ঢাকা, বৃহস্পতিবার 10 May 2018, ২৭ বৈশাখ ১৪২৫, ২৩ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

চলনবিল ও আশুরার বিলের শত শত বিঘা জমির ধান তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকরা মহাবিপাকে

চলনবিলের সিংড়ায় কৃত্রিম বন্যায় ১০ হেক্টর জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে, ৫০ হেক্টর জমির ধান আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে (বাঁয়ে) ছবি : আবু জাফর সিদ্দিকী সিংড়া)। দিনাজপুরের আশুরার বিলে এক কৃষক পানির নিচে থেকে এভাবেই ধান উত্তোলন করছেন (ডানে)

শাহজাহান তাড়াশ সিরাজগঞ্জ : দেশের সর্ববৃহৎ বিল চলনবিলের ১৪ উপজেলার নিম্নাঞ্চল গত কয়েক দিনের ভারীবর্ষণে তলিয়ে গেছে। এ অঞ্চলের হাজার হাজার বিঘা জমির কাঁচা পাঁকা বোরো ধান বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকেরা আর্থিকভাবে ক্ষতির সন্মূখীন হওয়ায় তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছে । অনেকে উপায়ান্ত না পেয়ে বাধ্য হয়ে কাঁচা ও আধাপাকা ধান কাটতে শুরু করেছে।
নদ-নদী খাল-বিল বৃষ্টির পানিতে ভরে যাওয়া তা নিচু এলাকায় নেমে আসায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। গত কয়েকদিনের বৈরী আবহাওয়ায় আর বৃষ্টিতে চলনবিলের কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছে। বৃষ্টিতে চলনবিলের নিচু বোরো ধান ক্ষেত তলিয়ে গেছে। চলনবিলে এবার রেকর্ড পরিমাণ জমিতে বোরো ধানের চাষাবাদ করা হয়েছে ।
ধান শীষ ফুলে ফেঁপে ওঠায় এ কৃষকেরা অনেক আশায় বুক বাধলেও সেই আশা বৃষ্টির নীচে ধানের মতোই তলিয়ে গেছে । ফলে তারা স্বপ্নভঙ্গের দুঃশ্চিন্তায় বিচলিত হয়ে পড়েছে। চলতি মৌসুমে এ অঞ্চলে আগুর ধানের ভালো ফলন হয়েছে। কিন্তু গত কয়েক দিনে এ অঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া কালবৈশাখী আর ভারী বর্ষণে বিভিন্ন স্থানে ফুলে ফেঁপে ওঠা আগুর ধান তলিয়ে যাওয়ায় মহাবিপাকে পড়েছে কৃষক।
ইতিমধ্যে চলনবিলের বিভিন্ন এলাকার নিচু বোরো ধান ক্ষেত বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। নিচু এলাকার জমিতে ধানের শীর্ষ পর্যন্ত পানি বেধে গেছে। বেশির ভাগ এলাকায় পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকরা বাধ্য হয়ে কাঁচা ধান কাটতে বাধ্য হচ্ছে। এতে নামমাত্র ফলন পাওয়া যাচ্ছে। চলনবিলের বিভিন্ন স্থানে কৃষককে কোমর পানিতে নেমে দল বেধে কাঁচা ধান কাটতে দেখা যাচ্ছে । নৌকায় করে সেই ধান আবার পাড়ে আনা হচ্ছে।
আধা পাঁকা ধান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় তা অনেকটাই নষ্ট হয়ে গেছে। উচ্চ মুল্যে শ্রমিক লাগিয়ে কৃষকরা খড় আর কিছু ধান পাওয়ার আশায় বাধ্য হয়ে সেই কাঁচা ধানই কাটছেন।
চলনবিলের উল্লাপাড়ার কৃষক মো.শাহজাহান আলী আক্ষেপ প্রকাশ করে জানালেন, বৃষ্টিতে সর্বনাশ করে দিয়ে গেছে। বিলাঞ্চলে তার কয়েক বিঘা জমির কাঁচা ধান বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। উচ্চ মূল্যে শ্রমিক লাগিয়ে তিনি খড় আর কিছু ধান পাওয়ার আশায় সেই কাঁচা ধানই কাটছেন। তার মত একই অবস্থা এই বিলের অনেক কৃষকের। তিনি জানান,শুধু বিল নয় এই এলাকার অনেক নিচু আধা পাকা বোরো ধান ক্ষেতে এখন ধানের শীর্ষ পর্যন্ত পানি আটকে আছে।
এসব জমিতে ধান কাটতে শ্রমিকদের দুইগুন পারিশ্রমিক দিতেও শ্রমিক সংকটে তা যথাসময়ে কেটে ঘরে তোলা সম্ভব হবে কি না, এ ক্ষেত্রেও চরম অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে। সেই সাথে ধান কাটার পর নৌকায় পাড়ে এনে তা বহন করে বাড়িতে আনতে দীর্ঘ সময় লাগছে। এতে উৎপাদন ব্যায় বহুলাংশে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলনও পাওয়া যাচ্ছে কম। চলনবিলের মাঠে মাঠে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হলেও দূর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় কারনে কৃষকরা তা ঘরে তোলো নিয়ে চিন্তিত। আবহাওয়া খারাপ থাকায় বাড়তি টাকাও শ্রমিক মিলছে না।
চলনবিলাঞ্চলের ১৪ উপজেলার অনেক মাঠে পাঁকা ধান কাটা শুরু হয়েছে। তবে মজুরি দ্বিগুণ দিয়েও চাহিদা মাফিক শ্রমিক মিলছে না। বৃহত্তর চলনবিলের শাহজাদপুর, উল্লাপাড়া, রায়গঞ্জ, তাড়াশ, ভাঙ্গুড়া, চাটমোহর, সিংড়া, বড়াইগ্রাম, গুরুদাসপুর, আত্রাই, রাণীনগর, শেরপুর ও নন্দীগ্রাম উপজেলার নিম্নাঞ্চলে রোপিত হাজার হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান ক্ষেত তলিয়ে গেছে। অনেক স্থানে কালবৈশাখী ঝড়ে জমির কাঁচা পাঁকা ধান গাছ নেতিয়ে পড়েছে ও তলিয়ে গেছে।
বিস্তৃর্ণ চলনবিলাঞ্চলের নিম্নভাগের ফসলী জমির মাঠে মাঠে কৃষকরা পানিতে নেমে ধান কেটে নৌকায় করে পারে বয়ে আনছে। আবার অনেক কৃষক ডুবে যাওয়া কাঁচা ধান কাটতে বাধ্য হওয়ায় তারা আর্থিকভাবে চরম ক্ষতির সন্মূখীন হয়ে পড়েছে। শুধু শাহজাদপুর ও উল্লাপাড়া উপজেলায় নয়, গোটা চলনবিলাঞ্চলে হাজার হাজার বিঘা জমির ধান বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। আবহাওয়া এমন থাকলে বাম্পার ফলনের পরও কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে।
নবাবগঞ্জ (দিনাজপুর)
চলতি বোরো মৌসুমে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী আশুড়ার বিলে ৫শ বিঘা কাঁচাপাকা বোরো ধান পানির নিচে। নৌকা দিয়ে পানির নিচে থাকা ধান উত্তোলন করতে চেষ্টা করছে ভুক্তভোগী কৃষকেরা। জেলার সর্ববৃহৎ শুকনো মৌসুমে ধান চাষ আর বর্ষা মৌসুমে দেশী মাছ চাষের উর্বর বিলের নাম আশুড়ার বিল। এলাকার শত শত ক্ষুদ্র প্রান্তিক শ্রেণীর চাষীরা বাড়তি সেচ দিয়ে গোটা বিলে চাষ করেছে বোরো ধান।
বর্তমানে প্রবল বর্ষন আর ধেয়ে আসা পানিতে ভরে গেছে আশুড়ার বিল। এর কারণে কাঁচাপাকা ৫শ বিঘা জমির ধান কর্তন নিয়ে বিপাকে পড়েছে উৎপাদনের সাথে জড়িত থাকা কৃষকেরা। ভুক্তভোগীরা জানান, শুধু শুকনো মৌসুমেই অল্প শ্রম বিনিয়োগ করলেই বিঘা প্রতি ৩৫ থেকে ৪০ মণ ধান উৎপাদন হয় এ বিলে।
রাসায়নিক সারও তেমন ব্যবহার করতে হয় না। গোটা বিলে কৃষি ফসল উৎপাদনের উর্বর ভূমি।
বর্তমানে প্রবল বর্ষনের পানিতে নিচে পড়েছে কৃষকের কষ্টের উৎপাদিত বোরো ধান। এ ধান উৎপাদন করে কৃষকেরা গোটা বছরের খাবারের চাল উৎপাদন করে। ইসলামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুর রউফ জানান, বিলটি এলাকার হতদরিদ্র ও নি¤œ আয়ের মানুষের আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার দৃষ্টান্ত।
কৃষক তহিদুল ইসলাম জানান, পানির নিচে থাকা কাঁচাপাকা ধান কেটে নিতে চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে ৩নং গোলাপগঞ্জ ইউনিয়নের ব্লকের উপ সহকারি কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহিনুর রহমান মুঠোফোনে জানান, তিনি বিষয়টি দেখে আসবেন বলে জানান।
এ বিষয়ে উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা আবু রেজা মো. আসাদুজ্জামান জানান, পানির নিচে থাকা ধানগুলো দ্রুত উত্তোলন করার জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
উল্লেখ্য গত বছর পার্বতীপুর থেকে কয়লাখনির থেকে আসা পানিতে ওই বিলের এক হাজার বিঘা জমি পানিতে নিচে পড়ে ক্ষতি গ্রস্ত হয়েছিল। ভুক্তভোগী কৃষকেরা তাদের কষ্টের উৎপাদিত ধান ঘরে তুলে নিতে অবিরাম চেষ্টা চালাচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ