ঢাকা, বৃহস্পতিবার 10 May 2018, ২৭ বৈশাখ ১৪২৫, ২৩ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রাজপথে ‘মাস্তান বাহিনী’

রাজধানী ঢাকার প্রাত্যহিক যানজট এবং পাবলিক বাসসহ গণপরিবহনে যাতায়াতের বিড়ম্বনা সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার অপেক্ষা রাখে না। টিভি ও সংবাদপত্রসহ গণমাধ্যমের প্রায় নিয়মিত রিপোর্টে রাজপথে হাজার হাজার গাড়ির ঠায় দাঁড়িয়ে থাকাসহ সাধারণ মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগের বিবরণ তো থাকছেই, পাশাপাশি থাকছে তাদের অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির কথাও। এ ধরনের বিষয় নিয়ে দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনাও যথেষ্টই হয়েছে। এখনো হচ্ছে। কিন্তু সরকার তো বটেই, অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা বা বিভাগের পক্ষ থেকেও প্রতিকারের কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। জানানো হয়নি তথ্য-পরিসংখ্যানসহ অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কেও। সমস্যার সমাধানে সুষ্ঠু কোনো পরিকল্পনা না আসার ফলেও মানুষের কষ্ট ও দুর্ভোগ দিন দিন কেবল বেড়েই চলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে আবার দুর্ঘটনা এবং  প্রাণহানির সঙ্গে হাত-পা থেতলে ও বিচ্ছিন্ন করে ফেলার মতো ভয়ংকর কর্মকান্ডও যুক্ত হয়েছে।
এমন এক পরিস্থিতিতে দরকার যেখানে ছিল যানজট এবং যাত্রী তথা সাধারণ মানুষের কষ্ট-ভোগান্তি ও ক্ষয়ক্ষতি কমানোর লক্ষ্যে উদ্যোগ নেয়া, সেখানে জানা গেছে সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী এক আশংকাজনক খবর। একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী রিপোর্টে জানানো হয়েছে, বাস মালিকরা রাজধানীর বিভিন্ন রুটের কয়েকটি পর্যন্ত পয়েন্টে তাদের ‘মাস্তান বাহিনী’ নিয়োজিত রেখেছেন। ‘মাস্তান’ শব্দটি ব্যবহার করা হলেও এই বাহিনীর সদস্যরা আসলে সশস্ত্র গুন্ডা-সন্ত্রাসী। ভাড়া আদায় নিয়ে বাস চালক এবং কন্ডাক্টর ও হেল্পারের সঙ্গে তর্ক বা ঝগড়ার মতো কোনো কারণ ঘটলে ‘মাস্তান বাহিনী’র গুন্ডা-সন্ত্রাসীরা সংশ্লিষ্ট যাত্রীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা শুধু মুখের অশ্লীল কথাতেই থেমে যায় না, যাত্রীদের গায়ে পর্যন্ত হাত তোলে। মারপিট করে এবং অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত ভাড়ার চাইতে অনেক বেশি টাকাও জোর করে আদায় করে নেয়।
প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, গাজীপুর থেকে গুলিস্তান ও সায়েদাবাদ পর্যন্ত দীর্ঘ রুটের টঙ্গী, উত্তরা, খিলক্ষেত, বাড্ডা, রামপুরা, মালিবাগ, মৌচাক, গুলিস্তান ও সায়েদাবাদের কয়েকটি পয়েণ্টে ‘মাস্তান বাহিনী’র সদস্যরা তৎপরতা চালাচ্ছে। ওদিকে মিরপুর-গুলিস্তান এবং মিরপুর-রামপুরা রুটে মিরপুর ১০, ১১, ১২ ও এক নম্বর ছাড়াও আগারগাঁও, আসাদ গেট, ফার্মগেট, মহাখালি, বাংলামোটর, বাড্ডা ও রামপুরাসহ বেশ কয়েকটি পয়েন্টে তৎপর রয়েছে ‘মাস্তান বাহিনী’র গুন্ডা-সন্ত্রাসীরা। এসব রুটের কোথাও যাত্রীদের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে কোনো বিতর্ক বা ঝগড়া হলেই বাস চালক মোবাইলে বিশেষ একটি নম্বরে ফোন করে দেয়। ফোন এলেই তৈরি হয়ে যায় ‘মাস্তান বাহিনী’। বাস চালক এরপর নির্ধিারিত কোনো স্থানে এসে হঠাৎ বাস থামিয়ে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়ে গুন্ডা-সন্ত্রাসীরা। আর উঠেই কন্ডাক্টর বা হেল্পারের দেখিয়ে দেয়া যাত্রী বা যাত্রীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা। 
রিপোর্টে তর্ক, ঝগড়া বা বিবাদ কেন হয়- সে সম্পর্কে জানাতে গিয়ে সরকার-নির্ধারিত ভাড়ার চাইতে বেশি টাকা আদায়, নামে সিটিং সার্ভিস হলেও দাঁড় করিয়ে ও ঠেসাঠেসি করে যাত্রী ওঠানো এবং নির্দিষ্ট স্টপেজ ছাড়াও যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানো ও নামানোর মতো বিভিন্ন কারণের উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন মিনিবাসে ও বড় বাসে সরকার-নির্ধারিত সর্বনিম্ন ভাড়া যথাক্রমে পাঁচ ও সাত টাকা। অন্যদিকে ভাঙাচোরা ও জোড়াতালি দেয়া মিনিবাসগুলোতেও ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয় সর্বনিম্ন ভাড়া হিসেবে। এরপর দূরত্বের সঙ্গে ভাড়ার পরিমাণও বাড়তে থাকে। এ ধরনের স্বেচ্ছাচারিতার প্রতিবাদেই যাত্রীদের অনেকে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। তখনই তর্ক ও কথাকাটাকাটি থেকে ঝগড়া-বিবাদের শুরু হয়। সংখ্যায় যাত্রীরা বেশি বলে প্রায় সব ক্ষেত্রে কন্ডাক্টর  ও হেল্পাররা সহজে পেরে ওঠে না। এমন অবস্থার ‘বিহিত’ করার জন্যই বাস মালিকরা ‘মাস্তান বাহিনী’ গঠন করেছেন। বাহিনীর সদস্য গুন্ডা-সন্ত্রাসীরাও যাত্রীদের নাজেহাল করে চলেছে। জানা গেছে, মালিক সমিতি স্বীকার না করলেও এই ‘মাস্তান বাহিনী’র কারণে ভদ্রজনদের পক্ষে বাসে যাতায়াত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি বিপন্ন্ হচ্ছেন নারী যাত্রীরা। মালিকদের নিয়োজিত গুন্ডা-সন্ত্রাসীরা নারী যাত্রীদের সম্ভ্রমহানি ঘটায় বলেও অভিযোগ উঠেছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, ‘মাস্তান বাহিনী’র সাহায্যে হামলা ও নির্যাতন চালানোর এবং যাত্রীদের অসম্মানিত ও নাজেহাল করার খবর যে কোনো মূল্যায়নে অগ্রহণযোগ্য। আমরা মনে করি, গুন্ডা-সন্ত্রাসীদের পেছনে অর্থ ব্যয় করার পরিবর্তে মালিকদের উচিত সকল রুটে সরকার-নির্ধারিত হারে ভাড়া আদায় করা এবং ভাঙাচোরা গাড়িকে সিটিং সার্ভিস হিসেবে চালানো থেকে বিরত থাকা। এ ব্যাপারে বিআরটিএর মাধ্যমে সরকারকেও তৎপর হতে হবে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতিসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের পক্ষ থেকে সিটিং সার্ভিস বাতিল করার যে দাবি জানানো হয়েছে তাকেও আমরা যুক্তিসঙ্গত বলে মনে করি। সরকারের উচিত রাজধানীর গণপরিবহন খাতে সমতা ফিরিয়ে আনা, অভিন্ন ভাড়ার হার প্রবর্তন করা এবং যাত্রীদের স্বার্থ ও মান-সম্মান রক্ষার ব্যাপারে বিশেষভাব মনোযোগ দেয়া। আমরা একই সঙ্গে বিভিন্ন রুটে তৎপর ‘মাস্তান বাহিনী’র বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্যও দাবি জানাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ