ঢাকা, মঙ্গলবার 8 May 2018, ২৫ বৈশাখ ১৪২৫, ২১ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নিজস্ব সৌন্দর্যগুণে বিশ্বের সেরা রাজধানীর অন্যতম ইসলামাবাদ

পাহাড়ের চূঁড়ায় নির্মিত পর্যটন কেন্দ্র ‘মোনাল’ থেকে মোবাইলে ধারণ করা রাতের ইসলামাবাদ

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল, পাকিস্তান থেকে ফিরে : আগেই জেনেছিলাম পাকিস্তানের অন্যান্য শহরের তুলনায় দেশটির রাজধানী ইসলামাবাদ বেশ আলাদা। এর সৌন্দর্য অন্য শহর গুলোর চেয়ে অনেক বেশী। ইন্টারনেট ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা টপ টেন ফাইন্ডিংস সম্প্রতি নিজস্ব সৌন্দর্যগুণে জায়গা করে নেয়া  বিশ্বের যে ১০টি রাজধানীর তালিকা করেছে সেখানে ইসলামাবাদ তৃতীয়। সেই শোনা কথাটির থেকেও যেন সুন্দর পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ। বিমান থেকে লক্ষ্য করলাম, চতুর্দিকে পাহাড়ে ঘেরা সুন্দর মনোরম শহর ইসলামাবাদ। করাচী সফর শেষে ২১ মার্চ সন্ধ্যার কিছুটা সময় আগে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া মিডিয়া টিমের সদস্যরা বেনজীর ভুট্ট্রো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালাম।  আমরা লাগেজ সংগ্রহ করলাম। এখানে আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন পাকিস্তান সরকারের প্রোটোকল অফিসার। বিমানবন্দরের ভেতর থেকে বাইরের কিছুই আঁচ করা গেলনা। বিমানবন্দরের অফিশিয়াল কার্যক্রম শেষে আমরা যখন মাইক্রোযোগে হোটেলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করলাম তখনই দেখা যাচ্ছিল ইসলামাবাদের সোন্দর্য। কোথাও চার লেন আবার কোথাও ছয় লেনের বিশাল রাস্তা। রাস্তার ধারে ধারে গাছ এবং অপূর্ব ফুলগাছ। ইউরোপের যে-কোনও শহরের সঙ্গে তুলনীয়। চারিদিকে পাহাড়ে মোড়া ইসলামাবাদ। তাপমাত্রাও মনোরম। রাস্তাগুলো খুবই পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। নেই গাড়ির দীর্ঘজট। সবাই যার যার মতো করে ছুটছে। হর্ণও শুনলাম না। এটি যে একটি পরিকল্পিত শহর তা আস্তে আস্তে টের পেতে লাগলাম। বিমানবন্দর থেকে ২৫ কিেিলামিটার দূরের হোটেলে যেন মাত্র কয়েক মিনিটেই পৌঁছে গেলাম। 
জানা গেছে, ১৯৬০ সালে এই নতুন শহর তৈরি শুরু করেন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান। এর আগে করাচি ছিল দেশের রাজধানী। ভৌগোলিক অবস্থান এবং আবহাওয়ার কথা বিচার করে ১৯৬০ সাল থেকে পাকিস্তানের নতুন রাজধানী হল ইসলামাবাদ। ১৯৫১ সালে ইসলামাবাদের জনসংখ্যা ছিল এক লক্ষেরও কম। আর এখন ২০ লক্ষাধিক। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সুন্দর শহর ইসলামাবাদ। এই শহরে সমগ্র পাকিস্তানের মধ্যে শিক্ষিতের হার সবচেয়ে বেশি। ছোটবড় প্রায় ২০টি বিশ্ববিদ্যালয় আছে শহরে। এ ছাড়া আছে সরকারের সমস্ত বিভাগীয় অফিস। প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, সুপ্রিমকোর্ট এবং অন্যান্য মন্ত্রী ও সরকারি আধিকারিকদের আবাস। একটি দেশের প্রতীক তার রাজধানী। পৃথিবীর প্রত্যেক দেশের রাজধানীই কমবেশী সৌন্দর্যমন্ডিত। প্রতিটি রাষ্ট্র সব সময় তার রাজধানীকে ঢেলে সাজাতে ব্যস্ত থাকে। কারণ একটি দেশের রাজধানীর হালচাল সে দেশকে বিশ্বে পরিচিত করে তোলে।
আমরা হোটেল দ্যা পাপায়েতে পৌঁছানোর পরই আমাদের প্রটোকল অফিসার উজমা আর্জমান্দ বললেন, আপনাদের এক ঘন্টার মধ্যে প্রস্তুত হয়ে বের হতে হবে। আমরা ‘মোনাল’ যাবো। মোনাল হচ্ছে ইসলামাদের সমতল জায়গা থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার ফুট উপরে অবস্থিত একটি ফাইভ স্টার রেস্টুরেন্ট। এইসাথে বিনোদন কেন্দ্রও বটে। এটি ইসলামাদ শহরের উপকন্ঠে অবস্থিত পাহাড়ের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে অবস্থিত। সমতল ভূমি থেকে ৯ কিলোমিটার পাহাড়ী রাস্তা অতিক্রম করে ‘মোনাল’ এ পৌঁছাতে হয়। পুরো রাস্তাটি যেন একটি জিলাপীর প্যাচের ন্যায়। এটি ছিল আমাদের একটি বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা। আমাদের বহন করা গাড়িটি যখন পাহাড়ের উপর উঠছিল তখন বুকের ভেতরে কেমন যেন ভয়ের কম্পন সৃষ্টি হলো। এতো আঁকা-বাকা রাস্তা। পাকা ড্রাইভার ছাড়া এখানে গাড়ি চালানো একেবারেই অসম্ভব। রাতে মোনাল থেকে একটি পাখির চোখের মতো পুরো ইসলামাবাদ শহরটাকে দেখা যায়। আকাশে যেমন অন্ধকার রাতে তারাগুলো ছকছক করে জ্বলমল করে তেমনি মোনাল থেকে পুরো রাজধানীটাকে আকাশের তারার মতোই মনে হলো। রাতের আলোতে তারার মতো জ্বলমল করছে পুরো শহর। নব্বইয়ের দশকে এই মোনাল তৈরী করা হয়েছে। ইসলামাবাদ পিআইডি প্রধান কর্মকর্তার আমন্ত্রণে আমরা এখানেই ডিনার করলাম।
তিনদিনের ইসলামাবাদ সফরে আমাদের বেশির ভাগ সময়েই বিভিন্ন সরকারি দফতরের সঙ্গে মিটিং, প্রশ্নোত্তর ইত্যাদি করতে হয়েছিল। একইসাথে আমরা দর্শন করেছিলাম ইসলামাবাদের দর্শনীয় স্থানগুলিও। আমরা বিভিন্ন সময়ে মিটিং করলাম পাকিস্তান সরকারের বিদেশ দফতরের মুখপাত্র, তথ্য দফতরের এডিশনাল সেক্রেটারীর সঙ্গে। প্রতিটি আলোচনায় উঠে আসে দুই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং বৈদেশিক নীতি ও সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার বিষয়টি। এখানকায় যে আতিথেয়তা এবং অভ্যর্থনা আমরা পেয়েছি, সেটা অত্যন্ত আন্তরিক এবং হৃদয়স্পর্শী। তবে সারাক্ষণই আমাদের ঘিরে ছিল কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আমাদের গাড়ি বা বাসের আগেপিছে নিরাপত্তা রক্ষীদের গাড়ি। অনেকে এটিকে একটু বাড়াবাড়ি বললেও সেটি ছিল আমাদের আতিথেয়তারই অংশ।
তিনদিনের সফরে দেখেছি একটি অন্যরকম শহরকে। ইসলামাবাদ সুন্দর পরিকল্পনা করে তৈরি এই শহর। চমৎকার রাস্তা। সিগন্যাল ছাড়া গাড়ি কোথাও দাঁড়ায় না। চতুর্দিকে সবুজের সমারোহ এবং পাহাড় দিয়ে পরিবেষ্টিত। আরামদায়ক তাপমাত্রা। আদ্যপান্ত এক আধুনিক শহর। অধিকাংশ ভবনই দুই থেকে তিন তলা পর্যন্ত। সবুজ বেস্টনীর মধ্যে যেন একটি অন্যরকম রাজধানী শহর ইসলামাবাদ। এত সুন্দর সাজানো শহর ইসলামাবাদও বাদ যায় না সন্ত্রাসবাদী হানার হাত থেকে। এখনও, যখন গোটা পাকিস্তান ঘুরে দাঁড়াতে চাইছে উন্নয়নের প্রশ্নে, যখন-তখন কেঁপে ওঠে শহরটা, বিস্ফোরণে। এই শহরটার অধিবাসীদের পোশাকেও অতি আধুনিকতার ছাপ। শিক্ষায় তো বটেই। ইসলামাবাদে সাক্ষরের সংখ্যা অবিশ্বাস্য, ৯৭শতাংশ। ইসলামাবাদ আমেরিকা-ইউরোপের অত্যন্ত উন্নত শহরের সঙ্গে তুলনীয়।
ইসলামাবাদে আমরা যে কয়টি স্থান পরিদর্শনে গিয়েছিলাম তার অন্যতম হচ্ছে বাদশাহ ফায়সল মসজিদ। শহরের মূল দর্শনীয় স্থান এটি। এটি ইসলামাবাদের অন্যতম আকর্ষণ। ১৯৬৬ সালে এই সৌধের নির্মাণকার্য শুরু হয়। তুরস্কের বিখ্যাত স্থপতি ভেদাট ডালকোয়ে তৈরি করেন মসজিদের নকশা। ১৯৮৬ সালে মসজিদের নির্মাণকার্য সম্পূর্ণ হয়। তৎকালীন সৌদি আরব সরকার এই নির্মাণকার্যের বেশির ভাগ অর্থ বহন করে। সৌদি আরবের রাজা শাহ ফয়সলের নামানুসারে এই মসজিদের নামকরণ হয়। আধুনিক স্থাপত্যের এক অপূর্ব নিদর্শন এই মসজিদ। মসজিদে ঢোকার ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ আছে। খালি পায়ে ঢুকতে হয় ভিতরে। মসজিদের অভ্যন্তরের ছবি তোলা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ। বাইরের ছবি যত খুশি তোলা যায়। মসজিদের মধ্যে আছে বিশাল আকারের নামাজঘর, লাইব্রেরি, কনফারেন্স হল, মিউজিয়াম এবং ক্যাফে। এ ছাড়া আছে ছোট একটি সেলস কাউন্টার। এখানে দশ হাজারেরও বেশি লোক একসঙ্গে নমাজ পড়তে পারেন। তা ছাড়া মসজিদের উঠোনে আরও সত্তর থেকে পঁচাত্তর হাজার মানুষ একসাথে প্রার্থনা করতে পারবে। সাদা মার্বেলে তৈরি এই চত্বর। মসজিদের চার পাশে রয়েছে ফাঁকা জায়গা এবং মাঠ। যেখান থেকে মসজিদ পুরোপুরি দর্শন করা যায়। বেদুইনদের তাঁবুর মতো দেখতে এই মসজিদ প্রায় ৫ হাজার স্কোয়ার মিটার জায়গা নিয়ে গঠিত। এটি পৃথিবীর চতুর্থ বৃহৎ মসজিদ।
ইসলামাবাদ সফরের দ্বিতীয়দিন আমরা যাই সৈয়দপুর গ্রামে। এটি নামে ‘গ্রাম’ হলেও এখানে সবকিছুই শহরের আদলে গড়ে উঠা। জনশ্রুত আছে, ইসলামাবাদের জমি অধিগ্রহণের সময় তখন যারা সেখানে বসবাস করতেন তাদের এই সৈয়দপুর গ্রামে স্থানান্তর করা হয়। এসব অধিবাসীদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেয়ার পাশাপাশি ইসলামাবাদের খুব কাছেই তাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়। এই সৈয়দপুর এখন দেশী-বিদেশীদের জন্য একটি পর্যটন স্পটও। এখানে রয়েছে অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক রেস্তোরাঁ। মারগাল্লা পাহাড়ের উপর মুঘল আমলের অপূর্ব সুন্দর গ্রাম এটি। পাহাড়ের কোলঘেষে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয়েছে এই গ্রামটি। এখানে প্রায় দশ হাজার পরিবার বসবাস করে।
বস্তুত, ইসলামাবাদ শহরটাই একটা উপত্যকা। বড় মনোরম। সৈয়দপুর গ্রামের নিদর্শন আছে বিভিন্ন সভ্যতায়। গ্রীক, মুঘল, বৌদ্ধ এবং বিশেষত অশোকের। কথিত আছে, মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন এই গ্রামের এক কন্যা। ‘টুজফ এ জাহাঙ্গীর’ সৌধটি এই সত্যের পরিচায়ক। শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশে এই গ্রামের মধ্যে গড়ে উঠেছে ছোট বড় নানা ধরনের রেস্তোরা। দেশী এবং বিদেশী পর্যটকদের আনাগোনা এই রেস্তোরাঁগুলিতে বছরের সব সময়েই। সৈয়দপুর গ্রামের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এখনও এই গ্রামে মসজিদ, মন্দির এবং গীর্জা বিদ্যমান। গ্রামে প্রবেশের মুখেই মাত্র দুইশ গজের মধ্যে মসজিদ এবং মন্দির। মন্দিরটি এখন মিউজিয়াম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এখানকার ঘরগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এখানে ঘনগুলোর একটি অংশে বসবাস করা হয়, অন্য অংশে ট্যুরিজম স্পট।
ইসলামাবাদের প্রেস ইনফোরমেশনের ডিজি (২) শাহানা শাহেদ এই প্রতিবেদককে বলেন, ইসলামাবাদ বিশ্বের অন্যতম সুন্দর শহর এটি এখন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। তবে এটি খুবই ব্যয়বহুল শহর। তিনি বলেন, এই শহরটি হচ্ছে ভিআইপিদের জন্য। এখানকার সৌন্দয্য সবাইকে মুগ্ধ করে। তিনি বলেন, এখানে স্থায়ীভাবে বাস করার কথা আমি স্বপ্নেও ভাবি না। এখানে জমির দাম অনেক বেশী। আবার জমি কেনার মতো সামর্থ থাকার পরেও এক টুকরো জমি কেনা যায় না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ