ঢাকা, মঙ্গলবার 8 May 2018, ২৫ বৈশাখ ১৪২৫, ২১ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদ ও সাবেক চেয়ারম্যানকে মুখোমুখি বসিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রস্তাব

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারি নিয়ে অভিযোগের মুখে থাকা বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যন শেখ আব্দুল হাই বাচ্চু দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জিজ্ঞাসাবাদ এড়াতে দফায় দফায় নানা কারণ দেখিয়ে সময় ক্ষেপন করছেন বলে অভিযোগ ওঠেছে। এবার অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের পঞ্চম দফা তলবে হাজির হননি বেসিক ব্যাংকের সাবেক এই চেয়ারম্যান, যাকে ওই কেলেঙ্কারির নায়ক বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
বেসিক ব্যাংকের সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় সাবেক চেয়ারম্যান বাচ্চুকে গত ৬ মার্চ সর্বশেষ জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ফের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গতকাল সোমবার বাচ্চুর দুদক কার্যালয়ে হাজির হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি না এসে দুই মাসের সময় চেয়ে একটি আবেদন পাঠান বলে জানান কমিশন সচিব মো. শামসুল আরেফিন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “আব্দুল হাই বাচ্চু অসুস্থতার কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন। ওই আবেদনের প্রেক্ষিতে ১৫ মে তার হাজিরার নতুন সময় দেওয়া হয়েছে।”
এদিকে, বেসিক ব্যাংকে জালিয়াতির মামলায় ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চু ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের মুখোমুখি বসিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র। এরই মধ্যে এঁদের সবাইকে আলাদা আলাদাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুদক‘র তদন্ত দল। এবার সবাইকে একসঙ্গে বসিয়ে তাঁদের সবার দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করতে চায় সংস্থাটি। দুদকের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র বলেছে, এ-সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব তদন্ত দলের পক্ষ থেকে কমিশনকে দেওয়া হয়েছে। কমিশনের অনুমোদনের পরপরই কাজে নামবে তদন্ত দল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়,অনিয়মের মাধ্যমে ২০০৯ সাল থেকে ২০১২ সালের মধ্যে বেসিক ব্যাংকের গুলশান, দিলকুশা ও শান্তিনগর শাখা থেকে ওই টাকা ঋণ দেয়ার অভিযোগ উঠলে তদন্তে নামে দুদক। প্রায় চার বছর পর ২০১৬ সালে রাজাধানীর তিনটি থানায় ১৫৬ জনকে আসামী করে ৫৬ টি মামলা করে কমিশন। কিন্তু আসামীদের তালিকায় ব্যাংকের চেয়ারম্যান বাচ্চু বা তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের কারও নাম না আসায় ওই তদন্ত প্রশ্নবিদ্ধ হয়। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এ নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করলে দুদক আবার উদ্যোগী হয়। এরপরই জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল হাই বাচ্চুকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হয়।
এদিকে আবদুল হাই বাচ্চুর স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ নিয়েও দুদকের অনুসন্ধান চলছে। এর অংশ হিসেবে বাচ্চুর ভাই শেখ শাহরিয়ার পান্নার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য যাচাই করে দেখতে চেয়েছে দুদক। গত বছর বাচ্চু ও তার পরিবারের সদস্যদের ব্যাংকিং লেনেদেনের সব ধরনের নথিপত্র চেয়ে দুদকের পক্ষ থেকে উপ-পরিচালক শামসুল আলমের সই করা একটি চিঠি বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হয়েছিল।
বাচ্চু অসুস্থতা দেখিয়ে দুদকে আসেননি, ১৫ মে ফের হাজিরা
অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে দুদকে হাজির না হয়ে দুই মাসের সময় চেয়েছেন বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চু। দুদক তা বিবেচনায় নিয়ে এক সপ্তাহ সময় দিয়েছে। নতুন নোটিশে ১৫ মে তাঁকে দুদকে হাজির হতে বলা হয়েছে। বেসিক ব্যাংকের সাবেক এই চেয়ারম্যানের অবৈধ সম্পদের উৎস খুঁজতে অনুসন্ধান শুরু করে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন ও অর্থ পাচারের অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে। গতকাল সোমবার আবদুল হাই বাচ্চুকে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে হাজির থাকতে তলবি নোটিশ পাঠিয়েছিলেন সংস্থার উপপরিচালক সামছুল আলম। পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনের তত্ত্বাবধানে তিনি অভিযোগগুলোর অনুসন্ধান করছেন।
 বেসিক ব্যাংকের সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা জালিয়াতির কেলেঙ্কারির ঘটনায় শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়সহ অধিকাংশ প্রতিবেদনে আবদুল হাইয়ের সংশ্লিষ্টতার কথা উঠে আসে। খোদ অর্থমন্ত্রী বেসিক ব্যাংকে ‘হরিলুটের’ পেছনে আবদুল হাই জড়িত বলে উল্লেখ করেছেন। জাতীয় সংসদেও এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সংসদীয় কমিটিতেও এ জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন কমিটির সদস্যরা।
অথচ ওই ঘটনায় করা ৬১ মামলার কোনোটিতেই বাচ্চুকে আসামি করা হয়নি। অনুসন্ধানকালে তাঁকে কখনো দুদকে ডাকাই হয়নি। আদালতে একটি আদেশের পর গত বছরের ডিসেম্বর থেকে তাঁকে তলব করে দুদক। এ পর্যন্ত চারবার দুদক কার্যালয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। গত বছরের ৬ ও ৮ ডিসেম্বর, এ বছরের ৮ জানুয়ারি ও ৮ মার্চ দুদকের পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে একটি দল জিজ্ঞাসাবাদ করে বাচ্চুকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে বেসিক ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। ২০১৩ সালের মার্চে তা দাঁড়ায় ৯ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। ওই চার বছর তিন মাসে ব্যাংকটি ৬ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা ঋণ দেয়, যার প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকাই নিয়ম ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
বেসিক ব্যাংকের অর্থ আত্মসাত নিয়ে গণমাধ্যমে লেখালেখি শুরু হলেও শুরুতে সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের ঘটনা চিহ্নিত হলে সরকার ব্যাংক পুনর্গঠনে বাধ্য হয়। প্রথমে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ফখরুল ইসলামকে অপসারণ করা হয়। ২০১৪ সালের ২৯ মে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এরই ধারাবাহিকতায় ৪ জুলাই অর্থমন্ত্রীর বাসায় গিয়ে পদত্যাগপত্র দেন শেখ আবদুল হাই বাচ্চু।
 বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে ২০১৫ সালের ২১, ২২ ও ২৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মতিঝিল, পল্টন ও গুলশান থানায় ১২০ জনকে আসামী করে ৫৬টি মামলা করে দুদক। এসব মামলায় বেসিক ব্যাংকের ২৭ কর্মকর্তা, ১১ জরিপকারী ও ৮২ ঋণ গ্রহণকারী ব্যক্তিকে আসামী করা হয়। গত বছর আরও পাঁচটি মামলা করে সংস্থাটি।

পর্ষদ ও বাচ্চুকে মুখোমুখি বসিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রস্তাব
বেসিক ব্যাংকে জালিয়াতির মামলায় ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চু ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের মুখোমুখি সবাইকে একসঙ্গে বসিয়ে তাঁদের সবার দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করতে চায় সংস্থাটি। কমিশনের অনুমোদনের পরপরই কাজে নামবে তদন্ত দল।
আবদুল হাই বাচ্চু বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান হওয়ার পর ২০০৯ সালের ১০ ডিসেম্বর ব্যাংকটির নতুন পর্ষদ গঠন করে সরকার। সেদিনই বেসিক ব্যাংকের পরিচালক নিয়োগ পান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দুই মহাপরিচালক (ডিজি) শুভাশীষ বসু ও নীলুফার আহমেদ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব রাজিয়া বেগম, বিসিক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব বিজয় ভট্টাচার্য। এ ছাড়া বেসরকারি খাত থেকে পরিচালক হন চাঁদপুর চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি জাহাঙ্গীর আখন্দ সেলিম, সাবেক শুল্ক কমিশনার শাখাওয়াত হোসেন, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান ও ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের তৎকালীন চেয়ারম্যান কাজী আখতার হোসেন এবং এ আর এস ল্যুভ বাংলাদেশ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের এমডি আনোয়ারুল ইসলাম।
শুভাশীষ বসু প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) থেকে পদোন্নতি পেয়ে হন রপ্তানি উন্নয়ন বোর্ডের (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান। বর্তমানে তিনি বাণিজ্যসচিব। ব্যাংকটির পরিচালক হওয়ার বছরেই বিজয় ভট্টাচার্যকে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা দূতাবাসে ইকোনমিক মিনিস্টার পদে সরকার নিয়োগ দেয়। জেনেভা থেকে দেশে ফিরলে পদোন্নতি পেয়ে তিনি অতিরিক্ত সচিব হন এবং বর্তমানে ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান।
বিজয় ভট্টাচার্য জেনেভা যাওয়ার পর অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের যুগ্ম সচিব কামরুন্নাহার আহমেদ পরিচালক হন। বর্তমানে পদোন্নতি পেয়ে তিনি একই বিভাগের অতিরিক্ত সচিব হন। পর্ষদ সদস্য হওয়ার পর রাজিয়া বেগম পদোন্নতি পেয়ে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব হন। ২০১০ সালের ৩১ জুলাই ব্যাংকের টুঙ্গিপাড়া শাখা উদ্বোধন করতে যাওয়ার সময় মানিকগঞ্জে এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান সচিব রাজিয়া বেগম ও বিসিক চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান।
অতিরিক্ত সচিব ফখরুল ইসলাম নতুন বিসিক চেয়ারম্যান হলে তাঁকে বেসিক ব্যাংকের পরিচালক নিয়োগ দেয় সরকার। এরপর তাঁকে পদোন্নতি দিয়ে করা হয় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) চেয়ারম্যান এবং ব্যাংকের পরিচালক পদটিও তাঁর থেকে যায়। পরে বিসিক চেয়ারম্যান হন ব্যাংকটির পর্ষদ সদস্য শ্যামসুন্দর সিকদার। পদোন্নতি দিয়ে তাঁকে করা হয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব। বর্তমানে তিনি ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব।
শেখ আবদুল হাইয়ের পাঁচ বছরের মেয়াদে এ ছাড়া পরিচালক ছিলেন আওয়ামী লীগের মুখপত্র মাসিক উত্তরণ পত্রিকার সহকারী সম্পাদক আনিস আহমেদ, সনদপ্রাপ্ত হিসাববিদ কামরুল ইসলাম এবং সাবেক অতিরিক্ত সচিব এ কে এম রেজাউর রহমান। আনিস আহমেদ এখন উত্তরণ পত্রিকার বার্তা সম্পাদক। এআরএস লুভের এমডি আনোয়ারুল ইসলাম বেসিক ব্যাংকের পরিচালক হওয়ার তিন বছরের মাথায় বাংলাদেশ যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য হন।
দুদক সূত্র জানিয়েছে, গত কয়েক মাসে বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদকের তদন্ত দল। এঁদের মধ্যে কাউকে দুদকে ডেকে, আবার কাউকে সংশ্লিষ্টদের অফিসে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। আবদুল হাইকে চারবার দুদক কার্যালয়ে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, গত বছরের ১৭ আগস্ট আপিল বিভাগে ব্যাংকের বরখাস্ত হওয়া মহাব্যবস্থাপক ও বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির ৫১ ও ৫৩ নম্বর মামলার আসামি জয়নুল আবেদীন চৌধুরীর জামিন আবেদনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। ওই দিন শুনানিতে সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার এক প্রশ্নের জবাবে জয়নুল আবেদীন বলেছিলেন, পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন সাপেক্ষেই ব্যাংকটিতে ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ লোপাটের ঘটনা ঘটেছে। এ ক্ষেত্রে কর্মকর্তারা শুধু বোর্ডের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করেছেন।
নিজেকে নির্দোষ দাবি করে জয়নুল আবেদীন আদালতকে জানান, ‘ওই সময় পর্ষদের নির্দেশ মানা ছাড়া আমাদের কোনো উপায় ছিল না।’ আসামীর আরজির পরিপ্রেক্ষিতে সাবেক প্রধান বিচারপতি দুদকের আইনজীবীর উদ্দেশে বলেন, পর্ষদের যাঁরা ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত, তাঁদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনতে হবে। এর মধ্যে যদি কেউ বাদ যান, তাহলে সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁর বক্তব্য দুদক চেয়ারম্যানকে জানিয়ে দেওয়ার কথা বলেছিলেন প্রধান বিচারপতি। পরে দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান লিখিতভাবে দুদকের আইন শাখার মহাপরিচালককে বিষয়টি জানিয়ে দেন।
এর আগে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ গত বছরের ২৬ জুলাই এক রায়ে বলেছেন, ‘আমাদের কাছে বিস্ময়কর ঠেকছে যে ঋণ কমিটির সুপারিশ না থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকের চেয়ারম্যান, এমডিসহ পুরো পরিচালনা পর্ষদ কীভাবে শুরুতে ১৭ কোটি টাকা, পরে আরও ৪০ কোটি টাকা ঋণ সৈয়দ ট্রেডার্সকে দিয়ে দিল!’ বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারিতে ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ কীভাবে জড়িত, ওই রায়ে আদালতই তা দেখিয়ে দিয়েছেন।
ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও জরিপকারী প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশে সৈয়দ ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান বেসিক ব্যাংক থেকে ৪০ কোটি টাকা তুলে নিয়ে আত্মসাৎ করে। ব্যাংকের ঋণ (ক্রেডিট) কমিটি সৈয়দ ট্রেডার্সকে ঋণ দেয়ার সুপারিশ করেনি, তারপরও পরিচালনা পর্ষদ তড়িঘড়ি করে ওই গ্রাহকের পক্ষে ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। দুদক ২০১৫ সালে সৈয়দ ট্রেডার্সের জরিপকারী রূপসা সার্ভেয়ারসের ব্যবস্থাপনা অংশীদার শাহজাহান আলীর বিরুদ্ধে মামলা করে। দুদক শাহজাহান আলীকে গ্রেপ্তার করে ২০১৬ সালের আগস্টে এবং সেপ্টেম্বরে তিনি জামিন পান।
বিচারপতি এম এনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি শহীদুল করিমের যৌথ বেঞ্চ ২০১৭ সালের ১২ জুলাই মামলার শুনানি নিয়ে দুই সপ্তাহ পর ২৬ জুলাই আট পৃষ্ঠার রায় দেন। ওই রায়ে পর্ষদ সদস্যদের জড়িত থাকার বিষয়ে প্রশ্ন তুলে দুদককে ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত করতে বলেন আদালত। মামলা হওয়ার দুই বছর পার হলেও কোনো অভিযোগপত্র তৈরি না হওয়ায় শাহজাহান আলীর মামলার শুনানির সময় ক্ষোভ প্রকাশ করেন আদালত। এ রায়ের পরই ঘটনাটি নতুন মোড় নেয়। দুদক তখনই প্রথমবারের মতো পর্ষদ সদস্যদের নোটিশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
সূত্র জানায়, বেসিক ব্যাংকে জালিয়াতির ঘটনায় ক্ষমতার অপব্যবহার, জ্ঞাতসারে কর্তব্যে অবহেলা, অসৎ উদ্দেশ্যে নিজে লাভবান ও অন্যকে লাভবান হওয়ার বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছিল। তাই কিছু কিছু ক্ষেত্রে দুর্বল জামানত, কিছু কিছু ক্ষেত্রে জামানতবিহীন ঋণ দেওয়া হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে আবদুল হাই বাচ্চুকে ওই সব নথি দেখানো হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) ছাড়পত্র না থাকা, জামানতের মূল্য যাচাই প্রতিবেদনে না থাকা, ঋণগ্রহীতার ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা না থাকা, ঋণের টাকা ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা সম্পর্কিত মূল্যায়ন প্রতিবেদন না থাকা, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতার ব্যবসা না থাকার নথিপত্রও তাঁকে দেখানো হয়। তারপরও ঋণ অনুমোদনপত্রে ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান সই করেছেন। অসংগতিপূর্ণ ওই সব নথি দেখেও বাচ্চু তাঁর দায় অস্বীকার করেন। প্রায় ক্ষেত্রেই বাচ্চু দায় চাপানোর চেষ্টা করেন ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ফখরুল ইসলামের ওপর।
সূত্র জানায়, এমডিসহ অন্য কর্মকর্তাদের ওপর বাচ্চু যখন দায় চাপানোর চেষ্টা করেন, তখন তদন্ত দলের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়, ওই সব ঘটনায় তিনি কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিলেন কি না। এ প্রশ্নেও বাচ্চু কোনো উত্তর দেননি। পর্ষদ সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদেও সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পায়নি দুদক। সূত্র জানিয়েছে, পর্ষদ সদস্যদের বেশির ভাগই জালিয়াতির ঘটনায় কিছু জানেন না বলে দাবি করেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, জালিয়াতিপূর্ণ ঋণপ্রস্তাবগুলো অনুমোদনের যাবতীয় নথিপত্র তদন্ত কর্মকর্তাদের হাতে আছে। জিজ্ঞাসাবাদে অস্বীকার করা এবং একে অন্যের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টার কারণে সবাইকে মুখোমুখি বসাতে চান তদন্ত কর্মকর্তারা। তাঁরা মনে করছেন, এর মাধ্যমে তদন্তে অগ্রগতি হতে পারে।
২০১৫ সালের ২১ থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর দুদকের করা ৫৬ মামলার তদন্ত উপপরিচালক ঋত্বিক সাহা, মোহাম্মদ ইব্রাহীম, মোরশেদ আলম, মির্জা জাহিদুল আলম, মাহবুবুল আলম, সামছুল আলম, সহকারী পরিচালক জয়নাল আবেদীন, উপসহকারী পরিচালক মো. শাহজাহান ও আ স ম শাহ আলম। তদন্ত তদারককারী কর্মকর্তা হিসেবে আছেন পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ