ঢাকা, শনিবার 5 May 2018, ২২ বৈশাখ ১৪২৫, ১৮ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বিপিসির আপত্তি সত্ত্বেও কনডেনসেট আমদানির সুযোগ পাচ্ছে ১৩ বেসরকারি রিফাইনারি

কামাল উদ্দিন সুমন : দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি রিফাইনারি গুলো জ্বালানি তেলে ভেজাল দিয়ে আসছে। হাতে নাতে ধরাও পড়েছে চারটি বেসরকারি রিফাইনারি। তারপর কনডেনসেট আমদানির উন্মুক্ত সুযোগ পাচ্ছে ১৩ কোম্পানি। খনি থেকে উত্তোলিত গ্যাসের উপজাত কনডেনসেট আমদানির জন্য নীতিমালা করছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। বেসরকারি রিফাইনারিগুলোর জন্য কনডেনসেট আমদানির সুযোগ রেখে এরই মধ্যে একটি খসড়া নীতিমালাও তৈরি করেছে জ্বালানি বিভাগ।
তবে এ খসড়া নীতিমালা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে পেট্রোলিয়াম রিফাইনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (পিআরএবি)। তারা বলছে, খসড়া নীতিমালা যেভাবে তৈরি করা হয়েছে, তাতে ছোট রিফাইনারিগুলো কনডেনসেট প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আরো বৈষম্যের শিকার হবে। অন্যদিকে কনডেনসেট আমদানি উন্মুক্ত করার বিপক্ষে বাংলাদেশ পেট্রোালিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। তারা বলছে, কনডেনসেট আমদানি হলে দেশে জ্বালানি তেলে ভেজালের সুযোগ বেড়ে যাবে।
সূত্র জানায়, গত বছরের জুন মাসে জ্বালানি তেলে ভেজাল দেয়ায় ধরা পড়ে চারটি কোম্পানি। কিন্তু কোনো রকম জরিমানা ছাড়াই তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের ক্ষতি হয়েছে ৪২৫ কোটি টাকা।
বিপিসির এক তদন্তে বেরিয়ে এসেছে ১৩টি বেসরকারি রিফাইনারির ১১টিই তেলে ভেজাল দেয়। ভেজালের অভিযোগে চার রিফাইনারিতে এক বছর কনডেনসেট সরবরাহ বন্ধও রাখা হয়। গত বছর এ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়েছে। যদিও অভিযুক্ত রিফাইনারিগুলো দাবি করে আসছে, অন্যায়ভাবে তাদের এ শাস্তি দেয়া হয়েছে।
কনডেনসেট আমদানির খসড়া নীতিমালার ৬-এর (খ)-তে বলা হয়েছে, কনডেনসেট আমদানি করতে চাইলে প্ল্যান্ট মালিকদের ৩০ হাজার টনের সংরক্ষণাগার বা স্টোরেজ ট্যাংক ও পণ্য আমদানির জন্য জেটি থাকতে হবে। দেশে যেসব প্রতিষ্ঠান কনডেনসেট দিয়ে জ্বালানি উৎপাদন করে, তাদের মধ্যে মাত্র দুটি কোম্পানির এ সক্ষমতা রয়েছে।
এ নীতিমালার বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে গত মাসে জ্বালানি বিভাগে চিঠি দিয়েছে পেট্রোলিয়াম রিফাইনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ। তারা বলছে, দেশে উৎপাদিত কনডেনসেটের প্রায় অর্ধেকই সরবরাহ করা হয় বড় দুই কোম্পানিকে। আবার তাদের জন্যই আমদানির সুযোগ রেখে নীতিমালা করা হচ্ছে। যদিও অন্য রিফাইনারিগুলো দীর্ঘদিন থেকে কনডেনসেট আমদানির সুযোগ চেয়ে আবেদন করে আসছে।
জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ২০টি রিফাইনারি রয়েছে। এর মধ্যে সাতটি সরকারি আর ১৩টি বেসরকারি। দেশের বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্র থেকে বর্তমানে দৈনিক ১২ হাজার থেকে সাড়ে ১২ হাজার ব্যারেল কনডেনসেট পাওয়া যায়। সরকারি রিফাইনারিগুলোয় প্রতিদিন ছয় হাজার ব্যারেল কনডেনসেট বরাদ্দ দেয়া হয়। বাকি ছয় থেকে সাড়ে ছয় হাজার ব্যারেল কনডেনসেট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল ও পেট্রোম্যাক্স রিফাইনারিকে দৈনিক ২ হাজার ২৫০ ব্যারেল করে মোট সাড়ে চার হাজার ব্যারেল কনডেনসেট সরবরাহ করা হয়। বাকি দেড় থেকে দুই হাজার ব্যারেল অন্য ১১টি রিফাইনারির মধ্যে আনুপাতিক হারে বণ্টন করা হয়। দুটি প্রতিষ্ঠানকে বেশি সরবরাহের পেছনে জ্বালানি বিভাগের যুক্তি হলো, তারা অকটেন উৎপাদন করে।
কনডেনসেট বরাদ্দে এমন বৈষম্য নিয়ে অন্য বেসরকারি রিফাইনারিগুলো বিভিন্ন সময় অভিযোগ করে আসছে। তাদের দাবি, মন্ত্রণালয়, পেট্রোবাংলা ও বিপিসির একটি চক্র অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে দুই রিফাইনারিকে বাড়তি বরাদ্দ দিচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির একাধিক বৈঠকেও আলোচনা হয়।
এদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিপিসি কনডেনসেট আমদানি উন্মুক্ত করার বিপক্ষে। প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, কনডেনসেট গ্যাসক্ষেত্রের উপজাত। এ উপজাত থেকে প্রাপ্ত জ্বালানি তেলের গ্রেড কম। লো-গ্রেডের এ তেল ইঞ্জিনের জন্য ক্ষতিকর। মান ভালো না হওয়ায় এ তেল দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানি করা যায় না। আবার আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের চেয়ে বাড়তি দামে দেশীয় রিফাইনারিগুলো থেকে নিম্নমানের এ তেল কিনতে হয় বিপিসিকে, যা বিপিসির লোকসানের একটি কারণ। এখন কনডেনসেটের আমদানি উন্মুক্ত করে দিলে দেশে জ্বালানি তেলের উৎপাদন বাড়বে এবং বিপিসিকেই সেই তেল কিনতে হবে। কারণ নীতিমালা অনুসারে এ পণ্য কিনতে বিপিসি বাধ্য। এতে বিপিসির লোকসান আরো বাড়বে।
জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ১৩টি বেসরকারি ফ্র্যাকশনেশন প্লান্টের মধ্যে ১১টিই জ্বালানি তেলের ভেজাল কারসাজির অভিযোগে অভিযুক্ত হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভেজালকারী চার রিফাইনারিতে গত বছর কনডেনসেট সরবারহ বন্ধ করে দেয় পেট্রোবাংলা। এগুলো হলো চৌধুরী রিফাইনারি, লার্ক পেট্রোলিয়াম, সিভিও পেট্রোকেমিক্যাল রিফাইনারি ও গোল্ডেন কনডেনসেট অয়েল। পরে কোম্পানিগুলোর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আবার তাদের কনডেনসেট বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় জ্বালানি বিভাগ। ক্ষতিপূরণ প্রদানসহ তিন শর্তে ওই এই অনুমতি দেওয়া হয়। জ্বালানি বিভাগ গত বছর ২৯ মে এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি ইস্যু করে। এর একদিন পরই ৩১ মে ক্ষতিপূরণ আদায়ের শর্ত বাদ দিয়ে আরেকটি নতুন চিঠি ইস্যু করা হয়। সেখানে ফের ওই অভিযুক্ত কোম্পানিগুলোকে কনডেনসেট সরবরাহ করতে বলা হয়। অভিযুক্ত চার রিফাইনারি গুলো হলো চৌধুরী রিফাইনারি, লার্ক পেট্রোলিয়াম, সিভিও পেট্রোকেমিক্যাল ও গোল্ডেন কনডেনসেট অয়েল। এই চার কোম্পানি কনডেনসেট শোধন না করে সরাসরি পেট্রোল পাম্প স্টেশনের কাছে বিক্রি করেছে। এতে তারা বেশ কয়েকগুণ বেশি লাভ করেছে। এ ছাড়া পাম্পগুলো তেলে ভেজাল দিয়েছে। এটা তদন্তে প্রমাণিত হয়
জ্বালানি তেলে কেন ভেজাল হচ্ছে এর কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে, পেট্রোবাংলা রিফাইনারিগুলোতে প্রতি লিটার কনডেনসেট ৪৪ টাকায় বিক্রি করে। প্রতি লিটার কনডেনসেট প্রক্রিয়া করে প্রাপ্ত পেট্রোলিয়াম পণ্য বিক্রিতে রিফাইনারিগুলোর মার্জিন (লাভ) ৭ টাকা। কিন্তু এই কনেডেনসেট চোরাইপথে তেল ভেজালকারীদের কাছে বিক্রি করলে তারা ২৫ টাকা পর্যন্ত লাভ করে। অন্যদিকে ফিলিং স্টেশনগুলো প্রতিটি লিটার তেল বিক্রি করে ৩ টাকা ৭০ পয়সা মার্জিন পায়। কিন্তু কনডেনসেট মিশিয়ে ভেজাল জ্বালানি তেল বিক্রিতে লিটারে ১৯ টাকা পর্যন্ত লাভ হয়। সূত্র জানায়, সব চেয়ে বেশি ভেজাল মেশানো হয় অকটেন ও পেট্রোলে। কারণ এই দুই জ্বালানি তেলের দাম বেশি। আবার সব চেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া ডিজেলেও ভেজাল দেওয়া হয়।
বর্তমানে দেশে দৈনিক ২৭৪ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের বিপরীতে এক হাজার ৫৬০ টন কনডেনসেট উৎপাদন হয়। বছরে উৎপাদিত কনডেনসেটের পরিমাণ পাঁচ লাখ ৫০ হাজার টন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ