ঢাকা,মঙ্গলবার 1 May 2018, ১৮ বৈশাখ ১৪২৫, ১৪ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কুরআন হাদীসের আলোকে শবে বরাত

নুফরাত জেরিন : শবে বরাত এর মর্যাদা সম্পর্কে সমাজে অনেক কথা প্রচলিত। উপমহাদেশের মুসলিমদের মধ্যে এ রাতকে ঘিরে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায়। এ রাতের ফজিলত নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। এ সকল মতভেদ ও মতপার্থক্যের উর্ধ্বে উঠে কুরআন ও হাদীসের আলোকে করণীয় নির্ধারণ করাই একজন সচেতন মুসলিমের দায়িত্ব। শবে বরাত শব্দের অর্থ বিমুক্তির রজনী যদিও আমাদের দেশে এটি ভাগ্য রজনী নামে পরিচিত। কুরআন ও হাদীসের কোথাও “লাইলাতুল বারাআত” পরিভাষাটি ব্যবহৃত হয়নি। সাহাবী-তাবিয়ীগণের যুগেও এ পরিভাষার ব্যবহার জানা যায়না। হাদীসে উল্লিখিত “লাইলাতুন নিসফি মিন শা’বান” বা মধ্য শাবানের রজনীই উপমহাদেশে শবে বরাত নামে প্রচলিত।
কুরআনে বর্ণিত শবে বরাত : কুরআনের আলোকে শবে বরাতের অণুসন্ধান করলে কুরআনের কোথাও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শবে বরাত বা মধ্য শাবানের উল্লেখ নেই। সূরা দুখানের ৩ নম্বর আয়াতকে শবে বরাতের প্রমাণ হিসেবে দাঁড় করানোর ব্যর্থ প্রয়াস চালান অনেকে। আয়াতটি হলো: “নিশ্চয় আমি এটি (আল কুরআন) এক বরকত ও কল্যাণময় রাতে নাযিল করেছি। নিশ্চয়ই আমি তো (জাহান্নাম থেকে) সতর্ককারী।”
তবে এ আয়াতটি শবে বরাতের সপক্ষে হওয়ার সম্ভাবনা কুরআনের দলিল দ্বারাই বাতিল হয়ে যায়। সূরা বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: “রমজান মাস, যার মধ্যে আল কুরআন নাযিল করা হয়েছে, যা মানব জাতির জন্য পুরোপুরি হেদায়াত।”
হাদীসের মানদন্ডে শবে বরাত : সবথেকে বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থ সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফে লাইলাতুন নিসফি মিন শা’বান নিয়ে কোন হাদীস পাওয়া যায়না। তবে সিহাহ সিত্তার অন্যান্য গ্রন্থ সমূহে এ ব্যাপারে একাধিক হাদীস রয়েছে। যেমন: “রাসূল (সা) বলেছেন, যখন মধ্য শা’বানের রজনী আসে তখন তোমরা রাতে দন্ডায়মান থাকো এবং দিনে সিয়াম পালন করো। কারণ, ওইদিন সূর্যাস্তের পর মহান আল্লাহ তা’য়ালা দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং বলেন, কোনো ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করে দেবো। কোন রিজিক তালাশকারী আছে কি? আমি তাকে রিজিক প্রদান করবো। কোন দুর্দশাগ্রস্ত ব্যক্তি আছে কি? আমি তাকে মুক্ত করবো। এভাবে সুবহে সাদিক উদয় পর্যন্ত চলতে থাকে।” - (ইবনে মাজাহ: ১৩৮৮)
হাদীসের ইমামদের মতানুসারে এই হাদীস অত্যন্ত দূর্বল। কিন্তু বুখারি ও মুসলিম শরীফে এসেছে, “রাসূল (সা) বলেছেন, আমাদের প্রতিপালক প্রতি রাতের শেষ এক-তৃতীয়াংশ বাকি থাকতে দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করে বলেন, আমাকে ডাকার কেউ আছে কি? আমি তার ডাকে সাড়া দেবো। আমার কাছে চাওয়ার কেউ আছে কি? আমি তাকে তা প্রদান করবো। আমার কাছে ক্ষমা চাওয়ার কেউ আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করবো।”
বুখারী ও মুসলিম শরীফের এ হাদীস দ্বারা বোঝা যায় মু’মিনের প্রত্যেকটি রাতই মর্যাদাপূর্ণ। অনুরূপভাবে তিরমিযী শরীফে উল্লিখিত আছে,
“হযরত আয়েশা (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক রাতে আমি রাসূল (সা) কে খুঁজে পেলামনা। তখন বের হয়ে দেখি তিনি জান্নাতুল বাকিতে আকাশের দিকে মাথা উঁচু করে রয়েছেন।
তিনি বললেন, তুমি কি আশঙ্কা করেছিলে যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তোমার ওপর অবিচার করবেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল আমি ধারণা করেছিলাম যে আপনি আপনার অন্য স্ত্রীদের নিকট গমন করেছেন। অতঃপর তিনি বললেন, নিশ্চয়ই মহিমান্বিত পরাক্রান্ত আল্লাহ মধ্য শা’বানের রাতে দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন। অতঃপর তিনি কালব গোত্রের মেষপালের পশমের অধিক সংখ্যককে ক্ষমা করেন।”
ইমাম বুখারী এ হাদীসটিকে দূর্বল বলে আখ্যা দিয়েছেন। তারপরও এ হাদীসে রাসূল (সা)-এর ইবাদাতের যে পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়েছে বর্তমানে মানুষ এর থেকেও অনেক দূরে সরে এসেছে। প্রিয় নবী ইবাদত করেছেন অথচ তার সহধর্মিণী পর্যন্ত জানেন না। এ খেকে বোঝা গেল কেউ যদি এ রাতে ইবাদত করতেই চায় তাহলে তা করতে হবে একান্ত ব্যক্তিগতভাবে।
শবে বরাত সম্পর্কিত প্রচলিত ভ্রান্ত বিশ্বাস: শবে বরাত নিয়ে সমাজে অনেক বিভ্রান্তিপূর্ণ বিশ্বাস ও আমল প্রচলিত রয়েছে। যা সম্পূর্ণ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। যেমন-
- এ রাতে কুরআন মাজিদ লাওহে মাহফুজ হতে প্রথম আকাশে নাযিল হয়েছে।
- এ রাতে গোসল করাকে সওয়াবের কাজ মনে করা।
- মৃত ব্যক্তিদের রূহ এ রাতে তাদের সাবেক গৃহে আসে।
- এ রাতে হালুয়া রুটি তৈরী করা ও অন্যকে বিলানো।
- বাড়িতে বাড়িতে বা মসজিদে মিলাদ মাহফিল করা।
- দলে দলে কবর জিয়ারত করা।
- আতশবাজি করা, আলোকসজ্জা করা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ