ঢাকা, বৃহস্পতিবার 3 May 2018, ২০ বৈশাখ ১৪২৫, ১৬ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

১২৪ কোটি টাকার চৌহালী উপজেলা রক্ষা বাঁধে এক বছরে ২০ স্থানে ধস

সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলা সদরের বাকি এলাকাটুকু রক্ষায় নির্মাণাধীন বাঁধে দূর্নীতির কারণে অব্যহত ধসের বিষয়টি অনুসন্ধানে কাজ করছেন দুদকের পাবনা অফিসের কর্মকর্তারা -সংগ্রাম

বেলকুচি (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতাঃ সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলা সদরে যমুনা নদীর তীর সংরক্ষনে নির্মানাধীন বাধে ব্যাপক দুর্নীতির জন্য অব্যাহত ধস অনুসন্ধানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্তে করছে  প্রায় ১২৪ কোটি টাকা ব্যয়ের এই বাধ এলাকা সরজমিনে প্রকৌশলীদের নিয়ে এলাকা পরিদর্শন করে এক বছরে ২০ বার ধসের বিষয়ে তারা তথ্য উপাত্ত খুজে বের করছেন। এলাকাবাসী তাদের এই অনুসন্ধানকে আশার আলো হিসেবে দেখছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সুত্র এবং এলাকাবাসী জানায়, এক সময়ের সমৃদ্ধশালী এলাকা হিসেবে দেশ তথা ভারতবর্ষে পরিচিত স্থল পাকড়াশী জমিদারদের এলাকা সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলা এখন দেশের অন্যতম নদী ভাঙ্গন কবলিত বিপর্যস্ত অঞ্চল। গত ১২ বছরে যমুনার পুর্বপাড় বোয়ালকান্দি থেকে দক্ষিণে পাথরাইল পর্যন্ত উপজেলা সদরের খাসকাউলিয়া হয়েপ্রায় ২০ কিলোমিটার জুড়ে উপজেলা পরিষদ, হাসপাতাল, প্রাণি সম্পদ অফিস, হাট-বাজার, ৮ সহস্রাধিক ঘরবাড়ি সহ এ উপজেলার ৪০ শতাংশ এলাকা নদীতে বিলীন হওয়ায়প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়।
ভাঙ্গন চৌহালীর ঘোরজান ইউনিয়নের পুর্ব অংশ গ্রাস করে টাঙ্গাইল সদর ও নাগরপুর উপজেলার কয়েকটি  গ্রাম একের পর এক নিশ্চিহ্ন করে দেয়। চির-চেনা সেই ঐতিহ্যবাহী এলাকা গুলো যমুনার ছল-ছল জলরাশীতে পরিনত হয়।প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ হয়ে পড়ে বিপর্যস্ত। এর মধ্যে প্রায় ৬০ ভাগ মানুষ নদীর পুর্ব পাড়ে ঘোরজান, উমরপুর, বাঘুটিয়া ইউনিয়নের জেগে ওঠা চর গুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। জমি-জমা হারিয়ে এদের কষ্টের শেষ নেই। আর ৪০ ভাগের মধ্যে তীরবর্তী এলাকা সহ আশপাশে ২০ ভাগ মানুষের অবস্থান। আর বাকি ২০ ভাগ মানুষ ছন্নছাড়া। এছাড়া সদর খাসকাউলিয়া সহ আশপাশের এলাকায় ভাঙ্গন কবলিত ছিল প্রায় আরো ৮/১০ হাজার মানুষ। এসব মানুষের দাবী ছিল বাকি এলাকা টুকু রক্ষার জন্য একটি স্থায়ী বাধ। এ নিয়ে তাদের আক্ষেপের শেষ ছিলনা।
 সরকারের উচ্চ মহলের নির্দেশে চৌহালী উপজেলা সদরের বাকি এলাকা সহ টাঙ্গাইলের কয়েক কিলোমিটার সহ ৭ কিলোমিটার এলাকা রক্ষায় এশিয় উন্নয়ন ব্যাংক ১০৯ কোটি টাকার বরাদ্দ গ্রহন করে। এই টাকা দিয়ে ভাঙ্গনের রশি টেনে ধরতে নদীর পুর্ব পাড়ের টাঙ্গাইল সদর উপজেলার সরাতৈল থেকে দক্ষিনে নাগরপুর উপজেলার পুকুরিয়া, শাহজানীর খগেনের ঘাট, সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার ঘোরজানের চেকির মোড়, আজিমুদ্দি মোড়, খাসকাউলিয়া, জোতপাড়া পর্যন্ত ৭ কিলোমিটার এলাকায় গত ২০১৫ সালের ২৪ নভেম্বর তীর সংরক্ষন বাধ নির্মান শুরু হয়। বাধের ৫ কিলোমিটার পাথরের বোল্ড দিয়ে স্থায়ী এবং বালি ভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে ২ কিলোমিটার অস্থায়ী বাধ নির্মান করা হয়।
যার ৯৫ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। তবে বাধ সম্পুর্ন হবার আগেই অন্তত ২০ বার ধসে পড়েছে। গত মাস খানেক আগেও হালকা ঝড়ে বাধে ধস নামে। অকার্যকর হওয়ায় সামান্য  বাধের শত মিটার ধসে খসে পড়ে বালু ভর্তি জিও টেক্স বস্তা ও পাথরের বোল্ড। বর্তমানে ৭ কিলোমিটার এই বাধ ভাঙ্গনে-ভাঙ্গনে বিপর্যস্ত। বার-বার এমন ভাঙ্গন নির্মানে স্লপিং কাজে অকার্যকর মাটি নিচে ফেলে ব্লক দেয়া সহ পাথরের চারপাশে ফাকা স্থান সিমেন্ট দিয়ে পুর্ণ করে না দেয়ায় পানি ঢুকে তা সাধারন স্রতে সরে গিয়ে এই ধস দেখা দিচ্ছে বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ করেছে। এছাড়া বোল্ড তৈরীতে সিলিকেন বালু ব্যবহার না করে স্থানীয় যমুনার বালু ও নিম্নমানের সিমেন্ট ব্যবহার, এতে মেশানো পাথার গুলোতেও হেরফের সহ নানা দুর্নীতি অনিময় আবদ্ধ থাকায় বাধটির স্থায়িত্ব নিয়ে জনমনে নানাপ্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এমন অবস্থায় আগামী বন্যায় মুল বাধটিও বিলীন হয়ে যেতে পারে বলে আশংকা করছে স্থানীয়রা।
 তাই কাজ নিয়ে অসন্তোষ ক্ষোভপ্রকাশ ক্ষুব্দ এলাকাবাসীর।এ ব্যাপারে চৌহালী উপজেলার খাসকাউলিয়া গ্রামে বাধের পাশে বসবাসকারী দরিদ্র দিন মজুর ইসমাইল হোসেন, সাইফুল ইসলাম ও আব্দুল হালিম জানান, আমরা বার-বার ভাঙ্গনে ঘর-বাড়ি হারিয়েছি। তারপরও বাকি এলাকা টুকু রক্ষায় দাবী ছিল এই বাধ। অনেক টাকায় তা হয়েছে। তবে স্রোত ঠেকাতে সে রকম ভুমিকা না রেখে নিজেই যমুনার থাবায় পরিনত হচ্ছে। অল্প স্রোতে বার-বার ভেঙ্গে যাচ্ছে এ বাধ। নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কারনেই এই অবস্থা। আমরা অনিয়ম-দুর্নীতির সঠিক তদন্ত চাই, কেন সরকারের টাকা অপচয় হচ্ছে। 
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা, ঠিকাদার এবং এলাকার স্বার্থন্বেষী মহলের যোগসাযোশে এই বাধে অনিয়ম দুর্নীতি বলে দাবী করেছে একটি মহল। এ কাজের সাথে জড়িত এলাকার কেউ-কেউ হয়েছেন বাড়ি-গাড়ীর মালিক। এ ব্যাপারে খাসকাউলিয়ার তীরবর্তী কৃষক আব্দুস ছাত্তার জানান, হবিবর রহমান, গৃহিনী ওলিমা খাতুন, ব্যবসায়ী নওশাদ শিকদার জানান, এ বাধের কাজে দুর্নীতি অনিয়ম নিয়ে প্রথম থেকেই মানুষের নানা অভিযোগ ছিল। পরামর্শ ও অনিয়মের প্রতিবাদ করায় এলাকার সাধারন মানুষকে হয়রানী করেছে ঠিকাদার ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকতরা। মিথ্যা মামলা পর্যন্ত করেছে। যার বহিঃপ্রকাশ গত বন্যায় অন্তত ১৫/১৬ স্থানে বিশাল এলাকা নিয়ে বাধটি ধসে গেছে। আসলে অকার্যকর ভাবে কাজ করার জন্যে স্রত না থাকলেও তা ধসে যাচ্ছে নদীতে। তারা আরো জানান, কাজে অনিয়মে পাউবো ও ঠিকাদাররা জড়িত। দুদক তদন্ত কাজ শুরু করায় আশা করছি সবার মুখোশ উন্মেচন হবে। তাই দোষীদের সঠিক বিচার হবে। পাশাপাশি বাধ নির্মানেও যথাযথ পদক্ষেপ চাই। তা না হলে আগামী বন্যায় বাধও থাকবেনা। আমরা বসতিও হারাবো।
এদিকে বাধটি নির্মানে কর্তৃপক্ষের যথাযথ তদারকি না থাকার পাশাপাশি দায়িত্বপ্রাপ্ত পাউবো কর্মকর্তাদের খেয়াল খুশি মত কাজ এবং ধসের পর পরই সেখানে বালু ভর্তি জিও টেক্স বস্ত ফেলে সংস্কার না করায় এর বিস্তৃতি আরো বেড়েই চলছে। এমতাবস্থায় দুদকের র নেতৃত্বেপ্রকৌশলীদের নিয়ে একটি টিম গত সোমবার দুপুরে চৌহালীর পুরো বাধ এলাকা পরিদর্শন করে। তখন দায়িত্বপ্রাপ্ত টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহীপ্রকৌশলী শাহজাহান সিরাজ উপস্থিত ছিলেন। দুদকের টিমটি খাসকাউলিয়া বাধের পাড় মাটি খুড়ে পরিক্ষাও করে।
দুর্নীতি অনুসন্ধানের বিষয় পাবনা সমন্বিত জেলা অফিসের উপ-পরিচালক আবু বকর সিদ্দিক জানান, বাধে অব্যাহত ধসে দুর্নীতির কারন ক্ষতিয়ে দেখতে আমরা অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্তে এসেছি।প্রকৌশলীদের তদন্তপ্রতিবেদন হাতে পেলে আমরা ব্যবস্থা নেব। তবে বিষয়টি গুরুত্বের সাথেই ক্ষতিয়ে দেখা হবে। বিষয়টি নিয়ে টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহীপ্রকৌশলী শাহজাহান সিরাজ জানিয়েছেন, দুদকতো যেকোন বিষয়ের একটি দরখাস্ত পেলেই ছুটে আসে। তাই আসছে তদন্ত করতে। এ বাধে দুর্নীতি হয়নি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ