে, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর গর্ব করে দেওয়া ভাষণের কথা। প্রবল হর্ষধ্বনি দিতে থাকা আমেরিকান দর্শক শ্রোতাদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘আপনাদের যুক্তরাষ্ট্র ও আমাদের পাকিস্তান কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করে সোভিয়েত ইউনিয়নকে পরাজিত করেছে। স্বাধীন জাতি হিসেবে টিকে থাকার তাদের ইচ্ছাকেই আমরা যৌথভাবে নষ্ট করে দিয়েছি!’ আফগান যুদ্ধ পরবর্তী ওই সময়টাতে রুশ বাহিনী একদিকে দিকভ্রান্ত হয়ে পিছু হটছিল, অন্যদিকে চেচেনিয়া রাশিয়া ভেঙে চলে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছিল। এমন কি খোদ মস্কোতে অনেক বিস্ফোরণ ও সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছিল। যা এখন শুধুই অতীত।
অবশ্য রাশিয়ার নতুন মিত্র হয়ে ওঠার ফলশ্রুতিতে পাকিস্তান উপকৃত হয়েছে অনেক বেশি। এই নতুন সম্পর্কের কারণে পাকিস্তান সামরিক শক্তির প্রতিযোগিতায় প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সমান্তরালে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। পাকিস্তান একই সঙ্গে ন্যাটোবিরোধী এসসিও-এর (সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন) দলে যোগ দিতে পেরেছে এবং ইরানের সঙ্গে একযোগে কাজ করে যাচ্ছে। চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ থাকাটাও পাকিস্তানের জন্য বাড়তি রাজনৈতিক সুবিধা এনে দিয়েছে। যা শুধু চিরবৈরি রাষ্ট্র ভারতেকে নয় বরং বিশ^ পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেকেও রীতিমত চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ও অন্যান্য সহায়তা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিকে বিদ্রূপ করে পাকিস্তানি জেনারেলরা ওয়াশিংটনকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, বিশ্বস্ত মিত্র হিসেবে চীন তাদের পক্ষে থাকবে। পাক জেনারেলদের এমন বক্তব্যকে কেউ কেউ উস্কানী এবং কুটনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত বলেই মনে করছেন। কিন্তু ভারতের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে সখ্যতা গড়ে ওঠেছে তাতে পাকিস্তানের পক্ষে অন্যথা ভাবার সুযোগ ছিল না। প্রসঙ্গত সিরিয়া ও ইউক্রেনের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করে তারা বলেছিলেন, ক্ষমতার বিচারে পশ্চিম আসলে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে চীন ও রাশিয়ার বলয় এখন বেশি শক্তিশালী। কুটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ‘পাকিস্তান যে পশ্চিমা বিশ্বকে চটাতে আর ভয় পায় না এবং তাদের সেনা কর্মকর্তারা যে তা প্রকাশে পিছপা হতে চায় না, এটিই তার প্রথম স্পষ্ট ইঙ্গিত’। যা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরও উপভোগ্য করে তুলেছে।
মূূলত ক্রমেই প্রভাবশালী হতে থাকা চীনের বিরুদ্ধে পাল্টা শক্তি হিসেবে ভারতকে গড়ে তোলা অত্যাবশ্যক বলে মনে করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।  এমন এক অনাকাঙ্খিত বাস্তবতায় মার্কিন-ভারত সখ্যতা এখন সময়ের পরীক্ষায় প্রায় উত্তীর্ণ বলেই বলা চলে। উল্লেখ করা দরকার যে, ডানপন্থী দল ভারতীয় জনতা পার্টি দেশটির ক্ষমতায় এলে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বাড়তে থাকে। ২০০৫ সালে দ্বিপাক্ষিক পরমাণু সমঝোতা স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকে ভারতের সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীগুলোর সঙ্গে যৌথ মহড়ায় অংশ নিয়েছে। ২০০৫ সালের পর কয়েক বছরের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ১০ হাজার কোটি ডলার থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার কোটি ডলারে উন্নীত করার বিষয়ে দুপক্ষই একমত হয়েছিল। সি-১৩০, সি-১৭ ও পি-৮০ বিমান ক্রয়ের প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত থাকা ১ হাজার কোটি ডলারের প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়েও সমঝোতা হয়েছিল। তাছাড়াও, চীন যাতে ভারত মহাসাগর অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে সেজন্য যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে কাজ করার বিষয়ে একমত হয়েছিল এবং সে ধারাবাহিকতা এখনও অব্যাহত আছে।
আর মার্কিন-ভারত সখ্যতায়  স্পস্ট যে,  চীনকে এই শক্তিশালী বার্তা দেওয়া যে শুধু তারই সামরিক শক্তি আছে তা নয়। এসসিওতে ভারতের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এবং ব্রিকসে দেশটির সদস্যপদ থাকলেও ভেতরে ভেতরে ঘটতে থাকা ঘটনাপ্রবাহ চীন-ভারত সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। গোলাবারুদের যুদ্ধ ১৯৬২ সালে থেমে গেলেও কিছু দিন পর পর সীমান্তে উত্তেজনাও দেখা দেয়। একথা মানতেই হবে যে, যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে পড়ার নতুন মেরুকরণ বিজেপির ২০১৪ সালে ক্ষমতায় যাওয়ার পর থেকে শুরু হয়নি বরং ভারতে এ প্রক্রিয়া কংগ্রেস শাসনামলে মনমোহন সিং ভারতের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে সূচিত হয়েছিল। একজন সাবেক কূটনীতিক বলেছেন, ‘ভারতের বেছে নেওয়া মতো অন্য কোনও সুযোগও খুব একটা ছিল না। কারণ, গণচীনের প্রভাব-প্রতিপত্তি মোকাবেলায় তাদের পক্ষে বিকল্প কোন পথই ছিল না।
আসলে ৯০-এর দশক ও তার পরের দশকে আমাদের ঐতিহ্যবাহী পুরনো মিত্র রাশিয়ার অবস্থা খুব দুর্বল বলে প্রতীয়মান হচ্ছিল। আর যুক্তরাষ্ট্র ক্রমেই এক মেরুকেন্দ্রিক বিশ্বের নেতৃত্ব নেওয়ার দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। পাকিস্তানকে নিয়মিত অস্ত্র সরবরাহ করতে থাকা এবং নিজে ক্রমেই শক্তিশালী হতে থাকা চীনের পক্ষ থেকে ভারতের স্বার্থরক্ষার বিষয়ে অধিকতর উদার হওয়ার কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে স্বল্প সময়ের মধ্যে হামলার জন্য নিজেদের সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত রাখা চীনের আক্রমণের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে জোটবাঁধা ছাড়া ভারতের আর কোন বিকল্প ছিল না।
ভারতের বর্তমান বিদেশনীতির বামপন্থী সমালোচকরা অভিযোগ করেছেন, চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে সহায়তা করার নামে যুক্তরাষ্ট্র ঘনিষ্ঠ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্থাপনের ফলে অর্জিত সুবিধাগুলো ভোগ করে যাচ্ছে, বিশেষ করে আর্থিক দিক থেকে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ভারতের (সামান্য পুরাতন) অস্ত্র ক্রয়ের বিষয়টি নিষ্কণ্টক করার বদলে প্রেসিডেন্ট ওবামা ভারত সফরকালে নিশ্চিত করেছিলেন, দুর্বল প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টিংহাউসের কাছ থেকে ভারতকে যেন ৫ বছর ধরে যন্ত্রপাতি কিনতে হয়। একই ধারা বজায় রেখেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তিনি যতই সখ্যতা করুন না কেন, শেষ পর্যন্ত না তিনি ভারতীয় দক্ষ পেশাজীবীদের যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করতে ভূমিকা রেখেছেন, আর না কর্মক্ষেত্রে তাদের পদোন্নতি নিশ্চিতে ভূমিকা রেখেছেন।
বরং তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মোটরসাইকেল ও অন্যান্য কিছু পণ্যের ওপর থাকা ভারতীয় শুল্কের বিষয়ে সমালোচনা করেছেন, যদিও কয়েকটি পণ্যের ওপর থেকে ভারত ইতিমধ্যেই শুল্ক হ্রাস করেছে। উন্নত প্রযুক্তির আধুনিক অস্ত্র বিক্রির বিষয়ে ভারতের সঙ্গে কোনও আলোচনা করে না দেশটি, যেখানে জাপান ও ইসরায়েল বিনা ক্লেশে এফ-৩৫ এর মতো যুদ্ধবিমান কিনতে পারে। বারবার অনুরোধ করার পরও ওবামা ও ট্রাম্পের কেউই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভারতের প্রবেশ সহজ করার অনুরোধে সাড়া দেননি। এমনকি উন্নত প্রযুক্তি হস্তান্তরের অনুরোধেও কোন সমর্থন দেননি। অপরদিকে, রাশিয়া ইতোমধ্যেই তার সর্বাধুনিক মিগ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছে ভারতের কাছে। বাংলাদেশও এতে আগ্রহ দেখিয়েছে।
মূলত দক্ষিণ এশীয় রাজনীতিতে একটা স্পষ্ট মেরুকরণ লক্ষ্য করা গেলেও এটিই শেষ কথা বলে মনে করার কোন কারণ নেই। কারণ, পূর্ব-পশ্চিমের স্থায়ী কোন শত্রুমিত্র আছে বলে মনে হয় না। কারণ, এসব ক্ষেত্রে তারা সবসময়ই জাতীয় স্বার্থকেই গুরুত্ব দিয়ে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন-ভারত সম্পর্কের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেলেও নেপথ্যে স্বার্থের দ্বন্দ্বটা বেশ জোরালো। ঠিক তেমনিভাবে রুশ-পাক সম্পর্কও স্থায়ী সম্পর্ক গড়ে উঠেছে এমনটা বলার কোন সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। তাই দক্ষিণ এশিয়ার মেরুকরণে ‘ঢাক ঢাক গুর গুর’ শোনা গেলে নেপথ্যের কথা তো ভিন্নতর হতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ