ঢাকা, বৃহস্পতিবার 3 May 2018, ২০ বৈশাখ ১৪২৫, ১৬ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ফুটবলের আরেক বিস্ময় মিসরের মোহাম্মদ সালাহ

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : লিভারপুলের জার্সিতে প্রথম মৌসুমেই তাক লাগিয়ে দিয়েছেন মোহামদ সালাহ। লিওনেল মেসির মতো ছোটখাটো গড়নের, বাঁ পায়ে খেলেন সমানে। খেলার ধরন, গোল করার ক্ষমতা, পাসিং দক্ষতা তাকে লিভারপুলের মেসি নামেই পরিচিত করে তুলেছে। চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত ৪১ গোল করেছেন মিসরীয় এই ফরোয়ার্ড। এমন পারফর্মেন্সের স্বীকৃতিও পেলেন হাতে নাতে। প্রতিবছর ইংলিশ ফুটবলে অংশ নেয়া ফুটবলারদের মধ্য হতে পারফর্মেন্সের ভিত্তিতে ‘পিএফএ প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার দেয়া হয়। এ বছর সেই পুরস্কার পেয়েছেন সালাহ।
২০১৭-১৮ মৌসুমের জন্যই এই খেতাব পান লিভারপুলের এই ফুটবলার। ‘পিএফএ প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার’ খেতাব জিততে সালাহ পেছনে ফেলেছেন ম্যানচেস্টার সিটির কেভিন ডি ব্রুইন, লেরয় সানে, ডেভিড সিলভা, টটেনহ্যাম হটস্পারের হ্যারি কেন, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের গোলরক্ষক ডেভিড ডি গিয়াকে। সম্প্রতি সেন্ট্রাল লন্ডনের গ্রসভেনর হাউসে এই পুরস্কার গ্রহণ করেন সালাহ। তিনিই প্রথম মিসরীয় খেলোয়াড় হিসেবে এই পুরস্কার পেলেন। পুরস্কার জিতে সালাহ বলেন, ‘আশা করি, আমিই শেষ ব্যক্তি নই। পুরস্কারটি জিততে পেরে আমি গর্বিত। আমি খুবই কঠোর পরিশ্রম করেছি। এটা খুবই সম্মানের।’ এ দিন সেরা তরুণ ফুটবলারের পুরস্কার জিতে নেন ম্যানচেস্টার সিটির জার্মান ফুটবলার লেরয় সানে। নারীদের মধ্যে তরুণ ফুটবলারে পুরস্কার পান ব্রিস্টল সিটির লুরেন হেম্প। আর বর্ষসেরা নারী ফুটবলার মনোনীত হন চেলসির ফ্রান কিরবি।
লিভারপুলে দারুণ অভিষেক মৌসুম কাটানো মোহামেদ সালাহর প্রশংসা করে সতীর্থ সাদিও মানে জানিয়েছেন, ম্যাচের পাশাপাশি অনুশীলনেও চমক দেখান মিশরের এই ফরোয়ার্ড। অ্যানফিল্ডে অভিষেক মৌসুমে সব ধরনের প্রতিযোগিতায় এরই মধ্যে ৪৩টি গোল করেছেন সালাহ। লিভারপুলের হয়ে এক মৌসুমে ইয়ান রাশের সর্বোচ্চ ৪৭ গোলের রেকর্ড ভাঙতে কমপক্ষে তিনটি ম্যাচ পাচ্ছেন এরই মধ্যে ৩৮ ম্যাচের প্রিমিয়ার লিগে এক মৌসুমে সবোর্চ্চ ৩১টি গোলের রেকর্ড ছোঁয়া এই খেলোয়াড়। পরের ম্যাচে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমি-ফাইনালের দ্বিতীয় লেগে রোমার মুখোমুখি হবে লিভারপুল। প্রথম লেগে নিজেদের মাঠ অ্যানফিল্ডে ৫-২ গোলের বড় জয় পেয়েছে ইয়ুর্গেন ক্লপের দল। সতীর্থের এমন পারফরম্যান্সে উচ্ছ্বসিত মানে। সালাহকে গোল করতে সাহায্য করে খুশি এই ফরোয়ার্ড। “আমার কাছে এটা অবিশ্বাস্য কিছু। মো (সালাহ) সব সময় এমনই, এমনকি অনুশীলনেও। আমাদের জন্য এটা স্বাভাবিক। আমরা তাকে আরও গোল করতে সহায়তা করার চেষ্টা করি।”  চলতি মৌসুমে মানে নিজেও করেছেন ১৮ গোল। এদের সাথে ব্রাজিলিয়ান রবের্ত ফিরমিনোর ২৭ গোলে দারুণ একটা মৌসুম কাটছে লিভারপুলের। ২৬ বছর বয়সী মানে মনে করেন তিনজনের পারস্পারিক বোঝাপড়াই তাদের সাফল্যের মূল কারণ “আমি মনে করি রহস্যটা হচ্ছে আমরা একে অপরের খুব কাছের বন্ধু। আমি সবসময় এসব দারুণ খেলোয়াড়ের সাথে খেলতে ভালবাসি। কারণ আমরা একে অন্যকে খুব ভালো বুঝি। আমরা একে অন্যের জন্য খেলতে চেষ্টা করি। যত বেশি আমরা একসাথে অনুশীলন করি এবং যত বেশি একে অন্যকে জানি ততই এটা আমাদের জন্য সহজ হয়ে ওঠে।আমার কাছাকাছি মো ও রবের্তর মতো খেলোয়াড় আছে, এটা অনেক মজার। এটা সব সময় উপভোগ্য। আমার বন্ধুকে গোলে সহায়তা করতে পেরে আমি সবসময় খুশি।আপনি এটা মাঠে দেখতে পারবেন। আমি সব সময় মো ও রবের্তকে খুজি এবং তারাও আমাকে খোঁজে। আমি মনে করি এটাই আমাদের ভালো একটা দল তৈরি করেছে।”
লিওনেল মেসি আর ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ফুটবল দুনিয়ার সব আলো কেড়ে নিয়েছেন। ব্যালন ডি’অর কিংবা ফিফার বর্ষসেরা ফুটবলারের তালিকাটা দেখলেই তা খুব সুস্পষ্ট। তবে মেসি-রোনাল্ডোদের সময়েই বিস্ময়কর পারফরম্যান্স উপহার দিয়ে পাদপ্রদীপের আলোয় ওঠে এসেছেন মোহাম্মদ সালাহ। ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগের শক্তিশালী ক্লাব চেলসির পর ইতালিয়ান জায়ান্ট রোমা ঘুরে গত বছরেই লিভারপুলে যোগ দেন তিনি। ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগের (ইপিএল) অন্যতম সেরা ক্লাব লিভারপুলের জার্সিতে প্রথম মৌসুমেই আলো ছড়ান মিসরের এই প্রতিভাবান ফুটবলার।
২০১৭-১৮ মৌসুমের শুরু থেকেই দুর্দান্ত খেলেন মোহাম্মদ সালাহ। গত মাসের মাঝামাঝি সময়ে ওয়াটফোর্ডের বিপক্ষেও প্রমাণ করলেন কেন তিনি সময়ের সেরা ফুটবলারদের একজন! ওয়াটফোর্ডের বিপক্ষে যে সেদিন একাই চার গোল করেন তিনি। সেই ম্যাচে প্রতিপক্ষের জালে চারবার বল জড়ানোর ফলে লিভারপুলের জার্সিতে নতুন এক রেকর্ডও গড়েন ২৫ বছরের এই প্রতিভাবান ফুটবলার। ছাড়িয়ে যান এক দশক আগে গড়া ফার্নান্দো টোরেসের রেকর্ডকে। ২০০৭-০৮ মৌসুমে লিভারপুলের হয়ে অভিষেক মৌসুমেই ৩৩ গোল করেছিলেন স্প্যানিশ স্ট্রাইকার টোরেস।
শুধু প্রিমিয়ার লিগেই সালাহর গোল এখন ২৯টি। এখানেও সালাহর সামনে নতুন রেকর্ড গড়ার হাতছানি। ইপিএলে আফ্রিকান ফুটবলার হিসেবে এক মৌসুমে সর্বোচ্চ গোল করেছিলেন দিদিয়ের দ্রগবা। ২০০৯-১০ মৌসুমে আইভরিকোস্টের এই তারকা ফুটবলার চেলসির হয়ে করেছিলেন ২৯ গোল। এবার দ্রগবাকে ছাড়িয়ে যাওয়াটা সালাহর জন্য কেবলই সময়ের ব্যাপার। সালাহর পর লীগে ২৪ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন হ্যারি কেন। ইনজুরির কারণে গত কয়েকটি ম্যাচে খেলতে পারেননি টটেনহ্যাম হটস্পারের এই ইংলিশ স্ট্রাইকার। যে কারণে সালাহর সঙ্গে গোলের লড়াই থেকে ছিটকে পড়েন স্পার্শদের এই তারকা ফুটবলার। সালাহ-হ্যারি কেনের পর সর্বোচ্চ গোলদাতার স্থানটি নিজের করে রেখেছেন ম্যানচেস্টার সিটির আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার সার্জিও এ্যাগুয়েরো। ইনজুরি থেকে দলে ফেরা সার্জিও এ্যাগুয়েরোর গোল এখন ২১। এক মৌসুমে আফ্রিকান ফুটবলার হিসেবে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডটা দ্রগবার দখলে থাকলেও মিশরের প্রথম ফুটবলার হিসেবে প্রিমিয়ার লীগে হ্যাটট্রিকের রেকর্ডটা সালাহ নিজের করে নিলেন ঠিকই। আরেকটি অবাক করা তথ্য হলো, ওয়াটফোর্ডের সালাহর চার গোল ঠিক চার শট থেকেই এসেছিল। তার আগে ২০০৯ সালের এপ্রিলে এমন কীর্তি গড়েছিলেন আন্দ্রে আর্শাভিন। সেটাও এই এ্যানফিল্ডেই! আর ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে লিভারপুলের হয়ে শেষ কোনো খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিপক্ষের জালে চারবার বল জড়ানোর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন লুইস সুয়ারেজ। উরুগুইয়ান স্ট্রাইকারের পর সেই কীর্তি গড়েন সালাহ।
দুর্দান্ত পারফর্মেন্সের কারণে এবার গোল্ডেন বুটের লড়াইয়েও রয়েছেন সালাহ। লিওনেল মেসির ডানায় ভর করে স্প্যানিশ লা লীগায় উড়ছে বার্সিলোনা। শনিবার রাতেও ঘরের মাঠ ন্যু ক্যাম্পে লেগানেসকে ৩-১ গোলে হারায় কাতালানরা। সেই ম্যাচে দুর্দান্ত এক হ্যাটট্রিক উপহার দেন বার্সিলোনার আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার। আর সেই ম্যাচেই লিভারপুলের হয়ে চলতি মৌসুমে ২৯ গোল করা মিসরীয় তারকা সালাহকে স্পর্শ করেন এলএম টেন। সেইসঙ্গে জমিয়ে তুলেন গোল্ডেন বুটের লড়াইটাকেও। প্রিমিয়ার লীগে চলতি মৌসুমে ২৯ গোল করে গোল্ডেন বুট জেতার দৌড়ে আরও আগেই সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন সালাহ। আর লেগানেসের জালে তিন গোল জড়িয়ে সালাহকে ছুঁয়ে ফেলেন মেসি। চলতি মৌসুমে ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লীগের সর্বোচ্চ গোলের মালিক এখন তারা দু’জনই। এর ফলে পঞ্চমবারের মতো গোল্ডেন বুট জেতার হাতছানি মেসির সামনে। অন্যদিকে, সালাহর সামনে সুযোগ এসেছে প্রথমবার তা স্পর্শ করার। তবে গোল্ডেন বুট জয়ের দৌড়ে মেসি-সালাহকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন রবার্ট লেভানডস্কিও। জার্মান বুন্দেস লীগার জায়ান্ট ক্লাব বেয়ার্ন মিউনিখের হয়ে ২৬ গোল করেছেন এই পোলিশ স্ট্রাইকার। সমান সংখ্যক গোল করে নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছেন ল্যাজিওর ইতালিয়ান ফরোয়ার্ড চিরো ইম্মোবিলেও। এ ছাড়াও ২৪টি করে প্রতিপক্ষের জালে বল জড়িয়ে গোল্ডেন বুট জয়ের দৌড়ে রয়েছে ইতালিয়ান সিরিএ লীগের সাবেক চ্যাম্পিয়ন ইন্টার মিলানের মাউরো ইকার্দি, প্যারিস সেইন্ট জার্মেইয়ের (পিএসজি) উরুগুইয়ান স্ট্রাইকার এডিনসন কাভানিও।
চলতি মৌসুমে সালাহর পারফরম্যান্সে মুগ্ধ-বিমোহিত ইউরোপিয়ান জায়ান্টরাও। তাকে পেতে মরিয়া এখন বড় বড় ক্লাবগুলো। এই তালিকায় সবার চেয়ে এগিয়ে রয়েছে রিয়াল মাদ্রিদ। গণমাধ্যমে গুঞ্জন লিভারপুল থেকে সালাহকে আনার জন্য সব ধরনের চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে স্প্যানিশ জায়ান্টরা। এ প্রসঙ্গে নতুন তথ্য দিয়েছে স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম দিয়ারিও গোল। এক প্রতিবেদনে দিয়ারিও গোল জানায়, মোহাম্মদ সালাহকে দলে ভেড়ানোর জন্য ৫০ মিলিয়ন ইউরো দেবে রিয়াল মাদ্রিদ। নগদ এই অর্থের পাশাপাশি রিয়াল মাদ্রিদ তাদের স্প্যানিশ মিডফিল্ডার ইস্কোকেও দেওয়ার প্রস্তাব করবে লিভারপুলকে! রিয়াল মাদ্রিদের গত মৌসুমটা ছিল সোনায় মোড়ানো। একের পর এক শিরোপা উৎসব করেছে জিনেদিন জিদানের শিষ্যরা। কিন্তু সেই পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি এবার। চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ছাড়া আর কোন শিরোপা উঁচিয়ে ধরার সুযোগ নেই লস ব্ল্যাঙ্কোসদের। তাই নতুন মৌসুমের জন্য নতুন করে পরিকল্পনা করছে রিয়াল মাদ্রিদ। গত গ্রীষ্মকালীন দলবদলে কিলিয়ান এমবাপেকে দলে ভেড়াতে চেয়েছিল স্প্যানিশ ক্লাবটি। এরপর পিএসজির ব্রাজিলিয়ান সুপারস্টার নেইমারকেও কেনার জন্য আগ্রহী প্রকাশ করে তারা। কিন্তু রিয়াল এবার নতুন করে দৃষ্টি রাখছে সালাহর উপর। লিভারপুলের এই তারকা ফুটবলারকে ছাড়াও ইন্টার মিলানের মাউরো ইকার্দি এবং টটেনহ্যাম হটস্পারের হ্যারি কেনকে কেনতে চায় রিয়াল মাদ্রিদ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ