ঢাকা, শনিবার 5 May 2018, ২২ বৈশাখ ১৪২৫, ১৮ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ইসলামে শ্রমিকের প্রতি আচরণ ও অধিকার

ড. মোবারক হোসাইন : ॥ ৩ ॥
শ্রমিকদের শ্রমের বিনিময়ে তিল তিল করে গড়ে উঠে শিল্প প্রতিষ্ঠান। একটি শিল্পের মালিক শ্রমিকদের শ্রম শোষণ করে অল্প সময়েই পাহাড় পরিমাণ অর্থ-বিত্তের মালিক হয়। শ্রমিকদের কম মজুরি দিয়ে, তাদের ঠকিয়ে গড়ে তোলে একাধিক শিল্প-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। কারখানায় তাদের কোনো অংশীদারিত্ব থাকে না। শ্রমিকের আরেকটি প্রণিধানযোগ্য অধিকার হলো লভ্যাংশের ভিত্তিতে অংশীদারিত্ব লাভ করা। এ ব্যাপারে মহানবী (সা) বলেছেন, “মজুরকে তার কাজ হতে অংশ দান কর, কারণ আল্লাহর মজুরকে বঞ্চিত করা যায় না।” (মুসনাদে আহমাদ)
শ্রমিকের পেশা পরিবর্তন বা কর্মস্থল পরিবর্তনে অধিকার থাকবে। এতে কারও ইচ্ছায় হস্তক্ষেপ করে স্বাধীন সত্তায় বাধা প্রদান উচিত নয়। সমাজ ব্যবস্থায় মানুষের ব্যক্তিত্বকে এমনভাবে ক্ষুণœ করা হয়েছে যে, শ্রমিককে তার এই মানবিক স্বাধীনতা হতে বঞ্চিত করা হয়েছে। এ ব্যবস্থায় শ্রমিক ইচ্ছামত কাজ নির্বাচন করে নিতে বা এক স্থান হতে অন্য স্থানে গমন করতে পারে না।
শ্রমিকদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো যথাযথ মজুরিপ্রাপ্তি। মাসের পর মাস চলে যায় শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরি পায় না। মালিকগোষ্ঠী বরাবরই বিভিন্ন অজুহাতে শ্রমিকদের টাকা আত্মসাৎ করে কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখে। প্রাপ্য মজুরির দাবিতে শ্রমিককে মালিকের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে হয়। ইসলামের ঘোষণা হলো, যারা শ্রমিকের পাওনা দিতে টালবাহানা করবে, হাশরের ময়দানে আল্লাহ নিজেই তাদের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াবেন। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, আমি কিয়ামতের দিন তিন শ্রেণীর মানুষের প্রতিপক্ষ। আর আমি যার প্রতিপক্ষ, তাকে পরাজিত করবই। তন্মধ্যে এক শ্রেণি হলো, যে কোনো শ্রমিক নিয়োগ করে, অতঃপর তার থেকে পুরো কাজ আদায় করে নেয় কিন্তু তার পারিশ্রমিক প্রদান করে না।’ (বুখারি : ২/৭৭৬) শ্রমিকের পাওনা যথাসময়ে পরিশোধের ব্যাপারে মহানবী (সা) কঠোর হুঁশিয়ারি প্রদান করেছেন। অবিলম্বে মজুরি প্রদান করার ব্যাপারেও তিনি ছিলেন সবচেয়ে আন্তরিক। মজুরির প্রশ্নে মানবসভ্যতার ইতিহাসে শীর্ষে অবস্থান করছে তাঁর বাণী। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ‘শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার পারিশ্রমিক পরিশোধ করে দাও।’ (ইবনে মাজাহ : ২/৮১৭) শ্রমজীবী মানুষ বা কোনো শ্রমিক অবসর নেয়ার পর তার বাকি জীবন চলার জন্য অর্থনৈতিক সুবিধা বা পেনশনের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। এ ব্যাপারেও ইসলাম নীরব নয়। হজরত ওমর (রা) বলেছেন, “যৌবনকালে যে ব্যক্তিশ্রম দিয়ে রাষ্ট্র ও জনগণের খেদমত করেছেন বৃদ্ধকালে সরকার তার হাতে ভিক্ষার ঝুলি তুলে দিতে পারে না।
১৮৮৬ সালের ১ মে আমেরিকার শিকাগো শহরের ‘হে’ মার্কেটে অধিকারবঞ্চিত শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কাজসহ বিভিন্ন দাবিতে সংগঠিত হয়ে আন্দোলন শুরু করেন। বিক্ষোভ সমাবেশে অনেক নিরীহ শ্রমিক পুলিশের গুলিতে নিহত হন। শ্রমজীবী মানুষের আপসহীন মনোভাব ও আত্মত্যাগের ফলে ৮ ঘণ্টা কাজের স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। ১ মে শ্রমিক আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হয়। হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর হাদিস, শ্রমিকদের সাধ্যের অতীত কাজে কখনো খাটাবে নাÑ এ নির্দেশনামূলক কথাটির কিছু অংশ হলেও ১ মের আন্দোলনে প্রতিফলিত হয়। অথচ মহানবী (সা) একজন শ্রমিককে তার শ্রমের মর্যাদা ও গুরুত্ব প্রদান করতে গিয়ে তাকে আল্লাহর বন্ধু হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। রাসূলের (সা) অপর তাগিদটি হলো শ্রমিকের প্রাপ্যতা নিয়ে। মহানবীর (সা)-এর বাণীতে শ্রম ও শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদার বিষয়টি অভূতপূর্ব স্বীকৃতি পেয়েছে। এ বাণীর আলোকে যদি বিশ্ব শ্রমব্যবস্থা প্রবর্তিত হতো, তাহলে ১৮৮৬ সালের ১ মে আমেরিকার শিকাগো শহরে শ্রমিক ও শ্রম-ইতিহাসের মর্মন্তুদ ঘটনার সৃষ্টি হতো না।
নবী-রাসূল ও সাহাবীদের শ্রমের দৃষ্টান্ত : বিশ্বমানবতার শ্রেষ্ঠ সুহৃদ মুহাম্মদ (সা) নিজেকে শ্রমিক শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত করে পৃথিবীর সব শ্রমিককে ধন্য ও মর্যাদাশীল করেছেন। মহানবী (সা) নিজে বকরি চরিয়েছেন, হযরত মূসা (আ) নিজে হযরত শোয়াইব (আ)- এর নিকট নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকের বিনিময়ে শ্রম বিক্রি করেছেন, দাউদ (আ) কর্মকার ছিলেন, আদম (আ) ছিলেন কৃষক, নূহ (আ) ছুতার ও ইদ্রিস (আ) দর্জি ছিলেন। মহানবী (সা) তার প্রিয়তম কন্যা ফাতেমাকে একজন উত্তম শ্রমিকের কাছে পাত্রস্থ করেছিলেন; যিনি শিক্ষা ও বীরত্বের দিক থেকেও ছিলেন সমান পারদর্শী। আমিরুল মোমেনিন হযরত আলী (রা) নিজে জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম হিসেবে শ্রমিকের জীবন বেছে নিয়েছিলেন। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা) ছিলেন কাপড়ের ব্যবসায়ী।
কোদাল চালাতে চালাতে একজন সাহাবীর হাতে কালো দাগ পড়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সা) তার হাত দেখে বললেন, “তোমার হাতের মধ্যে কি কিছু লিখে রেখেছ?” সাহাবী বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা) এগুলো কালো দাগ ছাড়া আর কিছুই নয়। আমি আমার পরিবার-পরিজনের ভরণ-পোষণের জন্য পাথুরে জমিতে কোদাল চালাতে গিয়ে হাতে এ কালো দাগগুলো পড়েছে। নবীজি (সা) এ কথা শুনে ওই সাহাবীর হাতের মধ্যে আলতো করে গভীর মমতা ও মর্যাদার সাথে চুমু খেলেন। এভাবে অসংখ্য কর্ম ও ঘটনার মাধ্যমে হযরত মুহাম্মদ (সা) পৃথিবীতে শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা) শ্রম দিয়ে জীবিকা অর্জন করার প্রতি গুরুত্ব প্রদান করে বলেন, ‘কারও জন্য নিজ হাতের উপার্জন অপেক্ষা উত্তম আহার্য বা খাদ্য আর নেই। আল্লাহর নবী দাউদ (আ) নিজ হাতের কামাই খেতেন।’ (বুখারি, মিশকাত হা/২৭৫৯)
বিশ্ববিখ্যাত ইসলামী পন্ডিত ও ইমামগণও তাঁদের নিজেদের মূল নামের পাশাপাশি পেশাভিত্তিক পরিচয় দিতে বিন্দুমাত্রও লজ্জাবোধ করতেন না। ‘আত্তার’ অর্থাৎ আতর বিক্রেতা, কাত্তান (তুলা উৎপাদনকারী), খাব্বাজ (রুটি ব্যবসায়ী) ইত্যাদি পেশাভিত্তিক উপাধি ব্যবহার করতেন তাঁরা।
শ্রমিকদের ভুল-ত্রুটিকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখা : বর্তমান সময়ে কল-কারখানা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রায়শই শ্রমিকরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। আজকাল পত্রিকার পাতা খুলতেই শ্রমিক নির্যাতনের খবর ভেসে ওঠে; অনেক সময় নিষ্ঠুর ও পাশবিক নির্যাতনের মাধ্যমে তাদেরকে মেরে ফেলা হচ্ছে। কল-কারখানার শ্রমিক তো বটেই, গৃহের শ্রমিকও বাদ যাচ্ছে না পাশবিক নির্যাতন ও নিষ্ঠুরতা থেকে। ঠুনকো অভিযোগে শ্রমিককে মারধর করার অধিকার কিছুতেই দেয়নি ইসলাম। হযরত আবু মাসউদ (রা) বলেন, আমি আমার চাকরকে মারধর করছিলাম। আমি পেছন থেকে আওয়াজ শুনতে পেলাম, ‘সাবধান আবু মাসউদ! তুমি তোমার গোলামের ওপর যতটুকু ক্ষমতা রাখো, আল্লাহ তোমার ওপর এর চেয়ে বেশি ক্ষমতা রাখেন।’ আমি পেছনে ফিরে দেখি, তিনি আমার প্রাণের নবী। আমি তখন বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি তাকে আল্লাহর জন্য আজাদ করে দিলাম। রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে বললেন, তুমি যদি তাকে মুক্ত না করতে তবে অবশ্যই তোমাকে আগুনে জ্বলতে হতো। (মুসলিম : ৫/৯২) একজন কেনা গোলামের গায়ে হাত তোলায় নবীজি (সা) কত বড় ধমক দিলেন! শ্রমিক কোনো ভুল করে ফেললেও তার জন্য ক্ষমার দরজা খোলা রেখেছে ইসলাম। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে এক লোক এসে জিজ্ঞেস করল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! শ্রমিককে কতবার ক্ষমা করব? নবীজি চুপ থাকলেন। লোকটি আবারও জিজ্ঞেস করলে নবীজি (সা) চুপ থাকলেন। লোকটি তৃতীয়বার জিজ্ঞেস করলে নবীজি (সা) বললেন, ‘প্রতিদিন ৭০ বার হলেও তার অপরাধ ক্ষমা করবে।’ (আবু দাউদ : ২/৭৬৩)
পরিশেষে ইসলাম শুধু শ্রমিক-মালিক সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার কথাই বলে না বরং সমগ্র মানবজাতির মধ্যে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে চায়। মানুষে মানুষে হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতার পরিবর্তে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি গড়ে তুলতে চায়। আর ইসলাম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই শ্রমিক-মালিক, নারী-শিশু-পুরুষ সর্বশ্রেণির মানুষ পাবে তাদের অধিকার, দূর হবে সকল প্রকার অশান্তি ও হানাহানি এবং বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত হবে শান্তি ও নিরাপত্তা। যে কোন শ্রমকেই আমাদের গুরুত্ব দেয়া উচিত এবং শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার সুরক্ষায় সম্ভাব্য সব প্রচেষ্টাই একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ জাতি-রাষ্ট্রের এক অনিবার্য অনুষঙ্গ হওয়া আবশ্যক। আগামী দিনে বাংলাদেশসহ বিশ্ব শ্রমিকরা নিজেদের প্রয়োজনে ইসলামের দেয়া শ্রমের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসবেন ইনশাআল্লাহ। (সমাপ্ত)
লেখক : সেক্রেটারি জেনারেল, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ