ঢাকা, বুধবার 9 May 2018, ২৬ বৈশাখ ১৪২৫, ২২ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

গাজীপুরের নির্বাচন : পিছু হটে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করা যায় না

যা আশঙ্কা করেছিলাম শেষ পর্যন্ত তাই হলো। গাজীপুর সিটি নির্বাচনে যখন মেয়র ও কাউন্সিলার প্রার্থীদের ভোটার যোগাযোগ তুঙ্গে উঠেছে তখন গত পরশু হঠাৎ করে হাইকোটৃ একটি রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে স্থগিতাদেশ দিয়ে তিন মাসের জন্য নির্বাচন বন্ধ করে দিয়েছেন। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী হুলস্থুল প্রচারণার মধ্যে প্রথমে ভোটারদের অনেকেই খবরটি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। প্রার্থীরাও হতবাক। খোদ নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে যে স্থগিতাদেশটি তারা টেলিভিশনে প্রথম জেনেছেন। অর্থাৎ নির্বাচনের সাথে সংশ্লিষ্ট তিনটি পক্ষ-নির্বাচন কমিশন নির্বাচন প্রার্থী ও ভোটার এদের সকলেই হাইকোর্টের আদেশটি শুনে আকাশ থেকে পড়েছেন। গাজীপুরের উপজেলা আওয়ামী লীগের শ্রম সম্পাদক এবং সাভারের শিমুলিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এবিএম আজাহারুল ইসলাম সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচন তফসীলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রীট করেন। এই রীটের পরিপ্রেক্ষিতেই হাইকোর্ট তিন মাসের জন্য নির্বাচন স্থগিত করে আদেশ জারী করেন। এই আদেশ জারীর ফলে ভোটার ও প্রার্থেিদর মধ্যে ক্ষোভ ধূমায়িত হয়ে উঠেছে। তবে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ এতে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মত প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন যে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল ক্ষমতায় আরোহনের শুরু থেকে নিজের অযোগ্যতা ও দুর্বলতা ঢাকার জন্য আদালতকে ব্যবহার করে এসেছে। তাদের গণবিচ্ছিন্নতাকে আদালতের ছত্র ছায়ায় মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করার জন্য ইতোপূর্বে তারা অনেক প্রশাসনিক কাজও আদালতের রায়ের বলে বাস্তবায়ন করেছে এবং বর্তমান পদক্ষেপটিও তারই ধারাবাহিকতা মাত্র। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের সর্বশেষ নির্বাচনে বিএনপির জনাব আবদুল মান্নান লক্ষাধিক ভোটে আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকার সীমাহীন হামলা মামলা ও নির্যাতনের আশ্রয় নিয়ে নির্বাচিত মেয়রকে কাজ করতে দেননি, অন্যায়ভাবে তাকে জেল খাটিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে এবার তারা ভেবেছিলেন যে কর্পোরেশনটি তারা দখল করতে পারবেন। এজন্য সারা কর্পোরেশন এলাকায় লীগ পরিবারের বাইরেও বিপুল সংখ্যক বখাটে মাদকসেবী তরুণ যুবকদের পয়সা কড়ি দিয়ে মাঠে নামিয়েছেন বলে জানা যায়। জামায়াতের জনাব সানাউল্লাহর মেয়র প্রার্থী হওয়াটাকে তারা অভিনন্দিত করেছিল এই ভেবে যে এতে ২০ দলীয় ঐক্যে ফাটল ধরবে এবং এই সুযোগ তাদের পক্ষে ভোট সংগ্রহ করা সহজ হবে। তারা জামায়াত প্রার্থীকে অনেকটা রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে, তার দলের ভোটার যোগাযোগকে উৎসাহিত করেছে। কিন্তু যেই মাত্র বিএনপির মেয়র প্রার্থীর অনুকুলে জনাব সানাউল্লাহ প্রার্থী পদ প্রত্যাহার করেছেন তাদের হৃদকম্পন শুরু হয়ে যায়। সর্বত্র সরকারি দলের বিরুদ্ধে জনজোয়ার সৃষ্টি হতে শুরু করে, বিরোধী দলের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন ভোটের চিত্র পাল্টিয়ে দিতে থাকে এবং সরকারি প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিরোধী দলের দৃঢ় অবস্থান সৃষ্টি হয়। সরকারের জন্য এই অবস্থাটি ছিল অত্যন্ত মারাত্মক। এই অবস্থায় সরকার জনাব সানাউল্লাহসহ বেশ কিছু জামায়াত নেতাকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠালেন। নির্বাচনকালীন সময়ে নির্বাচন কমিশনকে অন্ধকারে রেখে তাদের গ্রেফতার নানা সন্দেহের সৃষ্টি করেছে।
গত ৫ তারিখে আমি অন্য একটি কাজে কাশিমপুর গিয়েছিলাম। সেখানে রাস্তা ঘাটে অলিতে গলিতে বিরোধী প্রার্থীদের যে সরব উপস্থিতি এবং সরকারি প্রার্থীদের করুণ অবস্থা দেখেছি তাতে আমার আশঙ্কা হচ্ছিল যে সরকার জাতীয় নির্বাচনের আগে হয়ত তার এমন একটি করুণ পরিণতি ঝুঁকির চোখেই দেখবেন। কেননা এর প্রভাব, জাতীয় নির্বাচনে পড়লে তাদের আম ছালা দুটোই যাবে। আশঙ্কা সত্যে পরিণত হলো। দলীয় এক নেতাকে দিয়ে মামলা করে তাৎক্ষণিকভাবে নির্বাচন স্থগিত করে দেয়া হলো। আমি জানি না হাইকোর্টের এই আদেশের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ কোনও দল বা প্রার্থী সুপ্রীম কোর্টে আপীল করবেন কিনা কিংবা করলেও তাতে কোনও লাভ হবে কিনা। কেননা সাবেক প্রধান বিচারপতি সরকারের বিরুদ্ধে রায় দিয়ে শুধু চাকুরী হারাননি সরকারের কোপানলে পড়ে দেশ ত্যাগেও বাধ্য হয়েছেন। এই অবস্থায় যতই যথার্থ হোক কোনও বিচারকের পক্ষে সরকারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নতুন করে সরকারের স্বার্থের পরিপন্থী রায় দেয়ার কথা ভাবা সম্ভব কিনা তাতে সন্দেহ আছে।
হাইকোর্টের মামলাটি অনেকগুলো প্রশ্নের জন্ম হয়েছে। প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে, মামলাটি এত দেরীতে করা হলো কেন? দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে নির্বাচন কমিশন নির্বাচন পরিচালনা করেন। তারা নির্বাচনী এলাকা ঠিক করেন। মামলায় নির্বাচন কমিশনকে পার্টি করা হলো না কেন বা পাটি করা হয়ে ুথাকলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার থেকে শুরু করে কমিশনের সচিব, কমিশনার কেউ এ সম্পর্কে কিছু জানেন না কেন? সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে যে আমাদের সংবিধানের ১২৫ ধারার গ অনুচ্ছেদে পরিষ্কার বলা আছে “A court shall not pass any order or direction ad interim or otherwise in relation to an election for which schedule has been announced unless the Election Commission has been given reasonable notice and an opportunity of being heard.” অর্থাৎ নির্বাচন কমিশনকে যুক্তিসংগত নোটিশ না দিয়ে এবং তাদের যুক্তি না শুনে আদালত তফসীল ঘোষণা করা হয়েছে এমন কোনও নির্বাচনের ব্যাপারে অন্তর্বর্তিকালীন বা অন্যকোন আদেশ অথবা নির্দেশনা জারী করবেন না। স্থগিতাদেশে সংবিধানের ১২৫ অনুচ্ছেদের গ ধারা কি রক্ষা করা হয়েছে? যদি না হয়ে থাকে কেন? প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, নির্বাচন কেন স্থগিত হয়েছে তিনি তা জানেন না। টেলিভিশনের খবরে তিনি স্থগিতাদেশের কথা শুনেছেন। নির্বাচন কমিশনের সচিব জনাব হেলালুদ্দিন বলেছেন তিনি রীট পিটিশন সম্পর্কে কিছুই জানেন না। আদেশের পরে তারা সবাই এ সম্পর্কে জানতে পেরেছেন। নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেছেন যে তিনি খবরটি শুনে বিস্মিত হয়েছেন এবং জানিয়েছেন যে তিনিও এর কারণ জানেন না এবং তথাপিও আদালতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে গাজীপুর সিটি নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসারকে নির্বাচনের যাবতীয় কাজকর্ম স্থগিত করতে পরামর্শ দিয়েছেন।
এ দিকে বিভিন্ন গণমাধ্যম নির্বাচন স্থগিতের নেপথ্যের খবর প্রকাশ করতেও শুরু করেছে। আওয়ামী ঘরানার প্রভাবশালী একটি দৈনিকের ভাষ্য অনুযায়ী সরকারি দলের হেরে যাবার আশঙ্কার পটভূমিতে তফসীল ঘোষণার পর ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন নাটকীয়ভাবে স্থগিত হয়েছিল। চার মাসের ব্যবধানে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল। উভয় ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে রিট চ্যালেঞ্জে শিথিল মনোভাব প্রদর্শন করতে দেখা গেছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী তিন বছর আগে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ছয়টি মৌজার জটিলতা নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা আজহারুল ইসলাম হাইকোর্টে একটি রিট মামলা দায়ের করেছিলেন। এই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় সরকার বিভাগ তদন্ত করে বিষয়টি নিষ্পত্তি করে, চলতি বছরের ৪ মার্চ এই নিষ্পত্তি সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারী করা হয়। প্রজ্ঞাপন জারীর দুই মাস পর অর্থাৎ চলতি মে মাসেই এই প্রজ্ঞাপন ও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনী তফসীলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আগের রিটকারী জনাব আজহারুল ইসলাম পুনরায় হাইকোর্টে রীট করেন। এই রীট মামলাতেই হাইকোর্ট থেকে স্থগিতাদেশ দেয়া হয়। কিন্তু কথা হচ্ছে একই বিষয়ে, আবার নিষ্পত্তিকৃত বিষয়ে কয়বার রিট হয়? মামলা যে কেউ করতে পারেন, নিয়মানুযায়ী মামলার Maintainability নিয়ে একটি প্রাথমিক শুনানী হয়। সে শুনানী হয়েছে কিনা সে সম্পর্কে পত্র-পত্রিকায় কোনও রিপোর্ট আসেনি। তাহলে কি হলো? আদালত কি এত ভুল করতে পারে? পুরো ঘটনাটি বিশ্লেষণ করলে আসল কথা বেরিয়ে আসে। এবং তা হচ্ছে ভোটার ভীতি ও ক্ষমতাচ্যুতির ভীতি। লেখাটি যখন শেষ পর্যায়ে তখন আমার এক সহকর্মী একটি খবর দিলেন।
একটা বিশ্বস্থ সূত্র তাকে বলেছে, যে সরকার নির্বাচনী জরীপে নিশ্চিত হয়েছেন যে গাজীপুর সিটি নির্বাচনে তারা ৩৫ পার্সেন্টের বেশি ভোট পাবেন না। কাজেই ‘Wise General, hasty retreat’ কথাটির ন্যায় তারাও নির্বাচন থেকে পিছু হটলেন। রিট একটি অজুহাত মাত্র। অবশ্য এতে আদালতকে সম্পৃক্ত করে সরকার তার সুনাম নষ্ট করেছেন। এই পিছু হটা তাদের কোথায় নিয়ে যায় এখন সেটাই দেখার বিষয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ