ঢাকা,মঙ্গলবার 1 May 2018, ১৮ বৈশাখ ১৪২৫, ১৪ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দেশ কি চতুর্থ সংশোধনীর পুরাতন পথেই অগ্রসর হচ্ছে

পাঠকদের অনেকে জানতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচন কি আসলেই অনুষ্ঠিত হবে, না বিরোধী দলের সাথে ক্ষমতাসীন দলের যুদ্ধ হবে। এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া খুবই কঠিন। তবে ক্ষমতাসীন দলের হাবভাব, চালচলন, নির্বাচনী প্রস্তুতি, বিরোধী দলের প্রতি ট্রিটমেন্ট প্রভৃতি বিশ্লেষণ করলে নির্বাচন নিয়ে আশঙ্কার সৃষ্টি না হয়ে পারে না। ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসের মধ্যেই বর্তমান সংসদ ও সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবার কথা। ডিসেম্বরে যদি নির্বাচন না হয় অথবা বড় জোর জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে, তাহলে বিরাট যে সাংগঠনিক শূন্যতার সৃষ্টি হবে তা কিভাবে পূরণ করা হবে তা নিয়েও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে চিন্তাভাবনায় পড়ে গেছেন। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য অংগ। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বাংলাদেশের সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবার কথা ছিল। কিন্তু বিরোধী দলসমূহের বর্জন ও সরকারি দলের অগণতান্ত্রিক একগুয়েমী ও জুলুম নির্যাতনের ফলে উক্ত নির্বাচন হয়নি। সংখ্যাগরিষ্ঠ ১৫৪টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বিনা ভোটে ক্ষমতাসীন দলের এমপি প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছেন। অবশিষ্ট ১৪৬টি আসনে নির্বাচনের নামে প্রহসন হয়েছে এবং এতে সরকার অনুমোদিত দলসমূহের প্রার্থীরাই নির্বাচিত হয়ে এসেছেন যাতে ভোটার টান আউট ছিল আড়াই শতাংশ থেকে সাড়ে চার শতাংশ। অস্ত্রের বলে ক্ষমতায় গিয়ে সরকার অবশ্য এরশাদের জাতীয় পার্টিকে বিরোধী দল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার পাশাপাশি ঐ দলের তিনজন প্রতিনিধিকে মন্ত্রী বানিয়েছেন এবং দলীয় প্রধান এরশাদকে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপদেষ্টা পদে নিয়োগ দিয়েছেন। এই অবস্থায় বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে অভিধাপ্রাপ্ত রওশন এরশাদের ভাষায় তারা না বিরোধী দল না সরকারি দল হিসেবে পরিচয় দিতে পারছেন। তাদের পরিচয় সংকট দেখা দিয়েছে। স্বৈরতান্ত্রিক কায়দায় আওয়ামী লীগ জুলুম, নির্যাতন, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস-হামলা মামলা দিয়ে বিনা ঝামেলায়, বলতে গেলে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে প্রায় পাঁচ বছর কাটিয়ে দিয়েছেন। এখন আগামী পাঁচ বছর মেয়াদে ক্ষমতায় যাবার জন্য তারা দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছেন বলে মনে হয়। নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে দলটি নির্বাচন বিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত হয়ে পড়েছেন বলে মনে হয়।
দলটির একজন শীর্ষ নেতা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ সম্প্রতি মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের বার্ষিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা যত দিন জীবিত থাকবেন তত দিন সরকার প্রধান হিসেবে ক্ষমতায় থাকবেন। তিনি আরো বলেছেন, বাংলাদেশের কোন অপশক্তির ক্ষমতা নেই শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করে ক্ষমতা দখল করার। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নাগরিকত্ব নিয়েও তিনি কথা বলেছেন, তিনি বলেছেন, তারেক পাকিস্তানের করাচীতে জন্মেছেন এবং এ হিসেবে তিনি পাকিস্তানের নাগরিক, বাংলাদেশের নয়। এর আগে একজন মন্ত্রী বলেছেন যে, তারেক লন্ডন হাইকমিশনে তার পাসপোর্ট জমা দিয়ে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বর্জন করেছেন। জনাব হানিফ জনাব তারেককে জন্মসূত্রে পাকিস্তানী নাগরিক বানিয়ে ছেড়েছেন। নির্বাচনের বছরে এসে বাংলাদেশে কি হচ্ছে এখন বোঝা মুস্কিল। বিএনপি আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী একটি রাজনৈতিক দল। এই দলকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা না করে দলের নেতৃবৃন্দকে নোংরামীর মাধ্যমে যেভাবে ঘায়েল করার চেষ্টা করা হচ্ছে তা সাধারণ মানুষ ভাল চোখে দেখছেন না। প্রথমত  শেখ হাসিনাকে আজীবন প্রধানমন্ত্রী রাখার বাসনা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, জনগণের ক্ষমতা ও ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতায় আনা নেয়ার সার্বজনীন রীতি-নীতির সাথে সামঞ্জস্যশীল নয়। এতে স্বৈরাচারের গন্ধ আছে যদিও জার্মানির একটি গভেষণা ও বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান আগেভাগেই বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারকে বিশ্বের অন্যতম স্বৈরাচারী সরকার বলে অভিহিত করেছেন, ক্ষমাতর মালিক জনগণ সংবিধানের এই প্রতীতীর সাথেও কথাটি সাংঘর্ষিক। দ্বিতীয়ত তারেক রহমানের জন্ম কাহিনী নিয়ে স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর গল্প ফাঁদার মধ্যে কোনও প্রকার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা আছে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশী পিতা-মাতার ঘরে জন্মগ্রহণকারী কোনও সন্তান, বাংলাদেশের বাইরে যেখানেই জন্ম হোক না কেন, কখনো বাংলাদেশের নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত হয় না।
তারেকের জন্ম যদি পাকিস্তানের করাচীতে হয়ে থাকে তাতে তার জন্মসূত্রের নাগরিকত্বের উপর কোনও প্রভাব পড়ে না, তিনি জন্মসূত্রে বাংলাদেশী, মাইগ্রেশন সূত্রে নয়। ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ নামক ভূখ-টি পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল তথা পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিচিত ছিল। তারেকের পিতা সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা হিসেবে করাচীতে কর্মরত ছিলেন এবং আরো বহুলোক এরকম কর্মরত ছিলেন ও সেখানে পারিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করতেন। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে যেসব পূর্ব পাকিস্তানীর সন্তান-সন্ততির জন্ম হয়েছে তাদের কেউই স্বাধীনতার পর দেশে এসে নাগরিকত্ব হারাননি। তারেকের পিতা জেনারেল জিয়াউর রহমান স্বধীনতা আন্দোলনে অন্যতম মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে তিনি এখজন সেক্টর কমান্ডারও ছিলেন। অন্যান্য পরিচয় তো ছিলই। তার ছেলে তারেকের নাগরিকত্ব নিয়ে ৪৭ বছর পর এখন প্রশ্ন তোলা হচ্ছে কেন? তাও নির্বাচনের বছর? সরকার বেগম জিয়াকে বিতর্কিত বিচারিক প্রক্রিয়ায় জেলে পুরে নির্বাচন থেকে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন, অন্য দিকে তারেককেও মাইনাস করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন বলে মনে হয়। তাদের হিসাব অনুযায়ী বেগম জিয়া ও তারেক রহমানকে যদি সরিয়ে রাখা যায় তাহলে নির্বাচনে তাদের জয়লাভ নিশ্চিত হবে। জামায়াতকে তারা মাঠে নামতেই দিচ্ছেন না এবং দিবেন না। এই অবস্থায় সরকারের পথে আর বাধা কোথায়?
গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মাধ্যমে নিরপেক্ষ জরিপ চালিয়ে সরকার নিশ্চিত হয়েছে যে, নির্বাচন যদি অবাধ, নিরপেক্ষ এবং সামুদয়িক (inclusive) হয় তাহলে ক্ষমতায় আসা তাদের জন্য কঠিন হবে। এই অবস্থায় মূল প্রতিদ্বন্দ্বীদের নির্বাচনী মাঠ থেকে সরিয়ে দিয়ে ৫ জানুয়ারির অনুরূপ একটি নির্বাচনের মাধ্যমে তারা ক্ষমতায় যেতে চান। এতে নিশ্চিত হতে না পারলে প্রধানমন্ত্রীকে আজীবন প্রধানমন্ত্রী বানানোর জন্য সংবিধান সংশোধন, বর্তমান অনির্বাচিত সংসদের মেয়াদ বৃদ্ধি এমনকি সব দল বেআইনি ঘোষণা করে পুনরায় বাকশাল সৃষ্টির একটি উদ্যোগও তারা নিতে পারেন। এতে রাজনৈতিক মাঠে তাদের আর কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী থাকবে না। তারা চতুর্থ সংশোধনীর পুরাতন পথেই অগ্রসর হচ্ছেন বলে মনে হয়। বলাবাহুল্য, সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী মূল সংবিধানের শুধু আক্ষরিক পরিবর্তনই করেনি বরং এর প্রেরণা, মূল দর্শন এবং বৈশিষ্ট্যও বদলে দিয়েছিল। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার দ্বিতীয় সংশোধনীর ক্ষমতাবলে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেছিল। আবার জরুরি অবস্থা বলবৎ করার মাত্র ২৭ দিন পর ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংসদে কোনরকম বাকবিতর্ক বা আলোচনা ছাড়াই সংবিধানের ৪র্থ সংশোধনী অনুমোদন করেছে। এতে দেশে যে সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন এসেছে সেগুলো ছিল নিম্নরূপ:
(১) বিদ্যমান সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির সরকারে রূপান্তরিত হয়েছে।
(২) নির্বাচিত সংসদ সদস্য না হলেও যেকোনও ব্যক্তিকে মন্ত্রী নিয়োগের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতিকে অর্পণ করা হয়েছে।
(৩) এতে প্রধানমন্ত্রী রাতারাতি রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। এই সংশোধনী অনুযায়ী ধরে নিতে হয় যে, রাষ্ট্রপতি পদ গ্রহণ করার দিন থেকেই তিনি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন।
(৪) সংশোধনী অনুযায়ী ধরে নিতে হবে যে, সংসদে তখন যেসব সদস্য ছিলেন তারা সেদিনই জনগণের ভোটে সরাসরি নির্বাচিত হয়েছেন এবং তারা অতঃপর ৫ বছর মেয়াদে পদে থাকবেন।
(৫) রাষ্ট্রপতির পদে থাকার কোনও মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়নি। এই সংশোধনী বলে তিনি যতকাল ইচ্ছা ততকাল রাষ্ট্রপতি পদে বহাল থাকতে পারবেন।
(৬) সংশোধনীর আওতায় রাষ্ট্রপতিকে অভিশংয়িত করার ব্যবস্থা রাখা হলেও ঐ পদ্ধতিকে এতই কঠিন করা হয় যে, অভিশংষণ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
(৭) রাষ্ট্রপতিকে নিরঙ্কুশ ভেটো দেয়ার ক্ষমতা দেয়া হয়। অর্থাৎ সংসদে পাস করা কোনও বিলে যদি রাষ্ট্রপতি সম্মতি প্রদান না করেন তাহলে সে বিল কখনো আইনে পরিণত হবে না, আর সংসদ কখনো সে আইনটি পুনর্বিবেচনা করতে পারবে না।
(৮) মৌলিক অধিকার বলবৎ করার ব্যাপারে বিচার বিভাগের ক্ষমতা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। তার পরিবর্তে একটি সাংবিধানিক আদালত বা ট্রাইব্যুনাল গঠন করে মৌলিক অধিকারগুলো বলবৎ করার জন্য সংসদকে কর্তৃত্ব দেয়া হয়।
(৯) বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব করা হয়।
(১০) কেবলমাত্র রাষ্ট্রপতিই সুপ্রীম কোর্টের বিচারকদের নিয়োগ দেয়ার একক কর্তৃপক্ষ হয়ে উঠেন।
(১১) রাষ্ট্রপতি তার অভিপ্রায় অনুযায়ী সুপ্রীম কোর্টের বিচারকদের অপসারণের একক ক্ষমতাপ্রাপ্ত হন।
(১২) রাষ্ট্রপতি বিচার বিভাগের সকল কর্মকর্তা ও ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়োগ ও অপসারণের ক্ষমতার অধিকারী হন।
(১৩) বহুদলীয় রাজনীতির পরিবর্তে একদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়।
(১৪) সকল রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে দেয়া হয় এবং তার স্থলে একটিমাত্র রাজনৈতিক দল বাকশাল দেশে থাকবে বলে নির্ধারণ করা হয়।
(১৫) সরকারি কর্মচারীদের রাজনীতিকরণ করা হয় এবং তাদের বাকশালে যোগদান বাধ্যতামূলক করা হয়।
(১৬) এই সংশোধনীর বলে সদ্য গঠিত রাজনৈতিক দলের (বাকশাল) অনুমোদন ব্যতিরেকে কেউ রাষ্ট্রপতি বা সংসদ সদস্য হতে পারবেন না এবং নতুন দলে যোগ না দিলে বর্তমান সদস্যদের সদস্যপদ হারাতে হবে বলে নির্ধারণ করা হয়।
(১৭) সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্ব করা হয় এবং ৪টি দলীয় ও সরকারি পত্রিকা রেখে বাকি সব পত্রিকা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ