বুধবার ১৬ জুন ২০১০
Online Edition

পৃথিবীর সর্বশেষ জংলীমানব -নিষ্কাম মিত্র

বোৎসোয়ানার মধ্য কালাহারি গেম সংরক্ষণাগার। এই বিশাল সংরক্ষিত এলাকার ১ হাজার জংলী মানবকে পৃথিবীর সর্বশেষ জংলীমানব হিসেবে বর্ণনা করা হয়ে থাকে। একান্ত নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী শিকার কৌশলের ওপর নির্ভর করে এরা বেঁচে আছে। নিকটতম শহর থেকে পাঁচ ঘণ্টার পথ দূরে এখানকার সেড নামক জনবসতিতে পশ্চিমা সভ্যতার প্রচুর চিহ্ন রয়েছে। এখানকার মরুভূমিতে টিনেক ক্যান থেকে দুধের ফ্লাস্টিক পাত্র পর্যন্ত নানা পরিত্যাক্ত বর্জ্য ছড়িয়ে আছে। এগুলোর মধ্যে কিছু কিছু জিনিস স্কুলের আসবাবপত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এখানে ছাগল, মুরগি ও গাধা ভরে রাখা হয়। কাউকেই চামড়ার পোশাক বা কোনো লতাগুল্মের সাজ পরতে দেখা যায় না। অথচ ‘দ্য গডস মাস্ট বি ক্রেজি' চলচ্চিত্রে তাদেরকে ঐভাবেই চিত্রিত করা হয়েছে। এখানকার জংলী মানবদেহের ত্বকের রং বৈশিষ্ট্যপূর্ণভাবে হলুদ এবং চেহারা এশীয়দের মতো। তবে আফ্রিকার বেশির ভাগ লোকদের মতোই ভীষণ গরীব। তারা পুরাতন কাপড় পরে এবং গাছের ডাল দিয়ে তৈরি কুঁড়ে ঘরে বাস করে। ঘরের ফাঁকগুলো গোবর, কাদা ও প্লাস্টিক বা অন্যকিছু দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়। যাতে করে বাতাস বা উড়ন্ত বালি ঘরে ঢুকতে না পারে। জংলীমানবরা দক্ষিণ আফ্রিকার নিম্নশ্রেণীর লোকদের মতোই বহু দশক ধরে জীবনযাপন করছে। শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গ উভয়েই তাদেরকে হীন জাতি হিসেবে তাচ্ছিল্য করছে। গবাদি পশুর প্রাণনাশক হিসেবে তাদের কাউকে কখনো ধরা হলে তাদেরকে অবজ্ঞা করা হয়েছে ও তাদের সাথে পাশবিক ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এখানে তারা লড়াই জারি রেখেছে। বোৎসোয়ানা সরকার সংরক্ষিত এলাকা থেকে তাদের বের করে দিতে চায়। সরকার বলেছে, একটি জাতীয় পার্কে তাদের গবাদি পশু চারণ এবং বন্দুক দিয়ে শিকার করার খেলা বরদাস্ত করা যেতে পারে না। অধিকন্তু তারা বলেছে, জংলী মানবদের জন্যে এখন মরুভূমি ত্যাগ করে লেখাপড়া শেখা, জীবিকা উপার্জন এবং পরিশেষে বিভিন্ন উপায়ে বিংশ শতাব্দীতে যোগ দেয়ার সময় এসে গেছে। বোৎসোয়ানার ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, কম্পিউটার যুগে প্রস্তর যুগের প্রাণীর টিকে থাকা আপনারা কেমন করে আশা করতে পারেন। জংলীমানবরা যদি টিকে খাতে চায়, তাহলে তাদেরকে অবশ্যই বদলাতে হবে অন্যথায় তারা ডোডো পাখির মতোই নিঃশেষ হয়ে যাবে। কালাহারির জংলীমানবরা বলেন, তারা কোথাও যাবেন না। তারা দাবি করেন যে, এই ভূমি তাদেরই বলে স্বীকৃতি দিতে হবে। গ্যাবতে লোলয়ে মাৎসোমা ৫০ বছর ধরে সেডে বসবাস করছেন। খরা ও দুর্ভিক্ষে তাড়িত হয়ে তিনি মরুভূমির আরও প্রত্যন্ত এলাকা থেকে এখানে এসে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেন, সরকার আমাদের তুলনায় প্রাণীদের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। আমাদের প্রতি আরও বেশি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা উচিত। আমাদের সাথে ভাল ব্যবহার করা হয়নি, কারণ আমাদের তুলনায় তাদের জীবনধারা অনেক বেশি উন্নত। সরকার বহু বছর ধরে জংলী মানবদের পার্ক থেকে বের করে দিতে চেয়েছে, তবে এ ব্যাপারে খুব সামান্য কিছু করেছে। তবে সরকার সেডে জরুরি খাদ্য, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং একটি খন্ডকালীন হেলথ ক্লিনিকের মতো সহায়ক সার্ভিসের জন্য প্রতিবছর যথেষ্ট অর্থ ব্যয় করেছে। কিন্তু সরকার জংলী মানবদের ঐ এলাকা ছাড়ানোর জন্য চাপ প্রয়োগ করতে শুরু করেছে। জংলী মানবদের মধ্যকার এক বৈঠকে বহু জংলী মানবদের মধ্যে এরকম বিশ্বাস জন্মায় যে, তারা যদি নিজেদের ওপর ভর করে না চলে তাহলে তাদেরকে অপসারণ করা হবে। এই বিরোধ আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। সেখানে কি ঘটছে তা দেখার জন্য যুক্তরাষ্ট্র, সু্ইডেন, নরওয়ে ও বৃটেনের রাষ্ট্রদূতরা সেডে জমায়েত হন। এতে বোৎসোয়ানা, নামিবিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার জংলী মানবদের দুর্দশার ওপরও আলোকপাত করা হয়েছে। আফ্রিকায় কিছু কিছু জলগোষ্ঠী খুবই পশ্চাদপদ হয়ে আছে। তারা পশু খামারে অথবা নোংরা পুনঃবসতি শিবিরে কার্যত দাস হিসেবে জীবনযাপন করে। তবে কালাহাতির জংলীমানব বা তাদের রক্ষা করা কেউই তাদের ব্যাপারে কি করা ায়, সে ব্যাপারে একমত হতে পারেনি। তাছাড়া এদের কোনো নামকরণই হয়নি। কেউ কেউ জংলী মানবদের ক্রমহ্রাসমান জনগোষ্ঠী বলে মনে করে। তবে জংলীমানব সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত নাম। কেউ কেউ মানব জনগোষ্ঠী বলতে পছন্দ করে। অন্যরা এদেরকে এখনো ‘রেড পিপল' বলে। কেউ কেউ গেম সংরক্ষিত এলাকাকে দু'ভাগে ভাগ করে একাংশ জংলী মানবদের দিয়ে দেয়ার পক্ষপাতি। আমরা মনে করি জংলীদের তাদের জায়গায়ই থাকতে দেয়া উচিত। তবে তাদেরকে পর্যটন শিল্পের সাথে একীভূত করে নিয়ে পার্কের জন্য এলাকাটির উন্নতি সাধন করার পক্ষে মত দেয়। তাদেরকে শিকার সন্ধানী হিসেবে কাজ দেয়া অথবা গাছের ঈবন সম্পর্কে শিক্ষা দেয়া যেতে পারে। প্রত্যেকই বলে থাকেন যে, আধুনিক সমাজে বেঁচে থাকার ব্যাপারে সাহায্য করতে গিয়ে একটি জনগোষ্ঠীর মর্যাদা ও সংস্কৃতি রক্ষা করাই হচ্ছে মূল চ্যালেঞ্জ। বেসরকারি অলাভজনক সংস্থা বোৎসোয়ানা মানবাধিকার কেন্দ্র ডিশওয়ানেলোর প্রধান এলিস মনওয়ে বলেন, বাসার ভয়া উন্নয়নে অংশগ্রহণ করতে চায়। প্রশ্ন হচ্ছে, তাদেরকে ধ্বংস না করেই কিভাবে এলাকাটি প্রবেশযোগ্য করা যায়। যেটা সুস্পষ্ট সেটা হচ্ছে খুব অল্পসংখ্যক জংলীমানব লাফ দিয়ে নেংটি পোশাক পরে বিষাক্ত তীর তৈরি এবং এন্টিনার সন্ধান করতে ছুটে যাবে। কালাহারি কখনই স্বর্গ ছিল না। সাম্প্রতিক খরা এবং গবাদিপশু পালার জন্য দেশের একাংশ বেড়া দেয়ার চেষ্টায় এই এলাকায় শিকারের সম্ভাবনা নস্যাৎ হয়ে গেছে। তারা ঐতিহ্যবাহী অধিকার দাবি করছে না। তারা আধুনিক নাগরিকত্বের অধিকার চাচ্ছে। তারা যতদিন ঐ পার্কে থাকবে ততদিন ঐসব অধিকার পাবে না। ্য (বিদেশী পত্রিকা অবলম্বনে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ