ঢাকা, বৃহস্পতিবার 10 May 2018, ২৭ বৈশাখ ১৪২৫, ২৩ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

এখনো আছেন ক্রিস গেইল

মাহাথির মোহাম্মদ কৌশিক : ক্রিকেটের দানব হিসেবে বহু বছর ধরেই পরিচিত ক্রিস্টোফার হেনরি গেইল। চার আর ছক্কার ফুলঝুড়ি দিয়ে নিজেকে নিয়ে গেছেন আলাদা উচ্চতায়। বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে অনেকটা খাদের কিনারে থেকে দলকে তুলে আনতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। অর্থের লোভে পড়েও খেলেননি পাকিস্তান সুপার লিগে (পিএসএল)। তবে খেলছেন ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে (আইপিএল)। তবে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু যখন তাকে ছেড়ে দিয়েছিল, অনেকেই ভেবেছিলেন, ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-২০তেও বুঝি তার সময় শেষ হয়ে এল। নিলামের প্রথম দিনে দল না পাওয়ায় সেটি আরও জোরালো হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় দিনে ভিত্তি মূল্যে কিনে নেয় প্রীতি জিনতার মালিকানাধীন কিংস ইলেভেন পাঞ্জাব। দুটি ম্যাচে বসিয়ে রাখার ঝাল মিটিয়েছেন ঝড়ো হাফ সেঞ্চুরিতে (৩৩ বলে ৬৩), সেদিন নিজেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘ইউনিভার্স বস ইজ ব্যাক’! দ্বিতীয় ম্যাচে নিজেকেই ছাড়িয়ে গেছেন। হাঁকিয়েছেন এবারের আইপিএলে প্রথম সেঞ্চুরি। সানরাইজার্স হায়দরাবাদের বিপক্ষে ৬৩ বলে ১ চার ও ১১ ছক্কায় অপরাজিত ১০৪ রানের দূরন্ত ইনিংসের পর স্বভাবসুলভ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন এভাবে, ‘খেলাটা সবসময় ওঠে না।
আমি বলছি, এই লোকটাকে চিনে রাখুন, গেইলের প্রমাণ করার কিছু নেই!’ পাঞ্জাবের জয়ের চেয়েও তাই বেশি আলোচিত গেইল সেঞ্চুরি, ব্যতিক্রম উদযাপন আর স্বভাবসুলভ বক্তব্য। আগামী সেপ্টেম্বরে ৩৯ বছরে পা রাখতে যাওয়া জ্যামাইকান টর্নেডো তো এ-ও বলেছেন, নিলামে শেষ মুহূর্তে তাঁকে কেনার সিদ্ধান্ত নিয়ে বীরেন্দর শেবাগ (পাঞ্জাব থিঙ্কট্যাঙ্ক) আসলে আইপিএলকেই বাঁচিছেন! ‘আমি সব সময়ই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। অনেকেই বলতে পারে, গেইলের প্রমাণ করার আছে অনেক কিছু, কারণ ওকে আগের ম্যাচে নেয়া হয়নি কিংবা নিলামের শুরুতে কেনা হয়নি। কিন্তু আমি বলব, বীরেন্দর শেবাগ, তুমি আমাকে নিয়ে আইপিএলকেই বাঁচিয়েছ!’ এ বয়সে এসে গেইলের এ নতুন করে প্রমাণ করার নেই, সেটা সবাই মানেন। কিন্তু সমালোচকেরা হয়তো সেটা ভুলে গিয়েছিলেন। ম্যাচ শেষে গেইল তাই আবারও মনে করিয়ে দিলেন, ‘মানতেই হবে সময় কারও জন্য বসে থাকবে না। আমি এখানে কিছু প্রমাণ করতে আসিনি। এসব আগেই দেখেছি, সবকিছু করা শেষ আমার। এ নামটাকে একটু শ্রদ্ধা করুন। সব কোচকেও বলছি, একটু শ্রদ্ধা রাখুন!’ গেইলের মতো ব্যাটসম্যানকে প্রথম দুই ম্যাচ বসিয়ে রেখেছিল পাঞ্জাব। সুযোগ পেয়ে প্রথম ম্যাচেই ৩৩ বলে ৬৩ রান। পরের ম্যাচে সেঞ্চুরি। সেটিও যেনতেনভাবে নয়। একেবারে গেইলীয় স্টাইলে। ৫৮ বলেই পূর্ণ করেন ক্যারিয়ারের ২১তম টি-২০ সেঞ্চুরি। আইপিএলে যেটি রেকর্ড সর্বোচ্চ ষষ্ঠ। শেষ পর্যন্ত ৬৩ বলে অপরাজিত ১০৩। দানবীয় এই ইনিংসটিতে চার বলতে গেলে নেই, ১টি চারের পাশে ছক্কা ১১টি! এবারের আইপিএলে আগের সর্বোচ্চ ইনিংসটি ছিল রোহিত শর্মার। রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর বিপক্ষে ৫২ বলে ৯৪ রান করেছিলেন মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স অধিনায়ক। আসরের প্রথম সেঞ্চুরির পথে গেইল তাঁকে ছাড়িয়ে গেছেন, একেবারে রাজকীয় ভঙ্গিমায়। গেইল আইপিএলে নিজের পঞ্চম সেঞ্চুরিটি করেছিলেন ২০১৫ সালে।
মাঝখানে ফর্মটা খারাপ গিয়েছিল। মাঝের ২ বছরে ৪টি সেঞ্চুরি করেছেন বিরাট কোহলি। তবে ষষ্ঠ সেঞ্চুরিটি তুলে নিয়ে নিজেকে প্রমাণ তো করেছেনই, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সেঞ্চুরিয়ান কোহলির সঙ্গে পার্থক্যও বাড়িয়ে নিয়েছেন। অথচ কোহলির দল রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুই ছিল তার ঠিকানা। পরের ম্যাচেও দলের জয়ে নায়ক সেই গেইল। আবার ঝড়ো ব্যাটিংয়ে কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবকে জিতিয়েছেন। কলকাতা নাইট রাইডার্সকে ৯ উইকেটের বড় ব্যবধানে হারাল তার দল। ঘরের মাঠ ইডেন গার্ডেন্সে এদিন ৭ উইকেটে ১৯১ রান সংগ্রহ করে কলকাতা। জবাবে পাঞ্জাব যখন ৮.২ ওভারে বিনা উইকেটে ৯৬ রান তুলে নেয় তখনই বৃষ্টি নামে। পরে খেলা শুরু হলে জয়ের জন্য ১৩ ওভারে ১২৫ রানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়। গেইল আর লোকেশ রাহুলের ব্যাটিং তান্ডবে ১১.১ ওভারেই ১ উইকেট হারিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছে যায় পাঞ্জাব।
২৭ বলে ৯ চার ও ২ ছক্কায় ৬০ রান করে রাহুল আউট হলেও ৩৮ বলে ৫ চার ও ৬ ছক্কায় ৬২ রানে অপরাজিত থেকে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়েন গেইল। সুযোগ পাওয়ার পর প্রতিপক্ষ বোলারদের ওপর স্টিম রোলার চালিয়ে যাচ্ছেন গেইল। নাইট রাইডার্সের বিপক্ষেও বড় রান তাড়া করতে তার ব্যাটের দিকে তাকিয়ে ছিল প্রীতি জিনতার মালিকানাধীন দলটি। এদিন বৃষ্টি-বাঁধার আগে সঙ্গী লোকেশ রাহুলকে নিয়ে সেটাই করেছিলেন তিনি। গেইল ঝড়ে মাত্র ৮.২ ওভার ব্যাট করে বিনা উইকেটে ৯৬ রান তুলে ফেলে কিংস ইলেভেন। প্রথম দুই ম্যাচ বেঞ্চে বসে কাটানো গেইল টানা তৃতীয় ম্যাচের মতো প্রমাণ করলেন এখনো ফুরিয়ে যাননি। বৃষ্টি নামার আগে মাত্র ২৭ বলে ৪৯ রান করে অপরাজিত ছিলেন গেইল, আর রাহুল ৪৬ রানে। টানা দুই ম্যাচ বাইরে থাকার পর পাঞ্জাবের তৃতীয় ম্যাচে একাদশে সুযোগ পেয়েছিলেন। চেন্নাই সুপার কিংসের বিপক্ষে সেই ম্যাচে মাত্র ৩৩ বলে ৬৩ রানের ইনিংস খেলেন। ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-২০ ইতিহাসে সর্বোচ্চ রানের মালিক গেইল (১১,২৯৭)। এ রান করতে চারের ৮৪৮টি বিপরীতে ছক্কা হাঁকিয়েছেন মাত্র ৮৪০টি! আইপিএলেও সর্বোচ্চ ছক্কার (২৮৬) রেকর্ডটা তারই।
আইপিএলে তিনটি মৌসুম গেইল খেলেছেন রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর। ২০১২ মৌসুমে বেঙ্গালুরুর হয়ে ৭৩৩ রান করেছিলেন। এক হিসাবে দেখা গিয়েছিল, সেবার প্রতি ১০০ বল খেলে তিনি ১৬০ রান করেছিলেন। ২০১৩ সালেও তাঁর ব্যাট থেকে এসেছিল ৭০৮ রান। ২০১৪-তে ৯ ম্যাচে ১৯৬, ২০১৫-তে ১৪ ম্যাচে ৪৯১, ২০১৬-তে ১০ ম্যাচে ২২৭ করেছিলেন। ২০১৭ সালেও ৯ ম্যাচ খেলে ২০০ রান করেছিলেন। বাজে সময় পার করা গেইলকে আর ধরে রাখেন বিরাট কোহলির নেতৃত্বাধীন বেঙ্গালুরু। এগারতম আসরের নিলামের প্রথম দিনে তো দলই পাননি তিনি। দ্বিতীয় দিন বিক্রি হন ওয়েস্ট ইন্ডিজের মারকুটে ব্যাটসম্যান। ভিত্তিমূল্য ২ কোটি রুপিতেই তাকে ক্রয় করেছে কিংস একাদশ পাঞ্জাব। সস্তায় গেইলকে পেয়ে মুখে চওড়া হাসি দেখা যায় দলটির মালিক প্রীতি জিনতার মুখে। মূলত দলটির পরামর্শক বোর্ডের অন্যতম সদস্য বীরেন্দর শেবাগের পরামর্শেই তাঁকে দলে নেয় কিংস ইলেভেন। অবহেলার জবাবটাও দিয়ে চলেছেন বিচিত্র চরিত্রের অধিকারী এই ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান। ভবিষ্যতে দেখা যাবে আর কতদিন এভাবে খেলে যেতে পারেন তিনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ