ঢাকা, সোমবার 7 May 2018, ২৪ বৈশাখ ১৪২৫, ২০ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

অপরাধী গ্রেফতার দূরে থাক দু’মাসেও শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশে যোগদানকারীদের মিছিল থেকে একাধিকস্থানে নারীদের যৌন নিপীড়নের আলোচিত-সমালোচিত ঘটনার দু’মাস পার হচ্ছে আজ। যৌন নিপীড়নের তোলপাড় করা ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্তে কোনও অগ্রগতি হয়নি গত দু‘মাসেও। নারী লাঞ্ছনা ও  হয়রানির ভিডিও চিত্র পাওয়া গেলেও অভিযুক্তদের দুই মাসেও শনাক্ত করে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। ঘটনার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং পুলিশ কর্মকর্তারা অভিযুক্তদেরকে দ্রুত আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দিয়েছিলেন। সেদিনকার ঘটনাগুলোর মধ্যে  অন্তত একটি ঘটনার ভিডিও ফুটেজ পেয়েছে পুলিশ। সেটি জানিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বয়ং। কিন্তু সেই ফুটেজ থেকে কাউকেই শনাক্ত করা যায়নি।
ভিডিও ফুটেজ পাওয়ার পরও দুই মাসে অভিযুক্তরা গ্রেফতার না হওয়ায় পুলিশের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মানবাধিকার কর্মী সালমা আলী।
আর পুলিশ বলছে,ঘটনাস্থলের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহের পর তা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ফুটেজ হাতে পেলেও কাউকেই শনাক্ত করা যায়নি। পুলিশ এখন আরও নতুন ভিডিও চিত্র পাওয়ার চেষ্টার কথা বলছে।
অথচ ওই ঘটনার ১০ দিন পর বাসে যৌন হয়রানির ঘটনায় অভিযুক্ত বাস চালক ও সহকারীকে পুলিশ গ্রেফতার করতে পেরেছে। অভিযোগকারী ফেসবুকে তার প্রতিক্রিয়া জানানোর পর পুলিশ তার সঙ্গে যোগাযোগ করে অভিযান চালায়।
তদন্ত কর্মকর্তাদের দাবি, বেশ কয়েকটি অভিযোগের কথা শোনা গেলেও মাত্র একটি ঘটনায় ভুক্তভোগীকে পাওয়া গেছে। তার অভিযোগটি তদন্ত করা হচ্ছে। ঘটনাস্থলের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে।
গত ৭ মার্চ রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত আওয়ামীলীগের সমাবেশে আসা মিছিল থেকে অন্তত ছয়টি স্পটে নারীদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে। যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের দেওয়া স্ট্যাটাস থেকে জানা গেছে। বাংলামোটরের ঘটনায় গত ৮ মার্চ রমনা থানায় মামলা দায়ের করেন ভুক্তভোগীর বাবা। ওই মামলাটি তদন্ত করছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের দক্ষিণ বিভাগ।
মামলার অগ্রগতি না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, সমাবেশে লাখো মানুষ এসেছিল। তাদের মধ্য থেকে কারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, সেটা আইডেন্টিফাই করা কিছুটা মুশকিল। আমরা ফুটেজ দেখে কোন এলাকার মিছিলটি সেসময় ঘটনাস্থল দিয়ে যাচ্ছিল, সেটা খুঁজে বের করা চেষ্টা করছি। সেটা ধরেই তদন্ত চলছে।
ফুটেজ দেখে যৌন নিপীড়নের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানান মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের দক্ষিণ বিভাগের এডিসি রাজিব আল মাসুদ। তিনি বলেন, ‘আমরা তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছি। ইতোমধ্যে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছি। সেটা দেখে আসামীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।’
একই বক্তব্য মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের দক্ষিণ বিভাগের ডিসি জামিল হাসানের। তিনি বলেন, ‘এখনও উল্লেখযোগ্য কোনও অগ্রগতি হয়নি। তদন্ত চলছে।’
 যৌন নিপীড়নের ঘটনার তদন্ত  নিয়ে পুলিশের সদিচ্ছার প্রশ্ন তুলে মানবাধিকার কর্মী সালমা আলী বলেন, ‘এই ঘটনা তো নতুন নয়। সেই ১৯৯৯ সালে থার্টিফার্স্ট নাইটে যৌন হয়রানির কোন বিচার হয়নি। এ কারণেই অপরাধীরা সব সময়ে ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকে। এর ফলে এই মনোভাবের মানুষ মনে করে তাদের কিছু হবে না। এ কারণেই তারা এসব অসভ্যতা করতে উৎসাহী হয়ে ওঠে।’
৭ মার্চে বেশ কিছু হয়রানির ঘটনা ঘটলেও বাংলামোটরে ঘটা একটি ঘটনায় ভুক্তভোগী কিশোরীর বাবা অজ্ঞাতদের আসামী করে মামলাও করেছিলেন। আর সরকারের পক্ষ থেকে দোষীরা যেই হোক না কেন শনাক্ত করে বিচারের আশ্বাসও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু আশ্বাসের কোনো বাস্তবায়ন হয়নি এখনও।
তিন বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানে যৌন হয়রানির ঘটনাতেও আট জনের ছবি পাওয়া গেলেও সাত জনের নাম ঠিকানা পাওয়া যায়নি। আবার একজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করলেও তিনি জামিনে মুক্ত হয়েছেন আর মামলার সাক্ষীরা আদালতে হাজিরা না দেয়ায় বিচারও এগুচ্ছে না।এই অভিজ্ঞতার কারণে ৭ মার্চের ঘটনায় বিচার হবে কি না, এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে সংশয়ের কথা বলাবলি হচ্ছে।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ সোহরাওয়ারর্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের স্মরণে গত ৭ মার্চ একই ময়দানে জনসভা করে আওয়ামী লীগ। আর এ জন্য আশপাশের বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল নিয়ন্ত্রিত ছিল। এ কারণে হেঁটে চলতে বাধ্য হয় মানুষ। আর চলার পথে জনসভায় আসা নেতা-কর্মীদের হাতে বেশ কয়েকজন নারী হয়রানির শিকার হন বলে অভিযোগ উঠে।
এদের মধ্যে ভিকারুননেসার ছাত্রী অদিতি বৈরাগী ফেসবুকে তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করার সঙ্গে সঙ্গে তা ছড়িয়ে যায়। তিনি জানান, বাংলামোটর এলাকায় সোহরাওয়ার্দীর সমাবেশে যাওয়া একটি মিছিল থেকে তাকে হয়রানি করা হয়েছে। তাকে থাপ্পরও দেয়া হয়েছে। এই ঘটনায় মানসিকভাবে ভয়াবহ বিপর্যস্ত জানিয়ে অদিতি এমনও লিখেন ‘আমি এই শুয়রদের দেশে থাকব না।’
অদিতির পাশাপাশি ইশরাতুল শোভা, আফরিন আসাদ মেঘলাসহ আরও বেশ কয়েকজন তরুণীও ফেসবুকে একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা লিখেন।
একজন লিখেছেন ‘আল্লাহ কেন মেয়েদের দুইটা হাত দিল? দুইটা হাত দিয়ে এতগুলো হাত থেকে বুক, পেট বাঁচাব, ওড়না ধরে রাখব নাকি তাদের হাতগুলো সরাব?’
অন্য একজন লিখেন, ‘হল থেকে বের হয়ে কোনও রিকশা পাইনি। কেউ শাহবাগ যাবে না। হেঁটে শহীদ মিনার পর্যন্ত আসতে হয়েছে। আর পুরোটা রাস্তাজুড়ে ৭ মার্চ পালন করা দেশভক্ত সোনার ছেলেরা একা মেয়ে পেয়ে ইচ্ছামতো টিজ করছে। নোংরা কথা থেকে শুরু করে যেভাবে পারছে টিজ করছে।’

নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
ওই ঘটনার পরদিন ৮ মার্চ রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান অদিতিকে হয়রানির ভিডিও পেয়েছেন তারা। মন্ত্রী সেদিন বলেন, ‘ভিডিও ফুটেজ দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপরাধী যে দলেরই হোক ছাড় দেওয়া হবে না।’ ১১ মার্চ রাজধানীতে অন্য একটি আলোচনায় মন্ত্রী বলেন,  ‘ভিকারুননেসা স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীকে বেশ কয়েকজন ওড়না ধরে টানাটানি করেছে এ ঘটনা সত্য। ভিডিও ফুটেজ দেখেছি, সেখানে দেখা গেছে।...ভিডিও ফুটেজ দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপরাধী যে দলেরই হোক ছাড় দেওয়া হবে না।’
তবে মন্ত্রীর সেই আশ্বাস অন্তত এখন পর্যন্ত ফলেনি। হয়রানির ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। আবার মন্ত্রী ভিডিও ফুটেজে প্রমাণ পাওয়ার কথা বললেও  পুলিশ এখন বলছে, তারা এখনো সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করছে। এরপর জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তের কাজ শুরু হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ