ঢাকা, বৃহস্পতিবার 10 May 2018, ২৭ বৈশাখ ১৪২৫, ২৩ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মালয়েশিয়ায় ভোট গ্রহণ শেষ হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাষ

মাহাথির জিতলে বিরোধী আনোয়ার ইব্রাহিমকে মুক্ত করে ক্ষমতা হস্তান্তর করার চুক্তি

৯ মে, স্টার অনলাইন/রয়টার্স/দি স্ট্রেইট টাইমস, দ্য গার্ডিান : সংসদের ২২২ আসনে প্রতিনিধি নির্বাচনে গতকাল বুধবার ভোট প্রদান করেন মালয়েশিয়ার ভোটাররা। এই নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক ও দেশটির সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। প্রায় দেড় কোটি ভোটার স্থানীয় সময় সকাল আটটা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে। সকাল নয়টায় নিজের আসনে ভোট দিয়েছেন নাজিব। প্রাক নির্বাচনি জরিপে তার জোটের বেশি আসন পাবে বলে আভাস পাওয়া গেলেও সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না বলে আশঙ্কা রয়েছে। গতকাল বুধবার মধ্যরাতের আগেই ফলাফল ঘোষণা করার আশা করা হলেও আজ বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত তা চলতে পারে বলে বার্তা সংস্থা জানায়।

রাষ্ট্রীয় তহবিল আত্মসাতের অভিযোগ ওঠার পর ২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে নাজিবের পদত্যাগের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। গত বছরই নাজিব রাজাক নির্বাচনের ডাক দেবেন বলে আশা করা হয়েছিলো। তবে তা এড়িয়ে গেছেন নাজিব। নির্বাচনের আগে কাগজপত্র জমা দিতে না পারার অভিযোগে সাময়িক নিষিদ্ধ হয়েছিলো মাহাথিরের দল। পরে অবশ্য তা তুলে নেয়া হয়।

স্বাধীন জরিপকারী প্রতিষ্ঠান মান্দেকার প্রাক নির্বাচনি জরিপে দেখা গেছে নাজিবের নেতৃত্বাধীন বারিসান ন্যাসিওনাল (বিএন) জোট একশো আসনে জয় পেতে পারে। আর মাহাথিরের নেতৃত্বাধীন জোট পাকাতান হারাপান বা আশার জোট পেতে পারে ৮০ টি আসন।

মান্দেকার জরিপ বলছে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ১১২ আসন কোনও জোটই পাবে না। তবে এই জরিপ বলছে, ৩৭টি আসনে কারা জিতবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

দেশটির একটি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, শোকলাহ সেইন সুলতান আহমদ শাহ ভোটকেন্দ্রে সকাল নয়টা ২০ মিনিটে নিজের স্ত্রী রোশমাহ মানসুরকে নিয়ে উপস্থিত হন তিনি। সে সময় ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত ভোটারদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়েন তিনি।

৫৭ বছরের হƒদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ হাসরি সামিওন ব্রিটিশ বার্তা সংস্থাকে বলেছেন, মালয়েশিয়ার জন্য এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ দিন । কেননা এদিন আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবো। আমার মনে হয় মানুষ দীর্ঘদিন ধরে আত্মতুষ্টিতে ভুগেছে। আমাদের এমন একজনকে দরকার যিনি এই দেশকে নেতৃত্ব দিতে পারেন। মালয়েশিয়ার নেতৃতত্বের জন্য একজন স্বপ্নদ্রষ্টা প্রয়োজন।

ভোটের দিন প্রার্থীদের ফোন হ্যাকের অভিযোগ

মালয়েশিয়ার জাতীয় নির্বাচনের ভোটের দিন গতকাল বুধবার সকাল থেকেই  প্রার্থীদের ফোন হ্যাক করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিরোধী পাকাতান হারাপান-পিএইচ জোটের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন বারিসান ন্যাসিওনাল-বিএন জোটের প্রার্থীরাও একই অভিযোগ করেছেন। বেশিরভাগ  প্রার্থীর অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন নম্বর থেকে তাদের ফোনে অনবরত কল আসে। এমনকি ই-মেইল ঠিকানায়ও অসংখ্য স্পাম মেইল এসে ভর্তি হয়ে থাকছেন। এছাড়া বিএন জোটের ওয়েবসাইট হ্যাকেরও অভিযোগ পাওয়া গেছে। সিঙ্গপুরভিত্তিক সংবাদমাধ্যম এ খবর জানিয়েছে।

বিএন জোটের কৌশলগত যোগাযোগ পরিচালক দাতুক সেরি রহমান দাহলান বলেন, সকাল থেকেই বিএন নেতাদের ফোনে কারিগরি সমস্যা দেখা দেয়। দলটির সিপাংগর সংসদীয় আসনের প্রার্থী  এক টুইট বাতা বলেন, ‘আমাদের লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না দিতে  কয়েক সেকেন্ড পর পর বিদেশ থেকে কল আসতেই থাকে।’  

রেম্বু সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দি¦তাকারী ও  বারিসান যুব ইউনিটের প্রধান খাইরি জামালউদ্দিন ওই কলের একটি স্ক্রিনশটসহ টুইট বার্তায় লিখেছেন, ‘সকাল থেকে মনে হচ্ছে আমার ফোনে স্পাম হামলা হয়েছে, আশ্চয্য’ একই স্ক্রিনশটসহ তিনি ফেসবুকে আরেকটি পোস্ট দিয়ে লিখেছেন, ‘বন্ধুরা আমাকে ফোন দিয়ে পাচ্ছেন না বলে আমি দুঃখিত। জরুরি প্রয়োজনে আমার ব্যক্তিগত সহকারী জনাব বেহের সঙ্গে যোগযোগ করুন।’

বিরোধী পিএইচ জোটের অন্যতম সদস্য দ্য ডেমোক্র্যাটিক অ্যাকশন পার্টি-ডিএপি’র মহাসচিব লিম গুয়ান ইং বলেছেন, তিনি ও অন্যান্য দলের নেতারা অচেনা নম্বর থেকে অনেক কল পাচ্ছেন। নম্বর দেখে মনে হয় এগুলো বিদেশ থেকে স্বয়ক্রিয় প্রক্রিয়ায় পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, দলের সদস্যদের একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না দিতে এই সাইবার হামলা চালানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘এটা আমাদের ওপর একটি নোংরা প্রাযুক্তিক হামলা। আমাদের পক্ষঘাতগ্রস্ত হয়ে আছি। আমরা আর কথা বলতে পারছি না। তারা পিএইচ’র জয় বাতিল করতে নির্বাচন ব্যবস্থায় আঘাত করার চেষ্টা করছে’। এই ধরনের কলের মাধ্যমে ফোন হ্যাকড করার চেষ্টা করা হচ্ছে জানিয়ে লিম গুয়ান ইং দলের সদস্য ও জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।  

রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, এই স্পাম কল মালয়েশিয়ান নাগরিক অধিকার সংগঠন সুয়ারামের নেতাদেরও আক্রমণ করেছে। সংগঠনটি বলেছে, ‘ভোটের দিনের মতো স্পর্শকাতর সন্ধিক্ষণে এই স্পাম কল পরিষ্কারভাবে মানবাধিকার কর্মী ও রাজনীতিকদের কাজকে ব্যহত করার চেষ্টা’।

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক এসব ‘স্পাম কলে’র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, জোটের অনেক ওয়েবসাইটেও ঢোকা যাচ্ছে না। টুইট বার্তায় তিনি আরও বলেন, ‘আমি বিষয়টি নিয়ে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে নিন্দেশ দিয়েছি’। 

রাজনীতিন ও মানবাধিকার কর্মীদের কাছ থেকে এমন অভিযোগ আসলেও কোনও রাজনৈতিক নেতাই এই হামলার জন্য নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীকে সন্দেহ করে বক্তব্য দেননি। আর দেশটির টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা মালয়েশিয়ান কমিউনিকেশন ও মাল্টিমিডিয়া কমিশন (এমসিএমসি) তাৎক্ষণিকভাবে এই বিষয় কোনও মন্তব্য করেনি।

এদিকে ১৯৮১ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত টানা ২২ বছর ক্ষমতায় থাকলেও এবার বিরোধী দল থেকে নির্বাচন করছেন মালয়েশিয়ার নেতা মাহাথির মোহাম্মদ। তবে নির্বাচনে জয়লাভ করলেও দুই বছরের বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না ৯২ বছর বয়সী এই নেতা। বিরোধী দলের নেতৃত্ব নেওয়ার চুক্তির সময়ই এমন শর্ত মেনে নিয়েছেন আধুনিক মালয়েশিয়ার জনক মাহাথির। চুক্তি মোতাবেক, নির্বাচনে জয়লাভ করলে তিনি বিরোধী নেতা আনোয়ার ইব্রাহিমকে ক্ষমা করে দিয়ে মুক্ত করবেন। আর দুই বছরের মধ্যে তার হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের খববে বলা হয়, দেশজুড়ে মাহাথির মোহাম্মদের অনুগত লোকের সংখ্যা অনেক হলেও সম্প্রতি সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের কারণে ক্ষমতাসীন দলের জয়ের সম্ভবনা বেশি। কারণ তাদের সুবিধামতোই এই সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশটির নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘ বেরসিহ’ অনুমান করেছে, নাজিব ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ জনপ্রিয় ভোট পেয়ে জয়লাভ করতে পারবেন।

তবে শেষ দিকে এসে নির্বাচনি জন¯্রােত নাজিবের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে গেছে বলে মনে করছে অনেকে। গবেষণা সংস্থা মারদেকা সেন্টারের সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, মাহাথিরের পাকাতান হারাপান জোট ৪৩ দশমিক ৭ শতাংশ জনপ্রিয় ভোট পেয়ে  জয়লাভ করবে। আর নাজিবের ক্ষমতাসীন বারিসান ন্যাসিওনাল জোট পাবে ৪০ দশমিক ৩ শতাংশ ভোট।

যদি বিরোধী দল সত্যি নির্বাচনে জিতে যায় তাহলে ১৯৫৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পর দেশটির ইতিহাসে এমন ঘটনা হবে প্রথমবার। তবে  যদি নাজিব নির্বাচনে খারাপ করেই তাহলে নির্বাচন পরবর্তী নেত্ত্বৃ সংকটের আশঙ্কা রয়েছে।

তবে জিতলেও বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না মাহাথির মোহাম্মদ। কারণ নির্বাচনের জোট গঠনের চুক্তি অনুসারে মাহাথিরকে দুই বছর পর আনোয়ার ইব্রাহিমের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। আনোয়ার মোহাম্মদ সমকামের দায়ে দ্বিতীয় মেয়াদে কারাদ- ভোগ করছেন। তবে এই নেতার দাবি, তাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ফাঁসানো হয়েছ

নাজিব রাজাকের মতো আনোয়ার ইব্রাহিমও এক সময় মাহাথির মোহাম্মদের শিষ্য ছিলেন। তবে অনেক ক্ষমতাবান ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় ১৯৯৯ মাহাথিরই তাকে জেলে পাঠিয়েছিলেন। তবে এবারের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিজেদের বিরোধ মিটিয়ে ফেলেছেন তারা। নির্বাচনে জিতলে আনোয়ার ইব্রাহিমকে ক্ষমা করে দেবেন মাহাথির। পরে তার কাছেই দায়িত্ব হস্তান্তর করবেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ