ঢাকা, শুক্রবার 11 May 2018, ২৮ বৈশাখ ১৪২৫, ২৪ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ডিশ ব্যবসার আধিপত্য নিয়ে খুন হন বাবু॥ নির্দেশ আসে বিদেশ থেকে  

 

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : রাজধানীর গুলশান, বাড্ডা ও ভাটারা এলাকার ডিশ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে একাধিক গ্রুপ। তাদের মধ্যে রবিন কোম্পানী গ্রুপের সাথে ডিশ বাবু গ্রুপের দ্বন্দ্ব চলছিল বছরের পর বছর। প্রতিমাসে লাখ লাখ টাকা আয়ের লোভই তাদের দ্বন্দ্বকে উসকে দিয়েছে। তার ওপর ছিল ডিশ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণের আধিপত্য। ডিশ ব্যবসাবহুল তিন এলাকার আধিপত্য নিয়েই রবিন কোম্পানি গ্রুপের সঙ্গে দ্বন্দ্বে আব্দুর রাজ্জাক বাবু ওরফে ‘ডিশ বাবু’ (৩০) খুন হয়েছেন বলে সন্দেহ পুলিশের। আর বাবুকে হত্যার নির্দেশ বিদেশ থেকে আসে। রবিন গ্রুপের প্রধান এ নির্দেশ দেয়। তিনদিন আগেও তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয় বলে তদন্তে জানতে পেরেছে পুলিশ। ঘটনার পর প্রাথমিক যে তথ্য-প্রমাণ পুলিশ পেয়েছে তাতে এমনটাই সন্দেহ তাদের। যদিও আরও অনেক বিষয় মাথায় নিয়ে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছেন।

এদিকে ডিশ বাবুকে গুলী করে হত্যার ঘটনার পর জনতার ধাওয়ায় আটক তিনজনের মধ্যে একজন গোয়েন্দা পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। নিহত সাফায়েত হোসেন তামরিন ওরফে রানার (২৮) বিরুদ্ধে চারটি হত্যা মামলাসহ বিভিন্ন অভিযোগে ডজনখানেক মামলা রয়েছে বলে গোয়েন্দা পুলিশের উপ কমিশনার (উত্তর) মো. মশিউর রহমান জানান।

বুধবার রাতে দক্ষিণ বাড্ডার জাগরণী ক্লাবের সামনে গুলিতে নিহত হন আব্দুর রাজ্জাক ওরফে ডিশ বাবু। তার বাবার নাম মো. ফজলুর রহমান। ফজলুর স্থানীয় একটি স্কুলের নিরাপত্তা প্রহরী।

ডিশ ব্যবসার আধিপত্য নিয়ে খুন হন বাবু : পুলিশ

গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) মো. মশিউর রহমান বলেন, বাড্ডা, ভাটারা গুলশান এলাকায় ডিশ ও ইন্টারনেটের ব্যবসা বিভিন্ন পক্ষ নিয়ন্ত্রণ করছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে ডিশ বাবু গ্রুপ। আরেকটি রবিন কোম্পানি। বর্তমানে বাড্ডার জাগরণী ক্লাব এলাকার ডিশ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছিলেন ডিশ বাবু ও তার লোকেরা। রবিন কোম্পানি গ্রুপের লোকেরা সেখানে আধিপত্য বিস্তার করতে চাইছেন। তাদের দলের মূল ব্যক্তি হলেন তিনজন। এদের মধ্যে রবিন মালয়েশিয়ায় থাকেন। অপর দুজন ডালিম ও রমজান দেশে আছেন। এই গ্রুপে আছেন তানভীর সাফায়েত হোসেন তামরিন ওরফে রানা, হেলাল, শুভ ও অভি। তিন দিন আগেও তারা ডিশ বাবুকে মারার চেষ্টা করেন। কিন্তু তখন হত্যা করতে পারেনি।

পুলিশ বলছে, বুধবার বিদেশ থেকে ইন্টারনেট ব্যবহার করে ফোনে বাবুকে খুনের হুকুম দেন রবিন। তার নির্দেশনা অনুসারে সাফায়েত তানভীর, হেলাল ও অভি গুলশান কমার্স কলেজের কাছ গিয়ে শুভর কাছ থেকে অস্ত্র নেন। পরে তানভীর, হেলাল ও অভি মোটরসাইকেলে করে জাগরণী ক্লাবের কাছে বাবুর ডিশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যান। সেখানে থাকা চার-পাঁচজনের মধ্যে ডিশ বাবুকে গুলি করে মোটরসাইকেল যোগে পালাতে যান। যে পথে তারা যেতে থাকেন সেই পথে রাস্তা ভাঙা থাকায় মোটরসাইকেল আটকে যায়। পরে তারা মোটরসাইকেল ফেলে হাতে থাকা অস্ত্র কাঁধে থাকা ব্যাগে ঢুকিয়ে হাঁটতে শুরু করেন। ব্যাপারী টাওয়ার দিয়ে যাওয়া শুরু করলে সেখানে থাকা ছাত্রলীগ, যুবলীগের কয়েকজন তানভীরকে দেখে ফেলেন। এ সময় তানভীরকে তারা আটক করে। অন্যরা পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় অন্য দুজনকে আটক করে পুলিশ।

হত্যার সন্দেহভাজন ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত

ডিশ বাবুকে গুলি করে হত্যার ঘটনার পর জনতার ধাওয়ায় আটক তিনজনের মধ্যে একজন গোয়েন্দা পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। নিহত সাফায়েত হোসেন তামরিন ওরফে রানার (২৮) বিরুদ্ধে চারটি হত্যা মামলাসহ বিভিন্ন অভিযোগে ডজনখানেক মামলা রয়েছে ।বুধবার রাতে কেবল অপারেটর আব্দুর রাজ্জাক ওরফে ডিশ বাবু (৩০) খুন হওয়ার পর জনতা ধাওয়া দিয়ে তিনজনে আটক করে। তাদের মধ্যে রানাকে নিয়ে গোয়েন্দা পুলিশ বৃহস্পতিবার ভোরের দিকে আফতাবনগরের এল ব্লকে অভিযানে যায়। সেখানেই রানার সহযোগীদের সঙ্গে গোলাগুলির ওই ঘটনা ঘটে।

কেবল অপারেটর আব্দুর রাজ্জাক বাড্ডা এলাকায় ‘ম্যাক্স’ নামের একটি দোকান দিয়ে ব্যবসা করতেন। বাড্ডার আলাতুনেসা স্কুল রোডের এক বাসায় থাকতেন তিনি।

বাড্ডা থানার ওসি কাজী ওয়াজেদ আলী জানান, দক্ষিণ বাড্ডার জাগরণী ক্লাবের সামনে বুধবার রাতে রাজ্জাকের ওপর গুলি চালানো হয়। রাত ১০টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ওই থানার উপ পরিদর্শক আব্দুল মান্নাফ জানান, রাজ্জাক খুন হওয়ার পর স্থানীয় জনতার ধাওয়ায় তিন সন্দেহভাজন যুবক স্থানীয় একটি ইন্টারনেটের দোকানে ঢুকে যায়। তখন স্থানীয়রা বাইরে থেকে ওই ঘরে তালা লাগিয়ে দেয়। পরে থানা পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ ও সোয়াটের সদস্যরা ঘটনাস্থলে আসেন এবং অস্ত্রসহ তিনজনকে আটক করা হয়।

তাদের মধ্যে দুজন জনতার পিটুনিতে আগেই আহত হয়েছিলেন। রাত দেড়টার দিকে তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে সাফায়েত হোসেন তামরিন ওরফে রানাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যায় গোয়েন্দা পুলিশ।

গোয়েন্দা পুলিশের উপ কমিশনার (উত্তর) মো. মশিউর রহমান বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রানাকে নিয়ে তার অন্য সহযোগীদের গ্রেপ্তারের জন্য ভোরের দিকে আফতাবনগরের এল ব্লকে যায় গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল। “ভোর ৪টা ২০ মিনিটের দিকে ওই এলাকায় ওঁত পেতে থাকা রানার সহযোগীরা পুলিশের দিকে গুলি শুরু করে। আত্মরক্ষার জন্য পুলিশও তখন পাল্টা গুলি চালায়। এক পর্যায়ে রানা গাড়ি থেকে নেমে পালানোর চেষ্টা করে। গোলাগুলি থামার পর তাকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়।”

ভোর ৫টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক রানাকে মৃত ঘোষণা করেন বলে মশিউর রহমান জানান। তিনি বলেন, রানার বাসা সাভারে হলেও সে দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর বাড্ডা-রামপুরা এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকা- চালিয়ে আসছিল। তার বিরুদ্ধে রমনা, বাডাডা ও গুলশান থানায় অন্তত চারটি হত্যা মামলা রয়েছে। এছাড়া অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকা-ের অভিযোগে আরও অন্তত আটটি মামলা রয়েছে।

হত্যার নির্দেশ আসে বিদেশ থেকে  

ডিশ ব্যবসায়ী বাবুকে হত্যার নির্দেশ বিদেশ থেকে আসে। রবিন গ্রুপের প্রধান এ নির্দেশ দেয়। তিন দিন আগেও তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয় বলে তদন্তে জানতে পেরেছে পুলিশ।গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে বাড্ডা থানার ওসি কাজী ওয়াজেদ আলী বলেন, ‘বাড্ডা, ভাটারা ও গুলশান এলাকায় ডিশ ও ইন্টারনেটের ব্যবসা বিভিন্ন গ্রুপ নিয়ন্ত্রন করছে। তাদের মধ্যে ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্ধ ছিল চরমে। বাবুও একটি গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করতেন। আবার রবিন কোম্পানি গ্রুপও একই এলাকায় ব্যবসা করেছে। জাগরণী ক্লাব এলাকার ডিশ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন বাবু ও তার লোকজন। তবে রবিন গ্রুপ এ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। রবিন মালয়েশিয়ায় থাকলেও তার সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে এ দেশে ডালিম ও রমজান সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। তিন দিন আগেও তারা ডিশ বাবুকে হত্যার চেষ্টা করে। গ্রেপ্তারকৃত তিনজনই তখন ছিল। আর এ হত্যার নির্দেশ ইন্টারনেটের মাধ্যমে রবিন তার সহযোগীদের দেয়।’

স্থানীয়রা বলছেন, উল্লিখিত এলাকায় কোটি কোটি টাকার ডিশ ও ইন্টাররেট ব্যবসা হয়। এ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের জন্য বাবু, রবিন গ্রুপই নয়, আরো কয়েকটি গ্রুপ আছে। অনেক সময় তাদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ হয়েছে। যেকোনো সময় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষও হতে পারে।

এদিকে বিকেল পর্যন্ত বাবু হত্যার ঘটনায় থানায় কোনো মামলা হয়নি। নিহতের স্বজনরা থানায় আসলেই মামলা নেওয়া হবে বলে পুলিশ জানিয়েছে। সেক্ষেত্রে হত্যা ও অস্ত্র আইনে পৃথক মামলা হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ