ঢাকা, সোমবার 30 April 2018, ১৭ বৈশাখ ১৪২৫, ১৩ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ভারতে তলানিতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা

‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম’ সংস্থা প্রতিবছরই বিভিন্ন দেশে স্বাধীন সাংবাদিকতার তালিকা প্রকাশ করে। দেখা যাচ্ছে, দু’বছর আগে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের স্থান ১৩৩ হলেও গত বছর সেটা এসে দাঁড়িয়েছে ১৩৬-তে। আর এ বছর তা আরও দু’ধাপ নেমেছে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ ভারত। এ দেশে আইনসভা, আমলাতন্ত্র এবং বিচারব্যবস্থার পর সংবাদমাধ্যমকে বলা হয়, ‘গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ’। সেই স্তম্ভ এখন নড়বড়ে। বলছে বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকের স্বাধীনতারক্ষা সংগঠন ডাব্লিউপিএফ। গত ২৫শে এপ্রিল এই আন্তর্জাতিক সংস্থাটি তাদের সমীক্ষার ফল প্রকাশ করেছে। রিপোর্ট বলছে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় একসঙ্গে আরও দু’ধাপ তলিয়ে গিয়েছে ভারত।
গত বছর পর্যন্ত স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের তালিকায় ভারতের স্থান ছিল ১৩৬ নম্বরে। এবার তা ১৩৮ নম্বরে গিয়ে ঠেকেছে। ভয় দেখানো, হুমকি দেওয়া, দাম দিয়ে কেনার চেষ্টা ছাড়াও সাংবাদিকদের প্রাণনাশের ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে রিপোর্টে। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স বা আরএসএফ-এর এই বার্ষিক রিপোর্টে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশের খুন হওয়ার ঘটনা।
তালিকার সবচেয়ে নীচে স্থান পেয়েছে উত্তর কোরিয়া। তার ঠিক ওপরেই রয়েছে এরিট্রিয়া, তুর্কমেনিস্তান, সিরিয়া এবং চীন। তবে গত বছরের মতো এবারও চীন নিজেদের অপরিবর্তিত রেখেছে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে শীর্ষস্থান পেয়েছে নরওয়ে। এই নিয়ে টানা দু’বছর শীর্ষস্থানে তারা।
আরও উল্লেখযোগ্যভাবে সংস্থাটির সমীক্ষা রিপোর্টে সংবাদমাধ্যমের এই অধঃপতনের জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘উগ্র হিন্দুত্ব’ এবং ‘উগ্র জাতীয়তাবাদ’-কে দায়ী করা হয়েছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক নজরদারি সংস্থাটি তাদের সমীক্ষায় এবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দিকেও আঙুল তুলেছে।
বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে ভারতে মহিলা সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশসহ মোট তিন জন খুন হয়েছেন। বহু ক্ষেত্রে আইনের অপপ্রয়োগ করা হচ্ছে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে। ভারতীয় দ-বিধির ১২৪-এ ধারায় মিত্যা মামলা দেওয়া হচ্ছে। বলা হয়েছে, ভারতীয় জনতা পার্টির তথ্য-প্রযুক্তি বিভাগের কর্মীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিনিয়ত সাংবাদিকদের অনুসরণ করেন। সেইসঙ্গে গালমন্দ করেন। অপমানজনক পোস্ট করেন। এমনকি সাংবাদিকদের প্রকাশ্যে খুনের হুমকিও দেন। সংবাদপত্রে সরকার বা প্রধানমনত্রীর সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেই সুকৌশলে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে ‘দেশদ্রোহী’ বা ‘জাতীয়তাবাদ-বিরোধী’ তকমা সেঁটে দেওয়ার কাজ করে থাকেন শাসকদলের তথ্য-প্রযুক্তি বিভাগের কর্মীরাই।
ভারতের লোকসভার প্রাক্তন স্পিকার সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় মনে করছেন, এই সমীক্ষা রিপোর্ট দেশের গণতন্ত্রের কাছে বড়সড় ধাক্কা, ভারতাবাসীদের কাছেও লজ্জার। তাঁর কথায়, “এর জন্য বিভাজনের রাজনীতি অনংকাংশে দায়ী। বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করতে সংবাদমাধ্যমকে কাজে লাগানোর প্রচেষ্টায় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে ফেলছেন রাজনীতিকরা। বিশেষ করে শাসক দলগুলি (কেন্দ্রে ও রাজ্যে) সংবাদমাধ্যমের মালিকদের নানাভাবে কিনে নেওয়া অথবা বশ করে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।”
দীর্ঘ কয়েক দশকের সাংবাদাকিতার অভিজ্ঞতা থেকে পুরো বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করলেন আনন্দবাজার পত্রিকার রেসিডেন্ট এডিটর জয়ন্ত ঘোষাল। ডাব্লিউপিএফ-এর এই সমীক্ষা রিপোর্ট নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন।
জানালেন, “ভারতের রাজনীতির ইতিহাসে বরাবর উদারতা ও বহুত্ববাদের ঐতিহ্য ছিল। কিন্তু নানা সময় শাসক দল সংবাদমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ পেতে চেয়ে তাদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেছে। আজ থেকে চার বছর আগে দেশে ভারতীয় জনতা পার্টি ২৮২টি আসন নিয়ে ক্ষমতায় আসে। সেটা নরেন্দ্র মোদীর কৃতিত্ব। সেই জন্যই তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু তারপর থেকেই সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ করার চেষ্টা চালাতে থাকে। বিভিন্ন রাজ্যে সংবাদমাধ্যমের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে সাংবাদিকরা আক্রান্ত হচ্ছেন।”
বিষয়টিকে তিনি রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবেই দেখছেন। তিনি আরও বলেন, “এই সমস্যা মোটেও আর্থ-সামাজিক নয়। বেশিরভাগটাই রাজনৈতিক সমস্যা। সাংবাদিক ও অসাংবাদিকদের একত্রিত হওয়া উচিত। সেইসঙ্গে মালিকপক্ষ ও সংবাদকর্মীদের মধ্যে খাদ্য-খাদকের সম্পর্কে পরিণত হওয়া উচিত নয়। শাসক দল যদি মালিকদের নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তাহলে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হতে হয় সাংবাদিকদের। তবে যত বড় সমস্যাই হোক আলোচনা করেই তার সমাধান করতে হবে। এখানে অন্য কোনো পথ নেই। প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর সময় চেয়ে আলোচনায় বসতে হবে।”
গত সেপ্টেম্বরে একটি সংবাদপত্রের এডিটর গৌরী লঙ্কেশ গুলি করে খুন করা হয়েছে তাঁ বাড়ির সামনেই। কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের সমালোচনা করার পর থেকেই তাঁরে খুনের হুমকি দেওয়া হচ্ছিল।
একইভাবে কৃষক দুর্দশা, গোরক্ষক বাহিনী, নিছক জাত-পাত ও নারী সুরক্ষার মতো বিষয়গুলিতে সরকারের সমালোচনা করলেই ধেয়ে আসছে হুমকি। অনেকেই ভয় পেয়ে সিঁটিয়ে যাচ্ছেন। আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হচ্ছেন। আর যাঁরা ভয় না পেয়ে নিজেদের কাজ করে চলেছেন, তাঁরা হয় খুন হচ্ছেন, নয়ত শারীরিকভাবে নিগ্রহের শিকার হচ্ছেন।
নতুন দিল্লির প্রেসক্লাব অফ ইন্ডিয়া’র প্রেসিডেন্ট গৌতম লাহিড়ি বলেন, “আন্তর্জাতিক সংস্থার সমীক্ষায় ভারতের স্থান আরও দু’ধাপ নেমে যাওয়ায় বিশ্বের দরবারে ভারতের ভাবমূর্তিকে ম্লান করবে। নিঃসন্দেহে বিষয়টা শোচনীয়। সম্প্রতি সরকার-স্বীকৃত সাংবাদিকদের স্বীকৃতি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি। দেশের তো বটেই সেইসঙ্গে আন্তর্জাতিক স্তরে নিন্দিত হওয়ার পরে তিনি পিছু হটেছেন। তবে সূচকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের স্থান নেমে যাওয়ার পেছনে সংবাদমাধ্যমের নিজের ভূমিকাও রয়েছে।
মিডিয়া-হাউসগুলি সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করছে। কেউ কেউ প্ররোচনার ফাঁদে পড়ে ভুয়ো সংবাদ পরিবেশন করছেন। এগুলো বন্ধ না হলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা অক্ষুণœ রাখা অসম্ভব।” ভিডব্লিউ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ