ঢাকা, শুক্রবার 11 May 2018, ২৮ বৈশাখ ১৪২৫, ২৪ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

৯ বছরে ব্যাংকিং খাত থেকে আওয়ামী লীগ ২ লাখ কোটি টাকা লুট করেছে -মির্জা ফখরুল

 

#  শেয়ার বাজারের আতংক এখন ব্যাংকে #  ব্যাংকগুলোর বড় পদে নিজেদের লোক বসিয়ে লুটপাট করেছে সরকার # একদিন এদের বিচার জনতার আদালতে হবে

স্টাফ রিপোর্টার : বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের দুই মেয়াদে গত ৯ বছরে ব্যাংকিং খাত থেকে ২ লাখ হাজার কোটি টাকা লুট হয়েছে। তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোর বড় বড় পদে নিজেদের লোক বসিয়ে লুটপাট করেছে আওয়ামী নেতাকর্মী, সমর্থক ও আওয়ামী মদদপুষ্ট গোষ্ঠী। এই যে হাজার হাজার কোটি টাকা নাই হয়ে গেল, তাতে সরকারের কোন মাথা ব্যাথা নেই। কারণ বর্তমান ভোটারবিহীন অবৈধ সরকারের জনগণের নিকট কোনও দায়ববদ্ধতা নেই। দুর্নীতিগ্রস্ত ফ্যাসিস্ট সরকারের এহেন গণবিরোধী অর্থনীতি বিধ্বংসী কর্মকান্ড জনগণ কখনও ক্ষমা করবে না। একদিন জনতার আদালতে এদের বিচার হবে। 

গতকাল বৃহস্পতিবার গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করে মির্জা ফখরুল এসব অভিযোগ করেন। ব্যাংকিং খাতের বর্তমান চিত্র তুলে ধরতে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ ড. মঈন খান ও আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বক্তব্য দেন। 

মির্জা ফখরুল বলেন, আওয়ামী সরকারের বর্তমান ক্ষমতার ৯ বছরে দেশের অধিকাংশ সরকারি বেসরকারি ব্যাংক, ননব্যাংক ও ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিদারুণ ধ্বংসের মুখে পতিত হয়েছে। সুশাসনের অভাব, জবাবদিহিতার অভাব, দুর্নীতি, লুটপাট, নীতিহীনতা আর বিশৃংখলা সব মিলিয়ে এক অস্থিতিকর ও নৈরাজ্যকর অবস্থায় রয়েছে বর্তমান ব্যাংকিং খাত। ঋণের নামে ও বিভিন্ন কারসাজি করে গ্রাহকের প্রায় ২ লক্ষ হাজার কোটি টাকা লুটে নিয়েছে আওয়ামী নেতাকর্মী, সমর্থক ও আওয়ামী মদদপুষ্ট গোষ্ঠী। মুখ থুবড়ে পড়েছে দেশের ব্যাংকিং সেক্টর। এক সময় শেয়ার বাজারে আতংক থাকলেও এখন ব্যাংকিং সেক্টরে সেই আতংক তৈরি হয়েছে।  

তিনি বলেন, বর্তমানে ব্যাংকগুলো তীব্র তারল্য সংকটে জর্জরিত। ধার-দেনা করে চলছে দেশের বেশিরভাগ ব্যাংক; বিশেষ করে প্রাইভেট ব্যাংকগুলো। সরকারি ব্যাংকগুলোও তাদের মূলধনের অনেকাংশই লুটে নিয়েছে। আমানতকারীরা লাইন ধরে আমানতের টাকা ফেরত নিতে চাচ্ছে। তারা চেক দিয়েও সময়মত টাকা পাচ্ছে না।তহবিলের অভাবে চেক বাউন্স হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদনপ্রাপ্ত ঋণও ফেরত নেওয়া হচ্ছে। এফডিআর ভাঙ্গানোর হিড়িক পড়েছে ব্যাংকগুলোতে। 

মির্জা ফখরুল উল্লেখ করেন, বড় ধরনের ব্যাংক কেলেঙ্কারির শুরু হয় ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক গ্রুপ কেলেঙ্কারি থেকে। হলমার্ক গ্রুপের লোপাটকৃত অর্থের পরিমাণ সাড়ে চার হাজার কোটি টাকারও বেশি। এই অর্থ আত্মসাতের সাথে প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দ মোদাচ্ছের আলীসহ রাজনৈতিক বিবেচনায় নিযুক্ত সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদের সদস্যদের নাম জড়িয়ে আছে। এছাড়াও সরকারি জনতা ব্যাংক এবং বেসরকারি শাহ্জালাল ইসলামী, যমুনা, প্রিমিয়ার এবং প্রাইম ব্যাংক থেকে বিসমিল্লাহ  গ্রুপের ১২শ’ কোটি টাকার বহুল আলোচিত ঋণ জালিয়াতির কথা সবাই জানেন। এ ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংশ্লিষ্ট সরকারদলীয় দুই এমপির ছেলেকে আসামী করেনি। 

পরিসংখান দিয়ে বিএনপি মহাসচিব জানান, জনতা ব্যাংকের মোট মূলধন ২ হাজার ৯৭৯ কোটি টাকা। মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার সুযোগ আছে। কিন্তু দেওয়া হয়েছে মোট মূলধনের প্রায় দ্বি-গুণ। রাজনৈতিক বিবেচনায় শেখ আব্দুল হাই বাচ্চু বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হওয়ার পর ব্যাংকটি দেউলিয়াত্বের পর্যায়ে চলে যায়। ব্যাংকটি প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারির কারণে সংকটে পড়ে। এনআরবি ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকেও সীমাহীন অনিয়ম হচ্ছে। জনমতের অব্যাহত চাপের ফলে দুদক বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে লোক দেখানো (আইওয়াশ) তদন্ত নাটক শুরু করেছে। দুদকের তদন্ত চলাকালে আব্দুল হাই বাচ্চুর সহাস্য টিভি সাক্ষাৎকার দেখে মানুষ এই তদন্তের পরিণতি সম্পর্কে হতাশ হয়েছে। 

 

মির্জা ফখরুল আরও বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় জনতার মঞ্চের নায়ক মহিউদ্দিন খান আলমগীরের নেতৃত্বে ফারমার্স ব্যাংক চালু হবার পর ব্যাংকটি আমানতকারীদের ও সরকারি খাত হতে জমাকৃত অর্থ অধিকাংশ আত্মসাৎ করেছে। ব্যাংকটি ঋণ বিতরণে অনিয়ম, জালিয়াতি ও লুটপাটে অতীতের যে কোনো ব্যাংক কেলেঙ্কারি-অনিয়মকে ছাড়িয়ে গেছে। এই ব্যাংকের কাছে পাওনা যে কেবল ব্যক্তিগত আমানতকারীদের বা প্রতিষ্ঠানের তা নয়, এর মধ্যে জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ডের ৪৯৯ কোটি ৬৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা। সুদসহ যা ৫১০ কোটিতে পৌঁছেছে।

 

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রিজার্ভ চুরির ঘটনা উল্লেখ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ক্ষমতায় আসার পরপরই আওয়ামী লীগ সরকার তাদের অনুগত ড. আতিউর রহমানকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ করে ২০০৯ সালে। তার আমলেই রাষ্ট্রীয় কোষাগার  থেকে ৮০০ কোটি টাকা লুট হয়ে যায়।  বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে ডলার চুরির ঘটনায় ‘রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা’ রয়েছে এবং ‘ব্যাংক ডাকাতির হোতারা ব্যাংকের ভিতরেই আছে’ বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই’র এক কর্মকর্তা। বাংলাদেশ সরকারের আশীর্বাদ না থাকলে ব্যাংক ডাকাতির হোতাদের বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরে থাকা সম্ভব নয়। চুরি হয়ে যাওয়া অর্থের সামান্য অংশ ফেরত এলেও সিংহভাগ অর্থই আর ফেরত পাওয়ার সম্ভবনা নেই। 

ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা বদলের ঘটনা উল্লেখ করে বিএনপির এই শীর্ষ নেতা বলেন, ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা বদলের পর দেশে বেসরকারি খাতের সবচেয়ে বড় ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক এখন তীব্র আর্থিক সংকটে। সরকারি হস্তক্ষেপে মালিকানা বদলের পর মাত্র ১৫ মাসেই ব্যাংকটি এই ভয়াবহ দুর্দশায় পড়েছে। পরিবর্তনের আগমুহূর্তেও ব্যাংকটিতে ১০ হাজার কোটি টাকার মতো বিনিয়োগযোগ্য তহবিল ছিল। ২০১৭ সালে পট পরিবর্তনের পর ব্যাংকটির ৮ কোটি ৬৯ লাখ শেয়ার বিক্রি করেছে উদ্যোক্তা পরিচালক ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি), ২৫০ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছে কুয়েতের সরকারি ব্যাংক কুয়েত ফাইন্যান্স হাউস, আর যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক জেপি মরগানের একজন গ্রাহক ইসলামী ব্যাংকের ৪ দশমিক ১৬ শতাংশ শেয়ার কিনে নিয়েও আবার ছেড়ে দিয়েছেন। 

মির্জা ফখরুল আরও  বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থমন্ত্রীর নিকট থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার অনৈতিক সুবিধা হাতিয়ে নেবার পরেই অবৈধ প্রধানমন্ত্রী ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) নেতা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের গণভবনে নৈশভোজে আপ্যায়ন করেন। এরপরেই প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে তারা ১৬০ কোটি টাকা অনুদান প্রদান করেন। এর আগেও আমরা দেখেছি যে কিছুদিন পর পর ব্যাংক মালিকদের সংগঠনের ব্যানারে ব্যাংক মালিকরা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে কোটি কোটি টাকার চেক দান করেছেন। ব্যাংকগুলো যেখানে আমানতকারীর অর্থ ফেরত দিতে পারছে না সেখানে কিভাবে তারা ঈঝজ এর নামে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে কোটি কোটি টাকার অর্থ প্রদান করেন তা নিয়ে আমানতকারীদের মনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। 

ব্যাংকিং খাতের বর্তমান এই দুর্নীতি ও বিপর্যয়ের জন্য আওয়ামী লীগ সরকারই দায়ী। আর্থিক খাতে সুশাসন না থাকার ফলে ব্যাংক লুটেরারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় আওয়ামী আশির্বাদপুষ্ট মহল আরও উৎসাহিত হয়ে নানা কৌশলে ব্যাংকের অর্থ লুন্ঠন করেই যাচ্ছে। বর্তমানে সব ব্যাংকিং খাতে যে রক্তক্ষরণ হচ্ছে তা অচিরেই অর্থনীতিকে রক্তশূন্য করে ফেলবে। রাষ্ট্র ও সমাজ মুখোমুখি হবে গভীর সংকটে। বর্তমান অবৈধ সরকারকে অবশ্যই এই দায়ভার নিতে হবে। 

সাংবাদিক সম্মেলনে ব্যারিস্টার মওদুদ বলেন, ভোগ আর নিয়ন্ত্রকের ভ’মিকা থাকার কারণে ব্যাংকিং সেক্টরে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার থাকলে সরকার একাজটি করতে পারতো না।ং আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন বিএনপি ক্ষমতায় আসলে এগুলো বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ