ঢাকা, বৃহস্পতিবার 10 May 2018, ২৭ বৈশাখ ১৪২৫, ২৩ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ইরানের সাথে পরমাণু চুক্তিতে আসলে কি আছে?

৯ মে, আল আরাবিয়া/দ্য বোস্টন গ্লোব : ২০১৫ সালে ইরান বিশ্বের ছয়টি পরাশক্তির সাথে তার পরমাণু কর্মসূচি সংক্রান্ত একটি দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে আসতে সম্মত হয। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, চীন এবং রাশিয়া, অর্থাৎ পি ফাইভ প্লাস ওয়ান নামে পরিচিত পরাশক্তিগুলি ছিল এই চুক্তির অংশীদার।

 দেশটি তার পরমাণু কর্মসূচি বৃদ্ধি করায় কয়েক বছর ধরে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। যদিও ইরান তার কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ বলে দাবি করে আসছিল, কিন্তু তা বিশ্বাস করেনি বিশ্বের পরাশক্তিগুলো।

পারমাণবিক চুল্লীর জ্বালানি হিসেবে যেমন ইউরেনিয়ামের ব্যবহার তেমনি এটি দিয়ে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিও সম্ভব। তবে ২০১৫ সালের চুক্তির পর ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়া থেকে সরে আসে ইরান। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ইরান সংবেদনশীল পরমাণু কর্মকাণ্ড সীমিত করতে রাজি হয় এবং দেশটির বিরুদ্ধে আনা অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নেবার শর্তে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের পরমাণু কর্মকাণ্ড পরিদর্শনে অনুমতি দেয়।

জাতিসংঘের পরমাণু বিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি বা আইএইএর পরিদর্শকরা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা এবং সামরিক প্রকল্পগুলো পরিদর্শন করতে পারবেন- সে ব্যাপারে সম্মতি দেয় তেহরান।

 সেসময় বারাক ওবামা প্রশাসন আত্মবিশ্বাসী ছিল যে এর অধীনে ইরান কোনও ধরনের গোপন পারমাণবিক কর্মকা- চালাবে না। ইরানও তা নিশ্চিত করে।

তবে এবার ইরানের সাথে পারমাণবিক চুক্তি থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে। মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ ঘোষণা দেন।

নানতাজ এবং ফোর্ডো- ইরানের এই দুটি জায়গায় গড়ে ওঠা পারামণবিক কেন্দ্রে জড়ো করা হয়েছিল প্রচুর পরিমাণে ইউরেনিয়ামের বিশেষ আইসোটোপ ইউ-২৩৫। যা কিনা অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করা যায়

১৫ বছর পর্যন্ত পরমাণু জ্বালানি রাখার পরিমাণ, সেন্ট্রি-ফিউজসহ অন্যান্য যন্ত্রাংশের উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে সীমারেখা টেনে দেয়া হয়। শর্ত থাকে ইরান সেন্ট্রি-ফিউজ দুই-তৃতীয়াংশ হ্রাস করবে।

বর্তমানে ইরানের কাছে যে ইউরেনিযাম আছে তা থেকে ৯৮ শতাংশ কমিয়ে ৩শ কেজিতে নামিয়ে আনতে হবে। ফোর্ডো কেন্দ্রের ভূ-গর্ভস্থ অংশকে বানাতে হবে পদার্থ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র। সেখানে কেবলমাত্র চিকিৎসা, কৃষি ও বিজ্ঞান গবেষণায় ব্যবহƒত রেডিও আইসোটোপ তৈরি করা যাবে।

আর্ক শহরের কাছে ইরানে একটি পারমাণবিক একটি চুল্লী ছিল। যেখান থেকে প্লুটোনিয়াম পাওয়া যায় যা পারমাণবিক বোমা তৈরিতে ব্যবহার করা হয়।

বিশ্ব পরাশক্তিগুলো বেশকিছু দিন ধরেই ইরানের এই কর্মসূচীর বিরোধিতা করে আসছিল। চুক্তি অনুযায়ী ইরান সম্মত হয় যে তারা অস্ত্র তৈরিতে সক্ষম প্লুটোনিয়াম উৎপাদন বন্ধ রাখবে।

ইরান যে পরিমাণ ইউরেনিয়াম মজুদ করেছিল তা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হিসেব অনুযায়ী ৮-১০টি পরমাণু বোমা তৈরি করা সম্ভব। আর সবচেয়ে কম সময়ের মধ্যে অর্থাৎ চাইলেই ২-৩ মাসের মধ্যেই বোমা তৈরি সম্ভব বলে মার্কিন বিশেষজ্ঞদের ধারণা ছিল। এই সময়সীমাকে বলা হতো ব্রেক-আউট টাইম।

চুক্তির অধীনে পরমাণু বোমা তৈরির সহায়ক গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামগুলো সরিয়ে ফেলা হয় যাতে করে ব্রেক-আউট টাইম হয এক বছরেরও বেশি।

আর ইরানের এসব শর্ত মেনে নেয়ার বিনিমযে দেশটির বিরুদ্ধে আরোপ করা বিভিন্ন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেয়া হয় । দেশটি আবারো ফিরে পায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রি এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের সুযোগ।

শর্ত অনুযায়ী, ২০৩১ সালের মধ্যে ইরান যদি চুক্তির কোনও শর্ত লঙ্ঘন করে তাহলে একটি যৌথ কমিশন গঠিত হবে। কমিশন যদি সমাধান করতে ব্যর্থ হয় তাহলে বিষযটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে উঠবে।

গভীর উদ্বেগে জাতিসঙ্ঘ : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পরমাণু সমঝোতা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়ায় জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি এ সমঝোতা মেনে চলার জন্য অবশিষ্ট পক্ষগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

মঙ্গলবার রাতে ট্রাম্পের ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এক বিবৃতিতে গুতেরেস বলেন, ইরানের পরমাণু সমঝোতা আন্তর্জাতিক সমাজের একটি বড় অর্জন যা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় সহায়তা করেছে।

এদিকে আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সাবেক সদস্য গ্রে সিক ইরানের পরমাণু সমঝোতা থেকে ট্রাম্পের বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণাকে ‘ঐতিহাসিক ভুল’ উল্লেখ করে বলেছেন, এ সিদ্ধান্ত নিয়ে ট্রাম্প আমেরিকাকে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পরমাণু সমঝোতায় স্বাক্ষরকারী অন্যান্য পক্ষের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ২০১৫ সালের স্বাক্ষরিত পরমাণু সমঝোতা থেকে বেরিয়ে গিয়ে আমেরিকাকে ৫ বছর আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন বলেও মন্তব্য করেন গ্রে সিক।

ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনা করে যা বললেন ওবামা : সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ইরানের পরমাণু সমঝোতা থেকে আমেরিকাকে বের করে নেয়ার সিদ্ধান্তকে ভুল বলে অভিহিত করেছেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার আমেরিকাকে এ সমঝোতা থেকে বের করে নেয়ার ঘোষণা দেয়ার পর ওবামা এ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।

ট্রাম্পের ঘোষণা প্রচারিত হওয়ার পর ওবামা বলেন, এ সিদ্ধান্ত ‘মারাত্মক ভুল’। ২০১৫ সালে ওবামার শাসনামলে ইরানের সঙ্গে পরমাণু সমঝোতায় সই করে আমেরিকাসহ ছয় জাতিগোষ্ঠী।

বারাক ওবামা বলেন, আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিক, বিজ্ঞানী ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার পর ইরানের পরমাণু সমঝোতায় সই করেছিল ওয়াশিংটন। সেই সমঝোতা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার অর্থ হবে আমেরিকার ইউরোপীয় ঘনিষ্ঠ মিত্রদের হাতছাড়া করা।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেন, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় একটি দেশের প্রশাসন পরিবর্তন হলে তার নীতিতে পরিবর্তন আসবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে গেলে বিশ্বব্যাপী আমেরিকার গ্রহণযোগ্যতা মারাত্মকভাবে কমে যাবে। উত্তর কোরিয়াকে তার পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচি থেকে বিরত রাখার সম্ভাব্য আলোচনায় আমেরিকা দুর্বল অবস্থানে থাকবে।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোগানের এক মুখপাত্র বলেছেন, ইরানের পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের একতরফাভাবে প্রত্যাখ্যান করায় নতুন আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা ও সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হবে।

টুইটারের এক পোস্টে এরদোগানের মুখপাত্র ইব্রাহীম কালিন বলেন, অন্যান্য দেশের সঙ্গে ইরানের এই বহুপক্ষীয় চুক্তি অব্যাহত থাকবে। তুরস্ক সবসময় সব ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণের বিরোধিতা করে যাবে।

পরমাণু সিদ্ধান্তকে সৌদী ও তার মিত্র দেশগুলোর সমর্থন : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরমাণু সমঝোতা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার যে ঘোষণা দিয়েছেন তাকে স্বাগত জানিয়ে তার প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছে সৌদি আরবসহ তার মিত্র দেশ আরব আমিরাত ও বাহরাইন। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, “পরমাণু সমঝোতা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে ঘোষণা দিয়েছেন তাকে সৌদি আরব স্বাগত জানাচ্ছে এবং তার প্রতি সমর্থন ঘোষণা করছে।

বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, পরমাণু সমঝোতা সইয়ের পর ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ফলে তেহরান তার সুবিধা নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করার জন্য অর্থ খরচ করছিল। পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে যে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিও সমর্থন দিচ্ছে সৌদি আরব।”

 সৌদি আরবের মিত্র দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহরাইনও ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বিবৃতি প্রকাশ করেছে। এছাড়া, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, তেল আবিব ট্রাম্পের ঘোষণার প্রতি পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছে।

স্থানীয় সময় মঙ্গলবার বিকেলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে ছয় জাতিগোষ্ঠীর সই হওয়া পরমাণু সমঝোতা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

 হুমকির মুখে ইসরাইল ও বন্ধুহীন যুক্তরাষ্ট্র- কেরি : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পরমাণু সমঝোতা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণায় ইহুদিবাদী ইসরায়েল হুমকির মুখে পড়েছে। তার ঘোষণায় যুক্তরাষ্ট্র পুরো ইউরোপ থেকে আলাদা হয়ে একঘড়ে হয়েছে গেছে বলেও মন্তব্য করেন দেশটির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি। তার ইরানের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেয়ার পর সম্ভাব্য বিমান হামলা থেকে রক্ষা পেতে অধিকৃত গোলান মালভূমির ভূগর্ভস্থ আশ্রয় কেন্দ্রগুলো খুলে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে বলে ইসরাইলী ন্যাশনাল নিউজ।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, নিজের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেও সক্রিয় করেছে ইসরায়েলী সেনাবাহিনী। ইসরাইলী সেনাদের সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে বলে ঘোষণা করেছে দেশটির দখলদার বাহিনী। ‘সিরিয়ায় মোতায়েনকৃত ইরানের সেনাবাহিনী সন্দেহজনক তৎপরতা’ চালাচ্ছে তাই তারা সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে বলেছে তেল আবিবের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

এদিকে, মঙ্গলবার রাতে ট্রাম্প ইরানের পরমাণু সমঝোতা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়ার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন।

 নেতানিয়াহু দাবি করেন, ‘গত কয়েক মাস ধরে ইসরাইলে হামলা করার লক্ষ্যে সিরিয়ায় মোতায়েকৃত ইরানি সৈন্যদের কাছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রসস্ত্র পাঠিয়েছে তেহরান। তিনি বলেন, আমাদের ভূখণ্ডে আঘাত আসলে তার কঠোর জবাব দেয়া হবে।’

উল্লেখ্য, ১৯৬৭ সালের ছয়দিনের যুদ্ধে সিরিয়ার গোলান মালভূমি দখল করে নেয় ইহুদিবাদী ইসরায়েল। তখন থেকে এই কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ মালভূমির দুই-তৃতীয়াংশ জবরদখল করে রেখেছে তেল আবিব। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সমাজে এখন পর্যন্ত এ দখলদারিত্বকে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ