ঢাকা, শুক্রবার 11 May 2018, ২৮ বৈশাখ ১৪২৫, ২৪ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

যিয়াদ ও তার সোনার সবুজ সংঘ

শাহীন রায়হান : বাংলাদেশের একটি গ্রামের নাম কালমেঘা। গ্রামটি খুব বড় কিন্তু গাছপালায় ঘেরা। যেন ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়। গ্রামের ঠিক মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে একটি খাল। এ খালের ঠিক দু’পাশেই গড়ে উঠেছে গ্রামটি। গ্রামটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে হওয়ায় গ্রামের সব মানুষ এখনও পুরোপুরি সচেতন হয়ে উঠেনি। গ্রামের পূর্ব দিকে রয়েছে স্কুল কলেজ ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পশ্চিম দিকে রয়েছে হাঁটবাজার।

যিয়াদ এই গ্রামেরই ছেলে। ওর হাসি খুশি মাখা মুখে স্বপ্নালু দুটি চোখ। ছোট বুক ভরা দুরন্ত সাহস আর হৃদয়ে ভরা মহানুভবতা। এরপরও ও খুব শান্ত স্বভাবের। চেহারা ও চাহনিতে জ্ঞানী জ্ঞানী ভাব। তবে ও খুব বন্ধুবৎসলও। সবার সাথে মন থেকে মিশে। তাই ওকে সবাই ভালোবেসে ডাকে সোনার ছেলে। 

ওর বয়স কতোইবা হবে আট কি নয় বছর। ক্লাস ফোরে পড়ে। ও ক্লাসের খুব ভালো ছাত্র। একই সাথে ভালো বন্ধু ও সহপাঠী। স্কুলে সবার সহোযোগিতায় ও হাত বাড়িয়ে দেয়। তাই শিক্ষরাও ওকে খুব ভালোবাসে।

বাবাও যিয়াদকে খুব ভালোবাসে। ওর প্রতি মায়েরও ভালোবাসার অন্ত নাই। যিয়াদের স্কুল বাড়ি থেকে দুই কিলোমিটার দূরে। রিকশার পথ। গ্রামের প্রায় সব ছেলে-মেয়েরাই রিকশায় করে স্কুলে যায়। বাবাও যিয়াদকে প্রতিদিন রিকশা ভাড়া ও টিফিন খরচ দেয়। কিন্তু যিয়াদ কখনও রিকশায় করে স্কুলে যায় না। এমনকি স্কুলে নাস্তাও করে খুব সামান্য। বাকি টাকা যিয়াদ একটি বাক্সে জমিয়ে রাখে। এ টাকা দিয়ে অসহায় ছেলে মেয়েদের সাহায্য করে এবং বই খাতা কিনে দেয়।

এইতো সেদিন ওর সহপাঠী সিয়াম সাঁকো পাড় হতে গিয়ে বই খাতাসহ পানিতে পড়ে প্রায় ডুবেই যাচ্ছিল। ছোট ছেলে তার ওপর আবার সাঁতার জানে না। যিয়াদ তখন কি যেন ভাবতে ভাবতে আনমনে বাড়ি ফিরছিল। হঠাৎ খালের দিকে চোখ পড়তেই দেখল সিয়াম ডুবুডুবু অবস্থায় পানিতে ভেসে যাচ্ছে। ও নিজের কথা একটুও ভাবল না বরং খালের পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে সিয়ামকে উদ্ধার করল কিন্তু হারিয়ে গেল সিয়ামের বই খাতা। বই খাতা হারিয়ে সিয়ামের সেকি কান্না। যিয়াদ ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল- “ কি হয়েছে বন্ধু!” সিয়াম মুখে কিছুই বলতে পারল না। কান্নায় যেন ওর কথা গলায় আটকে যাচ্ছিল। যিয়াদ ওর পানি মুছিয়ে দিয়ে বলল- “ ধুর বোকা! বই খাতার জন্য এত কান্না করতে হয় নাকি! আমি তোর বই খাতা কিনে দেব।” যিয়াদের কথা শুনে সিয়ামের মন খুশিতে ভরে গেল। সে মুচকি হেসে সেদিনের মতো বাড়ি চলে গেল।

সন্ধ্যাবেলা। যিয়াদ এক মনে স্কুলের হোম ওয়ার্ক করছিল। কিন্তু ওর মন পড়ে রইল সিয়ামের কাছে। ও মনে মনে ভাবল সিয়ামরা খুব গরীব। বইখাতা কেনার সামর্থ্যও ওর বাবার নেই। আবার বই খাতা ছাড়া ওর লেখাপড়াও বন্ধ হয়ে যাবে। ওর জন্য অবশ্যই কিছু করতে হবে। সিয়ামের কথা ভাবতে ভাবতে যিয়াদের চোখ যে কখন পানিতে ভিজে গেছে তা টেরও পায় নি।

এমন সময় বাবা ডাকল-“ যিয়াদ সোনা।” যিয়াদ বলল-“ জ্বি, বাবা।” বাবা বলল- “ শুনে যা, বাবা।” যিয়াদ হোম ওয়ার্ক রেখে বাবার কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই বাবা বলল- “ কি করছিলে, বাবা?” “হোম ওয়ার্ক করছিলাম”- উত্তর দিল যিয়াদ। বাবা আরও বলল- “ লেখাপড়া কেমন চলছে, বাবা?” যিয়াদ বললÑ “ খুব ভালো।” তারপর মাথা চুলকাতে চুলকাতে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলল- “ বাবা, তোমার সাথে আমার একটা জরুরী কথা আছে।” বাবা বলল- “ এমন করে বলছিস কেন? কি কোন অসুবিধা?” যিয়াদ বলল- “ না, বাবা তা নয়। তবে একটু অসুবিধাও বটে। বাবা বলল- “ ঠিক আছে বলো না।” বাবার কথায় একটু স্বস্তি পেয়ে যিয়াদ বলল- “ বাবা, আমার সহপাঠী  সিয়ামকে তো তুমি চেনো? ওরা তো খুব গরীব। তার ওপর গতকালকে খালের পানিতে ওর বই খাতা হারিয়ে গেছে। ওর বাবার বই কিনে দেওয়ার সামর্থ্যও নেই। তাই ভাবছি আমি ওকে হারিয়ে যাওয়া বই খাতাগুলো কিনে দেব। তুমি কি আমাকে কিছু টাকা দিতে পারবে?”

যিয়াদের কথা শুনে বাবার মন খুশিতে ভরে গেল। সে যিয়াদকে পরম মমতায় বুকের কাছে টেনে নিয়ে বলল- “ এ তো খুব ভালো কথা, বাবা। তুমি এ কথা বলতে এত ভয় পাচ্ছিলে কেন? মানুষের বিপদে এগিয়ে যাওয়াই তো মানুষের কাজ। সারা জীবন মানুষকে এভাবেই ভালোবাসবে। সব ভালো কাজে আমি তোমার সাথে আছি এবং থাকব।” এ কথা বলে বাবা মানিব্যাগ থেকে কিছু টাকা বের করে যিয়াদের হাতে দিতেই সে খুশিতে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে দু’গালে চুমু খেয়ে বলল- “ বাবা তুমি খুব ভালো। তুমিই পৃথিবীর সেরা বাবা।”

খুব সকালে যিয়াদ ঘুম থেকে উঠল। রাত্রেই স্কুলের ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছে। মা বলল- “ নাস্তা রেডি হয়েছে। সারাদিন স্কুলে থাকবি। নাস্তা খেয়ে যা বাবা।” যিয়াদ বলল- “ না, মা। আজকে নাস্তা বাসায় খাব না। আমাকে টিফিন বক্সে করে নাস্তা দিয়ে দাও। স্কুলে গিয়ে খাব। মা যিয়াদকে নাস্তার বক্স দিতেই ও স্কুলব্যাগ নিয়ে স্কুলে রওনা হল। স্কুলের রাস্তার পাশেই সিয়ামদের বাড়ি। সে সিয়ামকে ডেকে নিয়ে প্রথমেই লাইব্রেরি থেকে ওর হারিয়ে যাওয়া বই খাতাগুলো কিনে দিল। তারপর মায়ের দেওয়া নাস্তা সিয়ামকে ভাগ করে দিতেই সে যিয়াদকে জড়িয়ে ধরে আনন্দে পুনরায় কেঁদে ফেলল।

আজ যিয়াদ সিয়ামের জন্য কিছু করতে পেরে খুব খুশি। সেই সাথে যার পর নাই খুশি সিয়ামও।

যিয়াদ মা-বাবার কথা খুব মনযোগ দিয়ে শোনে। মা-বাবার সব কথাই ওর কাছে খুব মূল্যবান। মা-বাবা সব সময়ই বলেন-“ বড় হতে হলে অবশ্যই ভালোভাবে পড়াশুনা করতে হবে। সেই সাথে মানুষকে করতে হবে সম্মান ও সহায়তা।” তাই যিয়াদ নিয়মিত স্কুলে যায়। মন দিয়ে পড়াশুনা করে। বড়দেরও খুব সম্মান করে, সমবয়সীদের ভালোবাসে এবং ছোটদের করে ¯েœহ। 

যিয়াদ খেলাধুলায়ও খুব ভালো। খেলাধুলায় ওর সাথে জুড়ি মেলা ভার। যিয়াদ দাদা-দাদীর গল্প শুনতে খুব ভালোবাসে। সে দাদা-দাদীর কাছ থেকে শুনেছিল- “ খেলাধুলা করলে মানুষের মন সতেজ হয়। সেই সাথে হয় স্বাস্থ্য গঠনও।” বইয়েও যিয়াদ এমন লেখা যেন কোথায় পড়েছিল। তাই সে পড়াশুনার পাশাপাশি নিয়ম করে খেলাধুলাও করে।

স্কুলে গ্রীষ্মকালীন ছুটি চলছে। তাই হাতে অফুরন্ত সময়। আজ রবিবার। বিকালবেলা গ্রামের পশ্চিম দিকে হাঁট বসেছে। হাঁটের পাশেই ঢাকা যাওয়া আসার ব্যস্ত রাস্তা। যিয়াদ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে লোকজনের আসা যাওয়া দেখছিল। হঠাৎ সে লক্ষ্য করল গ্রামের বুড়ো দাদু গনি মিয়া একটি ব্যাগ নিয়ে খুব অসহায়ভাবে রাস্তা পার হচ্ছে। যিয়াদ তাকে সাহায্য করার জন্য পা বাড়ানোর আগেই একটি দ্রুত গতির গাড়ি এসে ধাক্কা দিয়ে তাকে রাস্তার উপর ফেলে দিল। কিন্তু কেউ তার সাহায্যে এগিয়ে এল না। যিয়াদ চিৎকার করতে করতে তার কাছে গিয়ে হাত ধরে টেনে একটি ভ্যানে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিলো। কিন্তু কি দুর্ভাগ্য হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই দাদু রাস্তায় মারা গেল। যিয়াদ গনি দাদুকে খুব ভালোবাসত। দাদুর মৃত্যুতে যিয়াদ খুব ভেঙ্গে পড়ল। এ দৃশ্য যিয়াদের মা-বাবার মনেও খুব দাগ কাটলো।

পরদিন দুপুরবেলা। মা একমনে যেন কি করছিলো। যিয়াদ মায়ের খুব কাছে গিয়ে বসলো। ওর চোখ এখনও জলে ভিজা। বাবাও যিয়াদের দুঃখটা খুব বুঝে। সে যিয়াদকে কাছে টেনে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল-“ বাবা, এদেশে এ রকম হাজারো মানুষের হাজারো সমস্যা। এ সমস্যার পাশে সকলকেই দাঁড়াতে হবে। বিশেষ করে ছোটদেরও। তুমি তো খুব ছোট। তাই তোমার একার পক্ষে এত মানুষের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। তোমার উচিত তোমার সমবয়সীদের নিয়ে একটি সংঘ গড়ে তোলা।

যিয়াদ বাবার কথা শুনে জিজ্ঞেস করল-“ সংঘ কি বাবা?” বাবা বলল- “ কিছু মানুষ একত্রিত হয়ে সম্মিলিতভাবে কোন কাজ করার নামই সংঘ।”

যিয়াদ বাবার কথা শুনে সমবয়সীদের নিয়ে গ্রামে একটি সংঘ গড়ে তুলল। এবং এই সংঘের নাম দিল “ সবুজ সংঘ।”

এখন ওরা সবাই মিলে টিফিনের টাকা ও রিকশা ভাড়া জমিয়ে সব অসহায় লোকদের সহায়তা করে, তাদের ভেঙে যাওয়া ঘর নির্মাণ করে দেয়, বৃদ্ধ লোকদের হাত ধরে রাস্তা পার করে দেয় এবং গরীব ছেলে-মেয়েদের কিনে দেয় বই খাতা।

ওদের দেখাদেখি এখন গ্রামের বড়রাও সচেতন হয়ে উঠেছে। সবাই এখন একে অপরকে সাধ্যমত সাহায্য সহযোগিতা করে। গ্রামে কোন দুঃখ কষ্ট নেই। তাই সবাই খুশি হয়ে ওদের সংঘকে ডাকে “সোনার সবুজ সংঘ।”

সবুজ সংঘ মানব সেবার পাশাপাশি গ্রামের খালি জায়গায় বৃক্ষ রোপণ করে। সেই সাথে করে দুস্থ পশুপাখির সেবা।

এই সংঘের ছেলে -মেয়েরা পড়াশুনায়ও খুুব ভালো। সেবা ও পড়াশুনা করে ওরা সবাই বড় মানুষ হতে চায়। ওদের জন্য ওদের মা-বাবারা খুব গর্বিত। সেই সাথে গর্বিত গ্রামবাসীও।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ