ঢাকা, সোমবার 7 May 2018, ২৪ বৈশাখ ১৪২৫, ২০ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেয়ার পরিমাণ বাড়িয়েছে সরকার

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেয়ার পরিমাণ বাড়িয়েছে সরকার। প্রতিবছরই বাড়ছে এর পরিমাণ। গত অর্থবছরে এখাত থেকে ঋণ নেয়ার রেকর্ড অতিতের সকল রেকর্ড ভেঙ্গেছে। চলতি অর্থবছরে সে রেকর্ডও অতিক্রম করবে বলে মন্তব্য সংশ্লিষ্টদের। কেননা চলতি অর্থবছরের ৯ মাসেই টার্গেটের ২২ শতাংশ বেশি ঋণ নিয়ে ফেলেছে সরকার।
প্রতিবছর বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার দেশী-বিদেশী বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিয়ে থাকে। এরমধ্যে স্থানীয়ভাবে বেশ কয়েকটি উৎস রয়েছে। এ সব উৎসের মধ্যে একটি হলো সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে। আর এ ঋণের পরিমাণ প্রতিবছরই বেড়েই চলেছে। সর্বশেষ চলতি ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে সরকার এ উৎস থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য মাত্রা নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু বছর শেষ না হতেই সে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বর্তমান সরকারের মেয়াদে প্রতিবছরই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে বেশি ঋণ নেয়া হচ্ছে। ২০১০-১১ অর্থবছরে (জুলাই-জুন) সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে সরকার ঋণ নিয়েছিল ১৭ হাজার ২৩২ কোটি টাকা। ২০১১-১২ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে ১৮ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা ঋণ নেয় সরকার। ২০১২-১৩ অর্থবছরে ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৩২৭ কোটি টাকায়। পরবর্তী অর্থবছর তথা২০১৩-১৪ অর্থবছরে ঋণ নেয়ার পরিমাণ কমিয়ে আনার ঘোষণা দেয় সরকার। কিন্তু সে ঘোষণা খাতা কলমেই রয়ে যায়। বরং তার মাত্রা বেড়ে যায়। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সরকার ঋণ নেয় ২৪ হাজার ৩১০ কোটি টাকা। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৪২ হাজার ৬৬০ কোটি টাকায়। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ঋণ আরও বেড়ে ৫৩ হাজার ৭১২ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকে। পরের অর্থবছর তথা গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ঋণ নেওয়ায় নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়। সরকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে ঋণ নেয় ৭৫ হাজার ১৩৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।
চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের সে রেকর্ডও ছাড়িয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা। ইতোমধ্যে চলতি অর্থ বছরের প্রথম ৯ মাসে লক্ষ্যমাত্রার ২২ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এ বছর সরকার নিট ঋণ নেয়ার পরিমাণ ধরেছিল ৩০ হাজার কোটি টাকা। ৯ মাসে তা গিয়ে ঠেকেছে ৩৬ হাজার ৭০৯ কোটি টাকায়। আর চলতি ৯ মাসে মোট ঋণ নিয়েছে মোট ৬০ হাজার ১২৫ কোটি টাকা। চলতি বছরের এখনো তিন মাস বাকি।
এদিকে ঋণ পরিশোধ ও নিট ঋণ নেয়ার পরিমাণে দেখা যায়, ২০১০-১১ অর্থবছরে সরকার সুদ-আসল বাবদ পরিশোধ করে ১৭ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা। নিট ঋণ ছিল ২ হাজার ৫৭ টাকা। ২০১১-১২ অর্থবছরে সরকার সুদ-আসল পরিশোধ করে ১৮ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা। নিট ঋণ ছিল ৪৭৯ কোটি টাকা। ২০১২-১৩ অর্থবছরে সুদ-আসল পরিশোধ করা হয় ২২ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা। নিট ঋণের পরিমাণ ছিল ৭৭২ কোটি টাকা।
পরবর্তী ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এ খাত থেকে ৪ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা নিট ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে সরকার। কিন্তু অর্থবছর শেষে নিট ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ১১ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা। পরের অর্থবছরে ৯ হাজার ৫৬ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এর তিনগুণেরও বেশি ২৮ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা ঋণ নেয় সরকার। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাজেটে ১৫ হাজার কোটি লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও বছর শেষে সরকার ঋণ নেয় ৩৪ হাজার ১৫২ কোটি টাকা। সর্বশেষ গত অর্থবছরে মূল বাজেটে ১৯ হাজার ৬১০ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও বছর শেষে এ খাত থেকে নিট ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫২ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। আর চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে এই খাত থেকে সরকার নিট ঋণের লক্ষ্য ধরেছিল ৩০ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। কিন্তু ৯ মাসে তা ছাড়িয়ে ৩৬ হাজার ৭০৯ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। এ নয় মাসে সুদ-আসল পরিশোধে সরকারের ব্যয় হয়েছে ২৩ হাজার ৪১৫ কোটি ৯১ লাখ টাকা।  
আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল পরিশোধের পর যা অবশিষ্ট থাকে, তাকে বলা হয় নিট বিক্রি। ওই অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা থাকে এবং সরকার তা রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজে লাগায়। বিনিময়ে সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের প্রতি মাসে সুদ দিতে হয়। এ কারণে অর্থনীতির পরিভাষায় সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রিকে সরকারের ‘ঋণ’ বা ‘ধার’ হিসেবে গণ্য করা হয়।
বর্তমানে পাঁচ বছর মেয়াদি পরিবার সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ শেষে পাওয়া যায় ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ সুদ। পাঁচ বছর মেয়াদি পেনশন সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। আর পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের সুদের হার এখন ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ। অন্যদিকে, তিন বছর মেয়াদি মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১১ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ এবং তিন বছর মেয়াদি ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষক জায়েদ বখত বলেন, মানুষ ব্যাংকের প্রতি আস্থা রাখতে পারছেন না। নিরাপদ বিনিয়োগ ভেবে সঞ্চয়পত্রই কিনছে। এতেই এ খাত থেকে সরকারের ঋণ বেড়ে যাচ্ছে।
সরকারের ঋণের বোঝা বেড়ে যাচ্ছে বলে গত বছরের মে মাসে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। কিন্তু বাজেট অধিবেশনে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীসহ অন্যান্য মন্ত্রী এবং সংসদ সদস্যরা অর্থমন্ত্রীর ওই ঘোষণার তীব্র সমালোচনা করায় শেষ পর্যন্ত আর সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানো হয়নি।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংক খাতের প্রতি মানুষের আস্থা কমেছে। ফলে অনেকেই ব্যাংক থেকে টাকা উঠিয়ে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছেন। এতে সরকারের ঋণও বেড়ে যাচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ