ঢাকা, বুধবার 9 May 2018, ২৬ বৈশাখ ১৪২৫, ২২ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নীল জলের লাল সাগর

হামিদ খান : লাল সাগর। রেড সী বা লোহিত সাগর নামে সর্বাধিক পরিচিত। আপনি যদি লোহিত সাগরের তীরে দাঁড়ান বা বেলাভূমিতে আছড়ে পড়া জলের কিনারা ভেঙ্গে হাঁটেন-তাহলে বিভ্রমে পড়ে যাবেন। এত গভীর নীল হল! কোন মতিভ্রষ্ট এর নাম দিয়েছে লোহিত সাগর? এই গভীর নীল জলরাশির নাম রেড সী বা লোহিত সাগর কল্পনার ফানুস কি এতটুকু যায়? যায় না। লোহিত সাগরের বেলা ভূমিতে মিলন ঘটেছে সাগর আর মরুভূমির। এই মরু সাগরের সঙ্গমস্থল সত্যিকার অর্থেই এ গ্রহের সবচেয়ে মনোলোভা প্রাকৃতিক পরিবেশ আর সাগরচিত্র।
লোহিত সাগর এশিয়া এবং আফ্রিকা মহাদেশের মাঝখানে অবস্থিত। এই সাগরের উত্তর প্রান্ত পর্যন্ত সিনাই উপদ্বীপে আর ১০০০ মাইল দক্ষিণের মুখ মিলেছে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে। ভারত মহাসাগর ও লোহিত সাগরের মিলনস্থলের একপাশে ইয়েমেন, অন্য পাশে ইথিওপিয়া। উত্তর পশ্চিম জুড়ে মরু প্রান্তর। দক্ষিণে পর্বতময়। এ সব পর্বতের গড় উচ্চতা ২৬৪২ মিটার। এ পর্বতমালা সৌদি আরব থেকে শুরু করে সিনাইপার হয়ে আফ্রিকা মহাদেশের নুবিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। লোহিত সাগর তার কাঁচ স্বচ্ছ নীল জলের নীচে ধারণ করে আছে এক চমৎকার প্রাণের রাজ্য। এক সবুজ উদ্যান। ডুবো পাহাড় আর প্রবাল রাজ্যের বিভিন্ন বিন্যাস এ উদ্যানের শোভা বাড়িয়েছে অনেক। পূর্ব-পশ্চিমের যোগাযোগের ক্ষেত্রে এপথ দীর্ঘদিন ধরে মানুষের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু ছিল।
লোহিত সাগরের জন্ম ৩ কোটি বছর আগে ভূমি প্লেট সরে যাওয়ার কারণে। ওই সময় আরব উপদ্বীপ আফ্রিকা থেকে সরে যেতে শুরু করে। তৈরি হয় ছোট ফাটল, এই ছোট ফাটলটি তখনই সাগর জলে ভরে যায়। প্রকৃতি এ পর্যন্ত এসেই থেমে থাকেনি। ২ কোটি বছর আগে আবার ভূমির নড়াচড়া শুরু হয়। আফ্রিকা থেকে ভাগ হওয়া আরব উপদ্বীপ উত্তরে সরে যেতে থাকে। এই যাত্রা বাধাপ্রাপ্ত হয় তুরস্কের ভূমি দ্বারা, আরব উপদ্বীপ যাত্রা শুরু করে পূর্ব দিকে। আরো একটা খাঁড়ির সৃষ্টি হয়।
এই খাঁড়িটি ইসরাইলের উত্তর অঞ্চলে সৃষ্ট। এরা জর্ডান উপত্যকা হয়ে ডেড সী পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে। সবশেষে এর বিস্তৃতি ঘটে এইলাট উপসাগর হয়ে সিনাই-এর দক্ষিণপ্রান্ত রাস মোহাম্মদ পর্যন্ত। সাম্প্রতিক অতীতে এইলাটে উপসাগর এই খাঁড়ির গভীরতা বাড়িয়ে দেয়। দাহাবে এর গভীরতা দাঁড়ায় ১০০০ মিটার। উত্তরে ডিরানে এর গভীরতা ১৮০০ মিটার। অন্যদিকে পুরাতন সুয়েজ উপসাগরের গভীরতা অনেক কম। এ অঞ্চলে সর্বোচ্চ গভীরতা ৮৫ মিটার। লোহিত সাগরের প্রশস্ততা এখনো প্রতি বছর দেড় ইঞ্চি করে বাড়ছে। ভূ-মন্ডলের এই ফাটল এই গ্রন্থের ইতিহাসে সবচেয়ে শেষের ঘটনা। এর মাধ্যমে ভূ-তাত্ত্বিকরা শত কোটি বছর আগে আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে পারছেন।
লোহিত সাগরের পানির তাপমাত্রা প্রায় সারা বছর অপরিবর্তিত থাকে। এখানকার পানির গড় তাপমাত্রা ২২ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেট। এটা গ্রীষ্মকালের গড়। সাহারা মরুভূমিতে নিম্নচাপ দেখা দিয়ে এশিয়া থেকে গরম শুষ্ক বাতাস ওইদিকে বইতে শুরু করে। এর ফলে এ অঞ্চলে তপ্ত বালিঝড় হয়, তাপমাত্রা বাড়ে বিপুল জলরাশি। একই সময়ে লোহিত সাগরের নি¤œচাপের কারণে দক্ষিণ থেকে ধেয়ে আসে ভেজা ঠান্ডা বাতাস। এর ফলে সৃষ্টি হয় কুয়াশা ও মেঘ। মাঝে মাঝে বৃষ্টিও হয়। উত্তরের ভূমি উপকরণ উপসাগরের জলের তাপমাত্রার জন্য প্রধান কারণ। তবে যতই দক্ষিণে খোলা সাগরের দিকে যাওয়া হবে ততই শীতল হবে জল। দক্ষিণের খোলা সাগরের শীতলকরণ প্রক্রিয়া এক চমকপ্রদ তাপমাত্রা সৃষ্টি করে। গরমে দক্ষিণে থাকে নিম্ন তাপ আর উত্তরে থাকে উচ্চ তাপমাত্রা। শীতকালে এটা উল্টে যায়। সব সময়ই শীতলতম মাস হচ্ছে জানুয়ারি আর উষ্ণতম মাস হচ্ছে জুলাই ও আগস্ট। সমুদ্র ভ্রমণকারীদের জন্য লোহিত সাগর খুব ভাল নয়।
এর কারণ সমুদ্র পৃষ্ঠের তীব্র বাতাস এবং ঘন ঘন আবহাওয়ার চরিত্র ও ধরন বদল। সৈকতে সমুদ্র দর্শন প্রীতিকর হলেও ব্রাদার আয়ারল্যান্ডের মত উপকূলবর্তী দ্বীপ ভ্রমণ সুখকর হয় না। দ্বীপটি আল কাইজার থেকে কাছাকাছি হয়। আবহাওয়ার টালমাটাল অবস্থার কারণে প্রায়ই নৌকাগুলো বিপদে পড়ে।
কার্গো জাহাজ, অয়েল ট্যাংকর, মাছধরা জাহাজ, যাত্রীবাহী জাহাজ এই জলপথে হরহামেশা যাতায়াত করে। এতে ব্যবসা হচ্ছে বহুজনের। কিন্তু নীল জলাশির এই সাগরের প্রকৃত সম্পদ লুকিয়ে আছে এর জলের তলে। এখানে প্রায় ১০০০ প্রজাতির অমেরুদণ্ডী প্রাণীর বাস। এখানে আছে ২০০ জাতের প্রবাল। এছাড়া লোহিত সাগর এক হাজারেও বেশি প্রজাতির মাছে পরিপূর্ণ। এটা আনুপাতিক হারে বিবেচনা করলে ব্যাপক। আরো একটা মজার বিষয় হচ্ছে জল কেলির জন্য বিশেষ করে ‘ডাইভিং’ এর জন্য লোহিত সাগরকে খুবই উপযোগী মনে করা হয়। লোহিত সাগর ডাইভার, আলোকচিত্রী, সমুদ্র বিজ্ঞানী এবং বিশ্রামার্থীদের ব্যাপকভাবে আকর্ষণ করে। সাগরের চমৎকার প্রবালদ্বীপ, সাগরের রঙিন বিস্ময়কর পরিবেশ সারা পৃথিবীর সৌন্দর্য পিপাসুদের কাছে ডাকে। বিভিন্ন স্থানে আছে জীবন্ত প্রবালের উপনিবেশ। এই জীবন্ত উপনিবেশ সাগরের ব্যাপক গুহা, লেগুন ও বাগান সৃষ্টির রহস্য উন্মোচনে সহায়ক। কিছু কিছু প্রবাল পাহাড়ের উচ্চতা সাগরের তলদেশ থেকে কয়েক হাজার ফুট পর্যন্ত উঠে এসেছে। তবে লোহিত সাগর একেবারে বিপদ শূন্য হয়। কিছু সমস্যা এখানে যা আপনাকে সাগর মন্থনে বিরত রাখতে চাইবে। সামুদ্রিক প্রাণীর কাছ থেকে লোহিত সাগরে বিপদের সম্ভাবনা কম। তাছাড়া যে বিপদ আছে সেগুলোকে সাধারণ জ্ঞান ব্যবহার করেই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব।
কিছু সামুদ্রিক প্রাণী স্পর্শের জন্য বিপজ্জনক। কিছু খাওয়ার জন্য বিপজ্জনক। কিছুর  মুখোমুখি হওয়া বিপদের। কিছু অগ্নি-প্রবাল ফোয়ার কোরাল এবং কিছু জলজ উদ্ভিদ আছে যেগুলো স্পর্শ করলে তীব্র বেদনা অনুভূত হয়। যারা ভাল সাঁতার জানে না তাদের জন্য স্বল্প জলে বসে থাকাটা খুবই উপযোগী। হাঙ্গর, কাছিম, বাইম আপনার হাত থেকে পাউরুটির টুকরো নেবে। এছাড়া নানা জাতের অত্যুজ্জ্বল রঙিন মাছ আপনার চারপাশ আলো করে থাকবে। তবে বেশির ভাগ আপনাকে বলবেন গভীর জলে ডুবে দেয়াতে চমকপ্রদ তেমন কিছুই নেই। তবে নতুন ডুবুরিদের অনেকেই বলবেন হায় এতদিন প্রকৃতির এ সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসিনি কেন? লোহিত সাগর হল ডুবুরিদের জন্য ‘স্বর্গ’। স্বচ্ছ জলে দৃষ্টি যায় বহু দূর, প্রায় সারা জলের উষ্ণতা ডুবুরিদের মায়াবী হাতে ডাকে।
মাছ ধরা একটা শিল্প। জলমগ্ন পাহাড়ের জন্য লোহিত সাগরে মাছ ধরা একটা ভয়ঙ্কর খেলা। বড়শিতে মাছধরা এ সাগরে ৪  হাজার বছর ধরে চলে আসছে। এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে ক্রমাগত। অতিরিক্ত মাছ ধরা এবং কিছু বিলুপ্তির পথযাত্রী প্রজাতির সংরক্ষণ এ অঞ্চলের সরকারগুলোর জন্য একটা বড় ইস্যু। লোহিত সাগর থেকে প্রতিবছর প্রায় ৮ হাজার মেট্রিক টন মাছ ধরা হয়। যা সুদানের সার্বিক মাছ শিকারের ৮ গুণ। এ পরিমাণ মিশরের মাছ শিকারের অর্ধেক।
লোহিত সাগরের পানি সম্পদও খুবই প্রয়োজনীয় একটা বিষয়। এ সাগরের পাড়ে গড়ে ওঠা শহরের নাম পানীয় জলের জন্য নির্ভর করে এ সাগরের পানি সম্পদের উপর। ফলে গড়ে উঠেছে পানিশোধন কেন্দ্র।
এদিকে দূষণ নিরোধ নিয়েও চলছে নানা তৎপরতা। ইতোমধ্যেই সৌদি কর্তৃপক্ষ এক রাজকীয় ফরমান জারি করেছে। ফরমানের বলে এখন বেলা ভূমি থেকে ১০০ মাইলের মধ্যে কোন বর্জ্য ত্যাগ নিষিদ্ধ।
যাই হোক, লোহিত সাগর সাঁতারু, ডুবুরি, ব্যবসায়ী, শিল্পমালিক, জেলে, পুরাতাত্ত্বিক, সমুদ্রবিদ্যা বিশারদ, পর্যটক, সকলের জন্য এক আকর্ষণীয় স্থান। সকলের আশা এই প্রাকৃতিক সম্পদ ভা-ার যেন মানুষের হাতে ধ্বংস না হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ