বুধবার ১৬ জুন ২০১০
Online Edition

সুন্দরবনের পরিবেশ বিপর্যয়ে খাদ্যের সন্ধানে বাঘ লোকালয়ে

খুলনা অফিস : নোনা পানিতে সয়লাব সুন্দরবন। গাছ মারা যাচ্ছে। মারা যাচ্ছে বন্য প্রাণীর খাবার হরিণ ও ছোট ছোট প্রজাতির পশু-পাখি। জীবিকার তাগিদে উপদ্রুত এলাকার মানুষ গাছ কাটছে, হরিণ ও শুকর মরছে। ঢুকে যাচ্ছে গহিন বনে। যে কারণে বনে বাঘের খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে । বাঘ যেসব পশু-পাখি খেয়ে বেঁচে থাকে, বনে সেগুলোর বসবাসের পরিবেশ নেই। সুন্দরবনে বাঘের আবাসস্থল ও খাবার পানির উৎস নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে চলে আসতে বাধ্য হচ্ছে বাঘ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সুন্দরবনে পর্যাপ্ত খাদ্যের অভাব, বিচরণ এলাকা হ্রাস, জলবায়ু পরিবর্তনসহ বনের ভেতর প্রবাহিত নদী-খাল ও জলাধারগুলোতে মিঠা পানির অভাব, পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং মানুষের উপদ্রবের কারণে বাঘ বন থেকে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। এই প্রবণতা সুন্দরবনের সাতক্ষীরা ও চাঁদপাই রেঞ্জে বেশি। গত পাঁচ বছরে সুন্দরবন সংলগ্ন গ্রামগুলোতে মানুষের পিটুনিতে ৬টি বাঘ মারা গেছে। এর মধ্যে পাঁচটি বাঘই মারা গেছে খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জে এবং বাকি আরেকটি বাঘ মারা যায় বাগেরহাটের শরণখোলা রেঞ্জে। এ সময় বাঘের হামলায় জেলে-বাওয়ালীসহ ৭৩ জন নিহত ও অর্ধশত আহত হয়েছে। বর্তমানে সুন্দরবনে বাঘের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে খাদ্য। রাজকীয় এই প্রাণীর প্রধান খাদ্য হরিণ। সুন্দরবনে চোরা শিকারীদের হাতে প্রতিনিয়ত হরিণ নিধন হচ্ছে। ফলে বন থেকে হরিণ কমে যাচ্ছে। আর হরিণ কমতে থাকায় সুন্দরবনে বাঘেরও খাদ্য সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। তাছাড়া সুন্দরবনের ভিতরের যেসব প্রাকৃতিক জলাধারসমূহ যুগ যুগ ধরে বাঘসহ বন্য প্রাণীদের মিঠা পানির চাহিদা মিটিয়েছে; সে সকল জলাধার সিডর ও আইলাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মারাত্মকভাবে লবণাক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বনের মধ্যে মিঠা পানির অভাব দেখা দিয়েছে। এসব জলাধারের লবণাক্ত পানি পান করে বাঘ লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হচ্ছে। তাছাড়া বনের ভেতরে প্রবাহিত বহু নদী-খাল ভরাট হয়ে গেছে। মূলতঃ এ সকল কারণে বাঘ সহজেই লোকালয়ে প্রবেশ করছে। এদিকে বন সংলগ্ন গ্রামগুলোর মানুষও সব সময় বাঘ আতঙ্কে থাকে। ফলে বাঘ লোকালয়ে প্রবেশ করলে গ্রামবাসী তাদের পিটিয়ে হত্যা করে। তার ওপর প্রাকৃতিকভাবেও প্রতি বছর বেশ কিছু বাঘ মারা যায়। তাই বাঘ বাঁচাতে সুন্দরবন থেকে লোকালয়ে ঢুকে পড়া বাঘকে মানুষের হাত থেকে রক্ষা করতে বন বিভাগ ও ডব্লিউটিবি'র যৌথ উদ্যোগে বন সংলগ্ন এলাকার মানুষকে বাঘের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করতে গত বছর থেকে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে সবচেয়ে বেশি বাঘ উপদ্রুত সাতক্ষীরা রেঞ্জের শ্যামনগরের বন সংলগ্ন মানুষকে বেছে নেয়া হয়েছে। তবে পর্যায়ক্রমে এই কার্যক্রম গোটা সুন্দরবন সংলগ্ন লোকালয়ের মানুষদের মধ্যেও প্রচার করা হবে। এদিকে বাঘের ভয়ে সতর্ক পাহারা বসিয়েছেন এ জনপদের মানুষ। সন্ধ্যার পর নিতান্ত প্রয়োজনীয় ছাড়া কেউ ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। বন বিভাগের কর্মকর্তারা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে উপজেলার ছোট ভেটখালী, চুনকুড়ী, টেংরাখালী, যতীন্দ্রনগর, দাঁতনাখালী ও গোলাখালি এলাকায় গণসংযোগ করেছেন। বন বিভাগের কর্মী ও স্থানীয় গ্রামবাসীকে নিয়ে কয়েকটি দল গঠন করা হয়েছে। দলের সদস্যরা পালাক্রমে রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন। পশ্চিম বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) তৌফিকুল ইসলাম জানান, সুন্দরবন সংলগ্ন লোকালয়ে বাঘের উৎপাত বেড়ে গেছে। সম্প্রতি বাঘের আক্রমণে এক মহিলাসহ তিন জেলে নিহত হয়েছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ