ঢাকা, বৃহস্পতিবার 3 May 2018, ২০ বৈশাখ ১৪২৫, ১৬ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নদী ও সমুদ্রের নগরী!

এবারের বৈশাখে ঝড়ের পাশাপাশি আষাঢ়-শ্রাবণের মতো বৃষ্টি শুরু হয়েছে। মাত্র বৈশাখী বর্ষণেই পানিতে তলিয়ে গেছে রাজধানী ঢাকার সকল এলাকা। তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অচল ও বিপর্যস্তও হয়ে পড়ে দেশের রাজধানী। কোথাও কোথাও মানুষকে কোমর সমান পানি ভেঙে এবং জীবন বিপন্ন করে চলাচল করতে হয়েছে। গতকাল বুধবার পর্যন্তও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। কোনো এলাকার পানিই সহজে সরে যেতে পারছে না। কোনো রাজপথ বা সড়ক দিয়েই নির্বিঘেœ চলাচল করা সম্ভব হচ্ছে না। খানা-খন্দকে পথ ও সড়কগুলোর যেখানে-সেখানে যখন-তখন দুর্ঘটনা যেমন ঘটছে তেমনি তৈরি হচ্ছে যানজটের। জাতীয় দৈনিকগুলোর সচিত্র খবরে শুধু নয়, বেসরকারি টেলিভিশন ও ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বৃষ্টির দুর্ভোগ সম্পর্কেই বেশি খবর জানানো হচ্ছে। অনেকেই রাজধানীকে নদী ও সমুদ্রের নগরী হিসেবে চিহ্নিত করছেন। তারা এমনকি ‘মালিবাগ সমুদ্র সৈকত’, ‘কালশি নদী’ এবং ‘বসুন্ধরা নদী’ ধরনের নামও দিতে শুরু করেছেন। নদী ও সমুদ্রের তালিকায় আসছে মতিঝিল, শান্তিনগর, ধানমন্ডি ও সংসদ ভবন এলাকার নামও।
একযোগে প্রাধান্যে থাকছে সমস্যার কারণ সম্পর্কিত আলোচনাও। বলা হচ্ছে, দুই সিটি করপোরেশন এবং সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীন খোঁড়াখুঁড়ি ও নির্মাণ কাজের কারণে রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়ক থেকে অলি-গলি ও মহল্লা পর্যন্ত প্রতিটি এলাকায় প্রচন্ড পানি আবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এই পানিও আবার স্বচ্ছ বা নিরাপদ নয় বরং কালো, নোংরা এবং দুর্গন্ধযুক্ত। পানিতে রয়েছে নানা রোগ জীবাণু। ওদিকে কয়েকদিনের প্রবল বর্ষণে রাজধানীর কোনো এলাকার সড়ক দিয়েই কোনো ধরনের যানবাহন নির্বিঘেœ চলাচল করতে পারছে না। অনেক এলাকায় কোনো যানবাহন ঢুকতে পর্যন্ত পারছে না। সবচেয়ে পরিশ্রমী এবং ভয়হীন হিসেবে পরিচিত রিকশাচালকেরাও এরই মধ্যে পরাস্থ হয়েছে। তারাও আর সব এলাকায় যাওয়ার সাহস পাচ্ছে না।
বাস্তবেও প্রচন্ড পানিজটের শিকার হয়েছে রাজধানীর প্রতিটি এলাকা। মোটর সাইকেল থেকে শুরু করে সিএনজি চালিত অটোরিকশা ও প্রাইভেট কার তো বটেই, যাত্রীবাহী বাসও অচল হয়ে পড়েছে যেখানে-সেখানে। বেশির ভাগ সড়কেই অসংখ্য গাড়ি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকছে। এর ওপর রয়েছে যানবাহনের তীব্র সংকট। মানুষকে গাড়ির জন্য কয়েক ঘন্টা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। মুষলধারার বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে তারা। সঙ্গে রয়েছে বিদ্যুতের চমকানি এবং বজ্রপাতে নিহত হওয়ার ভীতি। আধ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে লেগে যাচ্ছে এমনকি চার-পাঁচ ঘণ্টা। অ্যাম্বুলেস চলাচল করতে পারছে না বলে গুরুতর অসুস্থদেরও হাসপাতালে নেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
এমন অবস্থার কারণ জানাতে গিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমের রিপোর্টে বলা হয়েছে, একাধিক ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল প্রকল্প, ওয়াসা, দুই সিটি করপোরেশন, তিতাস ও বিটিসিএলসহ কয়েকটি সংস্থা বছরের পর বছর ধরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁড়াখুঁড়ি ও নিত্য নতুন সড়ক ও ড্রেন ধরনের নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। এক সংস্থা কোনো এলাকায় কাজ শেষ করে চলে যাওয়ার পরপর অন্য কোনো সংস্থা আবার একই এলাকায় তাদের মতো করে খোঁড়াখুঁড়ি ও নির্মাণ কাজ শুরু করে দেয়। ফলে ওই এলাকায় সড়কের অবস্থা যেমন স্বাভাবিক হতে পারে না তেমনি অল্প বৃষ্টিতেই পুরো এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। এই সময়েও রাজধানীর কোথাও চলছে ভ’গর্ভস্থ বিদ্যুৎ, টেলিফোন, গ্যাস ও অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল প্রতিস্থাপনের কাজ, কোথাও আবার ওয়াসা পানি সররাহের সংযোগ পাইপ বসাচ্ছে।
আপত্তির কারণ হলো, সবই চলছে কয়েক বছর ধরে। ফলে মানুষের ভোগান্তিরও অবসান ঘটছে না। প্রশ্ন উঠেছে অপরিকল্পিত নগরায়নের পরিপ্রেক্ষিতেও। কারণ, নগরায়নের নামে শত শত পুকুর ও খাল ভরাট করা হয়েছে। এসব স্থানে নির্মিত হয়েছে অসংখ্য বহুতল ভবন ও স্থাপনা। ভবনগুলোর আশপাশে মাটির নিচে প্রাকৃতিক নিয়মে পানি নেমে যাওয়ার মতো যথেষ্ট জায়গা রাখা বা প্রশস্ত ড্রেন তৈরি করা হয়নি। এছাড়া পলিথিনসহ নানা ধরনের আবর্জনা জমে গিয়ে ড্রেনগুলো সংকুচিত হয়ে পড়েছে। সংক্ষেপে বলা যায়, রাজধানীর কোনো এলাকাতেই চারপাশের নদ-নদীতে পানি সরে যাওয়ার মতো অবস্থা বা ব্যবস্থা নেই।
এমন এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই এক ‘সুখবর’ জানিয়েছে ঢাকা ওয়াসা। সরকার নাকি সংস্থাটির জন্য ৪০ কেটি টাকা বরাদ্দ করেছে। এই টাকা দিয়ে খাল খননের জন্য বুলডোজার ও ময়লা আবর্জনা অপসারণের জন্য ডাম্প ট্রাক কেনার পাশাপাশি ১৬টি পাম্পে বড় ধরনের মেরামত কাজ করা হবে। এ ছাড়া বক্স কালভার্টগুলোকে সচল করে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক ম্যানহোলও নির্মাণ করবে ওয়াসা। জানা গেছে, অন্যান্য বছর সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হলেও এবছর ৪০ কোটি টাকার ‘সাহায্য মঞ্জুরি’ দিয়েছে সরকার। সে কারণে কখনো কখনো সাময়িক পানি জটের সৃষ্টি হলেও দু’-চারদিনের মধ্যেই সব পানি সরিয়ে দেয়া সম্ভব হবে।   
ওয়াসার পক্ষ থেকে আশা ও আশ্বাসের কথা শোনানো হলেও বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বলা দরকার, ঝড়-বৃষ্টি ও বন্যার এই দেশে মাত্র কয়েকদিনের বৃষ্টিতেই পুরো রাজধানী তলিয়ে যাবে, অচল হয়ে পড়বে এবং মানুষের কষ্ট ও ভোগান্তির শেষ থাকবে না- এমন অবস্থা কল্পনা করা যায় না। কিন্তু বাস্তবে সেটাই ঘটেছে। একই কারণে এমন আশংকারও সৃষ্টি হয়েছে যে, রাজধানী ঢাকা একটি ‘ব্যর্থ মহানগরীর’ অশুভ পরিণতি বরণ করতে চলেছে।
আমরা মনে করি, সরকারের উচিত এমন দ্রুততার সঙ্গে তৎপর হয়ে ওঠা, ঢাকাকে যাতে ‘ব্যর্থ মহানগরীর’ পরিণতি বরণ করতে না হয়। এজন্য খাল ও পুকুর দখল করে ভবন ও স্থাপনা নির্মাণ প্রতিহত করার পাশাপাশি বাধাহীন পানি প্রবাহের জন্য রাজধানীর প্রতিটি এলাকায় যথেষ্ট প্রশস্ত ড্রেন নির্মাণ করতে হবে এবং কোনো ড্রেনেই আবর্জনা জমতে দেয়া যাবে না। রাস্তায় বিভিন্ন নির্মাণ ও খোঁড়াখুড়িতে নিয়োজিত সকল সংস্থার কাজেও সমন্বয় করতে হবে। বড় কথা, সবই করা দরকার বর্ষা আসার আগেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ