ঢাকা, শনিবার 5 May 2018, ২২ বৈশাখ ১৪২৫, ১৮ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

শ্রমিকের চিৎকার তো থামলো না

খান মুহাম্মদ ইয়াকুব আলী : সেই কত বছর আগে শিকাগো শহরে শ্রমিক ট্রাজেডি। আট ঘণ্টা কর্ম করার দাবিতে আন্দোলন এবং শেষ পর্যন্ত জীবন দেয়া। যতদিন পৃথিবী থাকবে ততদিন শ্রমিকের এ ত্যাগের কথা স্মরণ থাকবে। জীবন বাজি রেখে আট ঘন্টা কর্মদিবস বা দিনে আট ঘন্টা শ্রম দেয়ার যে অধিকার আদায় করলো যে দিনে সে দিবসটিকে বলা হয় শ্রমিক দিবস। আজ আমরা ১ মে যা শ্রমিক দিবসে বিভিন্ন রকম অনুষ্ঠান ও বক্তব্য দেখতে পাই। অথচ শ্রমিকের বুক ফাটা কান্না আর মুখের চিৎকারে আকাশ বাতাস যেন নীরব হয়ে আছে। এক সময় যেমন শ্রমিক বেচাকেনা হতো তখন তাদের কোন অধিকার বা মতামত প্রকাশের সুযোগ ছিল না। আন্দোলনের তো প্রশ্নই আসে না। একেবারে বিক্রি হয়ে যাওয়া থেকে একটু ভালো তা হলো শ্রম দিবে টাকা নিবে। এখানেও সমস্যা, একদিকে ১২-১৬ ঘন্টা খাটানো, অন্যদিকে টারমিনেশন আইন। এ টারমিনেশন ছিল মূলত শ্রমিকের অধিকার। যেমন কোন শ্রমিক যদি অন্য কোন কল-কারখানায় ভাল বেতনে কাজ পায় তখন কোন পূর্ব নোটিশ না দিয়েই সে অন্যত্র চলে যেতে পারবে। একজন শ্রমিক যদি অন্য কোন প্রতিষ্ঠানে ভালো কাজ ভালো সুবিধা পায় আর ঐ প্রতিষ্ঠানকে বলে ‘চাকুরী তো দিলেন কিন্তু তিন মাস পর কাজে যোগদান করবো’। তাহলে কি তাকে কেউ চাকরি দিবে? ঐ প্রতিষ্ঠানের বর্তমানে একজন দক্ষ শ্রমিক দরকার, তাই সে বেশি বেতন দিয়ে একজন দক্ষ শ্রমিক নিয়োগ দিবে জরুরি ভিত্তিতে। এখানে যদি ঐ দক্ষ শ্রমিক বলে আমার বর্তমান চাকরিস্থল থেকে চাকরি ছাড়তে হলে তিন মাস পরে ছাড়তে হবে। তবে আর এ শ্রমিকের নতুন চাকরি হচ্ছে না। তাই শ্রম আইন শ্রমিকের অধিকার ও সুযোগ রক্ষার জন্য মালিককে টারমিনেট করতে পারবে অর্থাৎ তিন মাসের বেতন মালিককে ফেরত দিয়ে যখন তখন চাকরি থেকে অব্যাহতি নিতে পারবে। ভাগ্যের পরিহাস শ্রমিকের সে রক্ষাকবজ আজ মালিকের নির্যাতনের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন কথায় কথায় কেবল শ্রমিক ছাঁটাই করাই নয়, একেবারে বিনা কারণে তিন মাসের মূল বেতন দিয়ে বলে দেয়া হয় ‘কোন কারণ ব্যতীত আপনার চাকরির অবসান ঘটানো হলো’।
আমার জানামতে, দেশের একটি প্রভাবশালী এবং আদর্শের লালনকারী ব্যাংকের সহযোগী সংস্থা যাদের কাজ হচ্ছে মানবতার সেবা। অথচ এ প্রতিষ্ঠানের কিছু আইন বিরোধী কার্যকলাপের বিরোধিতা করায় প্রতিষ্ঠানের ২২ বছরের অভিজ্ঞ ও পুরাতন এমপ্লয়ীকে ‘বলে দেয়া হলো কোন কারণ ব্যতিতই আপনার চাকরির অবসান ঘটানো হলো।’ অবশ্য এ বিষয়ে সে এমপ্লয়ী বড় ধরনের প্রতিকার পাওয়ার আশায় শ্রম আদালতে না গিয়ে বিজ্ঞ জজ আদালতে মামলা করেই বসে থাকেনি। নিজে আইন বিদ্যা পাস করে এ মামলা অর্থাৎ নিজের মামলার আর্গুমেন্ট করার জন্য নিজেই প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হলো আপনার অভিপ্রায় কি? সে উত্তর দিয়েছে, শুনা যায়, এসব প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কেউ মামলা করতে সাহস পায় না। এদের অনেক টাকা, এরা টাকা দিয়ে সব ঠিক করে ফেলে। তাই আমি এ বিষয়টি জনগণের নিকট এবং শ্রমিক সমাজের নিকট প্রমাণ করে দিতে চাই, কেবল প্রভাব আর টাকার জোরে শ্রমিকের অধিকার সব সময় ভুলুণ্ঠিত করা যায় না। যে শ্রমিক বুকের রক্ত আর জীবন দিয়ে নির্যাতন আর জুলুম থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি পায়। আট ঘন্টা কর্মদিবস আদায় করে। সে শ্রমিক সমাজ যে আজ সর্বত্রই অধিকার বঞ্চিত এমনটি নয়। সেই শিকাগো শহরে গিয়েছিলেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক। তিনি তার কেস স্টাডি রিপোর্টে বর্ণনা করেন ‘শিকাগো শহরের উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেল সেখানকার শ্রমিকরা এ বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করছে। এক রুমে সমাজবিজ্ঞান, কোন রুমে ইংরেজি, কোথাও বা আইনের উপর পড়াশোনা চলছে।’ বলতে হয়, যে শিকাগো শহরে শ্রমিকদের রক্ত ঝরেছে সেখানেই আবার শ্রমিকরা উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করার সুযোগ পাচ্ছে। অথচ আমাদের দেশের শ্রমিকদের অবস্থা বিবেচনা করলে দেখা যায়, শ্রমিক সমাজ যে আবার লেখাপড়া করে বড় মাপের মানুষ হতে পারে তা তারা জানেই না। আর কেউ মনে করিয়ে দিবে কেন? যারা বড় মাপের গোফ রেখে শ্রমিক দরদী সাজে তারা কি কখনও বলেছে, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় এসএসসি থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নেয়ার সুযোগ রয়েছে একজন শ্রমিকের। না তা বলেনি। কারণ শ্রমিক যদি শিক্ষিত হয়ে যায়, তাহলে ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করবে কাকে? তাই কি সরকার কি বিরোধী শিবির সবাই কেবল সস্তা রাজনীতি করার হাতিয়ার হিসেবে শ্রমিকদের ব্যবহার করে। আমার এক চাচাতো ভাই এলাকার মাতুব্বর। তিনি আমাকে বলেছিলেন কি হবে লেখাপড়া করে, ক্ষেতে-খামারে কাজ করো’ তখন তার কথা বুঝতে পারিনি। আজ বুঝতে পারছি। সবাই নিজের স্বার্থের কথা বিবেচনা করেই কথা বলে থাকেন। আশার আলো আমরাও দেখছি। গত ক’দিন পূর্বে গাজীপুরের একজন শ্রমিক নেতা বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন গাজীপুর মহানগরীর সভাপতি জনাব আজহারুল ইসলাম মোল্লার সাথে কথা বললে তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘রানা প্লাজায় শ্রমিকদের যে অবর্ণনীয় বেদনার চিত্র আমরা দেখেছি, এর পরেও সরকার থেকে তাদের জন্য কোন সন্তোষজনক, কল্যাণকর কাজ করা হয়নি। বরং সরকারের মন্ত্রী শ্রমিকদের দরদী হয়ে শ্রমিক সম্মেলন করে। মানুষকে যেন কি বুঝাতে চায়। একদিকে সরকারের মন্ত্রী অন্যদিকে শ্রমিক নেতা এটা মানুষ বুঝে ফেলেছে। আবার যারা সমাজতন্ত্রের মহামন্ত্র দিয়ে শ্রমিকের ভাগ্যের পরিবর্তনের কথা বলে তাদের কথাও এখন আর শ্রমিক সমাজ বিশ্বাস করে না। আমরা ইসলামী শ্রমনীতি প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করি, যার মূল কথা হচ্ছে, শ্রমিক আল্লাহর বন্ধু, ইসলাম বলে, রমযান মাসে শ্রমিকের পরিশ্রম কমিয়ে দাও। ইসলাম বলে, শ্রমিকের শরীরের ঘাম শুকানোর পূর্বেই তার ন্যায্য পারিশ্রমিক দিয়ে দাও। ইসলামী শ্রমনীতির বক্তব্য হচ্ছে, শ্রমিক কেবল একটি কলকারখানার শ্রমিকই নন সে ঐ প্রতিষ্ঠানের মালিকও বটে। বিভিন্ন সময় ইনসেনটিভ বোনাস দিয়ে সে বোনাসকে নগদ প্রদান না করে তা শেয়ার হিসেবে দিলে এমন কয়েক বছর ইনসেনটিভ বোনাস দেয়ার পর একজন শ্রমিক অল্প সময়েই ঐ প্রতিষ্ঠানের মালিক পক্ষ হয়ে যাবে। যখন শ্রমিক দেখবে, সে নিজেও এ প্রতিষ্ঠানের একজন শেয়ারহোল্ডার, তখন পারিশ্রমিকের পাশাপাশি সে লভ্যাংশও পাবে। এমন সুযোগ-সুবিধা পেলে শ্রমিক কখনই কাজে অবহেলা করবে না এবং সে ঐ প্রতিষ্ঠানের কল্যাণ আত্মনিয়োগ করবে। মালিক-শ্রমিক দ্বন্দ্ব থাকবে না। আদর্শের লালন করার দরুণ স্লোগান দিবে ‘মালিক-শ্রমিক ভাই ভাই, আলোচনার মাধ্যমে সমাধান চাই।’ মালিক-শ্রমিক মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠলে যেমন কোন দ্বন্দ্ব থাকবে না আবার উৎপাদন ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে এক বিপ্লব সাধিত হবে। এ বিশ্বাস নিয়ে আমরা কাজ করছি এবং আমাদের যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেখানে এ আদর্শের পরিবেশ তৈরি করতেও আমরা সক্ষম হয়েছি। ফলে আজ হাজার হাজার শ্রমিক আমাদের এ সংগঠনে যোগদান করছেন। অনেকে বলেছেন, আমরা এতদিন ভুল পথে ছিলাম, প্রকৃতপক্ষে ইসলাম ও ইসলামী শ্রমনীতিই খেটে খাওয়া মানুষকে মুক্তি দিতে পারে এবং শ্রমিকের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পারবে। তাই আমরা মনে করি, সেদিন খুব বেশি দূরে নয়, যেদিন এদেশের শ্রমিক সমাজ ইসলামী শ্রমনীতি প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যোগদান করবে এবং একটি শান্তির সমাজ প্রতিষ্ঠা লাভ করবে। জনাব আজহারুল ইসলাম মোল্লার কথাগুলো মনোযোগ সহকারে শুনার পর মনে হলো, একথাগুলো পত্রিকার পাতায় ছাপা হলে হতেও পারে, শ্রমিক সমাজের মধ্যে কিছুটা হলে আলোড়ন সৃষ্টি হতে পারে। তাই আমাদেরকেও মনে রাখা দরকার, কেবল প্রতিবছর ১ মে আসলে শ্রমিকবান্ধব হয়ে মঞ্চে উঠে বড় গলায় বক্তব্য দিয়ে সকাল বেলা কারখানায় গিয়ে কথায় কথায় শ্রমিক ছাঁটাই করা। আবার পুরাতন শ্রমিককে তিন মাসের নোটিশ পে-প্রদান করে কম মূল্যে শ্রমিক নিয়োগ করার মত ন্যক্কারজনক কাজ করা এমন দ্বিমুখী চরিত্রের লোকদের দ্বারা কোন দিন শ্রমিকের ভাগ্যের পরিবর্তন সম্ভব নয়। শ্রমিকের সাথে এমন সব প্রতারণা না করে দেশের উন্নয়ন আর উৎপাদনের স্বার্থে নীতিনৈতিকতার স্বার্থে শ্রমিকদেরকে আপন মনে করে তাদের সুযোগ সুবিধার দিকে লক্ষ্য রেখে যদি পরিকল্পিতভাবে কাজ করা যায়, তাহলে আমরা পারবো জাপান, চায়না বা সিঙ্গাপুরের মত উন্নত দেশে পরিণত হতে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ