ঢাকা, বুধবার 9 May 2018, ২৬ বৈশাখ ১৪২৫, ২২ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

গাজীপুরের সিটি নির্বাচন

১৫ মে অনুষ্ঠেয় গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন তিন মাসের জন্য স্থগিত করেছেন হাইকোর্ট। একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই আদেশ ঘোষিত হয়েছে গত ৬ মে, নির্বাচনের পূর্বনির্ধারিত তারিখের মাত্র নয়দিন আগে। রিটটি দায়ের করেছিলেন সাভার উপজেলার শিমুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের শ্রম ও জনশক্তি সম্পাদক এবিএম আজহারুল ইসলাম। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, নিজের ইউনিয়নসহ ছয়টি মৌজাকে গাজীপুরের পরিবর্তে সাভারের অধীনে রাখার দাবি জানিয়ে রিট করেছিলেন ওই চেয়ারম্যান।
এবারই প্রথম নয়, তিন বছর আগেও একই দাবিতে রিট করেছিলেন তিনি। সে রিটের পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় সরকার বিভাগ দীর্ঘদিন তদন্ত করে মৌজা ছয়টিকে গাজীপুরের অধীনে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এ ব্যাপারে সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল গত ৪ মার্চ। তখন কিন্তু ওই চেয়ারম্যান সাহেবকে কোনো তৎপরতা চালাতে বা প্রতিবাদ জানাতে দেখা যায়নি। এর মধ্যে নির্বাচন কমিশন গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে এবং শুরু হয়েছে জোর প্রচারণা। তখনও চেয়ারম্যান সাহেব নীরবতা অবলম্বন করেছেন। শুধু তা-ই নয়, চেয়ারম্যান আজহারুল ইসলাম নিজেও নাকি নৌকার পক্ষে মিছিল করেছেন এবং স্লোগান দিয়েছেন বলে শোনা গেছে। এভাবে সব মিলিয়ে নির্বাচনমুখী সকল তৎপরতা ঠিকঠাকমতোই চলছিল। শুরু হয়েছিল সম্ভাব্য ফলাফলের হিসাব-নিকাশও।
এরই মধ্যে হঠাৎ একটি রিট দায়ের করে বসেছেন ইউপি চেয়ারম্যান আজহারুল ইসলাম। তিনি অবশ্য বলেছেন, ওই আবেদনে নির্বাচন স্থগিত করার দাবি জানানো হয়নি। তার দাবি ছিল শুধু ছয়টি মৌজার বিষয়ে। ওই ইউপি চেয়ারম্যান আরো বলেছেন, তার ধারণা ছিল, বিলম্ব এবং আইনগত ত্রুটি ও দুর্বলতার কারণে রিট আবেদনটি খারিজ হয়ে যাবে। এর আগেও নাকি বিভিন্ন সময়ে তাকে খারিজের আদেশ শুনতে হয়েছে! প্রজ্ঞাপন জারির সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ না জানানোর কারণে তো বটেই, ওই প্রজ্ঞাপনের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করায় এবং প্রচারণাসহ নির্বাচনী কার্যক্রম প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ার কারণেও দায়ের করা রিটটিকে খারিজ করা হবে বলে ধারণা করা হয়েছিল। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, খারিজ করাটাই হতো সঙ্গত ও স্বাভাবিক এবং এর ফলে কোনো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হতো না। অন্যদিকে হাইকোর্টের মাননীয় বিচারপতিরা খোদ আবেদনকারীকেও বিস্মিত করে নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করেছেন।
বিষয়টির সঙ্গে জনগণের ভোটের অধিকার এবং গণতন্ত্রের প্রশ্ন জড়িত রয়েছে বলেই অভিযোগের আঙ্গুল উঠেছে বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দল তথা সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের দিকে। বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পাশাপাশি গণফোরামসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ বিষয়টির জন্য ক্ষমতাসীনদের দায়ী করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমীর ও সাবেক এমপি মাওলানা আ. ন. ম. শামসুল ইসলাম এক বিবৃতিতে বলেছেন, শেষ মুহূর্তে এসে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন স্থগিত করার ঘটনার মধ্য দিয়ে সরকারের দুরভিসন্ধিরই প্রকাশ ঘটেছে। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের উদাহরণ উল্লেখ করে জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমীর বলেছেন, ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর জয়ী হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই বরং তার ভরাডুবি ঘটবে বলে জানার পরই সরকার ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ঢাকা উত্তরের মতো গাজীপুরের নির্বাচনও স্থগিত করিয়েছে। এজন্য আওয়ামী লীগের জনৈক নেতাকে দিয়ে রিট করানো হয়েছে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাও অত্যন্ত ন্যক্কারজনক।
তীব্র নিন্দা জানিয়ে ও ক্ষোভ প্রকাশ করে মাওলানা শামসুল ইসলাম আরো বলেছেন, ষড়যন্ত্রমূলক এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করলো যে, এই সরকার এবং বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে জাতীয় সংসদের নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হওয়া সম্ভব নয়। জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমীর তার বিবৃতিতে অবিলম্বে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন।
ওদিকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং গণফোরাম নেতা ড. কামাল হোসেনও ক্ষমতাসীন দলের নিশ্চিত পরাজয়ের সম্ভাবনার দিকটিকেই প্রাধান্যে এনেছেন। সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে ড. কামাল হোসেন বলেছেন, আওয়ামী লীগ প্রার্থী ১০ শতাংশ ভোটও পাবেন না জেনেই সরকার হাইকোর্টের মাধ্যমে গাজীপুরের নির্বাচন স্থগিত করিয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতা আরো বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী যে জনগণ দেশের প্রকৃত মালিক সেই জনগণকেই বর্তমান সরকার অসহায় বানিয়ে ফেলেছে। ড. কামাল হোসেনও অপিলের মাধ্যমে হাইকোর্টের আদেশ বাতিল করিয়ে অবিলম্বে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন।
আমরা গাজীপুরের নির্বাচন স্থগিত করার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করি এবং বিশেষ করে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার তীব্র নিন্দা জানাই। কারণ, প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, সব জেনেও কমিশন নাকি এ ধরনের ঘটনার জন্য আদৌ ‘প্রস্তুত’ ছিল না! একই কারণে কমিশন নাকি উপযুক্ত আইনজীবীকেও পাঠাতে পারেনি! অন্যদিকে তথ্যাভিজ্ঞ পর্যবেক্ষকরা কিন্তু মনে করেন, কোনো আইনজীবী পাঠালেও ব্যতিক্রম কিছু ঘটতো না। কারণ, সবকিছুর পেছনে ছিলেন ক্ষমতাসীনরা। তারা ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন, গাজীপুরে অন্তত তাদের প্রার্থী জিততে পারবেন না। এজন্যই উচ্চ আদালতের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে একজন আওয়ামী ইউপি চেয়ারম্যানকে দিয়ে রিট দায়ের করানো হয়েছিল। হাইকোর্টের রায়েও সরকারের ইচ্ছাই পূরণ হয়েছে। আপাতত পরাজয়ের লজ্জা থেকে বেঁচে গেছেন  ক্ষমতাসীনরা। এর মধ্য দিয়ে ‘আজ্ঞাবহ’ হিসেবে বর্ণিত নির্বাচন কমিশনও প্রমাণ করেছে, এই কমিশনের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব নয়।
আমরা সম্পূর্ণ বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুতর মনে করি। কারণ, গাজীপুরের ঘটনার বিশ্লেষণে পরিষ্কার হয়ে যাবে, সুষ্ঠু অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রশ্নে সরকারের নীতি ও মনোভাবে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। জনমত সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার পর সরকার বরং আরো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে। এজন্যই ক্ষমতাসীনরা উল্টো পথে হেঁটে চলেছেন। একই কারণে জনমনে এমন আশংকাই দৃঢ়মূল হতে শুরু করেছে যে, ক্ষমতাসীনদের এই কৌশল ও উদ্দেশ্যের পরিণতিতে চলতি বছরের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদের নির্বাচনও ভণ্ডুল হয়ে যেতে পারে। ঠিক কোন ধরনের অপকৌশলে সেটা করা হবে তা জানার ও দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে সত্য, তবে এটুকু অন্তত বলে রাখা যায়, দেশ থেকে আরো একবার গণতন্ত্র নির্বাসিত হতে পারে। গাজীপুরের ঘটনায় সরকারের তেমন উদ্দেশ্যেরই প্রকাশ ঘটেছে।
সবার মতোই আমরা আশা করতে চাই, ক্ষমতাসীনরা গণতন্ত্রসম্মত অবস্থানে ফিরে আসবেন এবং অবিলম্বে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করবেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যাপারেও এখন থেকেই সততার প্রমাণ দিতে হবে সরকারকে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ