ঢাকা, সোমবার 7 May 2018, ২৪ বৈশাখ ১৪২৫, ২০ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

স্বামীর অবৈধ সম্পদের জন্য স্ত্রীদের সাজা কাম্য নয়

স্টাফ রিপোর্টার : দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত রাজনীতিবিদদের স্ত্রীরা সবচেয়ে বেশি স্বামীর অবৈধ সম্পদের জন্য সাজা পেতে হয়েছে। তার পরই রয়েছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর স্ত্রীরা।
গতকাল রোববার ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আয়োজিত এক সেমিনারে এমন তথ্য উপস্থাপন করা হয়। তবে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, স্বামীর অপরাধের জন্য স্ত্রীদের এভাবে সাজাপ্রাপ্ত হওয়াটা কাম্য নয়।
এ দেশে যে কতভাবে নারীরা ভুক্তভোগী হচ্ছেন তার একটি নমুনা যেন উঠে এসেছে টিআইবির এই বিশ্লেষণে। যেখানে দেখানো হয়, ২০০৭ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দুদক কর্তৃক মামলায় আদালতের রায়ে স্বামীর অবৈধ সম্পদ স্ত্রীর নামে রাখায় সবচেয়ে বেশি সাজার শিকার হয়েছেন রাজনীতিবিদের স্ত্রীরা। শতকরা হিসেবে ৫৫ শতাংশ। এর পরের অবস্থানে আছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর স্ত্রীরা। যা ২১ শতাংশ। আর মোট সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে ১০ ভাগের পরিচয় তাঁরা ব্যবসায়ীদের স্ত্রী।
সভায় জানানো হয়, ২০০৭ সাল থেকে ২০১৮ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত সময়ে দুদক কর্তৃক দায়েরকৃত ২৯টি মামলায় ২৯ জন নারীকে তাদের স্বামীর দুর্নীতির কাজে সহায়তা বা জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত সম্পদ অর্জন বা সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে অধস্তন আদালত থেকে কারাদন্ড বা আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ২০১৫ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত দুদক পরিচালিত স্বামীর অবৈধ সম্পদ স্ত্রীর নামে অর্জন সংক্রান্ত ১১৮টি অনুসন্ধান চালানো হয়। এক্ষেত্রে তদন্তাধীন মামলার সংখ্যা ৩০টি এবং চার্জশীটকৃত মামলার সংখ্যা ১৪টি।
সভায় টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুর্নীতির যে মামলাগুলো হয়, সেখানে অবৈধ আয়ের মাধ্যমে যে সম্পদ অর্জিত হয় সেটার বোঝা পুরুষের পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রেই যৌক্তিক কারণে, অনেক ক্ষেত্রে অযৌক্তিক কারণে নারীর উপরে পরে।
অপরাধ করবেন স্বামীরা আর এজন্য সাজা পাবেন তাদের স্ত্রীরা। এটা মোটেও কাম্য নয় বলে দুদক চেয়ারম্যানসহ উপস্থিত আলোচকদের অনেকেই একমত। তবে এর জন্য অনেকেই দায়ী করছেন বর্তমান সময়ে দুর্নীতি সামাজিকভাবে ঘৃণিত হয় না বলে।
দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, ‘আমার এক বন্ধু, আমরা তখন চাকরি শুরু করেছি মাত্র, আমি জিজ্ঞেস করেছি, ঘুষ খেয়ে তুই টাকা কী করস, তাও প্রায় ২৫ বা ৩০ বছর আগে, বলে সমস্যা আছে বুঝছিস, টাকা আনছি কিন্তু আইনা বউয়ের সামনে দিতে পারছি না। আমি বললাম, কেন, বলল, জিজ্ঞেস করে যে, এই টাকা কই পাইলা?’
আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা অ্যাকশন এইডের আবাসিক প্রতিনিধি ফারাহ কবির বলেন, ‘মানে, আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন শুনেছিলাম কে যেন সরকারি দুর্নীতি করেছিল থ্রি নট থ্রি না কি যেন একটা হয়েছিল মানে বলতেও পারব না। স্ক্যান্ডেল এবং তাঁদের সঙ্গেও কেউ যোগাযোগ করত না। আর এখন আপনি বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন যে দেখে নেব কে আমাকে কী করবে।’
দুদক চেয়ারম্যান আরো বললেন, ‘এরই মধ্যে অনেক নারী স্বামীর দুর্নীতির কারণে সাজাপ্র্প্তা হয়েছেন এবং ভবিষ্যতে আরো হবেন। তার প্রশ্ন, এই ধারা চলতে থাকবে কি না?’
ইকবাল মাহমুদ বলেন, ব্যাপারটা আমি যেই কনসেপ্টে এই আলোচনাটা শুরু করার জন্য চেয়েছিলাম এবং সেটা হয়েছে। কিন্তু আমি এখনো ওই সমাধানে আসতে পারিনি।
সমাধানটা হচ্ছে এই, সমাধান চাচ্ছি এইটা, যিনি জানেন না তাঁকে কেন আমি। ইভেন মিনিস্ট্রিকেও আমি বলেছি যে, ভাই কিছু একটা করেন। নারীরা তো ভিকটিম হয়ে যাচ্ছে এক। দুই, আমাদের নারীরাই যদি সচেতন হয়ে যায় তাহলে প্রিভেনশনও হয় আমাদের। প্রিভেনশন একটা কাজও হয় এবং দুর্নীতি কিন্তু যদি নারীরা জিজ্ঞেস করে যে টাকা কই পাইলা।’    
এদিকে টিআইবির অনুসন্ধানে আরো উঠে এসেছে স্বামীর অবৈধ সম্পদের জন্য স্ত্রীদের ব্যাপারে বর্তমানে যে দুদক অনুসন্ধান করছে, তার বেশিরভাগই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর স্ত্রী।
মতবিনিময় সভায় আরো অংশগ্রহণ করেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন এর নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ এর নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবির, নিজেরা করি এর সমন্বয়ক খুুশি কবির, দুদক এর মহাপরিচালক (তদন্ত) মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান ও মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) জনাব মাহমুদ হাসানসহ বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিবৃন্দ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ