ঢাকা, বৃহস্পতিবার 10 May 2018, ২৭ বৈশাখ ১৪২৫, ২৩ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সামগ্রিক সংকটে প্রয়োজন নৈতিক জাগরণ

তরুণরা, যুবকরা জাতির শ্রেষ্ঠ সম্ভাবনা। কিন্তু সম্ভাবনার এই শক্তি যদি বিপথের যাত্রী হয় তাহলে জাতির জন্য তা হয়ে উঠতে পারে আপদের বিষয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সম্ভাবনাময় এই শক্তির যথাযথ বিকাশে আমাদের পরিবারে, সমাজে এবং রাষ্ট্রে কাক্সিক্ষত সচেতনতা ও ব্যবস্থাপনা আছে কী? এর আশাপ্রদ চিত্র নেই, জবাবও নেই। তবে কাজটি যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ তা সবাই স্বীকার করে থাকেন। কিন্তু কেবল মৌখিক স্বীকৃতি কোন লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য যথেষ্ট বলে বিবেচিত হতে পারে না। এ কারণেই হয়তো প্রায় প্রতিদিনই তরুণদের, যুবকদের ভুল পথে যাওয়ার প্রতিবেদন মুদ্রিত হচ্ছে পত্রিকার পাতায়।
‘লেখাপড়া শেষ করে দুই বন্ধুর ইয়াবা ব্যবসা!’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন মুদ্রিত হয়েছে পত্রিকান্তরে। ৫ মে মুদ্রিত প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেছেন দুই বন্ধু ইমরানুল হক ও তাইজুল খান। চাকরিও খুঁজেছিলেন কিছুদিন। সে জন্য নিয়েছিলেন পর্যাপ্ত প্রস্তুতি। হঠাৎ তাদের ভাবনায় আসে, চাকরি করে জীবনে কত টাকা আয় করা সম্ভব? জীবনে কি স্বচ্ছলতা আসবে? এর চেয়ে তো ব্যবসাই ভাল। আর তা যদি হয় অল্প পুঁজিতে, তা হলে তো কথাই নেই। চাকরি করে গাধার খাটুনি খেটে কী লাভ! চোখ বন্ধ করে তারা নেমে পড়েন ইয়াবা ব্যবসায়। অল্প দিনে সফলতাও আসে তাদের। জমিয়ে ফেলেছিলেন বেশকিছু টাকা, কেনেন গাড়িও। তবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে এতদিন ফাঁকি দিয়ে হলেও ৪ মে তারা ফেঁসে যান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের (ডিএনসি) কর্মকর্তাদের জালে। ডিএনসি প্রধান কার্যালয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে এভাবেই বর্ণনা দেন দুই বন্ধু ইমরানুল হক ও তাইজুল খান। ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থেকে ব্রিফকেস ভর্তি ৬০ হাজার পিস ইয়াবাসহ দুই বন্ধুকে গ্রেফতার করেন ডিএনসি কর্মকর্তারা। জব্দ করা হয় তাদের ব্যবহৃত প্রাইভেট কারটিও। তারা বিভিন্ন কৌশলে রাজধানীতে ইয়াবা এনে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করতেন।
যৌবনদীপ্ত ও মেধাবী ছাত্রদের এমন ভ্রষ্টযাত্রা আমাদের জন্য বড় দুঃসংবাদ। তারা এমবিএ পাস করেছিলেন, কিছুদিন চাকরিও খুঁজছিলেন। দেশের চাকরির বাজার তো বেশ কঠিন এবং তেমন আকর্ষণীয়ও নয়। এমন পটভূমিতে তারা ভুল পথে পা বাড়ালেন। এখানে এ বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, তদের নৈতিক মান ছিল বেশ দুর্বল। অনেক মেধাবী যুবক তো চাকরির এই কঠিন বাজারে ধৈর্য ধরেছেন, চাকরিও পেয়েছেন। প্রাপ্ত সীমিত অর্থেই তারা জীবনযাপন করছেন, সংসার চালাচ্ছেন। প্রশ্ন জাগে, বিভ্রান্ত ওই যুবকরা পরিবার থেকে, সমাজ থেকে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে সঠিক জীবনদৃষ্টি ও নৈতিক মূল্যবোধ অর্জনে ব্যর্থ হলো কেন? রাষ্ট্রও কি ওদের স্বপ্ন পূরণে সফলতার পরিচয় দিতে পারছে?
ভুল বার্তা এখন লক্ষ্য করা যাচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গনেও। এক সংবাদ সম্মেলনে গুরুতর অভিযোগ করেছেন বরগুনা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জুবায়ের আদনান অনিক। তিনি বলেন, বরগুনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর ছেলে জেলা তরুণ লীগের সভাপতি ও জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক সুনাম দেবনাথ মাদক বিক্রি করে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। সুনাম দেবনাথের বিরুদ্ধে মাদকের কারবারসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ এনে গত ২৮ এপ্রিল শনিবার জেলা ছাত্রলীগের এক সংবাদ সম্মেলনে সভাপতি জুবায়ের আদনান অনিক লিখিত বক্তব্যে বলেন, বরগুনার তরুণ সমাজ এখন ইতিহাসের ভয়ঙ্করতম সময় পার করছে। আগে শুনেছি কাজের বিনিময়ে খাদ্য মানে ‘কাবিখা’ কাজের বিনিময়ে টাকা মানে ‘কাবিটা’। কিন্তু এখন শুনতে হচ্ছে ‘মাবিরা’ মানে মাদকের বিনিময়ে রাজনীতি। মাদকের বিনিময়ে এখন অনেক তরুণই মিছিলে যায়। একটি ফেনসিডিল আর দুটি ইয়াবা ট্যাবলেটের বিনিময়ে অনেক তরুণই এখন ফেসবুকে ফেক আইডি খুলে পক্ষ-বিপক্ষের নেতাদের সম্পর্কে প্রচার ও অপপ্রচার চালায়। অনিক আরো বলেন, বরগুনার চিহ্নিত সব মাদক ব্যবসায়ীর নেতৃত্ব দেন এমপির ছেলে সুনাম দেবনাথ। তিনি কৌশলে তরুণদেরকে মাদক সেবন ও মাদক কারবারের সাথে সম্পৃক্ত করে ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতিতে টানছেন। তিনি বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদকের পদবি ব্যবহার করে মাদক কারবারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। বরগুনার বেশিরভাগ মাদকসেবী ও চিহ্নিত মাদক কারবারীরা তার ছত্রছায়ায় থাকেন। এছাড়া জেলার শীর্ষ সন্ত্রাসী অভিজিৎ তালুকদার ওরফে অভি সুনাম দেবনাথের শ্যালক। যার নামে ডাকাতি, ছিনতাই, অপহরণ, ধর্ষণ, জমিদখল এবং চাঁদাবাজিসহ প্রায় ১৬টি মামলা রয়েছে। একের পর এক ভয়ঙ্কর সব অপরাধ করেও এমপির ছেলের সহযোগিতায় পার পেয়ে যান অভি।
জেলা ছাত্রলীগের সংবাদ সম্মেলনে এমপি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর ছেলের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে তা খুবই মারাত্মক। রাজনৈতিক পদবি ব্যবহার করে তিনি যেভাবে মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসকে প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছেন, তাতে উপলব্ধি করা যায় তরুণরা কীভাবে বিপথগামী হচ্ছেন এবং রাজনীতি কীভাবে দুর্বৃত্তায়নের কবলে পড়ছে। আর ছেলে সুনাম দেবনাথের কর্মকা- সম্পর্কে তো এমপি সাহেবের অবহিত থাকার কথা। তিনি ছেলেকে শৃঙ্খলায় রাখলেতো আজ এতো অভিযোগ উঠতো না। বিষয়গুলো গুরুতর বিধায় আমরা আশা করবো, প্রশাসন সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দুষ্টের দমনে ও শিষ্টের পালনে সঙ্গত পদক্ষেপ নেবে।
পর্নো তারকা স্টর্মি ড্যানিয়লসকে মুখ বন্ধ রাখার জন্য আইনজীবী কোহেনের অর্থ দেয়া এবং পরে তা পরিশোধের বিষয়টি অবশেষে স্বীকার করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ড্যানিয়েলসকে দেয়া অর্থ ‘ট্রাম্প নিজের আইনজীবী কোহেনকে ব্যক্তিগতভাবে পরিশোধ করেছিলেন’ বলে সাবেক নিউইয়র্ক সিটি মেয়র রুডি গিউলিয়ানি জানানোর পর এবার ট্রাম্পও বললেন, ওই অর্থ তিনি শোধ করেছেন এবং তা বৈধভাবেই দেয়া হয়েছে। বিবিসির খবরে আরো বলা হয়, ট্রাম্প বলেছেন- ‘ওই অর্থ প্রেসিডেন্টের নির্বাচনী প্রচারাভিযানের তহবিল থেকে দেয়া হয়নি।’ ফলে প্রচারণার তহবিল যে তসরুপ হয়নি, সেটাই মূলত বলতে চেয়েছেন ট্রাম্প। ড্যানিয়েলসকে অর্থ দেয়া নিয়ে এই প্রথম সরাসরি কথা বললেন ট্রাম্প। যদিও ওই পর্নো তারকার সাথে কোনো সম্পর্ক থাকার কথা এখনো জোর গলায় অস্বীকার করছেন তিনি।
এদিকে স্টর্মি ড্যানিয়েলসের দাবি, ২০০৬ সালে তার সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু ড্যানিয়েলস যাতে বিষয়টি নিয়ে মুখ না খোলেন সে জন্যই ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাসখানেক আগে ট্রাম্প তার আইনজীবী মাইকেল কোহেনের মাধ্যমে ড্যানিয়েলসকে এক লাখ ৩০ হাজার ডলার দেন। কোহেন এরই মধ্যে ড্যানিয়েলসকে ওই অর্থ দেয়ার কথা স্বীকার করেছেন। আর ট্রাম্প এ অর্থই পরে কোহেনকে পরিশোধ করেছেন বলে ফক্স নিউজকে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন তাঁর আইনি টিমের নতুন সদস্য গিউলিয়ানি। ট্রাম্প এ ধরনের কোনো অর্থ লেনদেনের ব্যাপারে কিছুই জানতেন না বলে দাবি করে আসছিলেন এতদিন। অথচ ৩ মে বৃহস্পতিবার ট্রাম্প তিনটি টুইটে ড্যানিয়েলসকে দেয়া অর্থ পরিশোধ এবং তার সাথে গোপনীয়তা চুক্তি করার বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন।
ভাবতে অবাক লাগে, একজন প্রেসিডেন্ট এত সব অনৈতিক কাজ করেন কেমন করে? তিনি আবার কোনো সাধারণ দেশের নন, বর্তমান সভ্যতার শ্রেষ্ঠদেশ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। বিষয়গুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ট্রাম্প একজন পর্নো তারকার সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন ও তার সাথে অর্থ লেনদেনের ব্যাপারে মিথ্যা বলার দায়ে অভিযুক্ত হয়ে আছেন। দু’টি অভিযোগই মারাত্মক এবং বিবেকবান যেকোনো মানুষের জন্যই লজ্জাকর। অথচ ট্রাম্পের হাবভাবে তেমন কোনো লক্ষণ নেই। বরং তিনি বাগাড়ম্বর চালিয়ে যাচ্ছেন। তার দাম্ভিকতা বেশ দৃষ্টিকটূ। এমন বৈশিষ্ট্যের মানুষদের জন্য সংশোধন হওয়া বেশ কঠিন ব্যাপার। তবে সংশোধন হলে ভালো হয়। কারণ বড় বড় দেশের প্রেসিডেন্টদের ভুল বৈশিষ্ট্য শুধু সংশ্লিষ্ট দেশের জন্যই নয়, পৃথিবীর জন্যও ক্ষতির কারণ হতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ