ঢাকা, শুক্রবার 4 May 2018, ২১ বৈশাখ ১৪২৫, ১৭ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কোটা বাতিল নয় সংস্কার চায় সকলে

মো. তোফাজ্জল বিন আমীন : সরকারি চাকরিতে বিদ্যামান কোটা সংস্কার দাবিতে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে কোটা প্রথা বাতিলের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে গত ৮ এপ্রিল এই আন্দোলন যখন তুঙ্গে ঠিক তখনই প্রধানমন্ত্রী কোন কোটাই রাখার প্রয়োজনই নেই বলে যে মন্তব্য করেছেন তার আলোকে সরকারি আদেশ কী জারি হয় তা জানার জন্য দেশবাসীকে হয়তো আরও কিছু দিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে কোটা সংস্কার আন্দোলনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের যে ইতি ঘটেছে তাতে সন্দেহ নেই। চলমান এ আন্দোলনের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হলেও শিক্ষার্থীদের আংশিক বিজয় হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণার পর পরই আন্দোলন স্থগিত করেছে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে কোটা বাতিলের ঘোষণার প্রজ্ঞাপন জারির দাবি করেছে শিক্ষার্থীরা। বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা এ ঘোষণা দেন। মেধাবীদেরকে বঞ্চিত করে কোনো দেশ উন্নয়নের উচ্চ শিখরে পৌঁছতে পারে না এটা সবারই জানা। তাহলে কেন? চাকরিতে কোটা,ভর্তিতে কোটা, যানবাহনে কোটা-সর্বত্র কোটা আর কোটা। এই বিষয়টি ভেবে দেখা প্রয়োজন। কোটা বাতিল করলেই সমস্যার সমাধান হবে বিষয়টি এমন নয়! কোটা বাতিল করার চেয়ে বেশি প্রয়োজন মানুষের প্রাপ্য অধিকারটুকু রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করা। রাষ্ট্র যদি ঘুষ, স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ বন্ধ করতে পারতো তাহলে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে মেধাবীদের জীবন এভাবে বিপন্ন হতো না।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ধনী-গরিব বা সাদা-কালো নির্বিশেষে সব মানুষের সমান অধিকার থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক! কিন্তু কোনো একটি গোষ্ঠীর জন্য শুধুমাত্র অধিকার সংরক্ষণ করা হলে সামাজিক বৈষম্য বাড়বে। ছেলেমেয়েরা উত্তরাধিকার সূত্রে পিতার সম্পত্তি পেতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় সুবিধা পেতে পারে না। বাংলাদেশের প্রতিটি ছেলেমেয়েই অন্যান্য সব ছেলেমেয়ের মতোই সমান অধিকার পাওয়ার যোগ্য। এই অধিকার প্রয়োগে জাতি ধর্ম বর্ণ গোষ্ঠী বাছ-বিচারের বিষয় হতে পারে না। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা রয়েছে। ভারতে মোট ৪ ধরনের কোটা পদ্ধতি চালু আছে। যেমন উপজাতি কোটা,বিভিন্ন জাত ভিত্তিক কোটা, অন্যান্য অনগ্রসরদের জন্য কোটা এবং বিভিন্ন রাজ্যে সংখ্যালঘু কোটা। তবে কোটা পদ্ধতি থাকলেও ভারতে কোটার জন্য একটি সুষ্ঠু নীতিমালা রয়েছে। একটি পরিবারের মাত্র একজনই কোটা সুবিধা গ্রহণ করতে পারবে এবং যদি কেউ উচ্চ শিক্ষার জন্য কোটা গ্রহণ করে তবে সে চাকরিতে কোটা সুবিধা পাবে না। আমাদের সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে  সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করিতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবেন। মুক্তিযোদ্ধারা সমাজ ও রাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠ সন্তান। তারা কেউ সন্তানের চাকরি কিংবা ভাতা পাবার আশায় যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি। মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান রক্ষার্থে যোগ্য প্রার্থীদের সর্বক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু যখন দেখি সরকারের একাধিক সচিবের বিরুদ্ধে এমনকি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের একজন সচিবের বিরুদ্ধে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর অভিযোগ সংবাদ মাধ্যমে মুদ্রিত হয় তখন সত্যিই মনে দাগ কাটে। দুঃখজনক হলেও সত্য অদ্যাবধি মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক কোনো তালিকা কোন সরকারই প্রণয়ন করেনি।

দেশের বিরাজমান পরিস্থিতিতে পুরো কোটা ব্যবস্থা বাতিলের সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক তা বিবেচনা করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা চেয়েছিল সংস্কার কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিলেন বাতিলের। এই বিষয়টিও রাজনৈতিক বা ক্ষমতাধারীদের স্বেচ্ছাচারিতার আরও একধাপকে এগিয়ে যাওয়ার কৌশল ছাড়া আর কিছু নয়! পিছিয়ে পড়া জেলাগুলো, বিভিন্ন জাতিসত্তা কিংবা প্রতিবন্ধী মানুষের আরও পিছিয়ে পড়া ছাড়া এর কোনো কার্যকারিতা নেই, সেটি নিশ্চয় ক্ষমতাসীন সরকার জানেন। প্রধানমন্ত্রী কোটাব্যবস্থা সম্পূর্ণ অবসানের ঘোষণা দেয়ার পর নানা মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কয়েক মাস ধরে যে শিক্ষার্থীরা এই আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন তারা গত কয়েক দিনে পুলিশের নির্যাতন ও সরকার সমর্থক ছাত্রসংগঠনের আক্রমণের শিকার হয়েছেন। সবক্ষেত্রে রাজনীতির কূটচাল প্রয়োগ করা কাম্য নয়। তবে রাজনীতিতে যে শেষ কথা বলতে কিছু নেই তা আবারও প্রমাণিত হলো। গত ২১ মার্চ চট্রগ্রামের পটিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন চাকরিতে কোটাব্যবস্থা রাখাতেই হবে। কারণ মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছি। কাজেই তাঁদের সম্মান দিতেই হবে। তাঁদের ছেলে, মেয়ে, নাতি, পুতি পর্যন্ত যেন চাকরি পায়, তার জন্য কোটার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। অথচ তিনি এখন কোন বাছবিচার না করেই কোটা বাতিলের পক্ষে মত দিয়েছেন। গত সোমবার জাতীয় সংসদে কৃষিমন্ত্রী  মতিয়া চৌধুরী কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ৮০ শতাংশই রাজাকারের বাচ্চা বলে অভিহিত করেছেন। শুধু প্রধানমন্ত্রী নন খোদ সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা সংস্কারের দাবির বিরোধিতা করতে গিয়ে একে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন বলে এতদিন জিগির তুললেও প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর সবার সুর পাল্টে গেছে। 

একটি সমাজ বা রাষ্ট্রের দায়িত্বভার যখন অযোগ্য লোকদের হাতে ন্যস্ত হয়ে পড়ে তখন সেখানে আইনের শাসন ভূলন্ঠিত হয়। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ভাবে রাষ্ট্রের বিভিন্ন পদে নিজেদের লোক বসালেই তার সুফল পাবে। কিন্তু এই নীতি যে ভ্রান্ত তা ইতিহাসে প্রমাণিত হলেও ক্ষমতাসীন দল এই নীতি থেকে সরেনি। স্বাধীনতার পর তৎকালীন বিডিআর এর মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন মেজর জেনারেল এম খলিলুর রহমান। তিনি তার কাছ থেকে দেখা ১৯৭৩-৭৫ শীর্ষক বইয়ে লিখেছেন, ১৯৭৮ সালের গোড়াতে আমি আওয়ামী লীগে যোগদান করি এবং বেশ সক্রিয়ভাবে রাজনীতি শুরু করি। সে নির্বাচনে জেনারেল ওসমানী রাষ্ট্রপতি পদে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ঐক্যজোটের প্রার্থী ছিলেন। তাঁর নির্বাচনী প্রচার অভিযানে চলেছি ভোলায়, তোফায়েল সাহেবের এলাকায় জনসভা হবে। আমরা ওরই মেহমান। লঞ্চে বসে গল্প। আমি, তোফায়েল ও রাজ্জাক। কথা হচ্ছিল জিয়াউর রহমানের আমলে জেল খাটার সময়ে তাঁরা দুজন কেমন লাঞ্ছনা ভোগ করেছেন এবং কার হাতে। সেদিন একটা দামি কথা বলেছিলেন তোফায়েল সাহেব। বলেছিলেন ভাই, সবচাইতে বেশি খারাপ ব্যবহার পেয়েছি ওইসব অফিসারের কাছ থেকে, যাদের আমি নিজের হাতে ভর্তি করেছিলাম ১৯৭২ সালে। এরা আমাদের মনোভাবাপন্ন এটাই ছিল তাদের যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি। তাদের চাইতে শিক্ষাগত ও মেধাগত দিক থেকে বেশি যোগ্য কিন্তু আমাদের চিন্তাধারার অনুসারী নয় এমন অনেক প্রার্থীকে বাদ দেওয়া হয়। কাজটা বোধ হয় ভুল হয়েছে খলিল ভাই, তাই না? আমি হেসেই বলেছিলাম, ‘মারাত্মক ভুল হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে অযোগ্য লোকের কোনও নীতি বা আদর্শ থাকে না। থাকলেও চাকরি রক্ষার্থে তা বিসর্জন দিতে তার একমিনিটও সময় লাগে না। ক্ষমতাসীন শাসকদের এটা অনুধাবন করা প্রয়োজন যে সত্যিকার অর্থে যারা যোগ্য তাদের হাতে শত্রুরাও নিরাপদ। রাষ্ট্র পরিচালনায় যোগ্যদের বাদ দিয়ে অযোগ্যদের কোটার ভিত্তিতে বসানো সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য হুমকিস্বরূপ এটা বোধ হয় নতুন করে কাউকে বুঝানোর দরকার নেই। 

রাজধানীর মুক্তাঙ্গন আর পল্টন ময়দানকে মানুষ ভুলে যেতে বসেছে। পল্টন ময়দান দাবি আদায়ের প্রাণকেন্দ্র হলেও এখন শাহবাগ দাবি আদায়ের ময়দানে পরিণত হয়েছে। ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর শাহবাগের রাস্তার মোড়ে ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ আত্মপ্রকাশ করেছিল। আর সেখানে তারা জমায়েত হয়েছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নয়, ফাঁসির দাবিতে। সময় কত কিছুই না বদলে দেয়। একই শাহবাগের দুই রূপ। শুধু দৃশ্যপট আলাদা। ওই সময় শাহবাগ ছিল রীতিমতো সেলিব্রেটি শো। গণমাধ্যমের অকুন্ঠ সমর্থন। যেন এক মানুষ হত্যার উৎসবের মেলাতে পরিণত হয়েছিল। শাহবাগের আন্দোলনকে বেগবান করতে সংসদ আগ বাড়িয়ে আইন পরিবর্তন পর্যন্ত করেছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত বিরানি খাওয়ার উৎসব বেশি দিন টিকেনি। কারণ মিথ্যের আস্ফালন বেশিদিন পৃথিবীতে টিকতে পারে না। ওই সময় সব টিভি দিনের পর দিন আন্দোলন লাইভ সম্প্রচার করেছিল। কিন্তু এবার শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবির আন্দোলনে টিভি চ্যানেলে তেমন কোনো লাইভ সম্প্রচার দেখা যায়নি। ইতিহাস কত নির্মম! যে ইমরান এইচ সরকারের কথায় প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রাস্তায় নেমেছিল নীরবতা পালন করতে। সেই ইমরান এইচ সরকারকে এখন জুতাপেটা মোকাবেলা করতে হচ্ছে। ওই সময়ের স্লোগানও শিক্ষার্থীরা পাল্টিয়ে দিয়েছে। ওই সময় স্লোগান ছিল তুই রাজাকার, তুই রাজাকার। আর এখন স্লোগান হচ্ছে তুমি কে, আমি কে, রাজাকার রাজাকার। দিন কাটে স্লোগানে, রাত কাটে আতংকে, ওরা প্রতিবাদ করতে দেয় না, রগ কেটে দাবায় রাখা যাবে না, নিরাপত্তা নেই কোথাও, আমার বোন রক্তাক্ত কেন? এই ফাগুনে আমরা দ্বিগুণ হবো, আমার স্বাধীনতায় হামলা কেন? নিরাপদ ক্যাম্পাস চাই, পড়তে এসেছি মরতে নয়, হলে হলে অত্যাচার বন্ধ করো, বন্ধ করো, রামদা চাপাতির রাজনীতি, বঙ্গবন্ধুর বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই।

বর্তমানে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ৫৬ শতাংশ কোটা অনুসরণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধার ছেলেমেয়ের জন্য ৩০ শতাংশ, নারী কোটা ১০ শতাংশ, জেলা কোটা ১০ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ৫ শতাংশ, আর প্রতিবন্ধীদের জন্য রয়েছে ১ শতাংশ কোটা। বাকি ৪৪ শতাংশ মেধাবীদের জন্য বরাদ্দ। এই মেধা কোটায় নিয়োগে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং টাকা পয়সার লেনদেন হচ্ছে তাতে প্রকৃত মেধাবীরা সরকারি চাকরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ১৯৭২ সালে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ মেধা, ৪০ শতাংশ জেলা, ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা আর ১০ শতাংশ যুদ্ধবিধ্বস্ত নারী কোটা ছিল। একটা প্রেক্ষাপটে ওই সময় কোটা পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল। অপ্রিয় হলেও সত্য যে চাকরি থেকে শুরু করে ভর্তি পরীক্ষায় পর্যন্ত কোটা পদ্ধতি থাকায় ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের সার্টিফিকেট সংগ্রহের হিড়িক পড়ে গেছে। ক্ষমতাসীন শাসকেরা যখনই জনগণের মুখের ভাষা বুঝতে পারে না তখনই ক্ষমতার পিচ্ছিল পথে হোঁচট খায়। আমরা মনে করি সরকার শিক্ষার্থীদের ভাষা অনুধাবন করে কোটা ব্যবস্থা পুরোপুরি বাতিল না করে সংস্কারের জন্য উদ্যোগী ভূমিকা পালন করবেন, এমটিই দেশের ১৬ কোটি মানুষের প্রত্যাশা। অনেকেই মনে করছেন, বহুদিন কোটাপ্রথা চলার পর এখন এর প্রয়োজনীয়তা বহুলাংশেই কমে গেছে। কিন্তু একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। সবমিলিয়ে কোটা পদ্ধতি ১০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলেই প্রয়োজন মিটতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ