বুধবার ১৬ জুন ২০১০
Online Edition

উজবেকিস্তান সীমান্তে ১ লাখ শরণার্থী প্রবেশে বাধা\ গণহত্যার অভিযোগ

ওশ (কিরগিজস্তান) থেকে এএফপি : ভয়াবহ সহিংসতা থেকে রক্ষা পাওয়ার উদ্দেশ্যে কিরগিজস্তান ছেড়ে পালিয়ে আসা লোকেরা উজবেকিস্তানে যাতে প্রবেশ না করতে পারে সেজন্য উজবেকিস্তান তার সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে। উজবেকদের হত্যা করতে উদ্যত সশস্ত্র গুন্ডাদের কিরগিজ সরকারি সৈন্যরা সাহায্য করছে বলে বহু উজবেক শরণার্থী অভিযোগ করেন। জরুরি পরিস্থিতি সামাল দিতে নিয়োজিত সাহায্য সংস্থাগুলো প্রাণে বেঁচে যাওয়া লোকদের কাছে নির্যাতিত হওয়ার আরো অভিযোগ পেয়েছে বলে খবর দেয়। কিরগিজস্তানের দক্ষিণাঞ্চলীয় ওশ শহরে সড়কে বহু লাশ পড়ে থাকতে দেখা যায়। সেখানে আরো গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। পাশের জালালাবাদ শহর থেকেও আরো সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়। চারদিনের সহিংসতায় বহু মানুষ নিহত হওযার খবর দেয়া হয়েছে। প্রায় এক লাখ মানুষ ইতোমধ্যে উজবেকিস্তানে প্রবেশ করেছেন। উজবেকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী আব্দুল্লাহ আরিপভ বলেছেন সীমান্ত বন্ধ থাকবে। যদিও সাহায্যগোষ্ঠীগুলো ও জাতিসংঘ সীমান্ত খোলা রাখার অনুরোধ জানিয়েছে। তিনি বলেন, শরণার্থীদের প্রয়োজন মেটানোর সামর্থ্য আমাদের থেকে থাকলে অবশ্যই আমরা সীমান্ত খুলে দিতাম। পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য উজবেকিস্তানকে আন্তর্জাতিক মানবিক সাহায্য দিতে হবে। ওশও জালালাবাদকে ঘিরে চারদিনের সহিংসতায় কমপক্ষে ১৩৮ ব্যক্তি মারা গেছেন এবং ১ হাজার ৭শ' ৬১ জন আহত হয়েছেন বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়। বিপুলসংখ্যক উজবেকও তাজিক উদ্বাস্তু উজবেকিস্তানে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। গণঅভ্যুত্থানে প্রেসিডেন্ট কুরমানবেক বাকিয়েও উৎখাত হওয়ার পর দু'মাস না যেতেই কিরগিজস্তানে সহিংসতা দেখা দেয়। কিরগিজস্তানের দক্ষিণাঞ্চল বাকিয়েভের ঘাঁটি বলে পরিচিত। জাতিসংঘ মানবাধিকার হাই কমিশনার নভি পিল্লোই কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার কিরগিজ কর্তৃপক্ষকে আহবান জানিয়েছেন। বেইজিং থেকে এএফপি আর এক খবর জানায় সহিংসতা কবলিত কিরগিজস্তান থেকে চীন তাদের ২শ' জন নাগরিককে সরিয়ে নিয়েছে। বাকী নাগরিকদের সরিয়ে নেয়ার জন্য আরো দুটো প্লেন পাঠানো হবে বলে চীনা রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যমে বলা হয়। দক্ষিণাঞ্চলীয় ওশ শহরে বসবাসরত প্রায় ৬শ' চীনা দাঙ্গা এলাকা থেকে তাদের সরিয়ে নেয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। চীনা ডেইলি জানায়, কিরগিজস্তানের সেনাবাহিনী সাঁজোয়া যানে করে চীনাদের বিমানবন্দরে নিয়ে যাচ্ছে। ৭ হাজারের বেশি চীনা ওশ শহরে বসবাস করেন বলে চীনা ডেইলি জানায়। তাদের অধিকাংশ ব্যবসায়ী কিন্তু কিছু লোক রয়েছেন নির্মাণ পেশায়। এ পর্যন্ত কোনো একজন চীনা নাগরিকের নিহত বা আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। জাতিসংঘ সহিংসতার নিন্দা করেছে এবং আইনশৃংখলা ফিরিয়ে আনার জন্য কিরগিজ কর্তৃপক্ষকে চাপ দিয়েছে। ওশের পুলিশ প্রধান কুরসান আসানভ এপিকে বলেন, অধিকাংশ রুশ পাকিস্তানী ভারতীয় ও আফ্রিকান মিলিয়ে সাড়ে ৯শ' বিদেশীকে উপদ্রব শুরুর পর থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে। ওদিকে কিরগিজ সরকারের দেয়া এক তথ্যে বলা হয়, সহিংসতায় উসকানিদাতা সন্দেহে এক ব্যক্তিকে কিরগিজ সরকার বন্দী করেছে। বেশ ক'জন তাজিক আফগান ও কিরগিজকেও ক্ষমতাচ্যুত বাকিয়েভের সমর্থক সন্দেহে আটক করা হয়েছে। বাকিয়েভের সমর্থনে এরা কাজ করছিল বলে সন্দেহ করা হয় জানান সরকারি মুখপাত্র ফরিদ নিয়াজভ। বেলারুশে আত্মনির্বাসিত বাকিয়েভ সহিংসতায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। দাঙ্গা বন্ধে নিস্ক্রিয়তার জন্য তিনি অন্তর্বর্তী সরকারকে দোষী করেন এবং সৈন্য পাঠানোর জন্য মস্কোনিয়ন্ত্রিত কালেকটিভ সিকিউরিটি ট্রিটি অর্গানাইজেশন (সিএসটিও) কে আহবান জানান। নতুন কিরগিজ সরকারও রাশিয়াকে সৈন্য পাঠানোর জন্য বলে। কিন্তু ক্রেমলিন অনুরোধ রাখেনি। রুশ সংবাদ সংস্থা জানায়, কিরগিজস্তানসহ সিএসটিওয়ের প্রতিনিধিরা মস্কোয় বৈঠকে বসেন এবং কিরগিজ নিরাপত্তা বাহিনীকে সাহায্য পাঠাতে সম্মত হন। সংস্থার রুশ জেনারেল সেক্রেটারি জানান, হেলিকপ্টার, সামরিক যান ও জ্বালানি সাহায্যে শামিল থাকবে। রিপোর্টে সৈন্য পাঠানোর উল্লেখ নেই। ওদিকে উজবেক ন্যাশনাল সেন্টারের প্রধান জালাহিদ্দীন জালিলুদ্দীনভ এপিকে বলেন, কমপক্ষে ১ লাখ উজবেক সীমান্তে উজবেকিস্তানে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছেন। সীমান্ত অতিক্রম করেছেন আরো ৮০ হাজার উজবেক। উজবেক সরকার বলছে ৪৫ হাজার নাম নিবন্ধিত করা হয়েছে। জুন ১৯৯০ সালে কিরগিজস্তানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ওশ য়ে কিরগিজ ও উজবেকদের মধ্যকার ভূখন্ডভূভিত্তিক বিরোধে কয়েক শ' ব্যক্তি প্রাণ হারান। তখনকার সোভিয়েত সেনা বাহিনীর দ্রুত হস্তক্ষেপে দাঙ্গা প্রশমিত হয়। এক বছর পর সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায় এবং সেচের পানি প্রাকৃতিক গ্যাস ও বিদ্যুতের ভাগাভাগি নিয়ে উজবেকিস্তান ও কিরগিজস্তানের মধ্যে আবার উত্তেজনা দেখা দেয়। এদিকে রয়টার্স জানায়, কিরগিজস্তানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ওশের আশপাশের এলাকায় রোববার এক সশস্ত্র বাহিনী গণহত্যা চালিয়েছে বলে দেশটির ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সদস্যরা অভিযোগ করেছে। রাইফেল, ছুরি আর লোহার দন্ড নিয়ে হামলা চালানো এ বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে হাজার হাজার নারী ও শিশু ওশ ছেড়ে উজবেকিস্তানের সীমান্তের উদ্দেশ্যে পালিয়ে গেছে। অধিবাসীরা জানান, তাদের কাছে থাকা রাইফেলের সঙ্গে হামলাকারীদের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের কোনো মিল নেই। তারা জানিয়েছে, সন্ধ্যা নাগাদ গোলাগুলি বন্ধ হয়েছিল এবং আক্রমণকারীদের মধ্যে কয়েকজন পালিয়ে গেছে। অধিবাসী ম্যাগরাফিমোভ বলেন, ‘‘হামলাকারীরা আমাদের বলেছে, উজবেকিস্তানে ফিরে যাও। তারা আমাদের নারী ও শিশুদের ওপর আক্রমণ চালায়।’’ তিনি আরো বলেন, ‘‘সকাল থেকে গোলাগুলি চলছিল। তিন/চার ঘণ্টা আগে তা বন্ধ হয়েছে।’’ বেশ কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী রয়টার্সকে জানিয়েছেন, সেনাবাহিনী উজবেকদের উপর গুলী চালাচ্ছে। উজবেক গ্রুপের অধিবাসী খোরবেক বলেন, এলাকাবাসী চলে যেতে ভয় পাচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠন সিটিজেনস এগেইনস্ট করাপশনের তাখর মাকসিতোভ জানান, তিনি বিশ্বাস করেন এ হত্যাকান্ডের পেছনে রাজনৈতিক কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে। হাবিবুল্লাহ খুরুলায়েভ (৬৯) জানান, হত্যাকান্ড বন্ধে পুলিশ কিছুই করছে না। এদিকে এলাকাবাসী অভিযোগ করেছে, মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সীমান্ত এলাকা পর্যন্ত জনগণকে পৌঁছে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে সশস্ত্র সেনাবাহিনী।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ